ধর্ম ও জীবন

মদীনা রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকা-ের কেন্দ্র ছিল মসজিদ

প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-১০-২০১৮ ইং ০০:৫২:০৫ | সংবাদটি ৭২ বার পঠিত

মাওলানা মুহাম্মদ জমীরুদ্দিন
খতিব, হাজী কুদরত উল্লাহ জামে মসজিদ, সিলেট।
বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ মুসলিম। মুসলিমগণ একতাবদ্ধ হয়ে কল্যাণকর কাজ করার জন্য এবং ইবাদত বন্দেগী করার লক্ষ্যে মসজিদ তৈরি করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেন, কলেমা, সালাত, সাওম, হজ্জ, যাকাত হচ্ছে দ্বীনের স্তম্ভ। খুঁটি ছাড়া যেমন ঘর তৈরি করা যায় না, তদ্ররুপ কলেমা, সালাত, সাওম, হজ্জ, যাকাত আদায় না করলে মুসলিম হওয়া যায় না। বর্ণিত কল্যাণকর কাজসমূহের আলোচনা, আহ্বান, প্রেরণা ও তাগিদ দেওয়ার জন্যই মুসলিমদের মসজিদ। মানুষের জীবনে মসজিদের গুরুত্ব অপরিসীম, তার অবস্থান অনেক উপরে, এর সংক্ষিপ্ত কিছু বিষয় আলোচনা করছি।
মসজিদ আল্লাহ তা‘আলার ঘর, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘এবং এই যে মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। সুতরাং আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না। বর্ণিত আয়াতে আয়াতে মসজিদকে আল্লাহর দিকে সম্বন্ধযুক্ত করে উল্লেখ করার মাধ্যমে মূলত মসজিদের মর্যাদা ও গুরুত্ব ফুটে উঠেছে। মসজিদ পৃথিবীতে সর্বোত্তম জায়গা এবং আল্লাহ তা‘আলার সবচেয়ে প্রিয় স্থান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম জায়গা মসজিদ এবং সর্ব-নিকৃষ্ট জায়গা বাজার।’ (সহীহ মুসলিম)
আল্লাহ তাআলা বলেন, একমাত্র তারাই আল্লাহর মসজিদসমূহ আবাদ করবে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না। আশা করাযায়,ওরাহিদায়াতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’। (সূরা : তাওবা, আয়াত : ১৮)
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি তার বাড়ীতে পবিত্রতা অর্জন করল অতপর ফরয ইবাদত আদায়ের উদ্দেশ্যে আল্লাহর ঘরে (মসজিদে) গেল তার এক কদমের বিনিময়ে গুনাহ মার্জনা হবে এবং অপর কদমের বিনিময়ে মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।’ (মুসলিম : ৬৬৬)
সুতরাং মুসলিম হিসেবে মসজিদের সাথে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। প্রতিদিন আমাদেরকে ৫বার মসজিদে নামাযের উদ্দেশ্যে যেতে হয়।
অতএব মসজিদ সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের জানা থাকা দরকার। কিছু বিষয়ে আমাদের সচেতনতা দরকার। আশা করি বিষয়টি আমাদেরকে মসজিদ সম্পর্কে আরও যতœশীল ও সচেতন হতে সাহায্য করবে। তাই নিম্নে কুরআন ও হাদীসের আলোকে মসজিদের কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ আদব উল্লেখ করা হল।
হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি পেয়াজ বা রশুন খায়, সে যেন আমাদের থেকে অথবা আমাদের মসজিদ থেকে দূরে থাকে এবং সে যেন তার স্বীয় ঘরে বসে থাকে’। মুসলিম শরীফের অপর এক বর্ণনায় বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘নিশ্চয় ফেরেশতারা ঐ সব বস্তু হতে কষ্ট পায়, যে বস্তু হতে মানুষ কষ্ট পায়’।
ওমর বিন খাত্তাব (রা.) তার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষকে এ বলে ভাষণ দেন, ‘হে মানুষ তোমরা দুটি গাছ খাও এ দুটিকে খবীস বলেই মনে করি। গাছ দুটি হল, পেয়াজ ও রসুন। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখেছি, তিনি মসজিদে কোন মানুষ থেকে এ দুটি গাছের দুর্গন্ধ পেলে তাকে মসজিদ থেকে বের করে দিতেন। যদি কেউ খায় সে যেন গাছ দুটিকে সম্পূর্ণ পাক করে নেয়’। সুনানে ইবনে মাজাহ। আলবানী (রা.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।
মসজিদকে উঁচা করা, ও সাজানো ইত্যাদি নিষিদ্ধ হওয়া সম্পর্কে একাধিক হাদিস বর্ণিত। আর মসজিদ বানানোর ক্ষেত্রে অপচয় না করে পরিমিত খরচ করার বিষয়ে নির্দেশ সম্বলিত বিভিন্ন হাদিস বর্ণিত। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যতদিন পর্যন্ত মানুষ মসজিদ নিয়ে অহংকার না করবে ততদিন পর্যন্ত কিয়ামত কায়েম হবে না’। (সুনানে আবু দাউদ)।
হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত রাসূল বলেন, আল্লাহ তা‘আলা ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের অভিশাপ করেন। তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়েছে। (সহিহ আল বুখারি)
হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, উম্মে হাবীবাহ (রা.) ও উম্মে সালমা (রা.) তারা উভয়ে মুলকে হাবসাতে দেখা একটি উপাসনালয়ের কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আলোচনা করেন, যার মধ্যে রয়েছে মূর্তি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাদের মধ্যে যখন কোন ভালো লোক মারা যেত, তারা তাদের কবরের উপর মসজিদ বানাত এবং এ সব মূর্তি গুলো তাদের আকৃতিতে তৈরি করত। এরা আল্লাহর কিয়ামতের দিব সর্বাধিক নিকৃষ্ট সৃষ্টি। (সহিহ আল বুখারি)
পুরুষের জন্য মসজিদ সালাত আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্ব বিষয়। জামা‘আতের সাথে সালাত আদায় করা কেউ ওয়াজিব বা ফরযে আইনও বলেছেন। তবে যদি মসজিদ পাওয়া না যায় অথবা মসজিদ অনেক দূরে; আযান শোনা যায় না অথবা সফরে অবস্থান করছে, তখন জামা‘আতে সালাত আদায় করা ফরয নয়। জামা‘আত শুধু সক্ষম ব্যক্তির উপর ওয়াজিব, অক্ষমের উপর নয়। যারা অক্ষম তারা যে কোন পবিত্র স্থানে সালাত আদায় করে নেবে। জামায়াতের সাথে সালাত আদায়ের গুরুত্বÑ আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : তোমরা নামায সুপ্রতিষ্ঠিত কর এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু কর। (সূরা : বাকারা, আয়াত : ৪৩)
জামাআতের সাথে নামাজ পড়ার আগ্রহ ও উৎসাহ প্রদানে এবং তার ফযীলত সর্ম্পকে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। অপর দিকে জামাআত র্বজন ও জামাতের সাথে নামাজ আদায়ে অবহেলাকারীর বিরুদ্ধে ও তার অবহেলার ক্ষেত্রে সর্তককারী হাদীস এসেছে।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার এক অন্ধ ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলো, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.) আমার এমন কেউ নেই, যে আমাকে হাত ধরে মসজিদে আনবে। অতঃপর লোকটি মসজিদে উপস্থিত হওয়া থেকে অব্যাহতি চায় এবং ঘরে নামাজ পড়ার অনুমতি চায়। তিনি তাকে ঘরে নামাজ পড়ার অনুমতি দিয়ে দেন। অনুমতি পেয়ে লোকটি রওনা করে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে পুনরায় ডেকে পাঠান। সে ফিরে আসে। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তুমি কি আজান শুনতে পাও? সে বললো, হ্যাঁ, শুনতে পাই। তিনি বললেন, তাহলে তুমি মসজিদে উপস্থিত হবে।
ইমাম ইবনুল কাইয়ুম রাহিমাহুল্লাহু বলেন, যে ব্যক্তি হাদিসসমূহে ভালোভাবে চিন্তা করে, তার নিকট এ কথা স্পষ্ট হবে, মসজিদে জামা‘আতের সাথে সালাত আদায় করা ফরযে আইন। তবে কোন কোন অপরাগতা এমন আছে যেগুলোর কারণে জামা‘আত ও জুমু‘আর সালাত ছেড়ে দেয়া বৈধ। কোন প্রকার অপারগতা ছাড়া মসজিদে উপস্থিত হওয়া ছেড়ে দেয়া, বিনা ওজরে জামা‘আত ছেড়ে দেয়ার নামান্তর। আল্লাহ তায়লা বলেন, তাঁর আলোর পথ অবলম্বনকারী) ঐ সব ঘরে পাওয়া যায়, যেগুলোকে উন্নত করার ও যেগুলোর মধ্যে নিজের নাম স্মরণ করার হুকুম আল্লাহ দিয়েছেন ৷ সেগুলোতে এমন সব লোক সকাল সাঁঝে তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে৷ পরিতাপের বিষয় হলো, মসজিদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে সালাতের জামাত অনুষ্ঠান পর্যন্ত।
মদীনায় পদার্পণ করেই প্রথম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববী নির্মাণ করেন। তারপর এই মসজিদকে রূপ দেন তিনি মদীনা রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকা-ের প্রাণকেন্দ্রে। মসজিদ ছিল একই সঙ্গে দাওয়াতী কাজের প্রাণকেন্দ্র এবং রাষ্ট্রীয় ভবন। এখান থেকেই পরিচালিত হত দাওয়াতী কার্যক্রম। মসজিদ যেহেতু আল্লাহর বান্দা এবং আল্লাহতে সমর্পিত, ইবাদতে নিবেদিতদের ঘর, তাই বিশ্বাসী মুসলিম মাত্রেই এর নির্মাণ, পরিচালন বা রক্ষণাবেক্ষণের যে কোনো পর্বে অংশ নিতে পারাকে একান্ত সৌভাগ্যের ব্যাপার ভাবেন। তাই বলে সামাজিকভাবে মুসলিম দাবী করলেই কেউ মসজিদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নিতে পারেন না। তাঁকে ন্যূনতম কিছু বৈশিষ্ট্য ও যোগ্যতায় উত্তীর্ণও হতে হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, একমাত্র তারাই আল্লাহর মসজিদসমূহ আবাদ করবে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না। আশা করা যায়, ওরা হিদায়াতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’। (সূরা : তাওবা, আয়াত : ১৮)
সুতরাং অমুসলিমরা যেমন মসজিদ আবাদে যুক্ত হতে পারেন না। তেমনি ইসলামের শর্তভঙ্গকারী মুসলিম পরিচয় দানকারীরাও পারেন না মসজিদ কমিটির সহস্য হতে। কারো সামাজিক ক্ষমতা বা আর্থিক প্রতিপত্তি থাকলেই তাকে মসজিদ পরিচালনায় শ্রেয় ভাবা সঙ্গত নয়। মসজিদের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক পেশা বা স্বভাবের কেউ মসজিদ কমিটির যোগ্য হতে পারেন না। নিজের একাধিক প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অধুনাকালে অনেক মসজিদেই কমিটি গঠনে মসজিদের লক্ষ্য-উদ্দেশের প্রতি তোয়াক্কা না করে হীন রাজনৈতিক এজেন্ডায় সদস্য ঢোকানো হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘এবং এই যে মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। সুতরাং আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না।’
অনুলিখন : মাহমুদুর রহমান

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  • প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমান (রাহ.) ও সাদাকায়ে জারিয়া
  • রাসূলের সাথে জান্নাত
  • মাতা-পিতার অবাধ্যতার শাস্তি
  •  তাফসিরুল কুরআন
  • বিশ্বনবীর কাব্যপ্রীতি
  • শতবর্ষের স্থাপত্য সিকন্দরপুর জামে মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  •  আত্মার খাদ্য
  • মানব জীবনে আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা
  • সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ : ইসলাম কী বলে
  • মৃত্যুর আগে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করি
  •   তাফসীর
  • ইসলামে বিনোদনের গুরুত্ব
  • কুরআনে হাফিজের মর্যাদা
  • মদীনা রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকা-ের কেন্দ্র ছিল মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  • এতিম শিশু
  • বার্মিংহামে আল কুরআনের হাতে লেখা প্রাচীন কপি
  • রাসুলের সমগ্র জীবন আমাদের জন্য অনুকরণীয়
  • মৌল কর্তব্য আল-কুরআনের বিধান
  • Developed by: Sparkle IT