উপ সম্পাদকীয়

ফরমালিনমুক্ত খাবার সুস্থ জীবনের বুনিয়াদ

সালিম জাহাঙ্গীর শামীম প্রকাশিত হয়েছে: ২০-১০-২০১৮ ইং ০০:১৩:৫৫ | সংবাদটি ৪৬ বার পঠিত

সব ধরনের হালাল খাবার বান্দার জন্য মহান আল্লাহর প্রদত্ত এক বিশেষ নিয়ামত। জীবন ধারণের জন্য আমাদেরকে প্রতিনিয়তই খাবার গ্রহণ করতে হয়। সেই খাবার ভেজালমুক্ত না হলে আমাদের সুস্থ থাকা সম্ভব নয়। সুষম খাবার দেহের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই জরুরী। শুধুমাত্র স্বাস্থ্যই নয়, দেহের সুস্থতার জন্যও পুষ্টিকর ও সুষম খাবারের বিকল্প নেই। পুষ্টিকর খাবার দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। কিন্তু বর্তমান বাজারের বেশির ভাগ খাদ্য দ্রব্যই ভেজাল মিশ্রিত। ফরমালিনের মিশ্রণ নেই এমন খাদ্য বাজারে খুবই কম। ফরমালিন হল এক প্রকার রাসায়নিক পদার্থ। ফরমালডিহাইড বা মিথান্যালের ৪০% জলীয় দ্রবণকে ফরমালিন বলা হয়। ফরমালিন মিশ্রিত খাদ্য দ্রব্য দীর্ঘদিন তরতাজা থাকে এবং পঁচন ও পোকা ধরে না। ফরমালিনযুক্ত খাবার মানব দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
গ্রাম-গঞ্জের বাজার গুলোতে ফরমালিনমুক্ত ও টাটকা খাদ্য দ্রব্য কিছুটা পাওয়া গেলেও শহরাঞ্চলের বাজারগুলোতে টাটকা খাদ্য দ্রব্যের খুবই অভাব।
“ভেজাল, ভেজাল, ভেজালরে ভাই ভেজাল সারা দেশটায়/ভেজাল ছাড়া খাঁটি জিনিস মিলবে নাকি চেষ্টায়।/খাঁটি জিনিস এই কথাটা রেখো না আর চিত্তে,/ভেজাল নামটা খাঁটি কেবল আর সকলই মিথ্যে।”
সাম্যবাদী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের এই কবিতার সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের অনেকটা মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। খাদ্য দ্রব্য থেকে শুরু করে সব কিছুতেই ভেজাল। খাদ্য দ্রব্যে ফরমালিন থাকায় আমাদের খাদ্যাভ্যাস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেকে ফরমালিনের ভয়ে ফল খাওয়া ছেড়ে দিচ্ছে। অথচ একজন পূর্ণ বয়স্ক লোকের দেহের পুষ্টির জন্য প্রতিদিন অন্তত ১১৫ গ্রাম ফল খাওয়া উচিত।
জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত বিভিন্ন ফল-মূলের ব্যাপারে বর্তমানে জনমনে তৈরী হওয়া উদ্বেগ-উৎকন্ঠা দিন দিন বেড়েই চলছে। বিভিন্ন ধরনের ফল-ফলাদি, মাছ, গোশত, শাক-সবজি সহ সব কিছুতেই মেশানো থাকে মানব দেহের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী বিষাক্ত কার্বাইড ফরমালিন, ইতোফেন, ইউরিয়া, হাইড্রোজ ও রেড অক্সাইড সহ বেশ কিছু বিষাক্ত ক্যামিকেল। এছাড়া তেল, দুধ, জুস, আচার থেকে শুরু করে সব ধরনের খাদ্য পানীয়ের সাথে জেনে না জেনে বিভিন্ন রকমের বিষ সকাল থেকে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তে খেয়ে যাচ্ছি আমরা।
আমরা কোনটা রেখে কোনটা খাব? আমরা তো মাছে ভাতে বাঙালি। এ খাবারগুলোর বিকল্প হিসেবে অন্য কোনো খাবারও গ্রহণ করতে পারব না। তাহলে আমাদের করণীয় কী? আমাদের দেশের আইন ব্যবস্থায় অনুমোদন ব্যতীত ফরমালিনের ব্যবহার, উৎপাদন, আমদানী ও মজুত করণের শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিক মেশানো নিয়ে দন্ডবিধি ১৮৬০, বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ ১৯৫৯, বিশুদ্ধ খাদ্য নীতিমালা ১৯৬৭, ভ্রাম্যমান আদালত অধ্যাদেশ ২০০৯ ও পয়জনস এ্যাক্ট ১৯১৯ সহ আরো অনেক আইন রয়েছে। কিন্তু এ আইনগুলোর অধীনে সামান্য কিছু জরিমানা ও দু-এক মাসের কারাদন্ড ছাড়া অপরাধীকে সর্বোচ্চ কোনো শাস্তি দেওয়া হয় না। যার কারণে এ অপকর্ম কোন ভাবেই থামছে না। মরণঘাতি এ কুটিল প্রতারণা ব্যবসা বন্ধ করার যেন কেউ নেই।
সাধ্যের মধ্যে যতটুকুন সম্ভব সবাই কম বেশি ফল খায়। এসব ফল-মূল পাঁকাতে ব্যবহার হচ্ছে কার্বাইড। এক শ্রেণির অসাধু মুনাফালোভী ব্যবসায়ী তাদের স্বার্থের জন্য মানুষকে মৃত্যু মুখে ঠেলে দিচ্ছে দিনের পর দিন। বছরের পর বছর। তাদের মধ্যে ফরমালিন ও ভেজালের ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় এবং অপরাধ বোধ কোনটাই কাজ করে না। আড়ত, গুদামতো আছেই। ক্ষেত খামারের শাক-সবজি ও বাগানের ফল-মূলে বিষ প্রয়োগ করা হয় গাছে থাকা অবস্থাতেই। খাদ্য দ্রব্যে ফরমালিনের প্রয়োগ ক্রমশ বেড়েই চলছে। যার ফলশ্রুতিতে অদূর ভবিষ্যতে এদেশে কর্মঠ জনশক্তির চরম অভাব পরিলক্ষিত হবে। ফরমালিনের ব্যবহার রোধ করার জন্য জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি সরকারকে বাস্তব সম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং অসদুপায় অবলম্বনকারীদেরকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
ফরমালিন মিশ্রিত খাবার গ্রহণের ফলে জটিল রোগীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ডায়াবেটিস নেই এমন লোকের সংখ্যা আজ খুবই কম। কিন্তু অতীতে এই রোগের নামও শুনা যায়নি। এ ছাড়া গ্যাস্ট্রিক, আলসার, ক্যান্সার, জন্ডিস, এলার্জি ইত্যাদি রোগীদের সংখ্যাও কম নয়। ফরমালিন ও ভেজালমিশ্রিত খাবারই এর জন্য অধিকাংশে দায়ী। ফরমালিন ও অন্যান্য ক্যামিকেল সামগ্রী সব বয়সী মানুষের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য। ফরমালিনযুক্ত খাবার গ্রহণের ফলে দিন দিন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, কিডনি, লিভার ও বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নষ্ট, বিকলাঙ্গতা, এমনকি মরণব্যাধি ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে শিশু-কিশোররা। শিশুদের বুদ্ধিমত্তাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। শিশুদের দৈহিক গড়ন স্বাভাবিক বাধা গ্রস্ত হয়। গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে সন্তান প্রসবের সময় জটিলতা, বাচ্চার জন্মগত দোষত্রুটি ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। যকৃত, ফুলকা ও পাকস্থলী সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লিভারেও সমস্যা হতে পারে। এছাড়াও ফরমালিনের ফরমালডিহাইড চোখের রেটিনাকে আক্রান্ত করে কোষ ধ্বংস করে। পেটের পীড়া, শ্বাসকষ্ট, বদহজম, ডায়রিয়া ও চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগ হয়ে থাকে।
সন্দেহাতীতভাবে খাদ্যে ভেজাল একটি জাতীয় সমস্যা। এ জন্য আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে নীতি নির্ধারকদের সর্বাগ্রে এটা অনুধাবন করে দেশের বিদ্যমান আইনগুলোকে যুগোপযোগী করে আরো কঠিন শাস্তির বিদান প্রণয়ন ও বাস্তবে এর প্রয়োগ করে দেশ ও জাতির উন্নতির জন্য ভেজালমুক্ত খাবার নিশ্চিত করা সময়ের দাবী।
লেখক : শিক্ষার্থী, সিলেট ল’ কলেজ।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ডাক বিভাগ ফিরে পাচ্ছে প্রাণ
  • আমরা সবাই ভালো হলে দেশ ভালো হবে
  • ‘জাতীয় বীর’ কৃষকদের নিয়ে কিছু কথা
  • ভর্তিযুদ্ধে লাঘব হোক ভোগান্তি
  • মানব সম্পদ উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষা
  • ভোটের মাঠে তারকার মেলা
  • আয় বৈষম্য ও সামাজিক অসমতা
  • সামাজিক আন্দোলন : নিরাপদ সড়ক চাই
  • আলী হোসেন খান
  • মৃত্যুই দিয়েছে তাঁরে চিরমুক্তি!
  • আমেরিকা : ট্রাম্প শাসনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব
  • ইলেকট্রনিক ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে ক্ষতিকর প্রভাব
  • পরিবহন নৈরাজ্য
  • মাদকবিরোধী অভিযান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
  • ছড়াকার বদরুল আলম খান
  • একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিগত দশটি নির্বাচন
  • বইয়ের বিকল্প প্রযুক্তি নয়
  • আগুনের পরশমণি ছোয়াও প্রাণে
  • বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যা
  • জনসচেতনতাই পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে পারে
  • Developed by: Sparkle IT