পাঁচ মিশালী

ইনোভেটর : মুক্তিযুদ্ধের বইপড়ানোর ১২ বছর

আহমাদ সেলিম প্রকাশিত হয়েছে: ২০-১০-২০১৮ ইং ০০:১৮:৫০ | সংবাদটি ৫৭ বার পঠিত

সেদিনও শরৎ ছিল, সাদা হয়ে ফুটেছিল থোকা থোকা কাশও। শুধু বিপন্ন এক সময় ছিল মুক্তিযুদ্ধ, আর মুক্তবুদ্ধি চর্চার। স্বাধীনতা বিরোধীদের আস্ফালনে কাঁপছিল চারদিক। ২০০৬ সালÑ মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ সেদিন বড়ো কাঁদছিল। বিপন্ন-বিষণœ ছিল প্রগতিবাদের চিন্তা। সেই মনখারাপের এক শারদ বিকেলে কবি প্রণবকান্তি দেব সময়ের বিপরীতে চলার স্বপ্ন বুনলেন, ট্যানেলের শেষ প্রান্তে এক বিন্দু আলো খুঁজলেন তারুণ্যের মাঝে। ভাবলেনÑ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধে এগিয়ে আসতে হবে তরুণদের। ভাবনা বিনিময় করলেন রেজওয়ান আহমদের সঙ্গে। বই হবে ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে মোক্ষম অস্ত্র। এভাবে জন্ম নেয় ‘ইনোভেটর’-মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রত্যয়ে দুই তরুণের উদ্যোগ। নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে হবে। বইপড়ার উৎসব হবে। উৎসবের আনন্দে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানবে। সেই ২০০৬ থেকে ২০১৮। একযুগ পেরিয়ে ইনোভেটর আজ। শুধু মুক্তিযুদ্ধের বইকে তারুণ্যের কাছে পৌঁছে দেয়ার নিরন্তর অভিযাত্রায় সংগঠনটি অবিচল আজো। একযুগে বইপড়ায় অংশ নিয়েছে ১১ হাজার ৭শ’ বাহাত্তর জন শিক্ষার্থী। পড়ানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের কালজয়ী গ্রন্থগুলো- শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’, সেলিনা হোসেনের ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’, হাসান আজিজুল হকের ‘নামহীন গোত্রহীন’, মেজর (অবঃ) কামরুল হাসান ভুইয়ার ‘জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা’, মাহমুদুল হকের ‘খেলাঘর’, শওকত ওসমানের ‘দুই সৈনিক’, আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল রুটি আওরাত’, শাহিন আখতারের ‘তালাশ’, সেলিনা হোসেনের ‘গল্পটা শেষ হয়না’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান', রশীদ হায়দারের ‘শোভনের স্বাধীনতা’ এবং রাবেয়া খাতুনের মেঘের পরে মেঘ। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এর গন্ডী পেরিয়ে এখন বইপড়া উৎসব ছড়িয়ে পড়েছে স্কুলেরও আঙ্গিনায়। একযুগের এই বইপড়া উৎসবে অতিথি হিসেবে অংশ নিয়েছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, চিত্রনায়ক আকবর হোসেন খান পাঠান ফারুক, প্রথিতযশা লেখক, সাংবাদিক কামাল লোহানী, কথাসাহিত্যিক জাফর ইকবাল, অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, এডভোকেট সুলতানা কামাল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন, কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, লেখক সাংবাদিক আবেদ খান, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক প্রয়াত মেজর (অবঃ) কামরুল হাসান ভুইয়া, এভারেস্ট বিজয়ী প্রথম বাংলাদেশী মুসা ইব্রাহিম, বিজ্ঞানী জহিরুল আলম সিদ্দিকী প্রমুখ। সংগঠনটির অর্জনের ঝুলিতে জমা হয়েছে ২০১৭ সালে জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড। তবে সংগঠনের কর্মীরা মনে করেন ১২ বছরে তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের প্রতি তরুণ প্রজন্মের ভালোবাসা। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে বই বিতরণ, ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষা, আর স্বাধীনতার মাস মার্চে পুরস্কার বিতরণÑ বইপড়া উৎসবের এমন ব্যতিক্রর্মী অনুষ্ঠান বিন্যাস ‘ইনোভেটর’ কে দিয়েছে বিশেষ খ্যাতি। এছাড়া মাসিক পাঠচক্র. সেমিনার, সিম্পোজিয়ামও রয়েছে ইনোভেটর এর কার্যতালিকায়। ইনোভেটর এ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া প্রায় শতাধিক তরুণ-তরুণী কাজ করছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়াই তাদের মূল আনন্দ। “এসো পাঠ করি/বিকৃতির তমসা থেকে/ আবিষ্কার করি স্বাধীনতার ইতিহাস’-এই একই শ্লোগান নিয়ে ইনোভেটরসরা কাজ করছে প্রতিদিন। ইনোভেটর এর নির্বাহী সঞ্চালক সিলেট ইন্টারন্যাশনার ইউনিভার্সিটির সহকারি অধ্যাপক প্রণবকান্তি দেব বলেন- ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তরুণ প্রজন্মকে গড়ে তোলার প্রয়াসেই ইনোভেটরের পথ চলা।’ তিনি তাঁর স্বপ্নের কথা জানান ‘মুক্তিযুদ্ধের গ্রন্থ, তথ্য সংবলিত সর্বাধুনিক একটি পাঠাগার হবে, যেটি হবে গৌরবের একটুকরো বাংলাদেশকে খুঁজে পাওয়ার নির্ভরশীল ঠিকানা’। এই স্বপ্নের পথে আরেকটু আগালেন সংগঠনের মুখ্য সঞ্চালক, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর রেজওয়ান আহমদ। বললেন ‘আজকের তরুণরাই গড়বে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন-আকাংখার বাংলাদেশ। ইনোভেটর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন ‘সমাজকে আলোয় ভরিয়ে দেওয়ার এ সংগ্রাম চলবে নিরন্তর’। ইনোভেটরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বইপড়া উৎসবটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়া, মুক্তিযুদ্ধ গ্রন্থাগার, ই-লাইব্রেরী স্থাপনের মাধ্যমে ইতিহাস সংরক্ষণ, নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংবলিত বই পড়ায় উৎসাহিত করা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠের বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিকরণ। ইনোভেটর স্বপ্ন দেখে একদিন এই বইপড়া উৎসব গোটা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়বে, জ্ঞানের আলোয় দূর হবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির তমসা।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT