পাঁচ মিশালী

চৌকশ ব্যক্তিত্বের প্রতিবিম্ব

এম এ হান্নান প্রকাশিত হয়েছে: ২০-১০-২০১৮ ইং ০০:২১:৪৬ | সংবাদটি ১০৭ বার পঠিত

১৯৬৫ সালে মেট্টিক পাশ করে এমসি কলেজে ভর্তি হলাম। কলেজে এসে অনেক নামিদামি শিক্ষক পেলাম। তাদের মধ্যে যে শিক্ষককে সবচেয়ে আপন করে পেয়েছিলাম, তিনি অধ্যাপক মোফাজ্জল করিম সংক্ষেপে এমকে স্যার। যিনি অনেক শিক্ষকগণের মধ্যে বয়সেও তরুণ। চৌকশ বলতে যা বোঝায় এমকে স্যারের মধ্যে এ সবকটিই ছিল। একজন প্রাণবন্ত শিক্ষক, একজন শক্তিশালী কবি, একজন দুর্দান্ত ক্রীড়াবিধ, একজন নাট্যকার, একজন সফল উপস্থাপক, একজন আবৃত্তিকার, এমন কোনো গুণ নেই যা স্যারের মধ্যে অনুপস্থিত। ছাত্রজীবনে রাজনীতির সাথেও প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল। খেলাধূলার স্বীকৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লু পেয়েছিলেন, কবি হিসাবে এইতো বছর খানেক আগেই সাহিত্য সংসদ থেকে শ্রেষ্ঠ লেখকের স্বীকৃতি পেলেন।
সর্বগুণের সমাহার এমকে স্যারকে কলেজ জীবনের আগেই চিনেছিলাম কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া ও প্রতিযোগিতার প্রধান উপস্থাপক হিসাবে। বাসা থেকে সামান্য দূরত্বে এমসি কলেজ মাঠের বর্ণাট্য বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় স্কুল জীবনেও যেতাম। কলেজে ভর্তি হওয়ার আগের বছর স্যারের রসালো উপস্থাপনা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। কলেজে ভর্তি হওয়ার সামান্য ক’দিনের মধ্যেই স্যারের সাথে বিশেষভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ এসেযায় কাকতালীয়ভাবে। এমসি কলেজের সুবিশাল মাঠ কোন না কোন উপলক্ষ করে প্রতি বছরই নতুন করে উদ্বোধন করা হতো। সেবার প্রিন্সিপাল একাদশ বনাম ছাত্র সংসদের মধ্যে ক্রিকেট ম্যাচ দিয়ে উদ্বোধন হলো। সচরাচর খেলায় প্রিন্সিপাল একাদশকে ধীরে বল করে কিছু রান করার সুযোগ দিয়ে পরে ছাত্র সংসদ খেলা জিতে নিতে। কিন্তু সেবার মোফাজ্জল করিম এবং কেমিষ্ট্রির আর এক চৌকশ প্লেয়ার প্রফেসার হাফিজ স্যারের কাছে বেধড়কভাবে মার খেয়ে ছাত্র সংসদের বোলাররা যখন দিশেহারা তখন উপায়ান্তর না দেখে ছাত্র সংসদের স্বীপার বাবু ভাই নতুন কোন বোলার থাকলে বল করতে অনুরোধ করেন। আমাকে বাবু ভাই বোলার হিসেবে না চেনায় নিজেই বল করতে এগিয়ে গেলাম। এমকে স্যার প্রথম বল কোন মতে ঠেকালেন। দ্বিতীয় বল যথাসম্ভব অফ ব্রেক দিলাম যা গিয়ে লাগলো প্যাড ছাড়া স্যারের পায়ে। ‘ঠেং ভাঙ্গিলিছো, ইংরেজিতে পাশ করতায় নায়’। এমকে স্যারের রসেভরা ধমক।
এরপরই স্যারের সাথে একান্ত ঘনিষ্ঠ হতে সময় লাগেনি। আমি আর কাওসার ভাই যখন তখন স্যারের কাছে যেতাম। কখনো কবিতা, কখনো ম্যাগাজিন নিয়ে কখনো অন্য কাজ নিয়ে। স্যারকে কোন দিন বিরক্ত হতে দেখি নাই। বরং উল্টো উৎসাহ দিতেন বিভিন্নভাবে। এক দিনতো বলেই বসলেন ‘কাওসার, তোমার কাছে আমার ইংরেজি বাংলা দুইটাউ হিকা লাগব।’ একজন জ্ঞানী শিক্ষকের কাছ থেকে আর কতো উৎসাহ পাওয়া যায়?
এমকে স্যার খুব দ্রুত সাইকেল চালাতেন। কেউ তাকে অভারটেক করতে পারতো না। একদিন আমরা দুষ্টের শিরমনি ক’জন সাইকোলিষ্ট স্যারকে হারানোর মতলব করলাম। আমরা চারজন সাইকেল নিয়ে ফরহাদ খাঁর পুলের সামনে থেকে স্যারের অপেক্ষা করতে থাকলাম। স্যারের সাইকেল আসতেই আমরাও পিছু নিলাম। সুচতুর স্যার আমাদের মতলব বুঝে স্পীড বাড়ালেন। তখনকার সময় রাস্তায় জ্যাম থাকতো না। আমরা চারজন আপ্রাণ চেষ্টা করেও স্যারকে ধরতে পারছিলাম না। হাতিম আলী স্কুলের কাছে আমাদের একজন স্যারকে প্রায় ধরে ফেলেছিল। স্যার পলটি মেরে (বাল্লা মেরে) তাকে আটকে দিয়ে একটু এগিয়ে আমাদের দিকে বুড়ো আঙ্গুল উচিয়ে দেখলেন এবং বললেন, ‘পাল্লায় না।’ এমনই প্রাণবন্ত শিক্ষক ছিলেন এমকে স্যার।
এমকে স্যারের ক্লাস হতো কলেজের সবচেয়ে বড় হলরুম হল নং-২। বাংলা ইংরেজি আবশ্যকীয় বিষয় থাকায় সব ফ্যাকাল্টির ছাত্রছাত্রীর একসাথে ক্লাস হতো। ক্লাসের লেকচারে স্যার এমনভাবে মাতিয়ে রাখতেন যে কোন ছাত্র পারসেনন্টেড দিয়ে জানালা দিয়ে পালাতো না, বরং কবে স্যারের ক্লাস আসবে তারই অপেক্ষায় থাকতাম সবাই। ক্লাসে এতো হাসাতেন যে সদাগম্ভীর প্রিন্সিপাল সুলেমান চৌধুরী বলতেন যে, ‘করিম সাহেবের ক্লাসের হাসি আমার অফিস পর্যন্ত পৌঁছে যায়।’
এমকে স্যার ও ইদ্রিস স্যারের পরিচালনায় সেবার কলেজে মঞ্চস্থ হলো ১২ ঘণ্টা নামক নাটক। এতো সুচারু নাটক এমসি কলেজে এর আগে হয়েছে কি না সন্দেহ। কলেজের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সঞ্চালক এমকে স্যার। একটু বেশি রাত হয়ে যাওয়ার অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত করার প্রয়োজন দেখা দেয়। ইতোমধ্যে কলেজের একজন প্রাক্তন ছাত্র আবৃত্তিকার কবিতা আবৃত্তির ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। সময়ের স্বল্পতাহেতু স্যার উনার প্রস্তাব নাকোচ করায় আবৃত্তিকার বিভিন্ন চাপ প্রয়োগ করায় সঞ্চালক এমকে স্যার উনাকে আবৃত্তির অনুমতি দিলেন। আবৃত্তিকার মঞ্চে এসে অনেক অবাস্তব কথাবার্তা বলে উষ্মা প্রকাশ করলেন এবং আবৃত্তি না করে সঞ্চালক স্যারের কাছে প্রশ্ন রাখলেন আবৃত্তি কি সংস্কৃতির অংশ নয়?
সঞ্চালক এমকে স্যার সপ্রতিভভাবে উত্তর দিলেন, ‘সরি, উনার কথা বলার কথা ছিল। এবার উনার বদলে আমি একটা কবিতা আবৃত্তি করবো।’ রাগে অপমানে স্যার কাঁপছিলেন, এমনাবস্থায় নজরুলের বিদ্রোহী ধর্মি একটা কবিতা আবৃত্তি করলেন। এমন সুললিত আবৃত্তি আমি তো ইতোপূর্বে শুনি নাই, অন্য কেউ শুনেছে কী না সন্দেহ। আবৃত্তি শেষে স্যারকে মঞ্চে ধরে রাখা যায়নি।
কলেজের ইনডোর স্পোর্টসের টেবিল টেনিস ফাইনালে এমকে স্যার বিচারক। আমার মতো নি¤œমানের প্লেয়াররা অনেক আগেই বিদায় নিয়েছি। ফাইনালে এহিয়া চৌধুরী এবং আরো একজন (নাম জানা নেই)। তীব্র প্রতিযোগিতার পর এহিয়া চৌধুরী চ্যাম্পিয়ান হলেন। প্রতিযোগিতা শেষে স্যার বললেন, ‘এহিয়া, অনেক দিন খেলিনি। একটু ব্যাট ধরবে?’ খেলা শুরু হলে এমসি কলেজ চ্যাম্পিয়ান এহিয়া চৌধুরী স্যারের সাথে তালই রাখতে পারলেন না। এমনি চৌকশ ক্রীড়াবিদ ছিলেন এমকে স্যার।
সেকেন্ড ইয়ারে উঠার আগেই স্যার সিএসপিতে উত্তীর্ণ হয়ে সিভিলে যোগদান করলেন। আমিও ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। স্যার তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এসডিও। ঢাকা গিয়ে মহসিন হলে আমার রুমে এসে এমসি কলেজের ছাত্রদের ডেকে কুশলবার্তা জিজ্ঞেস করলেন। ছাত্রদের প্রতি এমন আন্তরিকতা ক’জন শিক্ষকের আছে? হলে আমি থাকা অবস্থায় স্যার মোট ৩ বার গেছেন। বিশেষ করে আমাদের ব্যাচে কুমিল্লা বোর্ডে প্রথম হওয়া আমার বিশিষ্ট বন্ধু মছদ্দর আলীর সাথে সবসময় যোগাযোগ রাখতেন।
স্যার তখন ঢাকার ডিসি। আমি কলেজের চাকুরি ছেড়ে ঢাকায় ব্যবসা করছি। আমার শো রুম থেকে ঢাকার ডিসি অফিস সামান্য দূরে। একদিন স্যারের অফিসে গেলাম। স্যার খুবই খুশি হলেন। আলাপের এক পর্যায়ে স্যার জিজ্ঞাসা করলেন আমি কোন কলেজে আছি। আমি ব্যবসা শুরু করেছি শুনে স্যার বললেন, ‘ও তুমি বেনিয়া ওই গেছ’।
এর বেশ কিছু দিন পরে ব্যবসা সংক্রান্ত শব্দাবলী দিয়ে স্যারের একটা কবিতা পড়লাম জাতীয় দৈনিকে, স্যার তখন চেয়ারম্যান এক্সপোর্ট ইম্পোর্ট (ব্যবসায়ীদের দন্ডমুন্ডের কর্তা)। সাথে সাথেই স্যারকে ফোন লাগালাম। পরিচয় দেয়ার পর বললেন, ‘ও বেনিয়া হান্নান বলছো, তা কেমন আছো?’ আমি উত্তরে বললাম, ‘বেনিয়াদের বিষয় বস্তু নিয়ে আপনার কবিতা পড়লাম। আপনিতো এখন বেনিয়াদের মা বাপ।’ স্যারের রসালো উত্তর, ‘সেভ পাই মারি দিলায়।’
স্যার তখন চেয়ারম্যানের কো-অপারেটিভ। মতিঝিলে স্যারের অফিসে গেলে একসময় স্যার আমার হাতে জালালাবাদ এসোসিয়েশনের একটা মেম্বারশীপ রিসিট ধরিয়ে দিলেন এবং এসোসিয়েশনের কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট হতে বললেন। অবাক হলাম, সরকারি এহেন উচ্চপদে আসীন থেকেও সিলেটি সংগঠনের জন্য স্যারের দরদ দেখে।
মহান আল্লাহ এই অসামান্য প্রতিভাধর মানুষটিকে সুখী ও সুন্দর রাখুন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT