পাঁচ মিশালী

ঘুরে এলাম পাইলগাও জমিদার বাড়ি

এম. শহিদুজ্জামান চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২০-১০-২০১৮ ইং ০০:২৩:১৮ | সংবাদটি ১৩৯ বার পঠিত

সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী ঐতিহাসিক পাইলগাও জমিদার বাড়ি। ছোটবেলা থেকেই এই বাড়ির শান শওকতের কথা শুনে আসছিলাম। ইতিমধ্যে সুনামগঞ্জের জমিদার দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরী, মৌলভীবাজারের ইটা জমিদার বাড়ি ও প্রাচীন লাউড় রাজ্যের উপ-রাজধানী হবিগঞ্জের বানিয়াচং রাজবাড়ি পরিদর্শন করে আসলেও আরশিনগরের মতো পাইলগাও জমিদার বাড়ি আর যাওয়া হয়ে উঠেনি। কয়েকবার সেখানে যাওয়ার মনস্তির করলেও অস্থির মন অন্য দিক নিয়েই ব্যস্ত থাকে। সিলেটের বিবিয়ানা সাহিত্য পরিষদ গত ২৮ শে সেপ্টেম্বর অষ্টম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নদী ভ্রমণ ও শরৎকালীন সাহিত্য উৎসবের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি যখন চূড়ান্ত ঠিক একদিন পূর্বে অর্থাৎ ২৭ শে সেপ্টেম্বর বিকেলে শিক্ষাবিদ মুহিবুর রহমান চৌধুরী স্মৃতি পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও বিবিয়ানা সাহিত্য পরিষদের উপদেষ্টা এম. গৌছুজ্জামান চৌধুরী বললেন, যেহেতু আমরা কুশিয়ারা নদী দিয়ে যাবো তাই নদী তীরবর্তী পাইলগাও জমিদার বাড়ি পরিদর্শন করতে হবে। কথাটি শুনা মাত্রই আমি জবাব দিলাম অবশ্যই এটি একটি গুড আইডিয়া, যা আমাদের কারো স্মরণেই আসেনি।
বৃহস্পতিবার রাতেই সকল অতিথি ও সদস্যদের জানিয়ে দিলাম পাইলগাও জমিদার বাড়ি পরিদর্শনের কথা। সংবাদটি শুনে সকলেই স্বাগত জানালেন। সময় নির্দিষ্ট হলো শুক্রবার সকাল ১০ ঘটিকায় জালালপুর খেয়াঘাট থেকে আমাদের নৌকা যাত্রা শুরু করবে। এবং দুদিন পূর্বে নির্ধারিত রাণীগঞ্জ বাজারে না থামিয়ে নৌকাটি পাইলগাওয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে। সেখানে জমিদার বাড়ি পরিদর্শন এবং জুমার নামায পাইলগাও জামে মসজিদে আদায় করে আমরা দিরাই উপজেলার বোয়ালিয়া বাজারের দিকে রওয়ানা হবো। সেখানে বিবিয়ানা মডেল ডিগ্রী কলেজে বিকেলে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
শুক্রবার সকাল ১১ ঘটিকায় আমরা নৌকায় উঠে পাইলগাও এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। নৌকার মাঝিকে বলা হলো ধীরগতিতে নৌকা চালানোর জন্য যাতে আমরা নদী ও তার আশপাশের প্রকৃতিকে ভালোভাবে অবলোকন করতে পারি। বিবিয়ানা সাহিত্য পরিষদের নির্বাহী সদস্য বাউল আফরোজ খান সুরেলা কন্ঠে গান ধরলেন ‘মাঝি বাইয়া যাওরে/ ওকূলও দরিয়ার মাঝে আমার ভাঙা নাওরে মাঝি...।’ চুনারুঘাটের কবি শওকত আলী ও বাহুবল উপজেলার তরুণ কবি ছাদেক ইমতিয়াজ শুরু করলেন ফেইসবুকে লাইভ। নৌ ভ্রমণ আর শরৎকালীন সাহিত্য উৎসব নিয়ে অভিব্যক্তি প্রকাশ করলাম আমি। আমার পর অন্যান্য অতিথিরাও মুগ্ধতার প্রকাশ ঘটালেন। ঘড়ির কাঁটা ১২:৩০ মিনিট। নৌকা গিয়ে থামলো পাইলগাও এর কিনারে। দুজন যুবককে জিজ্ঞেস করলাম জমিদার বাড়ি কোনদিকে। তাদের দেখানো পথে চার পাঁচ মিনিট চলার পরই বিশাল জমিদার বাড়ির দেখা পেয়ে সবার মনেই আনন্দের ঢেউ উৎলে উঠলো। বিশাল একটি দীঘির পাশেই একটি বিশাল অট্টালিকা জনমানবহীন নিরব দাড়িয়ে আছে। সকলেই অট্টালিকার সামনে দাঁড়ালাম বিবিয়ানা সাহিত্য পরিষদের যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক বদরুল আলম চৌধুরী কয়েকটি গ্রুপ ছবি তোলার কাজ সম্পন্ন করলো। আমার উপর দায়িত্ব পড়লো সংক্ষিপ্ত আকারে সবার উদ্দেশ্যে পাইলগাও জমিদার বাড়ির ইতিহাস তুলে ধরার। এসময় পরিদর্শনের সুবিধার্থে আমাদের ৩০ জনের দলটি বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায়। একটি গ্রুপের দায়িত্বে ছিলেন বিবিয়ানা সাহিত্য পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইয়াওর মিয়া ও সাংগঠনিক সম্পাদক কবি কবির হোসেন, কোষাধ্যক্ষ শুয়েব আহমদ শিবলু প্রমুখ। আর আমার গ্রুপে ছিলেন সিলেট থেকে আগত প্রধান অতিথি কবি বাছিত ইবনে হাবীব, বিশ্বনাথ থেকে আগত গবেষক খালেদ মিয়া, ডা. শাহ আবুল খায়ের, এডভোকেট এসএম ইলিয়াস, এস.আর. চৌধুরী সেলিম, রোটারিয়ান ফয়সল আহমদ ও কবি নিলুফা ইসলাম নিলু।
ডা. শাহ আবুল খায়ের বললেন, নিশ্চয়ই এই ঘরটি ছিলো জমিদারদের বিচারালয়। ঘরের ছাদে বিশাল লোহার পাত দেখে সবাই অবাক হয়ে যাই। এরপর আমরা আরো সামনে অগ্রসর হয়ে পুরো বাড়ির সবকটি ঘর দেখতে শুরু করলাম। অসাধারণ কারুকাজ আর নকশা সমৃদ্ধ ঘরগুলো যেন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে। একটি ঘরের ছাদ দেয়া হয়েছে ইটের টাইলস দিয়ে যার অনেকগুলো বিনষ্ট হয়ে গেছে। এস.আর. চৌধুরী একটি জাম্বুরা গাছের তলায় গিয়ে বললেন এই গাছের দায়িত্বে কে আছে? একজন মহিলা জবাব দিলেন তিনি এখানে বসবাস করেন এগুলো তার। সেলিম ভাই টাকা দিয়ে একটি জাম্বুরা ক্রয় করলেন। আমরা যেমন একদিকে ঘুরে ঘুরে দেখছি অপরদিকে ছবি তোলার কাজও সম্পন্ন করছি। জুমার সময় নিকটে তাই কবি শায়খ আব্দুর রকীব হাক্কানী মসজিদে যাওয়ার তাগিদ দিলেন। কিন্তু ফিরতে মন চায়না এতো বিশাল জমিদার বাড়ি জনমানবহীন অনাদরে অবহেলায় পড়ে আছে। অথচ এই বাড়ির জমিদারদের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। প্রাচীন পুরাকীর্তির অন্যতম নিদর্শন এ জমিদার বাড়ি প্রায় সাড়ে ৫ একর ভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত তিন শত বছরেরও বেশি পুরানো এ অঞ্চলের ইতিহাস ঐতিহ্যের নিদর্শন।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক অচ্যূতচরণ চৌধুরী পাইলগাও’র জমিদার বংশের 'রসময় বা রাসমোহন চৌধুরী’ হতে প্রাপ্ত সূত্রে লিখেছেন যে; পাইলগাওয়ে বহু পূর্বকালে পাল বংশীয় লোক বসবাস করত। এ গোষ্ঠির পদ্মলোচন নামক ব্যক্তির এক কন্যার নাম ছিল রোহিণী। কোন এক কারণে রাঢ় দেশের মঙ্গলকোট হতে আগত গৌতম গোত্রীয় কানাইলাল ধর রোহিণীকে বিবাহ করে গৃহ-জামাতা হয়ে এখানেই বসবাস শুরু করেন। কানাইলাল ধরের আট পুরুষ পরে বালক দাস নামের এক ব্যক্তির উদ্ভব হয়। এ বালক দাস থেকে এ বংশ বিস্তৃত হয় । বালক দাসের কয়েক পুরুষ পর উমানন্দ ধর ওরফে বিনোদ রায় দিল্লীর মোহাম্মদ শাহ বাদশা কর্তৃক চৌধুরী সনদ প্রাপ্ত হন। বিনোদ রায়ের মাধব রাম ও শ্রীরাম নামে দুই পুত্রের জন্ম হয়। তার মধ্যে মাধব রাম জনকল্যাণকর কর্ম পালনে নিজ গ্রাম পাইলগাওএ এক বিরাট দীঘি খনন করে সুনাম অর্জন করেন। তার দেয়া উক্ত দীঘি আজও ঐ অঞ্চলে মাধব রামের তালাব হিসেবে পরিচিত। মাধব রামের দুই পুত্র মদনরাম ও মোহনরাম । উক্ত মোহনরামের ঘরে দুর্লভরাম, রামজীবন, হুলাসরাম ও যোগজীবন নামে চার পুত্রের জন্ম হয় । এই চার ভাই দশসনা বন্দোবস্তের সময় কিসমত আতোয়াজানের ১ থেকে ৪ নং তালুকের যতাক্রমে বন্দোবস্ত গ্রহণ করে তালুকদার নাম ধারণ করেন। এদের মধ্যে হুলাসরাম বানিয়াচং রাজ্যের দেওয়ানি কার্যালয়ে উচ্চ পদের কর্মচারী নিযুক্ত হন। হুলাসরাম চৌধুরী বানিয়াচং রাজ্যের রাজা দেওয়ান উমেদ রজার অনুগ্রহে আতুয়াজান পরগণায় কতেক ভূমি দান প্রাপ্ত হন। হুলাসরামের প্রাপ্ত ভূমীর কিছু কিছু চাষযোগ্য ও কিছু ভূমি চাষঅযোগ্য ছিল। পরবর্তিতে হুলাসরাম চাষ অযোগ্য ভূমিগুলোকে চাষযোগ্য করে তুললে এগুলোই এক বিরাট জমিদারীতে পরিণত হয়ে উঠে। হুলাস রামের ভাতুষ্পুত্র বিজয়নারায়ণের একমাত্র পুত্র ব্রজনাথ চৌধুরী জমিদারি বর্ধিত করে এক প্রভাবশালী জমিদারে পরিণত হন। ব্রজনাথ চৌধুরীর দুই পুত্র রসময় ও সুখময় চৌধুরী। ইতিহাসে সুখময় চৌধুরী ও তাঁর ভাতিজা ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।
পাইলগাও সহ সমগ্র সিলেট বিভাগের শিক্ষা, সাহিত্য, রাজনীতি ও সমাজসেবায় পাইলগাও জমিদার বাড়ির জমিদারদের অবদান ছিলো অপরিসীম। কিন্তু কালের পরিক্রমায় আজ সেই ঐতিহাসিক জমিদার বাড়িটি সুন্দর আলী নামক এক ব্যক্তির মালিকাধীন। তিনি বাড়িটি লিজ আনায় বাড়িতে তার লোকজন বসবাস করেন। সচেতন মহলের দাবি বাড়িটি দখলমুক্ত করে পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সংস্কার করে সংরক্ষণ করা হোক।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT