সাহিত্য

শেষ দেখা

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ২১-১০-২০১৮ ইং ০১:১৯:০৬ | সংবাদটি ৬৭ বার পঠিত

দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর পর মৌলির সাথে দেখা। মনের গহীনে প্রোথিত এক ফ্রেম করা ছবি। গভীর প্রেম কাহিনী সম্বলিত নামকরা উপন্যাসটা যেন কাঠের আলমিরা হাতড়াতেই বেরিয়ে এল। যতেœ রাখা উপন্যাস সেই তিন যুগের সাক্ষী। কৈশোর আর যৌবনের সন্ধিক্ষণে যে আবেগ-অনুভূতি-রোমাঞ্চ দোলা দেয়- এখন মৌলির সামনে দাঁড়িয়ে এক মিনিটেই যেন সমস্ত কিছু কম্পিউটারের সাদা স্ক্রিনে ভাসতে লাগল। কৈশোরের খুনসুটি, লাগালাগি, মাখামাখি, মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নিরর্থক হাসি, চুম্বকের মত দুর্নিবার টান, মায়া না প্রেম-ভালবাসা কিছু বুঝে ওঠার আগেই মৌলি যেন গল্পের নায়িকা। ভর দুপুর কিংবা ভর রাত নেই শুধুই কাছে থাকার আকর্ষণ বুঝে আকাশ। সমস্ত অস্তিত্বে কেবল তারই উপস্থিতি। ঘুণ পোকা যেমন সারাক্ষণ কাঠের ভিতর ঘুন ঘুন করে কাঠ কাটে তেমনি মৌলি যেন এ দেহে বাসা বেঁধেছে। সারাক্ষণ মনের আয়নায় ভাসে ঐ মিষ্টি মুখ। হৃদয় জুড়ায় তার হাসি। শান্ত দিঘীর মত ভাসা- ভাসা চোখ যেন প্রশান্তির লীলা ক্ষেত্র। ওর চোখে তাকালে নিজেকে ধরে রাখা দায়। কিসের আকর্ষণে যেন কাছে টানে আরও কাছাকাছি থাকতে ভাল লাগে।
আকাশ আর মৌলি ক্লাস সিক্স থেকে একসাথে পড়ে। রোজই ওদের দেখা হত। আকাশ ক্লাসের সেরা ছাত্র বলে সবাই তাকে চিনত। সবারই সুনজর ছিল তার উপর। মৌলি অতি ভাল ছাত্রী না হলেও দুর্বল ছাত্রী বলা যায় না। ক্লাসে ১২ কিংবা ১৩ আবার ৯ কিংবা ১০ এরকমই তার অবস্থান। তবে দেহ সৌষ্ঠব আর আকর্ষণীয় চেহারার বলে সবাইকে কাবু করে রেখেছিল সে। মৌলির সাথে কথা বলতে সবাই আগ্রহী। তবে ব্যতিক্রম আকাশ। গম্ভীর তার চেহারা। অতি সহজে কারও সাথে কথা বলে না। এ রকমই দেখে আসছে মৌলি। আকাশের আর্থিক সঙ্গতি ভাল নেই। কিন্তু তার চেহারা দেখে বুঝার উপায় নেই। হাল্কা পাতলা লম্বাটে চেহারা, মাথাভর্তি ঝাকড়া চুল, বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখের উপর জোড়া ভ্রু। বেশ আকর্ষণীয়। আকাশ গান, গজল, বক্তৃতা, আবৃত্তি সবই পারে। সবখানেই সে যেন ফিট। খেলাধুলা শরীর চর্চা সবখানেই তার সরব উপস্থিতি। মৌলি ওকে দেখে। ও ভাল ছেলেদের মধ্যে একটি। তবে সে যেচে গিয়ে ছেলেদের সাথে কথা বলার পাত্রী নয়। রাজপুত্র এলেও তার কিছু যায় আসে না। সে চটপট করে কথা বলে। কারও সাথে কথা বললে আধা মিনিটেই শেষ। কাজী নজরুলের ভাষায় সে চঞ্চল হরিণী। এক জায়গায় দু’দন্ড দাঁড়ায় না। তার সাথে খোশ গল্প করার সময় নেই। এত দ্রুতগামী ঘোটকীর সাথে কয়জনইবা আছে তাল মেলাতে পারে। তারপরও সুন্দর সুপুরুষরা ওকে দেখার জন্য রাস্তায় লাইন দেয়। একসাথে নয়। কয়েক গজ দূরে দূরে। যে পথ দিয়ে সে যায় আর আসে, ঐ পথে দুটি বাজার। মাঝখানে ৩০০ গজের মত কাঁচা রাস্তা। মেয়েরা দল বেঁধে সে পথ দিয়েই স্কুলে যায়-আসে। চার পাঁচ জন সুদর্শন যুবক ৫০-৬০ গজ দূরে দূরে দাঁড়াত মৌলিকে দেখতে। মৌলি যে একেবারে বুঝত না তা নয়। তবে স্বভাবসুলভ সে এড়িয়ে চলত। ৭/৮ জন ছাত্রীর ভিড়ে সে ছাতার মিছিলের মাঝখানে থেকে হাঁটত। তাই সহজে তাকে দেখা কঠিন।
আকাশের একবার রিজাল্ট খারাপ হল। অর্থাৎ ক্লাস এইট থেকে নাইনে উঠার সময় ২নং হয়ে গেল। তার জন্য নির্ধারিত ১নং স্থানটি হাতছাড়া হল। এতে আকাশের অভিভাবকরা তাকে লজিংয়ে পাঠালেন। সৌভাগ্য আকাশের লজিংটি মৌলির বাড়ির অনতি দূরে পড়ল, আর যাতায়াতের জন্য একই রাস্তা। এটা মৌলি জানত না। একদিন স্কুলে আসার পথে দেখা হল মৌলির সাথে নদীর ঘাটে। মৌলি তো অবাক। আকাশ এদিক থেকে আসার তো কথা নয়। এদিকে ছোট নদীর সাঁকোটি কারা ভেঙ্গে দিয়েছে। তাই সাময়িক চলাচলের জন্য ছোট নৌকা রাখা হয়েছে। ভাগ্যক্রমে সেদিন আকাশ ও মৌলি একই নৌকায় চড়েছে। নৌকায় ছাত্র-ছাত্রী ছাড়াও ছিল পথচারি। সাইকেল টুকরি মিলিয়ে যাচ্ছেতাই অবস্থা। মৌলি এমনিতে চটপটে স্বভাবের কিন্তু নৌকা চড়ে অভ্যস্ত নয়। নৌকা তীরে ভিড়ার মুহূর্তে লাফ দিয়ে ডাঙ্গায় উঠতে চাইল কিন্তু ভারসাম্য হারিয়ে পড়ল নদীতে। খর¯্রােতা নদী বলে সে ভেসে যেতে লাগল। আকাশ সাত-পাঁচ না ভেবে মৌলিকে ধরতে নদীতে দিল ঝাপ। বেশ কষ্ঠে তাকে উদ্ধার করল। ততক্ষণে মৌলি কাহিল হয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে মৌলি একটু ভাল বোধ করল। আকাশ তাকে হাত ধরে ওর বাড়ি পৌঁছে দিল। সেদিন তার স্কুলে যাওয়া হল না।
সেই থেকে মৌলির সাথে একটা ভাল সম্পর্ক। তবে মৌলি বেশ চালাক। আকাশের সাথে যে তার একটা গুড রিলেশন আছে তা কাউকে বুঝতে দেয় না। নিতান্ত একা না হলে সে কথা বলে না। এদিকে ক্লাসের সুদর্শন যুবক অপু। সে মৌলিকে ভালবাসে। সে ভালবাসাবাসি দূর থেকে। মৌলিকে বলার মত সাহস তার নেই। কারণ দেখতে সে সুদর্শন হলেও বেক বেঞ্চার। কোন রকমে পাশ দিয়ে দিয়ে এ পর্যন্ত এসেেছ। একদিন সে আকাশকে ধরল। ভাই আকাশ আমার একটা কাজ করে দে না। কি কাজ? তুই একজনকে একটা ম্যাসেজ বলতে হবে? কাকে? আমতা আমতা করে বলল- মৌলিকে। কি বলব? আরে দোস্ত বুঝতে পারছিস না। ওকে আমি ভালবাসি। আকাশ বলল- তুই ভালবাসিস সেটা তুই বল। আমাকে দিয়ে বলাতে যাবে কেন? তাছাড়া মৌলিকে তো চিনিস- স্যান্ডেল খুলে মার শুরু করবে। সেটা আমি পারবনারে বাবা। তুই অন্য কিছু বল। অথবা আমাকে ক্ষমা কর। কিন্তু অপু নাছোড়বান্দা। সে অনুনয় বিনয় করতে করতে বলল- দেখ দোস্ত আমার জন্য তুই এই কাজটি কর। আমার বিশ্বাস সে আমার কথায় সায় দিবে। আর যদি বিপরীত প্রতিক্রিয়া হয় তাহলে আমার জন্য হয়ত তুই একটু বেইজ্জত হবি এই যা আর কি।
দিন যায় মাস যায়- আকাশ অপুর প্রস্তাবটি দিতে পারে না। এদিকে প্রতিদিনই অপু আকাশকে চাপ দিতে লাগল। একদিন সত্যি সত্যিই আকাশ অপুর প্রস্তাবটি সুযোগ পেয়ে বলল মৌলির কাছে। যেই মাত্র বলা হয়েছে অমনি মৌলি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। কিন্তু আকাশকে তেমন কিছু বলল না। শুধু বলল- আকাশ, দেখ তুই আমার ক্লাসমেইট হলেও আমি তোকে যথেষ্ট সম্মান করি, একটা ভাল ছেলে বলেই তোকে চিনি। তুই ওকে বলিস সাহস থাকলে ও যেন সরাসরি সেটা আমাকে বলে। আমি তার উপযুক্ত জবাব দিব। আকাশ পরদিন অপুকে ঘটনাটি বলল। অপু লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। এমনিতে সে ক্লাসের দুর্বল ছাত্র। প্রতিদিন সে একটা না একটা সাবজেক্টে স্যারদের দেয়া শাস্তি ভোগ করে। আর ওদিকে মৌলির তীক্ষè দৃষ্টির কবলে পড়বে বলে স্কুলে আসা বন্ধ করে দিল। আকাশ বিষয়টি খেয়াল করল। এবং অপুকে খুঁজতে একদিন গেল ওর বাড়িতে। সে কী অপু বিছানায়! পা ভেঙ্গেছে ফুটবল খেলে। বিষয়টি কেউ জানে না। আকাশ বলল- আরে দোস্ত এই অবস্থা আর তুই কাউকে কিছু বললে না। অপু বলল- আর কী বলব যার জন্য মন কাঁদে সেই যখন পাত্তা দিল না তখন এ জীবন রেখে কী লাভ। আগে মন ভেঙ্গেছে এখন পা ভেঙ্গেছে আর কিছুদিন পর নিঃস্ব হয়ে এ দেহ শূন্যে উড়ে যাবে। তবু আরেকটি কথা মৌলিকে বলিস মৃত্যুর আগে সে যেন একবার আমাকে দেখে যায়......।
আকাশের প্রস্তাব নিয়ে মৌলি ভাবে। শিহরণ জাগে মনে। যদিও সে প্রস্তাবটি উড়িয়ে দিয়েছে তথাপি কথাগুলো তার ভাল লেগেছিল। প্রিয় মুখ থেকে অমন কথা বেরুবে সে আশা করেনি। মৌলি ভাবছিল- আকাশই হয়ত তার পছন্দের কথা বলবে, ‘ভাল লাগার কথা বলবে। কিন্তু একী বলল সে? তবে কী মৌলির জন্য আকাশের বুকে কোন স্থান নেই? আকাশের চোখের দিকে তাকিয়ে সে যা দেখেছে এতে আশান্বিত হওয়ারই কথা। কিন্তু মৌলির আশা নিরাশায় ডুবল, যখন আকাশ অন্য একটি নাম প্রস্তাব করল। মৌলি ভাবে তাহলে কী আমি অন্য একজন দিয়ে আমার মনের কথাটি ওকে বলব? এত কাছাকাছি থেকেও একে অন্যকে জেনেও একটি কথা এখনও অজানা রয়ে গেল। আর ক’দিন পর এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। পরীক্ষা দিয়ে কে কোথায় যাবে তার হদিস থাকবে না। যারা সহপাঠী আছে তারা ছিটকে যাবে যার যার গন্তব্যে। পাঁচ পাঁচটি বছর যাদের সাথে কাটালাম তাদের হয়ত চিরতরেই হারাতে হবে। তবুও যত শীঘ্র সম্ভব আকাশকে মনের কথাটি বলতে হবে। অনেকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। কাছাকাছি গিয়ে ‘ভালবাসি’ কথাটি বলতে গিয়েছে মৌলি। কিন্তু কেন জানি গলার ঠিক নিচে আটকা পড়েছে। সবাই জানে মৌলি চটপটে, মুখকাটা। মুখে যা আসে তাই বলে দেয়, কিন্তু মনের গহীনে থাকা ছোট্ট একটি কথা বলতে পারল না পাঁচটি বছরেও....।
আকাশের পিছুটান অনেক। তার বাবা নেই। ছোট ছোট ভাই বোন একগাদা। ওদের মানুষ করা, নিজে মানুষ হওয়া সব মিলিয়ে একটি প্রচন্ড চাপে আছে সে। এই মুহূর্তে কারও প্রেমে পড়া তার জন্য মানায় না। মৌলির চোখ বলে সে আকাশের দিকেই হাত বাড়াতে চায়। কিন্তু আকাশ তাতে আগায় না। সে কোন এক উপন্যাসে পড়েছিল- নারীরা হাসার আগে পৃথিবী ছিল গোমড়ামুখী। হাসি আনন্দ ছিল না কোথাও। এই পৃথিবীতে যখন নারী এল- হাসল, গান গাইল, পৃথিবীও সেদিন থেকে হাসতে শিখল। এক টুকরো সুখ বাসা বাঁধল পৃথিবীর কোণে। মৌলি যখন ভুবন মোহিনী হাসি হাসে আকাশ তখন পলকহীন নেত্রে চেয়ে দেখে। একী পাগল করা হাসি। দেহ, মন- প্রাণ নিমিষেই হারিয়ে যেতে চায় ঐ মুক্তা ঝরানো হাসির রাজ্যে। কিন্তু সব চাওয়াই তো চাওয়া নয়। বাস্তবতা ভিন্ন। সংসারের দায় টেনে ধরে তাকে পিছন দিকে। ওদিকে যেওনা আকাশ। ফিরে দেখো আমরা কতগুলো অসহায় মুখ তোমারই প্রতীক্ষায়।
এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায়সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে গান গাইল আকাশ। ‘মাটির পৃথিবী তুমিই বল আমার কী অপরাধ/নেই কী আমার তোমার বুকে কোন আশা কোন সাধ’। গান শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় সবাই। স্তব্ধ হয়ে যায় মৌলিও। দু’গাল বেয়ে দু’ফোটা অশ্রু পড়ে। হৃদয় উতলা হয়। আর আল্লাহকে দোষ দেয়- আল্লাহ কেন মানুষ সৃষ্টি করে দুঃখকে সাথী করল? এ তো গান নয়, আকাশের মনের গহীনে জ্বলে থাকা জীবন্ত আগুন। গান হয়ে বেরিয়ে আসছে গলা দিয়ে। তবুও আকাশ যদি আমার হত, তাহলে দুজনে দুঃখটা ভাগাভাগি করে নিতাম। বিদায় সম্বর্ধনার পর যে যার চলে গেল। মৌলি অনেক অপেক্ষা করল কমন রুমে, যদি আকাশ এদিকে আসে। কিন্তু না সে আকাশের দেখা পেল না। ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে গেল বাড়ি। এক মাস পর্যন্ত পরীক্ষা হল পরীক্ষা সেন্টারে। তখনও মৌলি আকাশের দেখা হল না। আরও তিন মাস পর রিজাল্ট হল, সবাই আসলো স্কুলে। মৌলিও আসলো। আসলো না শুধু আকাশ।
এদিকে কলেজের ভর্তির সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। স্কুলের পাওনা পরিশোধ করতে পারেনি বলে আকাশ স্কুলে এসে মার্কসীট, প্রশংসা পত্র নেয়নি। ভর্তির শেষ তারিখে কোত্থেকে আকাশ টাকা সংগ্রহ করে আসলো স্কুলে। স্কুলের পাওনা পরিশোধ করে নিয়ে গেল তার মার্কসীট, প্রশংসাপত্র। অনেক কাঙ্খিত প্রথম বিভাগ পেয়েছে সে। অনেক কষ্টে অর্জিত এই ফল। বাবা অনেক সাধ বুকে নিয়ে আকাশকে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন। আজ বাবা থাকলে নিশ্চয়ই সবার চেয়ে বেশি খুশি হতেন।
অনেক কষ্টে আইএসসি ভর্তি হল আকাশ। ভাই বোন সবাইকে সামলে কোনরকমে পড়ালেখা চালিয়ে গেল। আকাশের বন্ধু অপু-আসিফ অনেকেই লন্ডনে পাড়ি জমিয়েছে। আকাশ শুনেছে মৌলিও নাকি বিয়ে করে লন্ডন চলে গেছে। কারও সাথে যোগাযোগ নেই। শৈশবের আবেগ অনুভূতির সাথে বাস্তবের কোন মিল নেই। যারা ছিল প্রাণের দোস্ত, স্কুল পার হওয়ার পর পরই সবাই পর হয়ে গেল। আকাশ আইএসসি পাশ করে, একটা হাইস্কুলে নিল মাস্টারি। শুরু হল তার কর্মজীবন। আবার বিএ তে হল ভর্তি। মাস্টারি আর লেখাপড়া নিয়ে চলে যাচ্ছে তার সময়। বি.এ পাশ করে হলো সিনিওর শিক্ষক তথাপি লেখাপড়া চালিয়ে যায়। সময় বসে থাকে না। প্রাইভেট মাস্টার ডিগ্রী দেয় সে। এদিকে পরিবার পরিজন আকাশের জন্য পাত্রী খুঁজে। কিন্তু আকাশ বিয়েতে মত দেয় না। বোনদের বিয়ে শাদি দেয় সে। আর ভাইকে পাঠায় বিদেশে। অবশেষে বিয়ের পিড়িতে বসল সে। দিন-মাস-বছর যায়। আকাশ চার চারটে সন্তানের বাবা হয়।
একদিন আকাশের মোবাইলে ফোন আসে। আকাশ ফোন তুলে। হ্যালো কে বলছেন? অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এল আসসালামু আলাইকুম। ওয়া আলাইকুম সালাম। কে বলছেন? আমি অপু। লন্ডন থেকে ফিরেছি এক সপ্তাহ আগে। আরে দোস্ত- খবর নেই অনেক দিন। যাক ভাল আছ তো, হ্যা ভাল আছি। আচ্ছা দোস্ত আগামী শুক্রবারে বাড়িতে আসিস তোর দাওয়াত। আকাশ না করতে পারে না। দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর পর দেখা হবে প্রাণের দোস্তের সাথে। সে এক আলাদা অনুভূতি। অপেক্ষা করতে থাকে আকাশ কখন শুক্রবার আসে। শুক্রবার ভোর হতে আকাশ তৈরি হয়। শহর থেকে গ্রামে যেতে হবে। ঘন্টাখানেক লাগবে। তথাপি দু’ঘন্টা সময় হাতে নিয়ে আকাশ বের হয়। একটা সিএনজি নিয়ে নির্ধারিত সময়ে পৌঁছে যায় আকাশ। অনেক খোঁজাখোঁজির পর অপুর বাড়ি খুঁজে পায়। অপু দেখেই আকাশকে জড়িয়ে ধরে- আকাশ কতকাল পর তোকে দেখলাম। তুইতো সুখেই আছিস দেশে। আমরা কত কষ্ট করছি বিদেশের মাটিতে তা কল্পনার বাইরে। উভয়ের কথাবার্তা চলে- আবেগে আকাশ কেঁদে ফেলে। নিজেকে সংযত করে বলে- ভাল আছিস অপু। তোরা লন্ডনে কত শান্তিতে আছিস্। আর আমরা ময়লা আবর্জনা ঘেটে মরছি বাংলাদেশে। তারপরও ভাল আছি বলতে হবে। স্ত্রী সন্তান নিয়ে দেশের মাটিতেই আছি। ভাবতে সুখই অনুভূত হয়।
হঠাৎ ব্যস্তসমস্ত হয়ে অপু বলল জানিস আকাশ- মৌলি দেশে এসেছে এবং দুর্ভাগ্যবশত আজ তার বাবা মারা গেছেন। আকাশ বলল ইন্নালিল্লাহ। আকাশ ব্যস্ত হয়ে বলল জানাজা কখন? সে বলল বাদ আছর। এ খবরটি আমাদের সিনিওর আরশাদ ভাই ফোন করে বলেছেন। আকাশ বলল চল দোস্ত সুযোগ যখন হয়েছে তখন জানাজায় শরীক হই।
বাদ আছর আকাশ ও অপু পৌঁছে গেল মৌলিদের বাড়ি। একটা লাইটেস নিয়েছে সাথে। ছেলেবেলার আরও দু’তিন বন্ধু এরই মধ্যে ঝুটেছে সেখানে। দুই বাজারের মাঝখানে ঐতিহাসিক সাঁকোটি পার হচ্ছে তারা। আকাশ দেখল সেটি আর বাঁশের সাঁকো নেই। আর সেই স্মৃতি জড়িত রাস্তা হয়েছে পাকা। অনেক বড় রাস্তা মনে হচ্ছে। সেতু হয়েছে নদীর উপর। ১০ মিনিটেই পৌঁছে গেল তারা। জানাজা শেষে অপু বলল চল মৌলিকে দেখে যাই। আকাশ বলল হু।
মৌলিদের ঘরের সামনে দাঁড়াল ওদের লাইটেস। কোথাও কোন সাড়া শব্দ নেই। ইতোমধ্যে সন্ধ্যা নেমে অন্ধকার হয়ে গেছে। চতুর্দিক আঁধারে ঢেকে গেছে। ঘরের সামনে ছোট্ট একটি বিজলিবাতি। এর আলোতে ছোট্ট একটি ছেলেকে নজরে পড়ল। আকাশ ডাকল এই ছেলে এদিকে আস। ছেলেটি আসলে মৌলিকে ডেকে দিতে বলল। ছেলেটি দৌড়ে গিয়ে মৌলিকে ডাকল... মৌলি আপু তোমার মেহমান এসেছে। ধীরে ধীরে দরজা খুলল মৌলি। কোথায় সেই মৌলি?
এক প্রৌঢ় মহিলার মত মনে হল। দরজা খুলে ভিতরে বসতে বলল। আকাশ দেখল মৌলিকে। অনেক দিনের পর দেখা হয় দু’জনে। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল মৌলিও। ওর মন ভাল নেই। আজ তার পিতৃবিয়োগ হয়েছে। তথাপি সে ওদের অভ্যর্থনা জানাতে ভুলল না। আকাশ সেই অতীতের মৌলির সাথে আজকের মৌলির তুলনা করছে। কোথায় সেই মৌলি? এত পরিবর্তন? আসলে মৌলিও চিনতে পারল না ওদের। লন্ডনে থাকতে থাকতে অপু বেশ স্মার্ট হয়েছে তবে মাথায় চুল নেই একটিও। অপু নিজের পরিচয় দিল আর আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলল ও আকাশ। মৌলি বলল কোন আকাশ? আমাদের সাথে যে পড়ত সেই আকাশ? অপু বলল হুম। কোশলাদি জিজ্ঞেসের পর চা এর ব্যবস্থা হল। শত আপত্তির পরও মৌলি চা খাওয়াতে ভুলল না। দশ মিনিটের মাথায় ওদের উঠতে হল। মৌলি কিছু বলল না। শুধু বলল দোয়া কর ভাইয়েরা। বিদায়ের সময় আকাশ একটু এগিয়ে গিয়ে মৌলির সামনাসামনি দাঁড়াল। কাল স্যুট পরা আকাশকে বেশ যুবকই মনে হচ্ছিল। আকাশ চোখে চোখে তাকাল মৌলির। মৌলিও চোখ তুলে দেখল আকাশকে। ক্ষণিকের তরে ভুলে গেল মৌলি ওর পিতৃবিয়োগের কথা। আচমকা এক হাসি খেলে গেল ওর মুখে। সেই ভুবন মোহিনী হাসি যেটি আকাশ অন্তরে লালন করছে দীর্ঘদিন থেকে। আকাশ হারিয়ে গেল সেই ছেলেবেলায়। আহ: মৌলি অধরাই রইলে। মৌলিকে বলল- মৌলি, হয়ত জীবনে এটাই শেষ দেখা যেখানে থেকো ভাল থেকো। আকাশের মনে হল মোবাইল- নম্বর চাইতে। পরক্ষণেই একটা চাপা অভিমান যেন অন্তর আহত করতে লাগল। নিরবে বেরিয়ে এল আকাশ মৌলির ঘর থেকে। দূরে কবরস্থানে জোনাকি পোকার উড়োউড়ি অন্ধকারকেই যেন আরও গাঢ় করে তুলল। দরজার ফাঁক দিয়ে ক্ষীণ আলোক রেখা আকাশের মুখে পড়লে অপু দেখল সেখানে অশ্রুর দাগ। অপু হতবাক হয়ে বলল আকাশ গাড়িতে উঠ। আকাশ উঠে বস

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT