স্বাস্থ্য কুশল

  মাতৃস্বাস্থ্য ও মাতৃমৃত্যু কিছু কথা

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ২২-১০-২০১৮ ইং ০১:২৯:০৫ | সংবাদটি ৬৩ বার পঠিত

‘মা’ এই ডাকটি খুব ছোট, কিন্তু অনেক বেশি মধুর। পৃথিবীর সবচেয়ে মধুরতম এই ‘মা’ ডাকটি শোনার জন্য কতো মা সন্তান জন্ম দানের সময় মারা যান। আবার কতো মা সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যখন জ্ঞান ফেরে তখন অনেক কষ্টের ধন সেই সন্তানটিকে দুর্বল শরীর নিয়ে দুধ পান করান আর ক্ষীণ কণ্ঠে বলেনÑ মা বলে ডাক!/ মা বলে ডাক!/ মা বলে ডাক মাকে!/ একবার গালভরা ‘মা’ ডাকে...।
অবুঝ সন্তান বুঝে না। মায়ের প্রসব দ্বার দিয়ে রক্ত ঝরে আর উপর দিক বা মায়ের বুক থেকে শিশু সন্তান আরামে দুধ পান করে। শিশুর দুধপানের এই দৃশ্য খুবই মনোরম! আর মনোরম এই দৃশ্যের গভীরে মায়ের কষ্ট বড় হয়ে যখন সন্তান বুঝে তখন কাঁদে। মায়ের সেই কষ্টের কথা আরো কিছু জানি এবং মাতৃস্বাস্থ্য রক্ষা ও নিরাপদ মাতৃত্ব কিভাবে নিশ্চিত করা যায় সে ব্যাপারে ভাবি।
বাংলাদেশে প্রতি বছর ৩০-৩২ লাখ মা গর্ভধারণ করেন। তাদের মধ্যে প্রতি হাজারে ১৫ জন মৃত্যুবরণ করেন। এটা খুবই দুঃখজনক। এছাড়া, আমাদের দেশে ১৫ বছর বা এর সমবয়সী মায়েদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তাদের মাতৃত্বকালীন ঝুঁকি অনেক বেশি। তবে আশার কথা এই যে, আগের তুলনায় বাংলাদেশে মাতৃত্ব সেবার উন্নতি হয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতি চারজন নারীর মধ্যে তিনজন গর্ভকালীন সেবা অর্থাৎ এন্টিনেটাল কেয়ারের আওতায় চলে এসেছেন। কিন্তু এক চতুর্থাংশ নারী এখনো চিকিৎসা সেবার আওতায় নেই। তাই গর্ভবতী নারীর সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাপী গর্ভবতী মায়ের প্রথম যোগাযোগ হয় একজন মিডওয়াইফ বা ধাত্রীর সঙ্গে। মিডওয়াইফ বা ধাত্রী নবজাতককে প্রথম পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তাই বর্তমান সরকার সারা দেশে সৃষ্টি করেছেন মিডওয়াইফদের জন্য তিন হাজার সরকারি চাকুরির পদ। এটা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় একটা উদ্যোগ। কিছু উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান বা এনজিও এই বিষয়টি নিয়ে প্রশংসনীয় অনেক কাজ করছে। আসলে উন্নয়নশীল দেশে বিভিন্ন সমস্যা থাকবে। এজন্য পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে হবে। নিরাপদ মাতৃত্বের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো খিচুঁনি বা একলামসিয়া এবং গর্ভ পরবর্তী রক্তক্ষরণ বা পিপিএইচ। প্রসবের বিষয়টি অনেকটা ধাত্রী নির্ভর। তাই একজন মিডওয়াইফকে এই দুই বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ডাক্তার সাহেব এবং নার্সদেরও যৌথভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াকে এ ব্যাপারে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে জন সচেতনতা সৃষ্টিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। যে মায়েরা বাসায় বা বাড়িতে সন্তান প্রসব করেছেন তাদের প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করতে হবে। সরকারি সংস্থার বিভিন্ন কর্মীদের মাধ্যমে বেসরকারি সংস্থাও এই সরবরাহের কাজ করতে পারে।
সন্তান জন্ম দেবার পর একজন মায়ের তিন দিন রক্তক্ষরণ হয়। এই তিন দিন প্রসূতি মাকে পরিবারের সদস, স্বেচ্ছাসেবী ও স্বাস্থ্যকর্মী, নার্স এবং সর্বোপরি একজন ডাক্তার বিভিন্ন পরামর্শ অথবা মানসিক সাপোর্ট দিতে পারেন। কারণ, এই সময় একজন মা তার জীবনের কঠিনতম সময় অতিক্রম করেন এবং অনেক ভয় ও মানসিক দুশ্চিন্তার মধ্যে দিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত পার করেন। অনেক মায়ের প্রেসার খুবই ল’ হয়ে যায়। তাই মা ভয়ের মধ্যে, ঘোরের মধ্যে থাকেন। মায়ের এই দুঃসময়ে পরিবারের সদস্য অথবা নার্সদের ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি।
প্রতিটি হাসপাতালের লেবার রুম বা প্রসবকক্ষে কমপক্ষে চারজন মিডওয়াইফ বা ধাত্রী রাখতে হবে। কারণ, অনেক সময় দেখা যায়, নরমাল ডেলিভারি হলে ডাক্তারদের চেয়ে মিডওয়াইফরা বেশি প্রসব করান এবং গর্ভবতী মায়েরাও স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। দরিদ্র মা যেন সঠিক সেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সরকারের স্বাস্থ্য খাতকে সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ছোট পরিসরে ল্যাব সুবিধা প্রদান করে প্রসব পূর্ববর্তী সেবা (এএনসি) বাড়াতে হবে। সরকারের পাশাপাশি সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও এই ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজে অংশগ্রহণ করার দরকার আছে। তবেই নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত হবে। সন্তান প্রসব করে সেই আদরের টুকরোকে কোলে নিয়ে মা বলবেÑ মা বলিয়া বাছা,/ ডাকো রে একবার!/ মা বলিয়া বাছা,/ ডাকো রে একবার!
বর্তমানে প্রতি লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যু সংখ্যা ২১৬। অর্থাৎ বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ জন মা মারা যান। প্রসবের ৪২ দিনের মধ্যে কোনো মায়ের মৃত্যু হলে তাকে মাতৃমৃত্যু বলে। বর্তমানে আমাদের দেশে প্রতি লাখ জীবিত জন্মে ১৭৬ জন মা মারা যান। ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৭০-এ নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে সরকার। প্রসবের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ৫৫ শতাংশ এবং ৪৫ শতাংশ মা মারা যাচ্ছেন প্রসবের ৪২ দিনের মধ্যে। বাড়িতে বা বাসায় প্রসবের জন্য ৫৪ শতাংশ মা মারা যান। হাসপাতালে যোগাযোগ করতে না পারা, বাল্যবিবাহ, শিক্ষার অভাব, কু-সংস্কার ইত্যাদি কারণে আমাদের দেশে প্রতিদিন মারা যান প্রায় ১৫ জন মা। চিকিৎসক সংকট, হাসপাতালে যথাযথ প্রস্তুতির অভাব, অনেক হাসপাতালে গর্ভবতী মাকে অবহেলা করা হয়-এই সমস্ত কারণেও অনেক মা অকালে প্রাণ হরান।
দেশের অনেক হাসপাতালে মাতৃমৃত্যুর প্রধান দুই কারণ, রক্তক্ষরণ ও খিচুঁনি বন্ধের জন্য তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই। যেমন বাসায় বা বাড়িতে, হাসপাতালের আউটডোর ও ইনডোর সব জায়গায় এ ব্যাপারে পরিকল্পিত কোনো পদক্ষেপ নেই। বিশেষ কোনো উদ্যোগও গৃহিত হয়নি। উপজেলা, জেলা হাসপাতালে রক্তক্ষরণ ও খিচুঁনির সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া অতিব জরুরি। শুধু এ দু’টো বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারলে মাতৃমৃত্যু অনেকটা কমে আসবে এবং নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত হবে বলে আমি মনে করি।
মায়ের যতœ নিন, মা মারা গেলে অবসর সময়ে একা ভরা পূর্ণিমার রাইতে আলোকিত আকাশের পানে তাকিয়ে মাগো মা! ওগো মা! বলে কাঁদবেন। মনে প্রশান্তি আসবে। পৃথিবীর সকল মাকে বিন¤্র শ্রদ্ধা।

শেয়ার করুন
স্বাস্থ্য কুশল এর আরো সংবাদ
  • কম বয়সে হৃদরোগের ঝুঁকি
  • শিশুর কয়েকটি অসুখ ও পরামর্শ
  • হাড়ক্ষয় রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা
  • শীতে নাক কান গলার সমস্যা ও সমাধান
  •   নীরব ঘাতক রক্তচাপ
  • গর্ভাবস্থায় কী খাবেন
  •   মাতৃস্বাস্থ্য ও মাতৃমৃত্যু কিছু কথা
  • সচেতন হলেই প্রতিরোধ ৬০ শতাংশ কিডনী রোগ
  •   হৃদরোগীদের খাবার-দাবার
  • ঘামাচি থেকে মুক্তির উপায়
  • মুখে ঘা হলে করণীয়
  • পায়ের গোড়ালি ব্যথায় কী করবেন
  • নীরব রোগ হৃদরোগ
  • পরিচিত ভেষজের মাধ্যমে অর্শের চিকিৎসা
  • অনিদ্রার অন্যতম কারণ বিষন্নতা
  • রক্তশূন্যতায় করণীয়
  • চোখে যখন অ্যালার্জি
  • স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে বাঁচার ১০টি উপায়
  • রোগ প্রতিরোধে লেবু
  •  স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্কের যত্ন নিন
  • Developed by: Sparkle IT