মহিলা সমাজ

প্রগতির পথিকৃৎ হুসন আরা

সৈয়দা মানছুরা হাছান (মিরা) প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-১০-২০১৮ ইং ০০:৪৯:১৭ | সংবাদটি ৭১ বার পঠিত

পৃথিবীর একটি নির্মমতা আছে। সে মানুষকে ধরে রাখে না! ধরে রাখে তার কাজ। যারা কালজয়ী মানুষ তারা টিকে থাকেন। কিন্তু যারা সাধারণ, তাদেরও আকুতি আছে টিকে থাকার। নানা প্রতিষ্ঠান, অনুষ্ঠান ও আয়োজনের মাধ্যমে তারা রেখে যেতে চান নিজেদের স্মৃতিচিহ্ন।
কর্মে মানুষ বেঁচে থাকে, কারণ জীবনতো ক্ষণস্থায়ী, এর যেকোনো সময় অবসান ঘটে, কিন্তু কেউ যদি মানুষের তরে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে কাজ করে যায়, তবে সেই হয় চিরজীবী এবং ইতিহাসের পাতায় তার নাম লেখা থাকে। আমি আজ এমনই একজন মহিয়সী নারীর কথা বলব। যার অবদান আমাদের সিলেটের নারী শিক্ষাক্ষেত্রে অবর্ণনীয়, তিনি হলেন অধ্যক্ষ হুসন আরা আহমদ।
শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের এতদঞ্চলের নারীরা অনেক পিছিয়ে ছিল। সেই পশ্চাৎপদ নারীদের শিক্ষায় অগ্রসর হতে তিনি বিরাট অবদান রেখেছেন। সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ-এ তাঁর দীর্ঘ ৩২ বছরের কর্মজীবনে এই বিদ্যাপীঠের অগ্রগমনে তাঁর মেধা, শ্রম ও স্বপ্ন বিনিয়োগ করেছেন, যার ফলে উক্ত কলেজ এই অঞ্চলে তথা সমগ্র জাতির নারী প্রগতিতে ধারাবাহিক অবদান রেখে চলেছে।
নারী জাগরণ ও নারী শিক্ষা প্রসারের অন্যতম পথিকৃৎ শ্রদ্ধেয় অধ্যক্ষ হুসন আরা আহমদ। তাঁর পৈতৃক নিবাস বালাগঞ্জ উপজেলার দেওয়ান বাজার ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী আনোয়ারপুর গ্রামে। পিতা আব্দুল ওয়াহাব চৌধুরী (আজিজ মিয়া)। তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা হয় বাড়ির পাঠশালায়। তারপর ভর্তি হন সিলেট সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে। ১৯৪১ সালে তিনি মেট্টিক পাশ করে মুসলমান ছাত্রীদের জন্য নির্ধারিত বৃত্তি লাভ করেছিলেন। হুসন আরা আহমদ আগাগোড়াই মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। ১৯৪৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম. এ পাশ করেন।
উল্লেখ্য যে, তিনি এক জায়গায় লিখেছেন, একদিন সিলেট থেকে বেগম জোবেদা রহিম চৌধুরী আমার স্বামী ডা. শামসুদ্দীন আহমদের কাছে ঢাকায় এসে বলেন, ‘পাকিস্তানের জন্য তুমি আত্মত্যাগ করেছ এখন শিক্ষার জন্যও তাই করতে হবে। হুসনারাকে সিলেট কলেজে নিয়ে না গেলে চলবে না। রিকশা ভাড়াও হয়তো দিতে পারব না। কিন্তু মেয়েদের শিক্ষা প্রসারের জন্য তাকে আমাদের একান্ত দরকার’। তখন আমাদের নতুন সংসার। তখন পর্যন্ত ৫ সন্তানের মধ্যে ২ জনের জন্ম হয়েছে, ছোট সন্তানের বয়স মাত্র ১১ মাস। কিন্তু কলেজ বাঁচানোর তাগিদেই শেষ পর্যন্ত আমি সিলেট যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। সমাজ ও দেশের জন্য নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করাই কর্তব্য মনে করেছি। সে জন্য, কর্তব্য পালনের তাগিদেই, আমাকে ও আমার স্বামীকে জীবনের বেশিরভাগ সময় আলাদা থাকতে হয়েছে।
১৯৫০ সালের ডিসেম্বর মাসে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে তিনি বাংলার অধ্যাপিকা হিসেবে যোগদান করেন। সেই থেকে নারী শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়নে তাঁর ব্রত শুরু হয়েছিল। ১৯৫৯ সালে হুসন আরা আহমদ অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। তৎকালীন সমাজ ও পরিবেশ রক্ষণশীল মনোভাবাপন্ন হওয়ার কারণে নারীর উচ্চশিক্ষা ব্যাহত হচ্ছিল। কিন্তু এই কলেজটি নারীর উচ্চ শিক্ষার পথ যে সুগম করেছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
দীর্ঘ ৩২ বছর হুসন আরা আহমদ এই কলেজের বিবিধ সংকট মোকাবিলা করে কলেজকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। উল্লেখ্য, ১৯৮২ সালে কলেজ সরকারিকরণের অব্যবহিত পরেই তিনি অবসরে যান। তখনকার সময়ে কলেজের শিক্ষকরা খুব আন্তরিক ছিলেন এবং ছাত্রীসংখ্যা সীমিত হলেও তাদের মধ্যে জ্ঞানপিপাসা ছিলো নিঃসন্দেহে। এই কলেজের পরিবেশ সুন্দর রাখতে অনেক শক্ত হাতে কঠিন পরিস্থিতি তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। দলাদলির মাধ্যমে ছাত্রীদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি না করার জন্য তিনি কলেজের প্রাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ রাখেন। এতে করে ছাত্রী এমনকি শিক্ষকদের মাঝেও বিরাজমান ছিলো সুন্দর ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ। উল্লেখ্য, সিলেটে নারী শিক্ষার প্রসার ও অগ্রগতির জন্য তিনি আম্বরখানায় একটি আদর্শ শিশু স্কুল ও মেয়েদের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন।
বিদ্যায়তনিক শিক্ষার প্রসার ও মানোন্নয়নের পাশাপাশি নীতিবোধ ও মূল্যবোধের উৎকর্ষ সাধনে তাঁর অবদান অনন্য। পঞ্চাশ, ষাট ও সত্তরের দশক জুড়ে সিলেট অঞ্চলে বিভিন্ন সামাজিক সাংগঠনিক উদ্যোগের আয়োজন ও নেতৃত্ব প্রদানে তিনি রেখেছেন বলিষ্ট ভূমিকা। তাঁর স্বামী মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবনোৎসর্গকারী শহিদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ। নারী শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নকাজে তাঁর চিকিৎসক স্বামীর ছিল সর্বাত্মক সমর্থন ও সহযোগিতা। সমাজ ও মানুষের সেবায় তাঁরা একে অপরের পরিপূরক হয়ে কাজ করে গিয়েছেন আজীবন। তাঁরা নিজেদেরকে বিলিয়ে দিয়েছেন একটি স্বপ্ন সম্ভব সমাজ ও সুন্দর আগামীর জন্য। বৃহত্তর স্বার্থে তাদের সেই ত্যাগ বিফল হয়নি; বরং সমাজ ও সময় এগিয়েছে ইতিবাচক কার্যে সামনের দিকে, তৈরি হয়েছে উৎকর্ষগামী প্রগতির পরিসর। এরা নিয়েছেন যত, ফিরিয়ে দিয়েছেন তার চেয়ে অনেক বেশি।
অধ্যক্ষ হুসন আরা আহমদ একজন অগ্রণী বিদূষী ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাক্ষেত্রে যার অবদান সুবিদিত। এতদঞ্চলের শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া নারী সমাজকে তিনি শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে তাদের উন্নয়নে কাজ করে গেছেন নিরলসভাবে। যার ফলশ্রুতিতে আমরা পেয়েছি প্রগতিশীল নারী ব্যক্তিত্ব। যারা আজ জ্ঞান গরিমায় স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন এবং উন্নত, সুখী ও সুন্দর সমাজ গঠনে অবদান রেখে যাচ্ছেন। সিলেটের নারী প্রগতির পথিকৃৎ আমাদের শ্রদ্ধাভাজন অধ্যক্ষ হুসন আরা আহমদ আজ আর বেঁচে নেই। কিন্তু তিনি তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকবেন। আমি এই কলেজের প্রাক্তন ছাত্রী হিসেবে গর্বিত। তাঁর প্রতি রইল আমার গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। আমাদের সমাজে যেন তাঁর মতো কর্মী এবং বিদূষী নারী জন্ম নেন যুগে যুগে, এই আমার প্রত্যাশা।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT