মহিলা সমাজ

অন্তু এখন একা

সামদিনা খান রুমি প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-১০-২০১৮ ইং ০০:৫১:৩৮ | সংবাদটি ৬৪ বার পঠিত

সারাদিন প্রচন্ড রোদের তেজ ছিল। কাঠফাটা রোদ্দুর। রাস্তাঘাটের পিচ গলে গলে পড়ছে। মনের ভেতরে হা-হুতাশ। গরমের সাথে লেপ্টে একটা বিরূপভাব ধারণ করছে। মাউন্ট এডোরা হসপিটালের আটতলার সিসিইউতে অন্তুর মা জীবনের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন। অন্তুর মনের অবস্থা খুবই খারাপ। মা বাঁচবেন তো? তার মায়ের অবদানের কথা কাকে বুঝাবে সে। জননী কত সংগ্রামী, মমতাময়ী সে জানে।
অন্তুরের ভাইবোনরা সবাই এসেছেন। সবাই কান্নাকাটি করছেন। বিদেশ থেকে এসেছেন, জলিবু, সাহেরাবু, দুলাল ভাই। নেদারল্যান্ডে ছিলেন বড়বু, টিকেট পাননি আসতে পারেনি, বাইশ বছর ধরে আমেরিকাতে অন্তুরাবু মায়ের মায়া ভরা মুখ দেখেননি। প্লেনে উঠলে শ্বাস কষ্ট হয়। তাই আসতে পারেননি। দেশেই থাকেন সেজবু, নুড়িবু। নুড়িবুকেই মা একটু ভরসা করেন। মায়ের জমানো টাকা পয়সা নুড়িবুর কাছে থাকতো। নুড়িবুই মাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেত, মা নুড়িবুকে বলতো আমার জমানো টাকা পয়সা আমার মৃত্যুর পর কাজে লাগিও।
মা ভালোবেসে অন্তুকে সব টাকা পয়সা দিতেন। একসময় অন্তু জীবনের ঝুকির মুখে পা বাড়িয়েছিল। সেই পথ থেকে মাই তাকে ফিরিয়ে এনে আলোর পথ দেখিয়েছেন। নুড়িবুকে বলেছিলেন মা ভালো দেখে মেয়ে দেখতে। তারপর একদিন ধুমধাম করে অন্তুকে মা বিয়ে দিয়েছিলেন। আজ অন্তুর ঘর আছে, সংসার আছে, সন্তান আছে, শুধু মা পরপারে পা বাড়াচ্ছেন।
বেলা বাড়ছে। গিজ গিজ করছে হসপিটার চত্বর। স্বার্থপর পৃথিবীতে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে মানুষ দিশেহারা। অধিক আগ্রহে অন্তুরা সব ভাইবোন হসপিটালের এক চিলতে বারান্দায় অপেক্ষারত কারো হাতে তসবি, কারো হাতে অজিফা। কেউ মৃদু হেসে মায়ের স্মৃতিচারণে ব্যস্ত। অন্তু একা দাড়িয়ে এক কোনে। ছোট্ট লিফট ঘেসে অনেক মানুষ অপেক্ষায়। বেদনার ক্লান্তিতে ছেয়ে গেছে কতজনের মুখ, কেউ কেউ হাসতে হাসতে প্রিয়জনকে নিয়ে বাড়ি ফিরছে। বুকের ভেতরটা হাহাকারে ভরে যায় অন্তুর। আহারে আমার মা বাচঁবেন তো।
মায়ের সুন্দর হাস্যজ্জ্বোল মুখটা ভেসে ওঠে অন্তুর মনে। মায়ের মুখে শোনা যুদ্ধের গল্প পাক হানাদার বাহিনির গল্প। কিভাবে মা সাহসের সাথে সন্তানদের নিয়ে লড়েছিলেন, সে সব দিনের গল্প, যুদ্ধের সময় বাবা ছিলেন বিলেতে মা তখন শাশুড়ি, দেবর সন্তান নিয়ে লড়ে বেঁচেছিলেন।
সংসারে মা সবাইকে শুধু দিয়েছিলেন। বিনিময়ে কিছুই নেননি। এই হসপিটালে যখন মা কিছুটা সুস্থ অবস্থায় ছিলেন তখন নিজে না খেয়ে কিভাবে নার্স, আয়াদের খাওয়াবেন, নিজে না খেয়ে সেটা নিয়ে রাগারাগি করতেন অন্তুদের সঙ্গে। মা সবাইকে ভালোবাসতেন হাসিমুখে কথা বলতেন। পৃথিবীকে ভালোবাসতেন, মানুষদের ভালোবাসতেন তাইতো বাঁচার বড় সাধ ছিল মার। দেখতে গেল, অন্তুও গেল।
মায়ের মুখে বড় মাস্ক লাগানো, অক্সিজেন চলছে। মনিটরে দেখা যাচ্ছে হার্টবিট প্রেসারের নাম্বারগুলো। প্রেসারটা কিছুতেই উঠছেনা। অন্তু দেখলো কোমল মুখটা মার। ঠিকযেন বড় ভাইজানের মুখের মত। বড় ভাইজান দেড় বৎসর আগে মারা গেছেন। এই দুঃখটা মাকে কম ঝরায়নি, প্রতিদিন মা বড় ভাইজানকে স্বপ্নে দেখতেন, বাবাকে স্বপ্নে দেখতেন। বাইরে বেরিয়ে এল অন্তু। বাইরে ঝিরঝিরে হাওয়া বইছে, ঠান্ডা হাওয়া, আবছা আলো আধারীতে খ্রীষ্টান টিলাকে মনে হচ্ছে ভৌতিক।
আটতলা থেকে তাকালে নীচে শহরটাকে বড়ই অচেনা মনে হচ্ছে। অন্তুর নিজেকে বড় একা মনে হচ্ছে। মায়ের সঙ্গে কত সময় কথা কাটাকাটি, মান অভিমান, অহেতুক ভুলবুঝা এসব মনে হয়ে কষ্ট বাড়ছে বুকে। অন্তুর মনে হল মা’তো আমাকে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত করে গেলেন সেই মা যদি না থাকে তাহলে কিসের জন্য বাঁচা। রাত দশটার দিকে অন্তুর মায়ের শরীর বেশি রকমের খারাপ হল। সবার ছোটাছুটি শুরু হল। হুড়মুড় করে ভেতরে ডাক্তার সবাইকে ডাকলেন। মায়ের নিঃশ্বাস ঘন ঘন উঠা নামা করছে। সাদা বেডের চারপাশ জুড়ে ডাক্তার, নার্স, অন্তুর সব ভাই জড়ো হলেন, মায়া ছেড়ে সকলে কলেমা তায়িব্যে পড়ছে, অন্তু ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। বুকফাটা আর্তনাদে হসপিটালের আট তলার সিসিইউ কেঁপে উঠছে, নির্বাক ডাক্তার নার্স, অসহায় অন্য রুগিরা, হাসিভরা মুখ নিয়ে চিরতরে চলে গেলেন অন্তুদের জননী। বাইরে এ সময় প্রকৃতিতেও ঝড় উঠলো ক্রন্দনে। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে ঠান্ডা ঝড় উঠলো প্রকৃতিতে। যেন প্রকৃতি কিছুতেই অন্তুর মায়ের চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেনা তাই বিলাপ করছে।
এরপর চলে গেল দিন। অন্তু এখন একা। সংসার আছে, সন্তান আছে সব আছে, শুধু মমতাময়ী মা নেই। মায়ের সেই ¯েœহকাড়া ডাক নেই, কইরে অন্তু, খেতে আয়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT