মহিলা সমাজ

জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ

শেখ উমায়ের প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-১০-২০১৮ ইং ০০:৫২:৪৩ | সংবাদটি ৮৩ বার পঠিত

বাংলাদেশ সরকারের মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর জীবনযুুদ্ধে জয়ী নারীদের স্বীকৃতি প্রদানের জন্য ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলদেশ’ শীর্ষক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩ অক্টোবর ২০১৮ বুধবার বিভাগীয় পর্যায়ে জয়িতাদের সম্মাননা প্রদানের জন্য সিলেট বিভাগের শ্রেষ্ঠ জয়িতা সংবর্ধনা অনুষ্ঠান কবি নজরুল অডিটোরিয়ামে আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাছিমা বেগম (এনডিসি) স্কাইপের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। তার সাথে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) কাজী রওশন আক্তারও স্কাইপে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মো: কামরুল আহসান বিপিএম, মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তোফায়েল ইসলাম এবং সাবেব সংসদ সদস্যও বেগম রোকেয়া পদক প্রাপ্ত সফল নারী নেত্রী সৈয়দা জেবুন্নেছা হক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন- সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী।
বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় সিলেট এর সিনিয়র সহকারী কমিশনার ইয়াসমিন নাহার ও সহকারী কমিশনার অনুপমা দাস এর যৌথ উপস্থাপনায় এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমী সিলেট এর নৃত্য শিল্পীদের উদ্বোধনী নৃত্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করা হয়। স্বাগত বক্তব্য রাখেন- অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) ও বিচারক কমিটির সভাপতি মো. আজম খান। অনুষ্ঠানে ৫টি ক্যাটাগরিতে জেলা পর্যায়ে ১৫ জন এবং বিভাগীয় পর্যায়ে নির্বাচিত ৫ জন শ্রেষ্ঠ জয়িতাকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। বিভাগীয় জয়িতাদের নাম ঘোষণার পর তাদের জীবনগাঁথা নিয়ে নির্মিত ভিডিও ক্লিপ প্রদর্শন করা হয়।
বিভাগীয় পর্যায়ে নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ ৫ জন জয়িতা হচ্ছেনÑ (১) অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী আসমা উল হাসনা খান (সিলেট) (২) শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী মোছাঃ রিপা বেগম (সিলেট) (৩) সফল জননী নারী, বীনা রানী রায় (সুনামগঞ্জ) (৪) নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছেন যে নারী হাসনা বেগম (মৌলভীবাজার) (৫) সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন যে নারী, ইন্দ্রানী সেন (সিলেট)। অনুষ্ঠানে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে ৫টি ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত জয়িতাদের ক্রেষ্ট, সনদপত্র ও নগদ অর্থ প্রদান করা হয়।
আসমা উল হাসনা খান :
আসমা উল হাসনা খান ১৯৭৪ সালে সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলার সেলবরষ গ্রামে মামার বাড়িতে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর বাবা নুর মিয়া ছিলেন একজন কৃষক ও মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ১১নং সেক্টরের অধীন তাঁর বাবা যুদ্ধ করেন। দেশের জন্য লড়তে লড়তে শহীদ হয়েছেন তার তিন মামা। রাজাকার হানাদার মিলে তাদের গ্রামের বাড়ী ও নানার বাড়ী পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল সেই একাত্তরে । এমন পরিবারের একটি মেয়ে সকল প্রতিকূলতা কাটিয়ে সফল হওয়ার শক্তি অর্জন করতে পেরেছেন সেখান থেকেই। দুই সন্তানের জননী আসমা’র স্বামী একজন ব্যবসায়ী।
বেগম রোকেয়ার আদর্শে অনুপ্রাণিত আসমা উল হাসনা। কোন ধনীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেননি। ছোটবেলা হতেই দারিদ্রের বিরুদ্ধে কঠোর সংগ্রামে নামতে হয়েছে তাকে । পিতার তেমন আয় রোজগার না থাকায় অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে তাদের দিনকাটত। সেজন্য তার বাবা জীবিকার তাগিদে তাদেরকে নিয়ে সিলেট শহরে চলে আসেন। সংসারের নানা অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে অনেক কষ্ট করে আসমা উল হাসনা খান এস.এস.সি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। তিনি ১৯৯০-৯১ অর্থ বছরে জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়, সিলেট হতে ১ বছর মেয়াদী দর্জি বিজ্ঞান ট্রেডে প্রশিক্ষণ নেন। তখনকার সময়ে সিলেটের নারীরা যখন ঘর থেকে তেমন একটা বের হত না তখন তীব্র নিন্দা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে নানীর কাছ থেকে পাওয়া মাত্র ১,৪০০/- (এক হাজার চারশত) টাকা পুঁজি নিয়ে একটি সেলাই মেশিন ক্রয় করে বাসায় ছায়া, ব্লাউজ সেলাই করে দিতেন দর্জির দোকানে। এসবেরও তিনি ন্যায্য মূল্য পেতেন না। পরবর্তীতে অনেক কষ্ট করে ছোট একটি লেডিস টেইলার্স শপ খুলেন। কিছুদিন পর সেলাই ও কাটিং এর উপর উন্নত প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেই চালু করেন মহিলাদের জন্য সেলাই ও কাটিং এর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। প্রায় দেড় শতাধিক নারীদের সেলাই ও কাটিং এর উপর প্রশিক্ষণ দেন আসমা উল হাসনা। তিনি তার প্রতিষ্ঠানে অনেক হতদরিদ্র মহিলাদের কাজের সুযোগ করে দিয়েছেন। কায়িক পরিশ্রমের বিনিময়ে তার টেইলার্স হতে যে উপার্জন হতো তার থেকে কিছু টাকা জমিয়ে একটি দোকান দেন সিলেট প্লাজায়। মার্কেটের সাথে নাম মিলিয়ে দোকানের নামকরণ করেন স্টার প্লাজা টেইলার্স। এরপর দোকানের চুক্তিনামায় মহিলার নাম দেখে দোকানের মালিক দোকান ভাড়া দিতে চান না । মার্কেটের মালিককে অনেক বুঝিয়ে চুক্তিনামায় সই করান। অত:পর ধীরে ধীরে তার ব্যবসা উন্নত হতে থাকে। তিনি জিন্দাবাজারস্থ সিলেট প্লাজার ৩য় তলায় ‘স্টার প্লাজা টেইলার্স’ নামে বড় পরিসরে ব্যবসা শুরু করেন। পাশাপাশি ২০১৪ সালে স্টার ফ্যাশন হাউস নামে আরোও একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলেন। এতে তার ফ্যাশন হাউজ ও একটি সেলাই কারখানা রয়েছে। তাতে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি অর্ধশতাধিক নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করেছেন তিনি। বর্তমানে স্টার প্লাজার ৪টি শো-রুম রয়েছে সিলেট শহরের বিভিন্ন মার্কেটে। তাঁর সেলাই কারখানায় ৬০ জন কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। তিনি ছোটবোন শেফা সাবরিনার সাথে যৌথ উদ্যোগে চালু করেন ”সাবরিনা’স কিচেন” নামে একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্ট। পিছিয়ে পড়া নারীদেরকে এগিয়ে নিতে সাধ্যমত কাজ করে যাচ্ছেন আসমা উল হাসনা । প্রশিক্ষক হিসেবে আসমা অঙ্গরুপা নামে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়েছিলেন। সেখানে প্রতি বছর নিজস্ব উদ্যোগে দু:স্থ ও দরিদ্র মহিলাদের বিনামূল্যে সেলাই প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। প্রশিক্ষণ শেষে তাদেরকে বিনামূল্যে সেলাই মেশিন প্রদান করছেন। ব্যবসায় নেমে অবশ্য ব্যর্থতার ছোঁয়াও পেয়েছেন তিনি। জিন্দাবাজারের আলহামরায় একটি দোকান করেছিলেন তিনি অজ্ঞাত কারণে সেখানে ব্যর্থ হয়েছেন। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হতে অনেক প্রতিকূলতাও মোকাবেলা করতে হয়েছে তাকে। ঘরে-বাইরে সব জায়গায় সব সময় নানা বিধি নিষেধ তো আছেই, আছে প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবসায়ীদের প্রতিহিংসামূলক আচরণ। নারী- বিদ্ধেষমূলক আচরণ এবং নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে একই অবস্থা। তবুও এগিয়ে গেছেন আসমা উল হাসনা, মোটেও পাত্তা দেননি এসবে। নিজের পরিবার থেকে সহযোগিতা আদায় করে নিয়েছেন। তিনি সিলেট উইমেন্স চেম্বার অব কমার্স এর একজন সম্মানিত সদস্য। ইতিবাচক কর্মকান্ড ও নিবেদিত প্রাণ কর্মী হিসেবে তিনি বহু সম্মাননা অর্জন করেছেন। যার মধ্যে রয়েছে বঙ্গবীর এম এ জি ওসমানী স্মৃতি পদক, মাদার তেরেসা স্বর্ণ পদক ও শেরে বাংলা শান্তি পদক, ২০১২ সালে তার বোন সাবরিনা খানের সাথে যৌথভাবে পেয়েছিলেন সেরা রাঁধুনি এ্যাওয়ার্ড। বর্তমানে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানদ্বয়ের বাজার মূল্য প্রায় ৫০,০০,০০০/- (পঞ্চাশ লক্ষ) টাকা। বর্তমানে তিনি অর্থনৈতিকভাবে সফল একজন নারী। এলাকায় সবাই তাকে সম্মান করে। তাকে অনুসরণ করে অনেক মহিলা জীবন সংগ্রাম শুরু করেছেন। আসমা উল হাসনা’র মতে কঠোর পরিশ্রম, মুখ বন্ধ রেখে ধৈর্য্যরে সাথে কাজ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি স্বামী এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সহযোগিতাও একজন নারীর এগিয়ে যাওয়ার জন্য খুবই জরুরী। আর পরিবারের সহযোগিতা পেয়েছিলেন বলেই আজ তিনি একজন সফল নারী।
মোছাঃ রিপা বেগম :
মোছাঃ রিপা বেগম ১৯৮৩ সালে তেতলি ইউনিয়নের দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় জন্ম গ্রহণ করেন। তার বাবা পেশায় একজন কৃষক ছিলেন। ৫ বোন ও ৩ ভাই ও বাবা মা সহ ১০ সদস্যের পরিবার। অনেক কষ্ট করে তার পিতা সংসার চালাতেন। দারিদ্রের বাঁধাকে উপেক্ষা করে অনেক কষ্ট করে নিজ মনোবলে তিনি লেখাপড়া চালিয়ে যান এবং ২০০০ সালে এসএসসি ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এসএসসি পাসের পর আর্থিক অস্বচ্ছলতার জন্য পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। তিনি তার পালিত হাঁস মুরগী বিক্রি করে ২০০১ সালে এইচএসসি তে ভর্তি হন। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে সেলাই বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে সেলাইয়ের কাজ করে নিজের ও ভাই বোনের পড়ালেখার খরচ বহন করতেন। এভাবে ২০০৩ সালে তিনি এইচ এস সি পাস করেন। ২০০৫ সালে তার এলাকায় প্রথম মহিলা উদ্যোক্তা হিসেবে রুপসী বাংলা লেডিস টেইলার্স এন্ড বুটিকস- নামে একটি বুটিকস হাউস প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি তিনি পড়ালেখাও চালিয়ে যান। ২০০৮ সালে বি,এ পাস করে লাউয়াই ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসায় কম্পিউটার শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ২০১০ সালে বি,এড, এম এ (বাংলা) ও এল এল বি পাস করেন। তিনি ২০১১ সালে নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফ্রন্ট ডেক্স অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। তিনি তার চাকুরীর পাশাপাশি ব্যবসাও চালিয়ে যান। ২০১৪ সালে রুপসী বাংলা লেডিস টেইলার্স এন্ড বুটিকস-২ প্রতিষ্ঠা করেন। তার এক ভাই রাসেল মিয়া (বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধি) তার জন্য কোন কর্মসংস্থানের সুযোগ করতে না পারায় তাকে যুব উন্নয়ন থেকে গবাদি পশু পালনের উপর প্রশিক্ষণ দিয়ে রাসেল ফার্ম হাউস নামে একটি ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনি নিজেও গবাদিপশু পালনের উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। রাসেল ফার্ম এ বর্তমানে ১২টি গরু ও ২০০০ সোনালী মোরগ আছে। তার ভাই বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধি হওয়ায় ফার্ম পরিচালনার যাতে ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয় সেজন্য সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তিনি নিজেই পালন করেন। ২০১৩ সাল থেকে অদ্যাবধি তিনি বিসমিল্লাহ কম্পিউটার ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষক ও ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। পাশাপাশি যুব উন্নয়ন কর্তৃক পরিচালিত সেলাই প্রশিক্ষণ কোর্সের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। তার ২ বোনকে বি এ পাশ করানোর পর বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে তার ১ ভাই অনার্সে ও ১ বোন মাস্টার্স ফাইনালে অধ্যয়নরত। তার প্রচেষ্টায় তার সকল ভাইবোনকে লেখাপড়ার পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে কাজ করছেন। তার ৩টি প্রতিষ্ঠানে ২০ জন কর্মচারী কাজ করছে, এর মধ্যে ৩ জন প্রতিবন্ধি কর্মচারী রয়েছে। একদিন অর্থের অভাবে তার পড়ালেখা বন্ধ হতে চলেছিল আজ তিনি নিজে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে চাকুরী ও ব্যবসা করছেন এবং তার ভাইবোনদেরকেও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলছেন। তিনি একজন এডভোকেট হিসেবে সিলেট বারেও প্রেক্টিস করছেন সফলতার সাথে। তার বহুমুখী প্রতিভার জন্য তার এলাকার সকলেই তাকে এক নামে চিনেন এবং এলাকার নারীরা তাকে অনুসরণ করে সাফল্য অর্জন করতে চান।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT