ইতিহাস ও ঐতিহ্য

গ্রামের নাম আনোয়ারপুর

এডভোকেট মোহাম্মদ জুয়েল প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-১০-২০১৮ ইং ০০:৪৬:১৪ | সংবাদটি ২০২ বার পঠিত

বালাগঞ্জ উপজেলার দেওয়ান বাজার ইউনিয়নের একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম আনোয়ারপুর। আয়তন ও জনসংখ্যায় আনোয়ারপুর একটি ছোট্ট গ্রাম। এ গ্রামে এখনো অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর কিংবা কোন স্থাপনা গড়ে না ওঠায় গ্রামে পূর্বের পরিবেশ বিদ্যমান রয়েছে। গ্রামের অনেক গুণীজন নিজ নিজ গুণ ও প্রতিভা দিয়ে এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এলাকাবাসী তাদের নিয়ে গর্ববোধ করে এবং তাদেরকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব আলহাজ্ব আব্দুল গফুর। ডাক নাম গফুর মিয়া। পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক ১৯৫৯ সালের অক্টোবর মাসে ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ আদেশ দ্বারা স্থানীয় স্বায়ত্বশাসন সংস্থাগুলোকে নতুনভাবে সংগঠিত করে। এর প্রথম স্তর হচ্ছে ইউনিয়ন কাউন্সিল। দেওয়ানবাজার ইউনিয়ন কাউন্সিলের প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন আলহাজ্ব আব্দুল গফুর। তিনি তাঁর মেধা যোগ্যতা দিয়ে এলাকার উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখেন।
এছাড়া, তিনি গহরপুরস্থ দেওয়ান আব্দুর রহিম হাইস্কুল পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় ও উদ্যোগে ১৯৫৬ সালে দেওয়ান আব্দুর রহিম নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে স্বীকৃতি লাভ করে। তিনি এ প্রতিষ্ঠানের অন্যতম ভূমিদাতা। আব্দুল গফুর একজন ক্রীড়া সংগঠক ও সালিশ বিচারক হিসাবে বালাগঞ্জে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তাঁরই পুত্র আলহাজ্ব আব্দুল কাইয়ুম। ডাক নাম তফুর মিয়া। দেওয়ান বাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি যুক্তরাজ্য প্রবাসী ছিলেন। তিনি সামাজিক কর্মকান্ড ও সালিশ বিচারক হিসেবে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছিলেন। তাঁরই পুত্র আ.ফ.ম শামীম ২৮ এপ্রিল ২০০৪ সালে তৎকালীন ১১নং দেওয়ান বাজার ইউনিয়ন পরিষদের (বর্তমান ৩নং দেওয়ান বাজার ইউনিয়ন) চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। শামীম ২০০৩-২০০৭ ইংরেজী পর্যন্ত দেওয়ান আব্দুর রহিম হাইস্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ছিলেন। ২০১৮ সালে আবারো অত্র প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সভাপতি মনোনিত হন।
সৈদুর রহমান খান একজন দেশপ্রেমিক, স্পষ্টভাষী উদার মনের মানুষ ছিলেন। তিনি ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সাংগঠনিক কর্মতৎপরতায় যোগ দেন। তারপর মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দায়িত্ব নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে চলে আসেন। অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দক্ষতার সহিত তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতার পর তিনি ৩ বার দেওয়ান বাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯১-৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি দেওয়ান আব্দুর রহিম হাইস্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ছিলেন। এছাড়া, দেওয়ান বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির দীর্ঘদিন সভাপতি ছিলেন। তাঁর জীবনে আর্থিক সুযোগ সুবিধা নেয়ার অনেক সুযোগ এসেছিল। কিন্তু ঐসব সুযোগ উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষের সেবার জন্য সাধারণ মানুষের সাথে সারাজীবন কাটিয়েছেন। ১৪ জুলাই ২০০৩ সালে তিনি অকালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁরই পুত্র এনায়েতুর রহমান রাজু একজন ক্রীড়া সংগঠক ও শিক্ষানুরাগী। তিনি দেওয়ান বাজার ইউনিয়ন ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি এবং দেওয়ান আব্দুর রহিম হাই স্কুল এন্ড কলেজ গভর্নিং বডি শিক্ষানুরাগী সদস্য। সৈদুর রহমান খানের ভ্রাতা আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ম্কতাফিজুর রহমান (লোভা মিয়া) ১৯৭২ সালে দেওয়ান আব্দুর রহিম হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক হিসাবে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং ১৯৭৮ সাল থেকে ২০০৭ সালে ৩রা জানুয়ারি পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ৪ জানুয়ারি ২০০৭ সালে তিনি অকালে ইহকাল ত্যাগ করেন। তাঁরই ভ্রাতুসপুত্র আহবাবুর রহমান খান মিরন একজন সমাজকর্মী। তিনি তাঁর পিতার নামে ‘সফিকুর রহমান খান এতিম ও গরীব কল্যাণ ট্রাস্ট’ গঠন করে এলাকায় চক্ষু শিবির, স্কুল-মাদ্রাসার গরীব মেধাবি শিক্ষার্থীদের মাঝে বৃত্তি প্রদান, দুস্থদের মধ্যে কম্বল বিতরণসহ আর্থিক সাহায্যে সহায়তা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি দেওয়ান আব্দুর রহিম হাই স্কুল এন্ড কলেজের আজীবন দাতা।
আব্দুল মুকিত চৌধুরী। সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সদস্য। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সততা নিষ্ঠার সাথে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের জিপির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বালাগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং জেলা আইনজীবী সহায়ক সমিতি সাবেক সভাপতি ছিলেন।
মরহুম হাজী কালা মিয়া, বিশিষ্ট আলেম ছিলেন। হাফিজ মাওলানা সালেহ আহমদ, জামেয়া ইসলামীয়া হুসাইনিয়া গহরপুর মাদ্রাসার হাদিস শরীফের ওস্তাদ। অধ্যাপক মুহিবুর রহমান চৌধুরী সিলেট সরকারি কলেজের শিক্ষক ছিলেন। আলাউদ্দিন (আনোয়ার) দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। হাজী মো. আব্দুল মুমিন চৌধুরী (ডাকনাম মধু মিয়া)। পিতা-মরহুম আব্দুল মনাফ চৌধুরী। তিনি মেট্রিক পাশ করার পর সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়েন। তিনি সিলেটের সাড়া জাগানো সাপ্তাহিক যুগভেরী পত্রিকার রিপোর্টার হিসাবে কাজ করেন। বিভিন্ন সময় সাহিত্য পত্রিকা ‘জাহানের নাও’ ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘জীবনের আলো’ ‘ইত্তেহাদ’ ও দৈনিক মিল্লাতের সিলেট প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের জীবন সদস্য ছিলেন।
মো. কলিম উল্লাহ বকুল মূলত যুক্তরাজ্য প্রবাসী। সেখানের ‘বালাগঞ্জ-ওসমানীনগর গরিব কল্যাণ ট্রাস্ট’র’ সাবেক সভাপতি। তিনি দেওয়ান আব্দুর রহিম হাই স্কুল এন্ড কলেজের আজীবন দাতা। মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী মো. হাব্বান মিয়া ও যুক্তরাজ্য প্রবাসী আব্দুল ওয়ালী সেজন দেওয়ান আব্দুর রহিম হাই স্কুল এন্ড কলেজের আজীবন দাতা। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক জহিরুল ইসলাম চৌধুরী (লাল মিয়া স্যার) দেওয়ান আব্দুর রহিম হাই স্কুলের একজন প্রজ্ঞাবান শিক্ষক ছিলেন। তাঁরই বোন অধ্যক্ষ হুসনে আরা আহমদ সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ছিলেন। তিনি স্কুলজীবনের শেষ পর্যায়ে এক রচনা প্রতিযোগীতায় তাঁর লেখা রচনা শ্রেষ্ঠ হয়ে ‘চন্দমা সুন্দরী’ স্বর্ণপদক লাভ করেন। নারী শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়নে তাঁর ব্রত শুরু হয়েছিল ১৯৫০ সালের দিকে। তাঁর নেতৃত্বে সিলেট মহিলা কলেজ ভঙ্গুর অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে সুদৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ এবং হুসনে আরা আহমদ একাকার হয়ে আছেন ইতিহাসের পাতায়। তিনি একাধিকবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমি কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। নারী শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়ন কাজে তাঁর স্বামী ডা. শামসুদ্দিন আহমদের সমর্থন ও সহযোগীতা ছিল সবসময়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন সিলেট সদর হাসপাতালে কর্তব্যরত অবস্থায় পাক হায়েনাদের হাতে তাঁর স্বামী ডা. শামসুদ্দিন আহমদ শাহাদাৎ বরণ করেন। তাঁর স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করার জন্য সিলেট সদর হাসপাতালের নাম ‘শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল’ নামকরণ করা হয়। হুসনে আরা আহমদ ১৫ জুলাই ২০১৮ সালে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে ৯৪ বৎসর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
মো. ছুলেমান খান এক সময়ের কৃতি ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। লোকমান আহমদ একজন ইঞ্জিনিয়ার। আব্দুল জলিল বেলাল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বি.এন.পি) বালাগঞ্জ উপজেলা কমিটি সদস্য। আজমল আলী মাসুক বালাগঞ্জ উপজেলা বি.এন.পির অন্যতম সহসভাপতি। মো. সহিদুর রহমান (গেদা মিয়া) বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতির সাথে জড়িত। ছানাওর আহমদ একজন সুবক্তা ছিলেন। ঘাতকের হাতে নিহত হন। তাঁরই ভ্রাতা দিলাওর আহমদ দেওয়ান আব্দুর রহিম হাই স্কুল এন্ড কলেজ গভর্নিং বডির প্রাক্তন সদস্য। পরিশেষে আমি আশা করব আনোয়ারপুর গ্রামের ইতিহাস ঐতিহ্যকে অক্ষুন্ন রেখে আগামী প্রজন্ম আনোয়ারপুর গ্রামকে আর সুদৃঢ় করবেন।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • যুগে যুগে সিলেটের নির্যাতিত সাংবাদিক
  • মুক্তিযুদ্ধে ছাতক
  • একটি বিলুপ্ত বিদ্যালয় ও শিক্ষাবিদ দেওয়ান ছনুবুর রাজা চৌধুরী
  • গড় যেভাবে গৌড় হলো
  • আমাদের জাতীয় পতাকা তৈরির কথকতা
  • ‘কান আই ঘাট’ থেকে কানাইঘাট
  • বেদে জীবনের চালচিত্র
  • ইয়ারানা ও বইনারী
  • আমেরিকা আবিস্কার ও রেড ইন্ডিয়ান
  • বাংলার জন্য প্রাণ দিলেন যারা
  • মুদ্রায় ভাষা আন্দোলনের চেতনা
  • হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ খেলাধুলা
  • প্রথম ছাপানো বই
  • বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যের শিলপাটা
  • গ্রন্থাগার আন্দোলনের ইতিহাস ও মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রাচীন মালয় রাষ্ট্র ব্রুনাই
  • সিলেটের ঐতিহ্য সুরমা
  • সিলেট অঞ্চলের ইংরেজি সংবাদপত্র
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • সেকালে সিলেটের কেনাকাটা
  • Developed by: Sparkle IT