ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বিপ্লবী লীলা নাগ ও সিলেটের কয়েকজন সম্পাদিকা

সেলিম আউয়াল প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-১০-২০১৮ ইং ০০:৪৮:৪৪ | সংবাদটি ৭৫ বার পঠিত

বাংলার নারীর আত্মোপলদ্ধি ও আত্মপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নারীবান্ধব সাময়িকপত্রের ভূমিকা রয়েছে। প্রথম মহিলা সম্পাদিত পত্রিকা হচ্ছে বঙ্গ মহিলা। মোক্ষদায়িনী দেবীর সম্পাদনায় এটি ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত ভাগের পর পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম মহিলা পত্রিকা বেগম প্রকাশিত হয় নূরজাহান বেগম ও সুফিয়া কামালের সম্পাদনায়। তবে তারও আগে সিলেটের নারী পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন।
অন্তঃপুর
মোক্ষদায়িনীর বঙ্গ মহিলা বের করার প্রায় ২৮ বছর পর সিলেটের হেমন্ত কুমারী চৌধুরী অন্তঃপুর নামে একটি পত্রিকা বের করেন। তার পিতা নবীনচন্দ্র রায় দীর্ঘদিন লাহোরে কর্মরত ছিলেন। সেখানেই ১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর জন্ম। ১৩০৫ সালে কলকাতা থেকে অন্তঃপুর আত্মপ্রকাশ করে। শুধুমাত্র মহিলাদের লেখা নিয়ে পত্রিকাটি বের হতো। অন্তঃপুর ছিল মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত মহিলাদের পত্রিকা। নারী শিক্ষার প্রসার ও অগ্রগতির লক্ষ্য নিয়ে পত্রিকাটি প্রকাশ করা হয়। প্রথম তিনটে বছর অন্ত:পুর’র সম্পাদক কে ছিলেন জানা যায়নি। তবে চতুর্থ বর্ষ থেকে ষষ্ঠ বর্ষ (১৩০৮, ১৩০৯ ও ১৩১০ সাল) পর্যন্ত সম্পাদনা করেন সিলেট জেলার নারীশিক্ষার অগ্রদূত হেমন্ত কুমারী চৌধুরী। তিনি ছিলেন সিলেটের কজাকাবাদ পরণার ধর্মদার বাসিন্দা স্পেশাল সাব রেজিস্ট্রার রাজচন্দ্র চৌধুরীর সহধর্মিণী। হেমন্ত কুমারীর নেতৃত্বে ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে সিলেটে প্রথম বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্তঃপুর কলকাতা থেকে বের হলেও হেমন্ত কুমারী সিলেটে বসেই পত্রিকাটি সম্পাদন করতেন। অন্তঃপুর নারীদের দ্বারা পরিচালিত সিলেটের সর্বপ্রথম মাসিক পত্রিকা। অন্তঃপুর প্রকাশের পূর্বে হেমন্ত কুমারী চৌধুরী ১৮৮৯ সালে শিলং থেকে হিন্দি ভাষায় ‘সুগৃহিণী' নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। পত্রিকাটি ৪/৫ বছর চালু ছিলো। প্রৌঢ়াবস্থায় তিনি পাতিয়ালা রাজ্যে শিক্ষা বিভাগে কাজ করেন। তখন হিন্দি ভাষায় তার কয়েকটি বই বের হয়েছিলো। তিনি প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের সভানেত্রী ছিলেন।
শিলং বার্ষিকী
১৩৪১ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে (১৯৩৪) শিলং থেকে ‘শিলং বার্ষিকী’ মাত্র এক সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিলো। এর অন্যতম সম্পাদক ছিলেন সুবর্ণ প্রভা দাস। তিনি দিঘলির প্রেমানন্দ দাসের স্ত্রী।
গৃহলক্ষী
করিমগঞ্জের কনক প্রভা দেব সম্পাদিত মাসিক গৃহলক্ষীর প্রথম সংখ্যা ১৩৪৪ সালের আশ্বিন মাসে (১৯৩৭) করিমগঞ্জ থেকে প্রকাশিত হয়। পরে পত্রিকাটির প্রকাশনা সিলেটে স্থানান্তর করা হয় এবং ১৩৪৫ সালের ভাদ্র সংখ্যা থেকে পাঁচ সংখ্যা পর্যন্ত বের হয়। প্রতি কপির মূল্য ছিল দু আনা। কনক প্রভা মাসিক জাগৃহি ও সম্পাদনা করতেন।
জাগৃহি
আসাম অঞ্চলের মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত একমাত্র বাংলা মাসিক জাগৃহি নারী জাগরণের পত্রিকা হিসেবে ১৩৪৫ সালের মাঘ মাসে আত্মপ্রকাশ করেছিল। সম্পাদনা করতেন করিমগঞ্জ নিবাসী কনক প্রভা দেব। মাত্র ৩/৪ সংখ্যা বের হয়ে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।
বিজয়িনী
মাসিক বিজয়িনী ১৩৪৭ বঙ্গাব্দে শিলচর থেকে প্রকাশিত হয়। এর সম্পাদিকা ছিলেন জোৎ¯œা চন্দ। তিনি বিভিন্ন সাময়িকপত্রে নিয়মিত লেখতেন। অনন্য প্রতিভাসম্পন্ন এই লেখিকা নিরলস সাহিত্যসেবায় ব্রতী ছিলেন। ‘বিজয়িনী’ কয়েক বছর নিয়মিত বের হয়েছিলো। এই পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ আর্শীবাণী দিয়েছিলেনÑ‘হে বিধাতা, রেখো না আমারে বাক্যহীনা, রক্তে মোর বাজে রুদ্রবীণা’। ‘বিজয়িনী’-তে নিয়মিত লেখতেন গীতাগুপ্ত, সুসঙ্গিনী দত্ত, বাণী রায় চৌধুরী, সুপ্রভা দত্ত, অমিতা কুমারী বসু প্রমুখ।
জোৎ¯œা চন্দ ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ মার্চ হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার দত্ত বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মহেশ চন্দ্র দত্ত। ১৯২৪ খ্র্রিষ্টাব্দে তিনি অর্থনীতিতে অনার্সসহ বিএ (তখন অনার্স দু’বছরের কোর্স ছিল) পাস করেন। তাঁর স্বামী ছাতিয়াইনের অরুণ কুমার চন্দ। জোৎ¯œা চন্দ ১৯৬২, ১৯৬৭ ও ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ অক্টোবর তিনি পরলোক গমণ করেন।
বাঙ্কার
সুনামগঞ্জ থেকে ‘বাঙ্কার’ নামে একটি বার্ষিকী ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে বের হয়েছিলো। এটি সম্পাদনা করেছিলেন সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার ছৈলা নিবাসী কিরণশশী দে।
বিপ্লবী লীলা নাগ
সংবাদপত্র সম্পাদনায় সিলেটের যে নারী পুরো উপমহাদেশে নিজের সুদৃঢ় অবস্থান তৈরী করেছিলেন, তিনি হচ্ছেন লীলা নাগ। সিলেটের প্রথম সাংবাদিক গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশ মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার যে পাঁচ গাঁও-য়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেই পাঁচগাঁও-ই লীলা নাগের বাবার বাড়ি। লীলা নাগের জন্ম তার বাবা গিরিশচন্দ্র নাগের কর্মস্থল আসামের গোয়ালপাড়া শহরে, ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দের ২ অক্টোবর। তার জন্ম নাম ছিলো লীলাবতী নাগ। বিয়ের পর নিজের নামের সাথে স্বামীর পদবী রায় জুড়ে লেখতেন ‘লীলাবতী রায়’ অথবা ‘লীলা রায়’। মা-বাবা আদর করে ডাকতেন ‘বুড়ী’। চার ভাইবোনের মধ্যে লীলা নাগই ছিলেন দ্বিতীয় এবং একমাত্র বোন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে চার ভাইবোনই কারাগারের স্বাদ নিয়েছিলেন। তাদের মায়ের নাম ছিলো কুঞ্জলতা নাগ। লীলা নাগের বাবা গিরিশ নাগ খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন। জীবনে প্রায় প্রতিটি প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারী গিরিশচন্দ্র নাগ ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। লীলা নাগও ছিলেন তার বাবার মতো মেধাবী। আসামের দেওঘরের একটি স্কুলে তার আনুষ্ঠানিক পাঠ শুরু হয়। সেখানে ভালো স্কুল না থাকায় আট বছর বয়সে (১৯০৭) কলকাতার ব্রাহ্ম গার্লস স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ঢাকা ইডেন হাইস্কুলে ভর্তি হন। ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। তিনি কলকাতার বেথুন কলেজে ভর্তি হন। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম বিভাগে আইএ পাশ করেন এবং পরে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স নিয়ে বেথুন কলেজেই বিএ-তে ভর্তি হয়েছিলেন। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজি অনার্সে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়ে বিএ পাশ করে পদ্মাবতী স্বর্ণপদক ও নগদ একশত টাকা পুরস্কার পেয়েছিলেন।
১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়যাত্রা শুরু হলেও প্রথম ভর্তির সময় সহ-শিক্ষার কোন সুযোগ ছিল না। ভর্তিচ্ছুক মেয়েদের সংখ্যা খুব কম হওয়ায় সেই পথও হয়ে যায় বন্ধ। সদ্য বিএ পাশ করা লীলা নাগ ভর্তির জন্য প্রচেষ্টা করে ব্যর্থ হন (মেয়েদের মধ্যে তিনিই প্রথম ভর্তির জন্য এগিয়ে গেলেও সফল হতে পারেননি)। জেদি লীলা নাগ তারই নিজের জেলার কৃতী ছাত্র আলতাফ হোসেনকে (পরে ‘ডন’ পত্রিকার সম্পাদক) নিয়ে উপাচার্য স্যার ড. জে. পি. হার্টগের সাথে দেখা করেন। আইনের জটিলতাকে উপেক্ষা করে সেদিন উপাচার্য লীলা নাগের অদম্য প্রাণশক্তি ও ইচ্ছেকে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। তার সক্রিয় প্রচেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ীভাবে প্রবর্তিত হয় সহ-শিক্ষার বিধান এবং ব্যবস্থা গৃহীত হয় পৃথক ছাত্রী নিবাস প্রতিষ্ঠার। লীলা নাগ নানা কাজে জড়িয়ে পড়ার পরও ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় শ্রেণীতে (ইংরেজি সাহিত্য) এম.এ. পাশ করেছিলেন। কিন্তু বড় বড় চাকরির সুযোগ ছেড়ে দেশ এবং দেশের মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করেন।
লীলা নাগ নারী ভোটাধিকার আন্দোলন, ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের উত্তর-বঙ্গে ভয়াবহ বন্যা বিধ্বস্ত জনপদে ত্রাণ তৎপরতায় অংশগ্রহণ করেন। লীলা নাগ যোগ দেন গোপন বিপ্লবী দল ‘শ্রীসংঘে’, তিনিই ছিলেন বিপ্লবী দলের প্রথম মহিলা সদস্য। অনগ্রসর নারী সমাজের উন্নয়নের লক্ষ্যে, নারী সমাজের রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে লীলা নাগ তার বারোজন সহকর্মী নিয়ে ঢাকায় দীপালি সংঘ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। লীলা নাগের উদ্যোগে ঢাকা ছাড়াও কলকাতা, সিলেট ও মানিকগঞ্জে মেয়েদের জন্যে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এছাড়া বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র, শিল্প শিক্ষাকেন্দ্র, পাঠাগার, ছাত্রীনিবাস, ব্যায়ামাগার, কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল, দীপালি ভান্ডার, নারী রক্ষা ফান্ড গড়ে তুলেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে ১৯২৬ খ্র্ষ্টিাব্দের ৭ ফেব্রুয়ারি কবি রবীন্দ্রনাথ ঢাকা আসেন। লীলা নাগের আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ পরেরদিন ঢাকা ব্রাহ্মসমাজ প্রাঙ্গনে দীপালি সংঘ আয়োজিত মহিলা সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন, সংঘের প্রদর্শনীও দেখেছিলেন। দীপালি সংঘের সশস্ত্র প্রশিক্ষণের একটি শাখা ছিলো। বিভিন্ন ধাপের পরীক্ষায় টিকে যাওয়া দেশপ্রেমী যে সকল মহিলা আত্মাহুতি দেবার সংকল্প করতেন, তাদেরকে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। সশস্ত্র প্রশিক্ষণের নেতৃত্বে ছিলেন লীলা নাগ। চট্টগ্রামে আত্মদানকারী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারও মাস্টারদা সূর্যসেনের নির্দেশে লীলা নাগের কাছ থেকে অস্ত্র চালনা শিক্ষা নিয়েছিলেন। শ্রীসংঘ নামের বিপ্লবী সংগঠনের নেতৃত্ব ছিলেন অনিল রায়। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করলে লীলা নাগ সংঘের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সংঘের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে ইংরেজ কর্মকর্তাদের উপর সশস্ত্র হামলা চালায়। পুলিশ-গোয়েন্দারা দীর্ঘ অনুসন্ধান করে এসব কর্মকান্ডের সাথে লীলা নাগের সংশ্লিষ্টতা আবিষ্কার করে। ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ২০ ডিসেম্বর অনেক কৌশলে পুলিশ লীলা নাগকে গ্রেফতার করে। তিনি হলেন ভারতবর্ষের প্রথম দীর্ঘদিন বিনা বিচারে আটক রাজবন্দিনী। তিনি রাজবন্দীদের সুবিদা বৃদ্ধির দাবীতে ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসের (সিউড়ী জেল) প্রথম দিকে অনশন শুরু করেছিলেন। কৌশল হিসেবে কর্তৃপক্ষ তার দাবী মেনে নেয়। তাকে হিজলী জেলে নেয়া হয়। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ এপ্রিল তিনি আবার অনশন ধর্মঘট করেন। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং ৪ মে অনশন ভঙ্গ করেন। একটানা ছ’ বছর জেল খেটে তিনি ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ৮ অক্টোবর মুক্তি লাভ করেন। তিনি দ্বিতীয় বার ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ জুলাই আবার গ্রেফতার হন। দাসত্বের শৃংখল হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ আন্দোলনের প্রাক্কালে ২ জুলাই (১৯৪০) সুভাষ চন্দ্র বসু গ্রেফতার হন। সুভাষ বসুর গ্রেফতারের প্রতিবাদে পুলিশের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভাষণ দেয়ার অজুহাতে লীলা নাগকে দ্বিতীয়বার (১৭ জুলাই) গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ আগস্ট তিনি মুক্তিলাভ করেন। ক্রিপস মিশনের সমালোচনা করে বিবৃতি প্রদান করায় ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের ১০ এপ্রিল তাকে গ্রেফতার করে দিনাজপুর কারাগারে নেয়া হয়। দিনাজপুর কারাগারে বসে কারাগার ভাঙ্গার দুঃসাহসী পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। তবে তার পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে তিনি মুক্তি পান। ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার বসতি উচ্ছেদ বিল বিধান সভায় উত্থাপন করলে লীলা নাগ প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি কর্মীদের নিয়ে বিধান সভার সম্মুখে অবস্থান ধর্মঘট করতে গিয়েও কারাবরণ করেন।
লীলা নাগ তার সশস্ত্র বিপ্লবী কর্মকান্ডের পাশাপাশি তার আদর্শ প্রচারের জন্যে একটি সাময়িকী বের করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিলেন তীব্রভাবে। এই অনুভূতি থেকেই তিনি একটি সাময়িকী বের করার উদ্যোগ নেন। তার বাবা গিরিশ নাগ ও বড়ো ভাই সুধীরকুমার নাগ পত্রিকা বের করার খরচ বহনের আশ^াস দিলে তিনি ছুটে যান কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে। রবীন্দ্রনাথই তার পত্রিকার নাম দেন ‘জয়শ্রী’। ১৩৩৮ বাংলার বৈশাখ মাসে বাংলা মাসিক হিসেবে ‘জয়শ্রী’র আত্মপ্রকাশ ঘটে। পত্রিকার প্রচ্ছদপট আঁকেন শিল্পাচার্য নন্দলাল বসু। প্রথম সংখ্যার পরিচিতি ছিলোÑসম্পাদিকা শ্রীযুক্ত লীলাবতী নাগএম.এ.; সহ-সম্পাদিকা শ্রীযুক্ত শকুন্তলা দেবী ও রেণুকা সেন। জয়শ্রী এন.এস. প্রেস: ৩, বকশীবাজার ঢাকা হইতে সুধীরকুমার নাগ কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত। প্রতি মূল্য : ছয় আনা; বার্ষিক মূল্য ৪.৫০ টাকা।
কবি রবীন্দ্রনাথ জয়শ্রী পত্রিকার নামকরণ করেছিলেন, তেমনি তিনি বিভিন্ন সময় জয়শ্রী পত্রিকায় লেখতেন। দেশ বিভাগের পর কলকাতা থেকে জয়শ্রী নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। ‘জয়শ্রী’র পূজা সংখ্যাটি বড় কলেবরে বের হতো। লীলা নাগ জীবত থাকা অবস্থায় তা নিয়মিত ছিল। ২৯ ডিসেম্বর, ১৯৮১ কলকাতায় ‘জয়শ্রী’র সুবর্ণ জয়ন্তী পালিত হয়।’
জয়শ্রী শুধু সাহিত্য পত্রিকা ছিলো না। বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সম্পাদকীয় প্রবন্ধ ইত্যাদি বের হতো। এজন্যে প্রথম থেকেই পত্রিকাটি ব্রিটিশ সরকারের চক্ষুশূল হয়ে উঠে। প্রথম সংখ্যা বের হবার পরই পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশককে সতর্কীকরণ নোটিশ দেয়া হয়। ‘২৮ অক্টোবর, ১৯৩১ ‘জয়শ্রী’র অফিস হঠাৎ করে পুলিশি তল্লাশী অভিযানে প্রায় সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়। এজন্য ১ম বর্ষ, ৮ম সংখ্যার (অগ্রহায়ণ) প্রকাশ দু সপ্তাহ পিছিয়ে যায়। নবম সংখ্যা প্রকাশের পূর্বেই সম্পাদিকা গ্রেফতার হন। ১০ম সংখ্যা প্রকাশিত হয়নি। ১১শ ও ১২শ সংখ্যা (ফাল্গুন- চৈত্র) একত্রে বের হলেও আর্থিক সংকট ও জামানত বৃদ্ধিসহ সরকারি দমননীতির ফলে প্রকাশের ধারাবাহিকতায় বিঘœ ঘটে। সম্পাদিকার অনুপস্থিতিতে সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন যথাক্রমেÑশকুন্তলা দেবী (রায়) ( বৈশাখ ১৩৩৯Ñআশি^ন, ১৩৪০); বীণাপাণি রায় (কার্তিক, ১৩৪০- চৈত্র ১৩৪০); ঊষা রায় (বৈশাখ, ১৩৪১-চৈত্র ১৩৪২)।’
১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে জয়শ্রী’কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলে লীলা নাগ জেল থেকে বের হয়ে ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে আবার প্রকাশ শুরু করেন। দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রথম সংখ্যা অর্থাৎ ৭ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, আষাঢ়, ১৩৪৫ বাংলা (১৯৩৮) প্রকাশিত হয়। তখন জয়শ্রী’র অফিস ঢাকা থেকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়।
লীলা নাগ শুধু জয়শ্রী’ই সম্পাদনা করেননি, তিনি নেতাজী সুভাষ বসুর ‘ফরোয়ার্ড ব্লক পত্রিকা’ও সম্পাদনা করেন। লীলা নাগ ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুর ‘ফরোয়ার্ড ব্লকের অন্যতম নেতা। হলওয়েল মনুমেন্ট আন্দোলনের পূর্বে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ২ জুলাই সুভাষ বসু গ্রেফতার হলে তার সম্পাদিত ‘ফরোয়ার্ড ব্লক পত্রিকা’র সম্পাদনার ভার গ্রহণের জন্যে তিনি লীলা নাগকে অনুরোধ করেন। লীলা নাগ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি তার স্বভাব অনুযায়ী বিভিন্ন বিষয়ে কড়া সম্পাদকীয় লেখেন। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ অক্টোবর সংখ্যায় ‘ফলো নাগপুর’ লেখার অপরাধে সরকার সব সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করে এবং জামানত হিসেবে গচ্ছিত দুই হাজার টাকা সরকার বাজেয়াপ্ত করে। ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে লীলা নাগ আবার গ্রেফতার হলে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।
সমাজ-সাহিত্য-রাজনীতি বিষয়ে লীলা নাগ প্রচুর লেখালেখি করেছেন। তার এসব লেখা সেই সময়ের ভারতবর্ষ, প্রবাসী, বঙ্গলক্ষী, মাতৃমন্দির, আনন্দবাজার, হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড, অমৃতবাজার পত্রিকায় ছাপা হয়েছে।
লীলা নাগ ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ মে তার আন্দোলনের সাথী বিপ্লবী অনিল রায়কে জীবন সাথী হিসেবে গ্রহণ করেন। বিয়ে অনুষ্ঠিত হয় ঢাকায়। তারপর ‘নাগে’র পরিবর্তে ‘রায়’ বিশেষণ যুক্ত হয়ে লীলা হলেনÑলীলা রায়। বিয়ের পর ১৯৪১-৪৫ পর্যন্ত অনিল রায় একটানা জেলে ছিলেন। লীলা নাগ ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের বিরোধী ছিলেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর এক বছরের মাথায় লীলা নাগের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহ মামলা জারি হয়। অনিল রায়সহ লীলা নাগ কিছুদিন আত্মগোপনে ছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি স্বামীসহ ভারতে চলে যান। সেখানে কলকাতায় বসবাস করতে থাকেন। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ৬ জানুয়ারি লীলা রায়ের স্বামী অনিল রায় মৃত্যুবরণ করেন। তারা ছিলেন নিঃসন্তান। লীলা রায় ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম হৃদরোগে আক্রান্ত হন। ১৯৫৭ ও ১

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • খেলাফত বিল্ডিং : ইতিহাসের জ্যোতির্ময় অধ্যায়
  • এক ডিমের মসজিদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের কিছু ঘটনা
  • খাদিমনগরে বুনো পরিবেশে একটি দিন
  • ফিরে দেখা ৭ নভেম্বর
  • শ্রীরামসি গণহত্যা
  • প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের ধারক মৃৎশিল্প
  • বিপ্লবী লীলা নাগ ও সিলেটের কয়েকজন সম্পাদিকা
  • গ্রামের নাম আনোয়ারপুর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • জাতীয় স্মৃতিসৌধ
  • বাংলাদেশের লোকশিল্প
  • উৎলারপাড়ের পোড়া পাহাড় আর বুদ বুদ কূপ
  • চেলা নদী ও খাসিয়ামারা মোহনা
  • Developed by: Sparkle IT