শিশু মেলা

আশ্চর্য আবিষ্কার

জসীম আল ফাহিম প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-১০-২০১৮ ইং ০০:৩৪:৫৫ | সংবাদটি ৬৬ বার পঠিত

ড. জিবরান একজন রসায়নবিদ। রসায়ন শাস্ত্র নিয়ে তার গবেষণার শেষ নেই। শুধু গবেষণা কর্মের জন্যই তার সময়মতো নাওয়া হয় না। খাওয়া হয় না। এমনকি আরামে একটু ঘুম পর্যন্ত হয় না। কারণ ঘুমুতে গিয়ে তার চোখের পাতা দুটো একত্র হলেই তিনি নানাবিদ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। তিনি সারাদিন যে সকল কাজকর্ম করে বেড়ান, তা-ই আবার স্বপ্নে দেখেন। এতে তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। বলা যায় স্বপ্নের জন্য তিনি ঠিকমতো ঘুমুতে পারেন না। রাতে একবার তার ঘুম ভেঙে গেলে সেই ঘুম আর ফিরে আসে না। সারারাত তখন তাকে শুয়ে বসে কাটাতে হয়।
ড. জিবরান কোনো কোনোদিন ঘুম থেকে জেগে আবার গবেষণা কাজেই লেগে যান। ভোর পর্যন্ত তিনি একটানা গবেষণা করে কড়া করে এক কাপ কফি পান করবেন। কফি পান শেষে ভোরের ¯িœগ্ধ হাওয়ায় তিনি হাঁটতে বেরুবেন। প্রায় ঘণ্টাখানেক হাঁটাহাঁটি করে সূর্য ওঠার পর তিনি বাসায় গিয়ে ঢুকবেন। তখন ¯œান সেরে নাস্তা করতে করতে তার বেজে যাবে সকাল ৮টা। তিনি সকাল ৮টা ৩০মিনিটে বাসা থেকে অফিসের উদ্দেশে রওয়ানা দেবেন।
ড. জিবরানের অফিসটি বড়োসড়ো একটি ল্যাবরেটরি। ল্যাবরেটরিতে তিনি রসায়ন শাস্ত্র নিয়ে গবেষণা করে থাকেন। তার অফিস শুরু হয় সকাল ৯টায়। বাসা থেকে বেরিয়ে রিকশা করে অফিসে যেতে তার সময় লাগে প্রায় কুড়ি মিনিট। বাকি ১০ মিনিট তিনি অফিসে বসে আয়েশ করে আরেক কাপ কফি পান করবেন। সে সঙ্গে সহকর্মীদের সাথে কুশলবিনিময় করবেন। এভাবেই ড. জিবরানের দৈনন্দিন জীবনের এক একটা দিন শুরু হয়ে থাকে।
আজকাল রাতবিরেতে ঠিকমতো ঘুম হয় না বলে ড. জিবরানের মন মেজাজে কেমন যেন তিরিক্ষি ভাব তৈরি হয়ে গেছে। সহ্য-ধৈর্য এখন ঠিক আগের মতো কাজ করছে না। অল্পতেই তিনি আজকাল রেগে যান। অকারণ বিরক্ত হয়ে ওঠেন।
ড. জিবরান একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তাই অফিসের সকলেই তার সাথে দূরত্ব বজায় রেখে কথাবার্তা বলেন। অযথা কেউ তাকে বিরক্ত করতে আসেন না। তাকে রাগাতে সাহস পান না। তবু তিনি রেগে যান। রেগে গিয়ে অধীনস্তদের কিছু হেনস্থা করবেন। কিছু কটু কথা শুনিয়ে দেবেন।
ড. জিবরানের এ বিষয়টি অফিসের সকলের চোখেই ধরা পড়েছে। কিন্তু ধরা পড়লেও মুখ ফুটে কেউ কিছু বলেন না। বলা যায় বলতে সাহস পান না। শত হলেও তিনি অফিসের বড়ো বস। চাকরি ক্ষেত্রে বসদের কোনো ভুল ধরা ঠিক নয়। চাকরি ক্ষেত্রে বসদের কোনো ভুল হয়ও না। হতে পারে না। আর ভুল হলেও তা ধরা বারণ। ভুল ধরা গুরুতর অপরাধ। বড়ো বস হিসেবে সকলেই তাকে একপ্রকার সমীহ করে চলেন। তাই অফিসটাতে সব সময় পিনপতন নীরবতা বিরাজ করে।
আজ অনেকদিন পর ড. জিবরান সহসা উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। অনেকদিন হয় কেউ তাকে এমন করে হাসতে দেখেননি। তার উচ্চস্বরে হাসি দেখে সকলেই কেমন যেন ‘থ’ হয়ে গেলেন। সকলেই ভাবতে লাগলেন, বিষয় কি? এমন করে তো তিনি কখনো হাসেন না। হঠাৎ তার এমন হাসির কি কারণ? কি সেই রহস্য?
ল্যাবরেটরিতে আরও একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়েছেন। তার নাম ড. লোকমান। ড. লোকমান উর্ধ্বতন কর্মকর্তা হলেও তিনি ড. জিবরানের অধিনস্ত। ড. জিবরানের উচ্চস্বরের হাসি শুনে কৌতূহলী হয়ে তিনি তার রুমের কাছে গেলেন। উঁকি দিয়ে দেখলেন, ড. জিবরান তার রুমটিতে উম্মাদের মতো ঘোরাফেরা করছেন। এলোমেলো ছুটোছুটি করছেন। আর হা-হা-হা করে হাসছেন। ব্যাপার বোঝার জন্য ড. লোকমান তখন তার রুমে গিয়ে প্রবেশ করলেন।
ড. লোকমানকে দেখে ড. জিবরান আরও জোরে হাসতে থাকেন। তখন ড. লোকমান বিনয়ভরা কণ্ঠে বললেন, নিশ্চয়ই বড়ো কোনো মজার ব্যাপার ঘটেছে জনাব?
জবাবে ড. জিবরান বললেন, মজার তো বটেই। আমি বিরাট এক সাফল্যের মুখ দেখে ফেলেছি লোকমান সাহেব।
তখন ড. লোকমান আরও আগ্রহী হয়ে জানতে চাইলেন, কি সেই সাফল্য জনাব?
ড. জিবরান বললেন, আমার ফর্মূলাটি মিলে গেছে।
ড. লোকমান জানতে চাইলেন, কোন ফর্মূলাটি জনাব?
জবাবে ড. জিবরান বললেন, টাক মাথায় চুল উৎপাদনের জন্য তৈল তৈরির ফর্মূলা।
শুনে ড. লোকমান অবাক হয়ে দু’চোখ বড়ো বড়ো করে তাকালেন। বললেন, বলেন কী জনাব! এ যে বড়ো অসাধ্য সাধন। এ যে আপনার বিরাট এক আবিষ্কার।
ড. লোকমানের কথা শুনে ড. জিবরান খুশিতে আরেক দফা হেসে নিলেন। তারপর বললেন, বিরাট আবিষ্কার তো বটেই। আমি সুদীর্ঘ উনিশ বছর ধরে অবিরাম গবেষণা করে ফর্মূলাটি মিলাতে পেরেছি। আমার এ ফর্মূলামতো তৈল তৈরি করে মানুষের টাক মাথায় ব্যবহার করলে, অল্পদিনের মধ্যেই চুল গজাবে। নিয়মিত এ তৈল ব্যবহার করলে চুলের গোড়া শক্ত ও মজবুত হবে। মাথার চুল পড়া বন্ধ হবে। চুল পড়ে পড়ে মাথা আর খালি হবে না। যেকোনো বয়েসি লোকের মাথায় চুল গজানোর জন্য এ তৈল বড়ো অব্যর্থ দাওয়াই।
ড. জিবরানের কথা শুনে ড. লোকমানের মুখখানা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠল। অবাক হয়ে তিনি বললেন, তাই নাকি জনাব? তাই নাকি?
ড. জিবরান বলেন, তো আর বলছি কি?
ড. লোকমানের মাথা ভরা টাক। মাথার সামনের দিকটা পুরোপুরি টাকের দখলে চলে গেছে। স্মিত হেসে তিনি বললেন, জনাব! চুল গজানোর প্রাথমিক পরীক্ষাটা কিন্তু আপনি অবশ্যই আমার মাথায় করবেন।
ড. জিবরান বললেন, ঠিক আছে। আমি আপনার মাথাকেই নমুনা হিসেবে ব্যবহার করব।
সেদিনই ফর্মূলামতো ড. জিবরান ও ড. লোকমান টাক মাথায় চুল গজাবার আশ্চর্য তৈল তৈরি করে ফেললেন। পরে বিজ্ঞানী দু’জন আশ্চর্য সেই তৈল একটি শিশিতে ভরে ল্যাবরেটরি রুম থেকে বেরিয়ে এলেন। এসে সহকর্মীদের একটি বড়ো হলরুমে নিয়ে জড়ো করলেন। তারপর বিজয়ীর হাসি হেসে ড. জিবরান সহকর্মীদের তার আশ্চর্য আবিষ্কারটির খবর শোনালেন। শুনে সকলেই খুব খুশি হলেন। অবাকও হলেন। কেউ কেউ আনন্দে উচ্ছ্বাসও প্রকাশ করলেন। সহকর্মীদের মধ্যে যারা টেকো ছিল তারা রীতিমতো আশার আলো দেখতে লাগলেন।
এতদিনে তারা বুঝতে পারলেন, ড. জিবরান এমন গবেষণা কাজে মত্ত ছিলেন বলেই সব সময় তিনি কম কথা বলতেন। গম্ভীর ভাব ধরে চলতেন। গবেষণায় সাফল্য লাভ করতে পেরেছেন বলেই আজ তাকে উচ্ছ্বসিত মনে হচ্ছে। পরে আশ্চর্য আবিষ্কারটির জন্য সকলে মিলে ড. জিবরানকে অভিনন্দন জানালেন।
সেদিন থেকেই ড. লোকমানের সাথে অফিসের আরও কয়েকজন টেকো সহকর্মী নিজেদের মাথায় আশ্চর্য তৈল ব্যবহার শুরু করে দিলেন। মাত্র সাত দিনের দিন দেখা গেল, টেকোদের কারও মাথা আর খালি নেই। যারা আশ্চর্য তৈল ব্যবহার করেছিল, তাদের প্রত্যেকের মাথাতেই চুল গজিয়ে গেছে। কিন্তু মাথায় চুল গজালে কি হবে? চুলের রং যে ধবধবে সাদা। কিন্তু চুল সাদা হলে তো বয়স ধরা পড়ে যাবে। বয়স ধরা পড়া চলবে না। যেভাবেই হোক বয়সকে লুকাতে হবে। বয়স লুকানোর জন্য চুলের রংটা কালো হওয়া অতি জরুরি।
ড. জিবরান এবার লোকের মাথার সাদা চুল নিয়ে গবেষণায় মেতে উঠলেন। প্রাকৃতিকভাবে কীভাবে সাদা চুলকে কালো করা যায়, সে ভাবনায় আবারও তিনি ভাব-গাম্ভীর্য ধারণ করলেন। প্রায় তিনমাস ধরে গবেষণা চালিয়ে তিনি লোকের মাথার কালো চুল সাদা হওয়ার কারণ খুঁজে বের করলেন। গবেষণায় তিনি দেখতে পেলেন, মানুষের চুলে রক্তকণিকার অনুপস্থিতির জন্যই চুল কালো বর্ণ হারায়। কাজেই সাদা চুলের মধ্যে রক্তকণিকার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারলে এ সমস্যা চুকে যাবে। তাই চুলের গোড়ায় এমন কিছু পৌঁছে দিতে হবে, যাতে করে গোড়া থেকেই চুলগুলো রক্তকণিকা গ্রহণ করতে পারে। এই নিয়ে এবার ড. জিবরান রাতদিন গবেষণায় মেতে উঠলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন, চুল গজানোর তৈল যখন আবিষ্কার করতে পেরেছি; তখন প্রাকৃতিকভাবে চুল কালো করার উপায়ও আবিষ্কার না-করে ছাড়ব না। ভেবে তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করলেন।
মোটামুটি বছরখানেকের মধ্যেই ড. জিবরান সাফল্যের মুখ দেখলেন। এরই মধ্যে টাক মাথায় চুল গজানোর ফর্মূলাটি তিনি আরও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে গেলেন। ফর্র্মূলাটি তিনি নতুনভাবে সাজালেন। আগের ফর্মূলার সাথে তিনি আরও কিছু নতুন উপাদান যুক্ত করলেন। ফলে তার আশ্চর্য আবিষ্কারটি আরও আশ্চর্য রূপ ধারণ করল। ড. জিবরান এবার আরও আধুনিক আরও যুগোপযোগী একটি ফর্মূলা দাঁড় করালেন। নতুন ফর্মূলামতে তিনি এবার আশ্চর্য একপ্রকার তরল তৈরি করলেন। তিনি এ তরলের নাম দিলেনÑটাক মাথায় ঘনকালো চুল গজাবার মহৌষধ।
ড. জিবরানের তৈরি বিশেষ তরলের ফলাফল যাচাই করার জন্য তাকে নমুনা খুঁজে পেতে কোনো বেগ পেতে হলো না। তার টেকো সহকর্মীরাই স্ব-উদ্যোগে এগিয়ে এল। ইতিমধ্যে যাদের মাথায় সাদা চুল গজিয়েছিল, তাদের প্রত্যেকেই চুল কালো করার তরল নিয়ে মাথায় মাখলেন। এভাবে সপ্তাহখানেক তরল মাখার পর আশ্চর্য ফলাফল পাওয়া গেল। তরল ব্যবহারকারী প্রত্যেকের মাথাতেই ঘনকালো চুল দোল খেতে দেখা গেল।
ড. জিবরানের আশ্চর্য এ আবিষ্কারের খবর কিন্তু চাপা থাকেনি। মুখে মুখে, লোকে লোকে সে খবর ছড়িয়ে পড়ল। এরই মধ্যে পৃথিবী বিখ্যাত একটি প্রসাধন কোম্পানি উপযুক্ত মূল্য দিয়ে পণ্যটি বাজারজাত করণের অনুমতি দলিল করে নিল। অবশ্য ড. জিবরানের হাতেই পণ্যটির স্বত্ব রেখে দিলেন। মাস তিনেকের মধ্যেই কোম্পানিটি তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে শুরু করল। সে বছরই মানুষের সৌন্দর্য বিকাশে বিশেষ অবদান রাখায় নরওয়ের নোবেল কমিটি ড. জিবরানকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করল।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT