শিশু মেলা

ভূত মরিলে মার্বেল হয়

জাফর সাদেক চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-১০-২০১৮ ইং ০০:৪৩:৪৩ | সংবাদটি ৭৩ বার পঠিত

মানুষ মরিলে ভূত হয় আর ভূত মরিলে হয় মার্বেল। এই কথাটি বলিয়াছিলেন, স্বর্গীয় ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়। কিন্তু কথাটি বিলক্ষণ মিথ্যা মনে হইতেছিল যখন বেলতলায় নিজ হাতে একটি জলজ্যান্ত ভূতকে নিজ টুথব্রাশ দ্বারা পিটাইয়া মারিয়াছিলাম।
কিন্তু তাহাকে তাৎক্ষণিক মার্বেলে রূপান্তরিত হইতে না দেখিয়া আমি অগ্রজ মনীষীদের কথার উপর বিশ্বাস হারাইতে বসিয়াছিলাম। আমি যাহাকে ভূত ভাবিয়া টুথব্রাশ দ্বারা পিটাইয়া মারিয়াছিলাম তাহাকে দেখিলাম মরার পর পিংপং বলের মতো লাফাইতে ছিল। আমি হাতে নিয়া দেখিলাম ইহা পিংপং বল ছাড়া আর কিছুই হইতে পারে না। ভূতটাকে কেন মারিলাম সেই কাহিনীতে যাওয়া আজকের রচনার উদ্দেশ্য নহে। আজকের রচনা দীর্ঘদিন টিকিয়া থাকা একটি ধারণার গ্রহণযোগ্যতা পরিমাপ করার নিমিত্তে বর্ণিত হইবে।
পিংপং বলখানা প্রমাণ স্বরূপ হাতে লইয়া আমি স্বর্গীয় ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ভূত মশায়কে আহ্বান করিলাম। কীভাবে আহ্বান করিলাম তাহা সবার সম্মুখে প্রকাশযোগ্য নহে, কারণ তাহা হইলে এই জগতে মুনী ঋষি হওয়ার নানা ফর্মুলা সম্বলিত বহু পুস্তিকা এদেশের প্রকাশনিগুলো প্রকাশ করিত, যেমনটি তারা অতীতকাল হইতে প্রকাশ করিয়া আসিয়াছে। যেমন- তিন দিনে ইংরেজি শেখা, দশ মিনিটে পৃথিবী ধ্বংস হওয়া, সোলেমানি খাবনামা, বেহেশতের কুঞ্জি ইত্যাদি। কিছু বিদ্যা প্রকাশযোগ্য নহে। এসব বিদ্যা প্রকাশিত হইলে মানব সভ্যতার অনিষ্ট বৈ নিষ্ট হইবে না।
তাই আমি কীভাবে স্বর্গীয় ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ভূত মশায়কে আহ্বান করিলাম এবং সশরীরে উপস্থিত করিলাম তাহা উহ্য রাখিলাম মানব সভ্যতার বৃহত্তর কল্যানে। পাঠক ভাবিবেন না এমন কিছু ঘটে নাই, আর ভাবিলেও আমার কিছু করার নাই, কারণ আমি কারও মনের ওপর জোর খাটাইতে চাই না। বিশ্বাস অবিশ্বাস সম্পূর্ণ আপনাদের হাতে।
আমার অব্যর্থ গুপ্ত বিদ্যার প্রভাবে ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ভূত মশায় কিছুক্ষণের মধ্যেই হাজির হইলেন। উনার উপস্থিতি আমাকে মারাত্মকভাবে বিস্মিত করিয়াছিল, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সাহস থাকার দরুণ আমি মূর্ছা গেলাম না। ভূত লইয়া আমাদের যাবতীয় বিশ্বাসের মুখে চুন-কালি মাখাইয়া উনি সম্পূর্ণ বিলেতি কায়দার পোশাক পরিধান করিয়া আমার সম্মুখে হাজির হইলেন। অথচ আমি প্রত্যাশা করিয়াছিলাম একটি কাকতাড়ুয়া কিংবা নগ্ন কংকাল আকৃতির কিছু একটা আমার সম্মুখে আসিবে।
অতীতে আমি যেই সব ভূত দেখিয়াছি কিংবা ক্রোধের বশে যাহাদের পিটাইয়াছি সবাই আমাদের সাহিত্যে বর্ণিত ভূতের মতোই ছিল। কিন্তু শতবর্ষ পূর্বে ভূতে রূপান্তরিত মহাশয়ের জীবন্ত মানুষের মতো অবয়ব-রূপ-লাবণ্য দেখিয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হওয়া ছাড়া কোন গতি থাকিল না। তিনি আমাকে ধাতস্ত করিলেন এবং বলিলেন ভূত পৃথিবীর সুন্দরতম জীব। যুবক ভূতেরা এতো সুন্দর হয় যে হলিউড-বলিউডের যেকোন নায়ক-নায়িকা তাহাদের সম্মুখে দাঁড়াইলে মনে হইবে এক টিন দুধের পাশে এক টিন আলকাতরা রাখা হইয়াছে। মানবজাতি সম্পর্কে তাহার এমন বর্ণবাদী কথায় আমি প্রচ- কষ্ট পাইলাম।
ভাবিলাম হইতেও পারে, আমাদের কল্পনার এলিয়েনগুলো তো দেখতে আমাদের তুলনায় কিম্ভূতকিমাকারই হয়, আমাদের অজানা অনেক কিছুই রহিয়াছে। আমি তাহার কাছে জানিতে চাহিলাম,
- মহাশয় ভূতেরা কি জীব?
-অবশ্যই ভূতেরা জীব, জীব বলিয়াই ভূতেরা মরিয়া মার্বেল হয়। আর আমাকে মহাশয় বলার দরকার নাই, এইসব মানবীয় সম্বোধনের তোয়াক্কা ভূতেরা কখনই করে নাই।
আমি মহাশয় ত্যাগ করিয়া আলাপ চালাইতে আরম্ভ করিলাম।
-আপনি মরিলেও কি মার্বেল হইবেন?
-বিলক্ষণ মার্বেল হইব, তবে কৃতকর্মের ওপর ভিত্তি করিয়া কেমন মার্বেল হইব তাহা নির্ধারিত হইবে, ইদানিংতো শুনিয়াছি মানুষ প্লাস্টিকের মার্বেলও তৈয়ার করিয়াছে। মন্দ কাজ করিলে প্লাস্টিকের মার্বেলই হইব।
-আপনি কি শুনিয়াছেন কখনো, ভূত মরিয়া পিংপং বল হইয়াছে?
-প্রশ্নই আসে না, আমার শত বছরের ভূত জীবনে কয়েক হাজার ভূত মরিতে দেখিয়াছি। কাউকে পিংপং বল হইতে দেখি নাই, কারও মুখে শুনিও নাই।
আমি আমার হাতের পিংপং বলখানা মহাশয়ের সম্মুখে হাজির করিতেই উনি রাগিয়া অগ্নিশর্মা হইলেন। তাহার রাগের কোন কারণ খুঁজিয়া পাইলাম না। আমিতো ভূতটাকে শুধু হত্যা করিয়াছিলাম, কিন্তু পিংপং বল বানাইতে আমার কোন হাত ছিল না। আমি বিষয়টি তাহাকে বোঝাইবার চেষ্টা করিলাম। তিনি আমাকে বলিলেন- দেখো বাপু, তোমরা মানুষেরা আজকাল অনেক কিছুতেই ভেজাল করিতেছ, তোমরা প্লাস্টিকের ডিম্ব, প্লাস্টিকের চাউল, প্লাস্টিকের আম-কাঁঠাল সবই বানাইতেছ, তাই বলিয়া কি আসল আম কাঁঠাল বিলুপ্ত হইয়াছে!
আইকা গাম দিয়া নকল ঘি বানাইয়াছ, তাহাতে আসল ঘিয়ের কদর কমে নাই, পোড়া মবিল দিয়া চানাচুর ভাজিয়াছ অথচ আমরা ভূতেরা পোড়া মবিল দিয়া কস্মিনকালে ভেরে-াও ভাজি নাই। তোমরাতো আরও জঘন্য, মরা মানুষকে আইসিউতে রাখিয়া টাকা আদায় কর, ভুল চিকিৎসা করিয়া শিশুদের মারিয়া ফেল, চলন্ত বাস হইতে ধাক্কা মারিয়া মানুষ মারিয়া ফেল, তোমাদের অনাচারের কথা আর কত বলিব! তোমরা সয়াবিন তেল বলিয়া পামওয়েল বিক্রি করিতেছ, তাহাতে দুইটা কি এক হইয়াছে! তোমরা দুধে পানি মেশাও, নকল ওষুধ বানাও, মাছে ফরমালিন মেশাও, আর কত ফিরিস্তি দেব! তোমাদের ভেজালেরতো আর শেষ নাই। তোমরা কি তাহলে নকল ভূত বানাইবার বিদ্যাও রপ্ত করিয়াছ? তোমাদের এইসব হীন কম্মো দেখিয়া বেয়াদব ভূতদের আমরা মানুষের বাচ্চা বলিয়া গালি দেই।
আজ তোমার সহিত সাক্ষাৎ হইয়া আমার নিকট স্পষ্ট হইয়াছে মানুষের থেকে এর থেকে ভালো আচরণ আশা করা যায় না। একারণেই তোমরা মরিয়া ভূত হও, আমরা মরিয়া কখনো জঘন্য মানুষ হই না। শুনিয়াছি তোমরা আজকাল কি এক যন্ত্র বানাইয়াছ তাহাকে তোমরা রোবট বল। তাহাদের নাকি বুদ্ধিমত্তাও আছে। কিন্তু ভূত লইয়া কখনো ফাজলামোর দুঃসাহস দেখাইও না, তাহলে মারিয়া একদম ভূত বানায়াইয়া দিব।
আমি তাহাকে বোঝাইবার চেষ্টা করিলাম, তাহাকে রাগানো আমার উদ্দেশ্য নহে। আমার উদ্দেশ্য ভূত মরিয়া কী হয় তাহার স্বরূপ উদ্ঘাটন করিয়া মানবজাতির কল্যান সাধন করা। কারণ মার্বেল হইলে একরকম প্রস্তুতি থাকিবে আবার পিংপং বল হইলে আরেকরকম প্রস্তুতি থাকিবে। পিংপিং বল হইলেতো সারা জীবন পেটানোর ওপরই থাকিতে হইবে।
আমি তাহাকে বিনয় করিয়া বলিলাম- আমি নিতান্ত এক সাধারণ মানুষ, আপনার সহিত তর্ক করা আমার কম্মো নহে, আমি শুধু জানিতে চাই আমার হাতের পিংপং বলটা কীভাবে এলো। তিনি অত্যন্ত চড়া গলায় বলিলেন, ভূত নিয়ে ইয়ার্কি করবি না বদমাশ, ভূত মারা তোর কম্মো নহে। তোকে যদি আমি সাত দিন এই শ্যাওড়া গাছের উপর বাঁধিয়া না রাখি তবে আমার ভূত জন্মই বৃথা।
এই বলিয়া যেই তিনি আমার দিকে তেড়ে আসিতেছিলেন তখনই আমি আর নিজের মেজাজ হারাইলাম। হাতের টুথব্রাশ দিয়ে স্বর্গীয় ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ভূত মশায়কে এমন বেদম প্রহার করিলাম যে, কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি একটি পিংপং বলে পরিণত হইলেন। তারপর ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ভূত সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের জন্য আমি আরও ডজনখানেক ভূত মারিয়া পিংপং বল ছাড়া ব্যতিক্রম কিছুই দেখিতে পাইলাম না। তখন হইতে আমি ভূতদের ওপর চিরতরে বিশ্বাস হারাইয়াছি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT