ধর্ম ও জীবন

কুরআনে হাফিজের মর্যাদা

মো. আব্দুশ শহীদ নেগালী প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-১০-২০১৮ ইং ০১:১৬:৩৭ | সংবাদটি ৬২ বার পঠিত

কুরআন শরীফ মহান আল্লাহ তায়ালার বাণী, কথা বা কালাম এবং ঐশী গ্রন্থ। কালামে পাক মহান আল্লাহ তায়ালা মানব জাতির কল্যাণের জন্য পৃথিবীতে অবতীর্ণ করেন। যে কালামে পাক লৌহে মাহফুযে সংরক্ষিত ছিল। প্রশ্ন দেখা দিল মহাগ্রন্থ আল-কুরআন কোথায় অবতীর্ণ করবেন। একালামে পাক ধারণ করার মত সাহসই বা কার! কুরআনে কারীমে মাহাত্ম সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক বলেনÑ যদি আমি এ ‘কুরআন’ পর্বতের উপর নাযিল করতাম, তবে তুমি নিশ্চয় দেখতে, তা নত হয়ে বিদীর্ণ হয়ে গিয়েছে (সুরা হাসর ২১) মহান রাব্বেকারিম অন্যত্র বলেনÑ নিশ্চয় আমি আকাশ, পৃথিবী ও পর্বত মালার প্রতি এ আমানত (কোরআন) অর্পন করতে চেয়েছিলাম, অত:পর তারা ভয়ে তা বহন করতে অস্বীকার করল এবং শংকিত হল। কিন্তু মানুষ তা বহন করল। (সুরা আহযাব, ৭২) মহান রাব্বুল আলামীন জানেন এ কালামে পাকের যিম্মাদারীর উপযুক্ত কারা। এ বিশ্ব ভূমন্ডল, নভোমন্ডলসহ আরশ, কুরছি, লওহো, ক্বলম, সব কিছুরই ¯্রষ্টা হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ। তিনির কথা বা কালাম তো সাধারণ কিছু নয়। পবিত্র কুরআন শরীফের দায়িত্বভার কার উপর অর্পণ করবেন নিশ্চয় এটা তাঁর ইল্মের মধ্যে নির্ধারিত রয়েছে। পরিশেষে এসে গেলো কুরআন শরীফ নাযিল হবার সময়। বারো মাসের মধ্যে সবচাইতে বরকতময় মাস হলো পবিত্র রমজান মাস এবং মাসের শ্রেষ্ঠ রজনী হল ‘সবে ক্বদর’ নবী-রাসুলগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ রাসুল হলেন মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) অতঃপর শ্রেষ্ঠ কিতাব শ্রেষ্ঠ মাসের শ্রেষ্ঠ রাত্রিতে শ্রেষ্ঠ নবীর উপর অবতীর্ণ হলো। অর্থাৎ শ্রেষ্ঠত্বের পথ ধরেই কুরআন শরীফে যাত্রা।
পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল হবার প্রথম দিন থেকেই হিফয পদ্ধতি শুরু হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা দীর্ঘ তেইশ বছরে হযরত জিবরাইল (আ.) এর মাধ্যমে প্রয়োজন অনুসারে তাঁর হাবীব (সা.) এর উপর সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ নাযীল করেছেন। নাযিলের এ পদ্ধতিকে ওহী বলে। জিবরাইল (আ.) যখনই ওহী নিয়ে আসতেন রাসুল করীম (সা.) সাথে সাথে তা মুখস্ত বা হিফজ করে নিতেন। উপস্থিত সাহাবীগণকেও মুখস্ত করতে বলতেন। আমাদের পূর্বেকার নবীগণের অনুসারীরা তাদের হীন স্বার্থ হাসিলের জন্য তাদের কাছে বিদ্যমান আসমানি কিতাব সমুহের অনেকাংশে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে ফেলেছে। কিন্তু একমাত্র কুরআন শরীফ কিয়ামত পর্যন্ত অবিকৃত অবস্থায় থাকবে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন: আমি নিজেই এ উপদেশ গ্রন্থ (কুরআন) নাযীল করেছি এবং আমি নিজেই তার সংরক্ষক (সুরা হিজর ৯) কুরআন শরীফ সংরক্ষণ কিভাবে করবেন, তার একটি পদ্ধতি হচ্ছে মহান আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের মধ্যে যাদেরকে মনোনীত করেন তাদের বক্ষে কুরআন মজিদ আমানত রাখেন, ওদেরকে হাফিযে কুরআন বলে। মহান আল্লাহ পাক এ সম্পর্কে বলেনÑযাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তাদের অন্তরে এটা (কুরআন) তো স্পষ্ট আয়াত, বেইনসাফরাই আমার আয়াত সমূহকে অস্বীকার করে। (সুরা আনকাবুত ৪৯) আসমানি কিতাব সমূহের মধ্যে একমাত্র কুরআন শরীফ ব্যতিত তাওরাত, ইঞ্জিল ও যবুরের কোন হাফিয ছিলেন না। আমাদের একটি গৌরবের বিষয় হচ্ছে অদ্বিয়ীত, অতুলনীয়, কুরআন শরীফের হাফিয প্রতি যুগে এতো অধিক পরিমাণ ছিলেন যাহা গণনা করা সম্ভব নহে। খুলাফায়ে রাশিদিনসহ প্রায় দশ হাজার সাহাবী হাফিয ছিলেন। ইসলামের খেদমতে যে সকল মহান ব্যক্তিবর্গ শ্রেষ্ঠ অবদান রেখেছেন তারাও হাফিযে কুরআন ছিলেন, যেমন মাযহাবের প্রবর্তক ইমাম আবু হানিফা (রা.) বিশ্ববরেণ্য ওলী আব্দুল কাদির জিলানী (রা.) সুলতুল হিন্দ খাওজা মঈন উদ্দীন চিশতী (রা.) সুলতানে বংলী হযরত শাহজালাল ইয়ামনী (রা.) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কালামে পাকের শ্রেষ্ঠ মর্যাদার কারণে হাফিযে কুরআনগণও মানব সমাজে এক বিরল সম্মানের অধিকারি। ইহকাল থেকে পরকালে তাদের মর্যাদা শতগুণে বৃদ্ধি পাবে। যেমন হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেছেন, যে কুরআন শরীফ পড়েছে এবং তা মুখস্ত রেখেছে, এত:পর কুরআনের হালালকে হালাল এবং হারামকে হারাম জেনেছে; তাকে আল্লাহ তায়ালা বেহেস্তে প্রবেশ করাবেন এবং তার পরিবারের এমন দশজন ব্যক্তির জন্য তার সুপারিশ কবুল করবেন, যাদের প্রত্যেকের উপর জাহান্ন অবধারিত হয়ে গিয়েছিল। (তিরমিযি) হাফিযে কুরআনের মর্যাদা সম্পর্কে হযরত উক্ববা ইবনে আমীর ((রা.)) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি রাসুল (সা.) থেকে শুনেছি কুরআন যদি চামড়ায় রেখে আগুনে ফেলা হয় তবে তা জ্বলবে না। এখানে চামড়া বলতে মানুষ এবং আগুন বলতে জাহান্নামের আগুনকে বুঝানো হয়েছে। এটা চির সত্য যারা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরআন শরীফ মুখস্ত করবে তাদের জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না।
রাসুল (সা.) আরও বলেছেন: সাহিবে কুরআনকে (হাফিযদেরকে) কিয়ামতের দিন বলা হবে পড় এবং উপরের দিকে উঠতে থাকো, যেভাবে তোমরা দুনিয়াতে তারতিলের সাথে পড়তে, তোমাদের স্থান শেষ আয়াতের নিকটে (তিরমিযি) অর্থ্যাৎ ছয়হাজার ছয়শত ছেষট্টি তলা ভবন তাদের জন্য নির্ধারিত। প্রিয় পাঠকগণ আমি এদিকে আর অগ্রসর না হয়ে চলে এলাম আমার এ কলামের মূল বিষয়ের প্রতি। আমরা যদি নিক্তির নিরিখে যাচাই করি, তাহলে আমরা দেখতে পাই, হাফিযে কুরআন এবং হাফিযিয়া মাদরাসা সরকারীভাবে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান শূন্যের কোটায় দু’চারটি প্রমাণ আপনাদের সামনে পেশ করছি। এদেশের গ্রামে-গঞ্জে আর শহর নগরে অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে আলিয়া শাখার সাথে হাফিযি সংযুক্ত যেমন ‘হাফিযিয়া দাখিল মাদরাসা’ বা হাফিজিয়া আলিম মাদরাসা এমপিও ভুক্তির বেলায় জ্ঞানী আর গুণীজনের কলমের আগায় হাফিজিয়া শব্দটি কাটা পড়ে দাখিল বিভাগ এমপিও ভুক্ত হয়ে যায়, যা ভাবতে অবাক লাগে। আমরা আরও লক্ষ্য করি, দাখিল বিভাগে সুপার, সহ সুপার আর মুজাব্বিদ ক্বারী থেকে যদি আরও নিচের দিকে যাই তাহলে দেখবো দপ্তরী এবং নাইট গার্ডের পর্যন্ত পদবী রয়েছে। বর্তমানে দাখিল বিভাগে লাইব্রেরিয়ান নামে আরেকটি পদবী তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু হাফিযে কুরআনে জন্য কোন পদবী তৈরি করার মত উদ্দ্যোগ কারো নেই। এটা কি তাদের অবহেলা অনিহা, না অজানা বিষয় তা আমাদের বোধগম্য নয়। অথচ সহকারী মৌলভী আর মুজাব্বিদক্বারীর মত হাফিযে কোরআন পদবীও অত্যন্ত জরুরী। তা কিন্তু সুন্দর মনোভাব আর সুদূর পরিকল্পনার আড়ালে এ পদবীটি পড়ে আছে। হিফজুল কুরআন বিভাগে দাখিল পরীক্ষার একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছিল, বর্তমানে তা কোন অবস্থায় রয়েছে তার হদীস পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে হাফিজিয়া মাদরাসার উপর আরেকটি মুসিবত চেপে বসেছে, তা হলো ষোল বছর বয়সের মধ্যে ছাত্র-ছাত্রী জেডিসি পরীক্ষা দিতে হবে, ইবতেদায়ী বা প্রাইমারী সমাপ্ত করার পর সাধারণত ছাত্ররা হাফিজিয়া মাদরাসায় ভর্তি হয়। সাধারণ মেধার ছাত্ররা হিফজ সমাপ্ত করতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যায়। হিফ্য (বোর্ডের) ফাইনাল পরীক্ষার পর গণনায় দেখা যায় তার বয়স হয়ে গেছে ষোল বছরের অধিক। এমতাবস্থায় হাফিয ছাত্র-ছাত্রীরা কি বয়সের বাধনে আটকা পড়ে জেডিসি সহ বাকী সকল পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকবে? বাংলাদেশ জমিয়তুল মুদাররিসীন মাদরাসা শিক্ষকদের অভিভাবক সংগঠন, দাখিল, আলিম, আর ফাযিল-কামিলকে মর্যাদার যথা স্থানে উন্নিত করেছে এ সংগঠনটি। কিন্তু দাখিলের সাথে সংযুক্ত হাফিজিয়া শাখার বেলায় তাদের কি করণীয় কিছু ছিল না। হাফিজিয়া মাদরাসাকে মূল্যায়ন করলে কি কুরআন শরীফকে মূল্যায়ন করা হয় না, এ বিষয়টিতো কুরআন পিপাসু লোকগুলোর অন্তরে দাগ কাটে। আমার এ উপস্থাপনা যদি যুক্তিসঙ্গত হয় তাহলে কয়েকটি প্রস্তাবে আমরা একমত হতে পারি।
(১) আলিয়া শাখার সাথে সংযুক্ত যে সকল হাফিযি শাখা রয়েছে সেগুলো এমপিও ভুক্ত চাই; (২) কুরআন শরীফের বিশেষ ফযিলত পূর্ণ সুরা এবং বিশেষ করে সুরা হুজরাত থেকে বায়্যিনাহ পর্যন্ত ফজর ও এশার নামাযে পড়া মুস্তাহাব এগুলো মুখস্ত করানোর জন্য হাফিযে কোরআন পদবী তৈরী করা; (৩) মুজাব্বিদের মত হিফজুল কোরআন বিভাগে দাখিল পরীক্ষার সুযোগ চাই; (৪) অফিস-আদালত সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিফযুল কুরআন বোর্ডের সনদের মূল্যায়ন চাই; (৫) জেডিসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে হাফিযি ছাত্র-ছাত্রীদের বয়সের শিথিলতা চাই; (৬) সর্বোপরি হিফযুল কুরআন বোর্ডের সরকারী স্বীকৃতি চাই। পাঠকগণ প্রস্তাবগুলো মনঃপূত হলে সমর্থন চাই, ত্রুটি হলে সংশোধনের পরামর্শ চাই।

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  • প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমান (রাহ.) ও সাদাকায়ে জারিয়া
  • রাসূলের সাথে জান্নাত
  • মাতা-পিতার অবাধ্যতার শাস্তি
  •  তাফসিরুল কুরআন
  • বিশ্বনবীর কাব্যপ্রীতি
  • শতবর্ষের স্থাপত্য সিকন্দরপুর জামে মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  •  আত্মার খাদ্য
  • মানব জীবনে আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা
  • সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ : ইসলাম কী বলে
  • মৃত্যুর আগে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করি
  •   তাফসীর
  • ইসলামে বিনোদনের গুরুত্ব
  • কুরআনে হাফিজের মর্যাদা
  • মদীনা রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকা-ের কেন্দ্র ছিল মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  • এতিম শিশু
  • বার্মিংহামে আল কুরআনের হাতে লেখা প্রাচীন কপি
  • রাসুলের সমগ্র জীবন আমাদের জন্য অনুকরণীয়
  • মৌল কর্তব্য আল-কুরআনের বিধান
  • Developed by: Sparkle IT