ধর্ম ও জীবন

মৃত্যুর আগে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করি

প্রিন্সিপাল মাওলানা মজদুদ্দীন আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-১০-২০১৮ ইং ০১:২৬:২৫ | সংবাদটি ১৫৪ বার পঠিত

খতিব, ভার্থখলা জামে মসজিদ, সিলেট
আল্লাহ পাক মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদাতের জন্য। আল্লাহ ছাড়া উপাসনা পাওয়ার মতো দুনিয়াতে আর কেউ হতে পারে না। তিনি এক, অদ্বিতীয়, তার কোন অংশিদার নাই। তিনি তামাম জাহানের বাদশাহ। তিনি অতি পবিত্র, শান্তির আধার, নিরাপত্তাদাতা, রক্ষক, সবার ওপর বিজয়ী, নিজ হুকুম প্রয়োগে পূর্ণ ক্ষমতাবান এবং প্রবল পরাক্রমশালী। সবকিছুর ওপর ক্ষমতাশালী এবং ক্ষমতার নিরঙ্কুশ মালিক।
কিন্তু যুগে যুগে অবাদ্য মানুষেরা আল্লাহপাকের নাফরমানী করেছে। যেমন নিজেকে বড় প্রভু বলে দাবি করেছিল ফেরাউন। কুরআনের অনেক জায়গা আল্লাহ তাআলা সে কথা জানিয়েছেন। ফেরাউনের ধংস হয়েছিলো। ফেরাউনের সময়কালে আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা আলাইহিস সালাম ও হজরত হারুন আলাইহিস সালামকে দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার জন্য নবি হিসেবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন। হজরত মুসা আলাইহিস সালাম ও হজরত হারুন আলাইহিস সালাম দুই ভাই। আল্লাহ তাআলা তাঁদের দুজনকে বনি ইসরাঈল জাতির নিকট পাঠিয়েছেন। বনি ইসরাঈল এমন এক জাতি, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি নিয়ামত দান করেছেন। কুরআনে এসব নিয়ামতের ইতিহাস উল্লেখ করে মুসলিম জাতিকে এক দিকে সুসংবাদ দিয়েছেন, অন্যদিকে শ্রেষ্ঠ নবির শ্রেষ্ঠ উম্মাত হওয়ার জন্য মন-মানসিকতা তৈরির রসদ যুগিয়েছেন। বিপদে ও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার উপায় স্বরূপ ধৈর্যধারণ করার উত্তম শিক্ষা দিয়েছেন।
ফেরাউন তার রাজত্ব ও প্রভুত্ব কায়েমের লক্ষ্যে বনি ইসরাঈলের সব নবজাতক শিশুকে হত্যার জঘন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই মহাহত্যাযজ্ঞের মাঝেও আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা আলাইহিস সালাম ও হজরত হারুন আলাইহি সালামকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। যা আল্লাহ তাআলার কুদরতের মহানিদর্শন।
অসীম ক্ষমতার উৎস মহান আল্লাহ তাআলা চাইলে যে কাউকে পিতা ছাড়া সন্তান দান করতে পারেন, তেমনি এক পরীক্ষায় ফেলেছিলেন হযরত মরিয়ম (আ.) কে। মরিয়মের স্বামী না থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলা তাকে সন্তান দান করেছিলেন। মরিয়ম (আ.)-এর আলোচনা করতে গেলে তাঁর মায়ের আলোচনা আগেই করে নিতে হয়। পূর্ববর্তী পয়গম্বরগণের শরীয়তে প্রচলিত ইবাদতপদ্ধতির মধ্যে আল্লাহর নামে সন্তান উৎসর্গ করার রেওয়াজও চালু ছিল। এসব উৎসর্গকৃত সন্তানদের পার্থিব কোন কাজকর্মে নিযুক্ত করা হতো না। এ পদ্ধতি অনুযায়ী মরিয়ম (আ.) এর মা অর্থাৎ ইমরানের স্ত্রী নিজের গর্ভস্থ সন্তান সম্পর্কে মান্নত করলেন যে, তাকে বিশেষভাবে আল্লাহর ঘর বায়তুল মুক্বাদ্দাসের খিদমতে নিয়োজিত করা হবে। তিনি ভেবেছিলেন পুত্র সন্তান হবে। কিন্তু যখন তিনি কন্যা সন্তান প্রসব করলেন, তখন আক্ষেপ করে বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমি কন্যা প্রসব করেছি’ (আলে ইমরান ৩৬)। অর্থাৎ একে দিয়ে তো আমার মান্নত পূর্ণ হবে না। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল অন্যরূপ। তিনি উক্ত কন্যাকেই কবুল করে নেন। বস্তুত উনি ছিলেন মারিয়াম বিনতে ইমরান, যিনি ঈসা (আ.)-এর কুমারী মাতা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যাকে জান্নাতের শ্রেষ্ঠ চারজন মহিলার অন্যতম হিসাবে অবিহিত করেছেন। মরিয়মকে উপযুক্ত বয়সে আল্লাহর ঘর বায়তুল মুকাদ্দাসের সেবায় সারা জীবনের জন্য ওয়াকফ করেন। তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে আল্লাহর ইবাদতে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন এবং তার কোন প্রকার খাবার-দাবারের জন্য চিন্তা করতে হত না। কারণ আল্লাহপাক নিজে ফেরেশতা দিয়ে আসমান থেকে তার জন্য বেহেশতি খাবার প্রেরণ করতেন। একদিন বিবি মরিয়ম যখন প্রার্থনায় রত, তখন জিব্রাইল (আ.) তাকে এক সুসন্তানের সুসংবাদ দিলেন, যিনি ভবিষ্যতে একজন নবী হবেন। বিবি মরিয়ম বললেন, আমি কুমারি, আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করেনি, তাহলে কিভাবে আমার সন্তান হবে। উত্তরে জিব্রাইল (আ.) বললেন, আল্লাহর কুদরতে হবে। এ কথা বলে জিব্রাইল (আ.) মরিয়মের নাকে ফুঁৎকার করে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
যথারীতি আল্লাহর হুকুমে মরিয়ম গর্ভবতী হয়ে পড়লেন এবং গ্রামবাসী আল্লাহ কুদরত না বুঝতে পেরে মহাসতি বিবি মরিয়মকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে গর্ভাবস্থায় গ্রাম থেকে বিতাড়িত করে দিল। বিতাড়িত অবস্থায় তিনি জন্ম দেন ইসা (আ.) কে। জন্মের ৮ দিনের মাথায় নবজাতকের সুন্নাতে খতনা সম্পন্ন করে তার নাম রাখা হল ইসা মসিহ। হযরত ইসা (আ.) কে আল্লাহপাক রুহুল্লাহ উপাধিতে ভূষিত করলেন। কারণ তিনি একমাত্র নবী যিনি জন্ম থেকে নফসের অধীনে ছিলেন না। কারণ তার নফস ছিল জন্ম থেকেই পবিত্র।
নবী ইসা জন্ম থেকে কথা বলার শক্তির অধিকারী ছিলেন। যখন লোকেরা ইসা (আ.) জন্মের পর মাতা বিবি মরিয়মকে নানা অপবাদ দিচ্ছিল, তখন ৩০ দিনের শিশু ইসা তার মা যে একজন সতি নারী এবং তিনি নিজে একজন আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন, তা সবাইকে মুখে বলে দেন। একজন ছোট শিশুর মুখে এমন আশ্চর্যজনক কথা শুনে সেদিন সবাই বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছিল যে, নবী ইসা আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন এবং বিবি মরিয়ম একজন সতি নারী।
যাই হোক, আজ আমি খুবই ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে বয়ান পেশ করছি। আজ আমার বন্ধু ও ক্লাসমেট প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবীবুর রহমান দুনিয়ার মায়া ত্যাগে করে চিরতরে চলে গেছেন। তিনি আল্লাহর ডাকে সারা দিয়ে চিরবিদায় নিয়েছেন। আল্লাহপাক তাকে জান্নাতে উচু মাকাম দান করুন। আমরা একসাথে পড়ালেখা করেছি। সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা থেকে আমরা উভয়েই কামিল পাস করেছি। সিলেটের ইসলামী আন্দোলনের কিংবদন্তী, বাতিলের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার ছিলেন প্রিন্সিপাল হাবীব। এদেশের মানুষ তাকে কোনো দিনই ভুলবেনা। দ্বীনের খেদমতে তিনি যেভাবে নিরলস কাজ করে গেছেন, তার উত্তম প্রতিদান মহান আল্লাহ তাকে দান করবেন, আমরা আশা করি। আল্লাহ তাআলা বলেন, প্রতিটি প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে আর ভাল ও মন্দ দ্বারা আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করে থাকি। এবং আমার কাছেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। (আল-কুরআন) আল্লাহ আমাদেরকে জন্ম দিয়েছেন মৃত্যুও দিয়েছেন। পৃথিবীতে আমরা কেউই স্থায়ী নয়। একদিন আমাদের সবাইকে চলে যেতে হবে। তাই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে আমরা যেন আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করতে পারি। আল্লাহ পাক আমাদেরকে সেই তৌফিক দান করুন।
অনুলিখন : মাহমুদুর রহমান

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  • শতবর্ষের স্থাপত্য সিকন্দরপুর জামে মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  •  আত্মার খাদ্য
  • মানব জীবনে আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা
  • সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ : ইসলাম কী বলে
  • মৃত্যুর আগে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করি
  •   তাফসীর
  • ইসলামে বিনোদনের গুরুত্ব
  • কুরআনে হাফিজের মর্যাদা
  • মদীনা রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকা-ের কেন্দ্র ছিল মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  • এতিম শিশু
  • বার্মিংহামে আল কুরআনের হাতে লেখা প্রাচীন কপি
  • রাসুলের সমগ্র জীবন আমাদের জন্য অনুকরণীয়
  • মৌল কর্তব্য আল-কুরআনের বিধান
  • তাফসিরুল কুরআন
  • ওলীগণের লাশ কবরে অক্ষত থাকে
  • ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার
  • কওমি সনদের স্বীকৃতিতে কী লাভ
  • ইসলামে সংখ্যালঘুর অধিকার
  • Developed by: Sparkle IT