পাঁচ মিশালী

কলকাতার ডায়েরী

এনামুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-১০-২০১৮ ইং ০০:২১:৪৫ | সংবাদটি ৭১ বার পঠিত

গত জুন মাসে বহুজাতিক আইটি কোম্পানী ইপসন ও ফ্লোরা লিমিটেডের সৌজন্যে কলকাতা সফরের আমন্ত্রণ পাই। যেহেতু আমার পাসপোর্টে ভারতের এক বছরের মাল্টিপল ভিসা লাগানো ছিল, তাই যথারীতি বিমানের টিকেট করার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে পাসপোর্ট হস্তান্তর করি। তারাও টিকেট কনফার্ম করে আমাদের যাত্রার তারিখ জানিয়ে দিলেন।
পরদিন সকাল ১০টায় ঢাকা বিমানবন্দর থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে ইউএস বাংলা বিমানে করে আমরা যাব কলকাতা। তাই আগের দিন রাতেই ঢাকা বিমানবন্দর এর কাছাকাছি একটি হোটেলে রাত্রি যাপন করতে হলো। সকাল ৮টায় সকল কাজ শেষ করে হোটেলের গাড়ি পৌঁছে দিল বিমানবন্দরে। সেখানে পৌঁছেই দেখা হলো পরিচিত অনেকের সাথে। বডিং পাস, ইমিগ্রেশন সহ বিমানবন্দরের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ওয়েটিং রুমে বিমানে উঠার জন্য অপেক্ষা। এরই মধ্যে দেখা হয়ে গেল সাংবাদিক সাবান মাহমুদ ভাই ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল অলী আহমদ সাহেবের সাথে। সাবান ভাই সপরিবারে ব্যংকক যাওয়ার জন্য ইউএস বাংলার আরেকটি ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষারত।
এবার বিমানে উঠার পালা। বিমানবন্দর এর লাউঞ্জ থেকে ল্যান্ড করা বিমান অনেক দূরে। তাই একটি বাসে করে আমাদের বিমানের সামনে নিয়ে যান কর্তৃপক্ষ। বিমানে উঠার পর তাদের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে পাইলট বিমান উড্ডয়নের আগে কোরআন তেলাওয়াত করলেন, দোয়া পড়লেন, আমিও তাই করলাম। অতঃপর বিমান আকাশে উড়লো।
পাইলটের ঘোষণা অনুযায়ী আমাদের বহনকারী ইউএস বাংলার বিমানটি প্রতি ঘন্টায় ৮শ’ কিলোমিটার দ্রুত গতিতে উড়ছে। ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট আকাশে থেকে বিমানবালা কর্তৃক প্রদত্ত নাস্তা (বার্গার, আপেল ও পানি) খেয়ে দৈনিক বনিকবার্তায় চোখ বুলাতে বুলাতে পাইলটের ঘোষণা ‘আমরা আর মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করব’। পাইলটের ঘোষণা অনুযায়ী আমরাও আমাদের যাবতীয় প্রস্ততি নিতে লাগলাম।
বিমান রানওয়ে ছুয়ে তার নির্দিষ্ট জায়গা মতো ল্যান্ড করার পর আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিমান থেকে নেমে সোজা চলে যাই ইমিগ্রেশন কাউন্টারে। এরই মধ্যে ইমিগ্রেশন ফরেন কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন। একই সময় আরেকটি ডমেষ্টিক ফ্লাইট ল্যান্ড করায় কিছুটা হুলস্থুল দেখা দেয়। তবে সেখানে শৃংখলা অত্যন্ত চমৎকার।
লাইন বেধে আমরা ইমিগ্রেশন করছি। যখন আমার পালা আসলো আমি গিয়ে দাঁড়ালাম সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সামনে। পাসপোর্ট ও ফিলাপকৃত ইমিগ্রেশন ফরম হাতে নিয়ে ইংরেজিতে কথা বলতে লাগলেন। আমিও যথাসম্ভব জবাব দিতে লাগলাম। বুঝলাম ঠুকা দিয়ে জিনিস একটু ট্রাই করছেন। যখন বুঝলেন জিনিস মোটামোটি ঠিক আছে তখন হাসি মুখে বললেন, দাদা আপনি যে হোটেলে থাকবেন তার ঠিকানা দিন। তাও লিখে দিলাম। প্রশ্নবানে জর্জরিত তখন-কোথায় সাংবাদিকতা করি, কেন ভারত এসেছি, কোন এসাইনম্যান্ট কিনা, আইডি কার্ড আছে কিনা, সাথে কে এসেছে, কি কি প্রোগ্রাম, কেন এসেছি, কার সাথে দেখা করব ইত্যাদি। এদিকে ভেতরে ভেতরে একটু ভয়ও কাজ করছে। যদি কোন অজুহাত দেখিয়ে ইমিগ্রেশন থেকে রিটার্ণ দেয়। কারণ বুঝতে পারছি সাংবাদিকদের নিয়ে তাদের মাঝেও আলাদা ভয় কাজ করে। অবশেষে সব তথ্য জেনে আমার হাতে পাসপোর্ট দিয়ে বেচারা হাসি মুখেই হ্যান্ডশেক করে বিদায় জানালেন।
ততক্ষণে আমার সাথের সফর সঙ্গীরা নিচ তলায় এসে বাইরে আমার জন্য অপেক্ষমান। অতঃপর আমিও বিমান বন্দরের বাইরে আসলাম। ফরেন লাউঞ্জে আমাদের জন্য বহুজাতিক আইটি কোম্পানির প্রতিনিধি ও ট্যুর গাইড ট্যুরিস্ট বাস নিয়ে অপেক্ষমান ছিলেন। তারা ফুল ও পানির বোতল হাতে দিয়ে স্বাগত জানালেন। আমরা বাসে চড়ে বসলাম।
নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে আমাদের বাস চলল শহরের উদ্দেশ্যে। এয়ারপোর্ট থেকে মূল শহর প্রায় আধ ঘন্টার রাস্তা। বাসে জানালার পাশে বসে অবলোকন করতে লাগলাম কলকাতা শহরের দৃশ্য। আর মনে পড়ল ইতিহাসে পড়া কলকাতার নানা ঐতিহাসিক কথা গুলো।
পশ্চিমা দেশের মতো খুব বেশি উন্নত শহর না হলেও খুব বড়, প্রচন্ড ব্যস্ত আর ঐতিহাসিক একটি মেগা সিটি হলো কলকাতা। এসি বাসের জানালার পর্দা সরিয়ে যখন দেখছিলাম মনে হলো তারা বৃটিশ সাম্রাজ্যের স্থাপনাগুলো বিলীন হতে দেয়নি। প্রতিটি মার্কেট, প্রতিটি বাড়ি পুরনো বৃটিশ আমলের ডিজাইন অক্ষুণœ রেখেই সংস্কার করেছে কেবল। তবে কোন কোন স্থাপনাগুলোর বাইরের অবস্থা দেখে মনে হয় খুব অবহেলিত নোংরা পরিবেশ হয়তো কিন্তু ভেতরে প্রবেশ না করলে তাদের আভিজাত্য বুঝার উপায় নেই তবে ব্যতিক্রমও রয়েছে। কিন্তু আমরা পুরোটাই ব্যতিক্রম। কোন মতে দু’চার লাখ টাকার মালিক বনে যেতে পারলেই ইট সিমেন্ট দিয়ে তালাতালি করে বিল্ডিং করতে না পারলে যেন আমাদের জীবনটা ব্যর্থ!
কলকাতার বুক চিড়ে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলেছে। পয়েন্টে পয়েন্টে মারাত্মক ট্র্যাফিক জ্যাম দেখে মনে হলো ঢাকার যন্ত্রণা এখানে এসেও? তবে সেখানকার জ্যাম এলোমেলো নয়, উচ্চ আওয়াজে গাড়ির হর্ন বাজানো নয়, সাদা পোষাকের ট্র্যাফিক পুলিশ, সিগন্যাল জ্বলার সাথে সাথে মুহূর্তেই জ্যাম ছুটে যায়। হাজার হাজার গাড়ি অথচ নেই একটি গাড়ি আরেকটি গাড়িকে অভারটেক করার প্রতিযোগিতা।
অবশেষে বিকাল ৩টার আগেই আমাদের বহনকারী বাস কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার ডক্টর ইসহাক রোডের প্রাদেশিক সদস্যদের বাস ভবনের ঠিক উল্টো দিকে অবস্থিত ‘হোটেল দ্যা ইম্প্রেসা’তে গিয়ে থামল। বাস থেকে নেমে হোটেল চেকিং এবং হোটেলের ওয়াই ফাই পাসওয়ার্ড সংগ্রহ করে বরাদ্দকৃত রুমে প্রবেশ করলাম। হোটেলের সামনে গিয়ে মনে হচ্ছিল এই হোটেলে থাকব? বাইরের পরিবেশ দেখে বুঝার উপায় নেই ভেতরে কেমন। কিন্তু রিসিপশনে প্রবেশ করে আমার সে ভুল ভেঙ্গে গেলো। অত্যাধুানিক ফিটিংস, কারুকাজ, আসবাব পত্র, সুইমিং, জিমনেসিয়াম সব মিলিয়ে থ্রি স্টার মানের হোটেল দ্যা ইম্প্রেসা।
রুমে প্রবেশ করে ফ্রেশ হয়ে হোটেলের নিচতলায় রেষ্টুরেন্টে খাবার খেতে নেমে আসলাম। কলকাতার মাটিতে প্রথম খাবার। থ্রি স্টার মানের হোটেলের রেষ্টুরেন্টে স্বাভাবিক ভাবেই বুফে সিস্টেম খাবার। সেখানে দেখা হলো বেশ কয়েকজন ইউরোপিয়ান, শিখ, আফ্রিকান সহ অনেকের সাথে। প্রথমেই খাবারের বৈচিত্র দেখে ভালই লাগলো। ভাত, মাছ, মাংশ সহ ভিন্ন ধরনের রান্না করা সুস্বাদু সবজি, ভর্তা, আর ভাতের সাথে নিমকি একটি আলাদা স্বাদ তৈরি করে।
খাবার খেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। তখন পড়ন্ত বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। পড়ন্ত বিকালে অচেনা অপরিচিত মেগা সিটি কলকাতা দেখতে জানতে বের হলাম। প্রথমেই হোটেলের আশে পাশে ডক্টর ইসহাক রোড এলাকা দেখে বিস্মিত হলাম। সামনেই কয়েকটি সাধারণ মানের বিশাল বিল্ডিং। টিনের গেইটে লিখা ‘প্রাদেশিক সদস্যদের বাস ভবন’ বুঝতে বাকি রইলো না এটিই এখানকার এমপিদের বাসা। নেই তেমন কোন সিকিউরিটি। দেখে মনে হয় সিলেট শেখঘাটের সরকারী কলোনীর মতো। জানলাম তারা তাদের নাগরিকদের সেভাবে গড়ে তুলেছে যে যে মানের সে সেই মানের জীবন যাপন করতে অভ্যস্ত। সেখানে চাইলেই এমপিরা বিলাসী জীবন যাপন করতে পারবেন না। একটি সাইন বোডে ইংলিশ, বাংলা ও হিন্দি তিনটি ভাষা লিখা থাকে।
আশেপাশে মসজিদের খোঁজ করতে গিয়ে একটি সুন্দর মসজিদ পেয়ে গেলাম। দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নেমে এলো। মজার বিষয় হলো সেই রাতটি ছিলো শবে বরাতের রাত। কলকাতার মুসলমানদের মাঝে শবে বরাতের উৎসবও কোন অংশে কম নয়। জেনে নিলাম পশ্চিবঙ্গে ৩৫ ভাগ মুসলমানদের মধ্যে সুন্দর সম্প্রীতি ও বন্ধন। শবে বরাতের রাতে মসজিদে আলোকসজ্জা, তরুণরা দল বেধে ঘুরাঘুরি, পায়েশ খাওয়া, সকল সংস্কৃতিই সেখানে জাঁকজমক। তবে পাশেই স্ট্রিট রোডে রঙ্গিন নিয়ন বাতির আঁধার আলোর মাঝে আছে সারি সারি বার।
কলকাতা শহরের একটি ভাল দিক হলো, প্রতিটি রাস্তার দু’পাশে সারি সারি বৃক্ষরাজি। বিশাল বিশাল প্রশস্ত অনেক রাস্তার পাশে বিশাল বিশাল খেলার মাঠ, ঝমকালো সোডিয়াম বাতির আলোয় ঝলমলে হয়ে উঠে রাজপথ। সন্ধ্যার পর যাব নিউ মার্কেট। একটি টেক্সি ডেকে নিলাম। চালক ৫০ রুপি চেয়ে বসলো। ভাবলাম হয়তো বেশি জায়গা হবে না। পায়ে হেটেই চলে যাই। পা চলল নিউ মার্কেটের উদ্দেশ্যে।
বিশাল রাস্তা তার দু’পাশে যে ফুটপাত তা আমাদের পুরো রাস্তার সমান হবে মনে হলো। সেখানেও ফুটপাথ দখল করে আছে হকাররা। প্রথমে মনে হলো আমাদের মেয়রের মতো এখানের মেয়র হয়তো গরম নয়। কিন্তু কিছু জায়গা এগিয়ে যাওয়ার পর দেখলাম ভিন্ন দৃশ্য। এখানে মেয়র কর্তৃক হকারদের দৌড়াতে হয় না। বিশাল প্রশস্ত ফুটপাথের দু’পাশে সারি সারি হকার আর মাঝখানে পথচারিদের হাঁটার জায়গা, দেদারছে পথচারিরা হাঁটছে, কেনা বেচা হচ্ছে। কারো কোন অসুবিধা হচ্ছে না। কারণ সুশৃংখল মানসিকতায় তাদের এভাবেই তৈরী করা হয়েছে।
সামনে হেটে চলেছি। টিভিতে ওপার বাংলার ভাষা শুনতে ভালই লাগে তখন হাঁটছি আর সরাসরি তাদের কথা গুলি শুনে ভালই লাগছে। প্রতিটি বিল্ডিং বৃটিশ ঔপনিবেশিক এর স্থাপনা সদৃশ্য করে রাখা হয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, বৃটিশ শসনামলে ভারতবর্ষের রাজধানী ছিল কলকাতা। তাই সেই সময়ের প্রতিটি বড় বড় স্থাপনা তাদের স্টাইলেই তৈরী। আজও ভারতীয়রা তা অক্ষুণœ রেখেছে।
কলকাতা সর্ববৃহৎ শহর ও প্রধান বন্দর হিসেবে বিরাজমান এ মহানগরীটি ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। পরবর্তীকালে এটা অবিভক্ত বাংলা প্রদেশের রাজধানী হয়। শুধুমাত্র লন্ডনের পরই দ্বিতীয় স্থানে অবস্থিত এটাকে তখনকার সময় ‘সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় নগর’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এর নিজস্ব মার্জিত ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের জন্য কলকাতাকে ‘প্রাসাদ নগরী’ও বলা হতো। বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ১৩৮ কিলোমিটার উত্তর দিকে হুগলি (ভাগীরথী) নদীর বাম (পূর্ব) তীরে অবস্থিত এটি অন্য তিন দিকে থেকে চব্বিশ পরগণা জেলা দ্বারা বেষ্টিত।
হাঁটতে হাঁটতে চললাম নিউ মার্কেট এলাকার উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে দেখতে পেলাম ‘ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম’ অপর পাশে লেখা ‘ভারতীয় সংগ্রহালয়’। প্রতিটি সাইনবোর্ডে ইংরেজির পাশে শুদ্ধ বাংলার ব্যবহার তাদের বাধ্যতামূলক।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT