সম্পাদকীয়

ভূমি সংক্রান্ত সেবা পেতে ভোগান্তি

প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-১০-২০১৮ ইং ০০:৩৭:৩৭ | সংবাদটি ৮৩ বার পঠিত

ভূমি সংক্রান্ত যেকোনো সেবা পেতে মানুষকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। সবচেয়ে বেশি ঘুষের লেনদেন হয় জমি নিবন্ধন ও নামজারিতে। আর সেবা পেতে পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি ঘুষ দিতে বাধ্য হয়। এতে বলা হয়, ভূমি বিষয়ক কাজে মানুষের ভোগান্তির মূল কারণ দীর্ঘসূত্রতা। মূল দলিল তৈরি করতে ইচ্ছাকৃতভাবে এক দেড় বছর দেরি করা হয়। নিবন্ধন ও নামজারিতে ছয়টি করে ধাপে ঘুষ দিতে হয়। এর পেছনে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় একটি চক্র কাজ করছে। এই পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গ বেশির ভাগই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। ভূমি সংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতি আমাদের দেশে অত্যন্ত পুরনো একটা বিষয়। জমি বিকিকিনি, রেকর্ড, জরিপ, খাজনা পরিশোধ সব ক্ষেত্রেই চলছে অনিয়ম। বাড়তি টাকা না দিয়ে জমির রেজিস্ট্রেশন করানো হয়েছে, এমন ঘটনা নেই বললেই চলে। প্রকৃতপক্ষে রেজিস্ট্রেশন ফি কতো টাকা, তা জানতে পারছে না দলিল গ্রহীতারা। এটাই যেন নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে। তার ওপর রয়েছে জাল জালিয়াতি। আমাদের দেশে ভূমি রেজিস্ট্রেশনের যে নিয়মটি চালু রয়েছে তা এমনই, যে কেউ দলিল লিখিয়ে নিয়ে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নিতে পারে, সে জমির প্রকৃত মালিক হোক বা না হোক। সুষ্ঠু ভূমি ব্যবস্থাপনার জন্য সুষ্ঠু জরিপ জরুরি। সেই সঙ্গে রেজিস্ট্রেশন, নামজারি, খাসজমির বিধিসম্মত পত্তনদান, সংরক্ষণ এবং ভূমি রাজস্ব প্রভৃতি ক্ষেত্রে অনিয়মের কারণে আমাদের দেশে জমি নিয়ে বিরোধ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে।
ভূমি উন্নয়ন কর জমা দেয়ার ক্ষেত্রে একশ’ টাকা থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয়। নামজারির ক্ষেত্রে তিন হাজার থেকে দুই লাখ টাকা, নিবন্ধনের ক্ষেত্রে এক থেকে ৫০ হাজার টাকা, খতিয়ান ও নকশার নকল তোলার ক্ষেত্রে দু’শ থেকে এক হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। এছাড়া দলিলের নকল তোলার ক্ষেত্রে আটশ’ থেকে দুই হাজার টাকা, জরিপের ক্ষেত্রে পাঁচশ থেকে পাঁচ হাজার টাকা, ভূমি রেকর্ড সংশোধনের ক্ষেত্রে চার থেকে পাঁচ হাজার, হাট বাজার ইজারা দেয়ার ক্ষেত্রে দশ থেকে ২০ লাখ টাকা এবং কৃষি সংক্রান্ত মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধাপে তিনশ’ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষের লেনদেন হয়। ভূমি সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাধারণ মানুষদের নানান ফাঁদে ফেলে ঘুষ দিতে বাধ্য করে। সাধারণত: ভূমি জরিপের সময় জরিপকারীরা জমি কম দেখানোর ভয় দেখিয়ে মালিকদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ করে। জরিপের সময় ভূমি মালিকের অনুপস্থিতিতে তাদের সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি খাস জমি, অর্পিত সম্পত্তি প্রতাবশালীদের পক্ষে রেকর্ড ও নামজারি করা হয়। দলিল লেখকরা সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে অনেক বেশি হারে ফি গ্রহণ করে। খাসজমি বরাদ্দের সময় কোনো ধরনের প্রচারণা চালানো হয় না। রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীদের পরামর্শে এসব জমি বরাদ্দ দেয়া হয়। সর্বোপরি জমি সংক্রান্ত কার্যক্রমে দালাল টাউটদের দৌরাত্ম বেশি। রীতিমতো একটা চক্র এই কার্যক্রমে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর।
ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সেবা কার্যক্রমের এই অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। আর তার জন্য প্রচলিত পদ্ধতি ও নিয়মকানুনে পরিবর্তন আনতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্য একটা সুসংবাদ রয়েছে। সরকার ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ডেজিটাল করার কার্যক্রম শুরু করেছে। কাজ অনেকটাই এগিয়েও গেছে। আশা করা হচ্ছে ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা চালু হলে ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে জনভোগান্তি কমে আসবে। যদিও ভূমি ডিজিটাল করার কার্যক্রম চলছে ধীর গতিতে। ২০১০ সালে কার্যক্রম শুরু হলেও এখন পর্যন্ত শেষ হয় নি। আমরা চাই এই প্রকল্প অতি দ্রুত বাস্তবায়িত হোক। সেই সঙ্গে দালালচক্র এবং ভূমি বিভাগের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হোক।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT