সাহিত্য

হেমন্তের কবি

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-১০-২০১৮ ইং ০০:৪৮:৩৮ | সংবাদটি ৬০ বার পঠিত



নাম নিয়ে তাঁর সঙ্কট মিটেনি কখনও। তেমনি তাঁর উপাধি নিয়েও মিটেনি সংশয়। বাবা সত্যানন্দ জ্যেষ্ঠপুত্র ছাড়া সপরিবারে ব্রাহ্ম হয়ে বরিশালে থিতু হওয়ার আগে তাঁদের বংশগত পদবি ছিল দাশগুপ্ত। গুপ্তবিদ্যায় পারদর্শিতার কারণে এই পদবি তাদের কাঁধে সওয়ার হলেও ব্রাহ্ম হওয়ার পরে ‘গুপ্ত’ পদবি উঠাতে জীবনানন্দকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। তাঁর নামের বানানেও অনেকে একটা দন্ত্যন্ন কম লিখে বিভ্রাট তৈরি করতেন। ব্যক্তি নামের বাইরে কবি হিসেবেও তাঁকে ডাকা হয় বিভিন্ন নামে। কখনও নির্জনতার কবি, কখনও নিঃসঙ্গ কবি। কখনও ধূসর পান্ডুলিপি কিংবা রূপসী বাংলার কবি। তাঁর মা কবি কুসুম কুমারী দাশ থেকে জায়গা নিয়ে ‘ব্রহ্মবাদী’-তে বর্ষ আবাহনের কবিতা দিয়ে তাঁর কবি জীবনের সূচনা। তারপর ‘ঝরাপালক’ এ কাজী নজরুল ইসলামকে ভাবের কেন্দ্রে রেখে কাব্যগ্রন্থের জনক হলেও পরবর্তীতে খুঁজে পেয়েছেন নিজের মৌলিক পথ। একেবারে অন্যরকম সে পথ। কখনও এপথ বিশ্বসভ্যতাকে নিয়ে এসেছে পাঠকের কাছে, কখনও নাগরিক পাঠককে নিয়ে গেছে কুয়াশা স্নাত গ্রামীণ জীবনে।
কবি একজন জীবনের মানস-কুসুম। বাস্তবতা থেকে পরাবাস্তবতা, জীবন থেকে কল্পনা, কাল থেকে কালান্তরে কবির বিচরণ পথ। তাই কবিকে নিছক একটি অভিধায় আটকে রেখে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। তবুও কবির কবিতায়, ভাবনা ও দর্শনে কিংবা মনের জানালায় কখনও কখনও বিশেষ কিছু বিষয় মূর্ত হয়ে উঠে কিংবা অতিরিক্ত সজ্ঞান প্রশ্রয় লাভ করে। কবিকে নির্মোহ পাঠ করলে কখনও মনে হয় কবি বুঝি এক নদীকুমার যার সখ্য সন্ধ্যা, কীর্তনখোলা, ধানসিঁড়ি কিংবা কালীদহ আর কীর্তিনাশার সঙ্গে। কখনও রূপসার ঘোলাজলও কবিকে টেনে নেয় জলমাতার কাছে। কবিকে কখনও মনে হয় অতীতচারী এক পথভুলো কুমার যে হাজার বছর আগের সভ্যতা গায়ে মেখে ভুলে চলে এসেছে বর্তমানে। এসিরীয়, ব্যাবিলনীয় সভ্যতার নান্দনিক সুঘ্রাণ নিয়ে কবি এক পথভোলা কালের কুসুম। গোধূলিসন্ধির নৃত্য অবলোকন করে বড় হওয়া কবি কখনও মিথ আর পুরাণের বাহক। কখনও কবি মৃত্তিকা মায়ের আঁচলে বসে থাকা ভূমিসূত। কবিকে অন্তরে ধারণ করতে করতে এক সময় মনে হয় কবি বুদ্ধের সমসাময়িক এক মহান পরিব্রাজক যার কবিতার পরতে পরতে উঠে আসে তথাগতের স্মৃতি ও চেতনার নির্যাস। উঠে আসে বৌদ্ধ সভ্যতার অপার মৈত্রীমাখা নিদর্শনসূত্র। জীবনানন্দ দাশ হেমন্তপুত্র। হেমন্তে বুঁদ হয়েছিলেন জীবনভর। তাই পতা রোমান্টিক ফাল্গুনের জাতক হয়ে কবি হেমন্তে বিদেহী হয়েছেন, খুঁজে পেয়েছেন আপন মাতৃ-জঠর। সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা সকল দেশের রানীর অঙ্গে ষড়ঋতুর যে ফ্যাশান বছর বছর প্যারেড করে যায় র‌্যাম্পে তার সবগুলোই কবি ধারণ করেছেন কবিতায়। কিন্তু তবুও মনে হয় হেমন্তের প্রতি কবির পক্ষপাত একটু বেশিই। ‘এসো হে বৈশাখ বলে’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রীষ্মকে নিয়েছেন কব্জা করে আর নিজেকে ‘শ্রাবণ প্লাবন বন্যা’ বলে শাওন রাতের কবি নজরুল বর্ষায় নিজের জমিদারি ফলিয়েছেন। জীবনানন্দ নদীমাতৃক এলাকার কবি বলে তাঁর চোখে ফসল আর ফসলের ক্ষেত এনেছে জীবনের বার্তা। তাই নবান্নের ঋতু হেমন্তই হয়ে উঠেছে জীবনানন্দের শিল্পঋতু।
ঝরাপালক, ধূসর পান্ডুলিপি, রূপসী বাংলা, বনলতা সেন, মহাপৃথিবী, সাতটি তারার তিমির, বেলা-অবেলা কালবেলা, শ্রেষ্ঠ কবিতা শীর্ষক আটটি কাব্যগ্রন্থসহ অগ্রন্থিত অনেকগুলো কবিতায় কবি স্মরণ করেছেন হেমন্তকে। হেমন্ত কবিকে যাদু করেছে তার সমৃদ্ধির রূপ দিয়ে যেমন, তেমনি মায়ার ঘেরাটোপেও রেখেছে আবদ্ধ করে। কবির কবিতায় হেমন্ত কখনও তার স্বনামে মূর্ত হয়েছে, কখনও কার্তিক আর অঘ্রাণ হয়ে বেড়ে উঠেছে কবিতার দেহে। কখনও কেবল শিশিরের জল, হিমরাত হয়েও হেমন্ত লুকিয়েছিল কবির মনন-গর্ভে। ‘ঝরাপালক’-এর একদিন খুঁজেছিনÑযারে, আলেয়া, কবি, শ্মশান, সেদিন এ ধরণীর ইত্যাদি কবিতাগুলোতে হেমন্ত হয়েছে .... বাঙ্ময়। হেমন্তের হিমঘাসে কবি একদিন কাউকে খুঁজে বেড়িয়েছিলেন সুঘ্রাণে মাতোয়ারা কামিনী ফুলের ঝরো ঝরো বেদনার সঙ্গীতে। নিশির শিশিরস্নাত ঘাসের ওপর সাদা চাদরের মতো বিছিয়ে থাকা শুভ্র কামিনীর রূপে নয়, ঝরে পড়ার বেদনাই কবিকে বিমোহিত করে রেখেছিল একদিন। হেমন্তের হিমলাজে গুটানো সন্ধ্যায় কবি যাকে খুঁজে ফিরেছেন সে ছিল মানবী নয় আলেয়া। হেমন্তের হিমগলানো পথে বার বার সেই আলেয়াকে খুঁজে ফিরেছেন কবি ভগ্নদূতের মতো।
কখনও কখনও হেমন্ত কবিকে আরও কবি করে দেয় তার নিটোল কোমল রূপে। কবিও হেমন্তের কোমল কুয়াশার রহস্য ফুঁড়ে বকবধূটির মতো শাদা ডানা মেলে কল্পনায় উড়ে যান হেমন্তের হিম মাঠে। আকাশের আবছায়া আর কবির কল্পনার যুগলবন্দীতে হেমন্ত হয়ে উঠে মায়াবী। পৃথিবীর শেষ বিকেলের ছবি কবিকে স্মরণ করিয়ে দেয়, একদিন যেতে হবে জীবনের বৃন্ত হতে ঝরে, হেমন্তের পাতাঝরা দিনের মতো। সেদিন এ ধরণীর হেমন্তের হিমে ভেজা ঘাস, জোনাকির ঝাড়, মৃত্তিকা-মা তাকে ডাকবে পিছে, কবি পার হয়ে যাবে হিমানী পাথার। ‘শ্মশান’ কবিতায় কবির এই বেদনার সুর যেন বয়ে গেছে তার জীবনের পথ ধরে ঘাতক ট্রামের চাকার গতি পেয়ে। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ধূসর পান্ডুলিপি’-তে কবি নিজেকে নিজের মতো করে তৈরি করে নিয়েছেন আপন কাব্য-প্রকৌশলে। এই কাব্যগ্রন্থের নির্জন স্বাক্ষর, পেঁচা, কার্তিক মাসের চাঁদ, অনেক আকাশ, অবসরের গান, জীবন, পিপাসার গান কবিতায় আপন করে পেয়েছেন হেমন্তকে। জীবনের পথে শীতের আগে হেমন্ত এসে হয়ত কবিকে ঝরিয়ে নিয়ে যাবে অনন্তের পথে, কিন্তু তখনও কবির জীবন রয়ে যাবে অগাধ। ঝরে গেলেও কবির সকল গান তার প্রাণের অন্তরতম সখার জন্য নিবেদিত হবে। পথের ঝরা পাতা যেমন আঁকড়ে থাকে মৃত্তিকার বুক, তেমনি কবির ভালবাসাও কি তাকে বুকে নিয়ে শুয়ে রবে অনন্তকাল, এ জিজ্ঞাসা কবিকে করুণ করে তোলে। হেমন্ত যে কেবল পাতাঝরা দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় তাই-ই নয়, হেমন্ত আনে ভরা গোলার নবান্ন। কৃষকের মুখে নতুন সোনার ধানের সোনালি হাসি সে-ও আসে হেমন্তের হাত ধরে। কবিও তাই সুখের আলাপ পেয়ে ‘পেঁচা’ কবিতার মধ্য দিয়ে লক্ষ্মী পেঁচার সৌভাগ্য দেখতে পেয়ে বলেন,
প্রথম ফসল গেছে ঘরে-
হেমন্তের মাঠে-মাঠে ঝরে
শুধু শিশিরের জল,
অঘ্রাণের নদীটির শ্বাসে
হিম হয়ে আসে...।
মাটির সঙ্গে বাংলার কৃষকের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কৃষক গ্রহীতা আর মাটি দাতা কেবল নয়, মাটি ও কৃষকের আলাপনে প্রেমিক ও প্রেমিকার বন্ধন তৈরি হয় যেন। তাই তো কৃষক মাঠে চাষ করে চলে গেলেও থেকে যায় আড়ালের গল্প। এই গল্পগাথা হেমন্তের নদী হয়ে ক্ষুধিতের মতো দীর্ঘশ্বাস তোলে। এই দীর্ঘশ্বাসে মাঝে মাঝে অনুরণিত হয় কার্তিকের মঙ্গার বেদনার গীত। তখন ক্ষেতজুড়ে হাতছানি দেয় সমৃদ্ধির আগামী। আজকের দুঃখের অশ্রু আগামীর সুখের হাসিতে পরিণত হবে বলেই কবি ‘অবসরের গান’ শুনতে পেয়ে লিখেন-
শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে
অলস ধোঁয়ার মতো এইখানে কার্তিকের দেশে।
হেমন্তে ধান ওঠে ফলে
দুই পা ছড়ায়ে বস এইখানে পৃথিবীর কোলে।
হেমন্তে নির্মিত হয় কবির জীবনের বোধ। এই জীবনবোধের শক্তিতেই হেমন্তের নতুন ফসলের আগমনী হাওয়া পৃথিবীজুড়ে দোলা দিয়ে বাসি হিসেবের জীর্ণ খাতা নিয়ে যায় উড়িয়ে দূর পাহাড়ের পার। কবির প্রণয়ে হেমন্ত আনে হিমের পরশ। বনের পাতা কুয়াশায় হলুদ হওয়ার আগেই কবি চেতনার অন্তরতর বৃন্ত হতে ঝরে পড়েন বিগত প্রথম প্রণয়ীকে কার্তিকের ভোরবেলা দূরে যেতে দেখে। শরত পেরিয়ে হেমন্তের সোনালি বিভায় কবির বেড়ে যায় নান্দনিকতার পিপাসা। নিজের দেহখানি তার কাছে হয়ে উঠে অলস মেয়ের প্রতীক যে হেমন্ত ঋতুর পুরুষালি সোহাগে হয়ে উঠে অবশ। হাল্কা হিমের রোমান্সে দেহ চায় লেপের ওম। বিকেলের রোদ শুষে দেহ নেয় সন্ধ্যার প্রণয়। অঘ্রাণের মাঝরাত রক্তহীন সাদা কঙ্কালের হাতে অলস দেহকে ধরে। দেহখানি গলে যায় সকালের অরুণের তাপে।
‘রূপসী বাংলা’র জীবনানন্দ হেমন্তকে এঁকে নেয় ইতিহাসে, লোকাচারে। কবির কল্পনায় আজও শশাঙ্কের গৌড়ীয় বাংলায় কার্তিকের অপরাহ্নে হিজলের পাতার মতো সাদা উঠোনে হেমন্তের রাজ্য উঠে ফুটে। সেই স্মৃতিভারাতুর হয়ে কবি আবারও জন্মাতে চান এই নবান্নের বাংলাদেশে, যেখানে কার্তিকের মাঠে ছড়ানো সোনার ধান কাক হয়ে খুঁটে খাবেন তিনি, গায়ে লেগে রবে সোঁদা মাটির সিক্ত ঘ্রাণ।
চিনিচাঁপা গাছে চড়ে বসা রাঙারোদ, ধানঝরা অঘ্রাণ আর হলুদ সর্ষে ফুলের আমোদে ভরে কবি হেমন্তকে উপভোগ করেন একান্ত নিজের করে। কার্তিকের সন্ধ্যায় পরলোকগত জ্ঞাতির স্মরণে আকাশ প্রদীপ জ্বেলে কবিও জেগে ছিলেন হেমন্তে মাঠ থেকে ভেসে আসা গাজনের গানের উচ্ছ্বাসে। অসংখ্য কাকের কাতর স্বরে কবির বুকে বাজে নিকটজনের বিয়োগ ব্যথা, যাকে মনে মনে খুঁজে কবি থেকে যান সমাধানহীন। হেমন্তের আদরে ঝরা বটের শুকনো পাতায় কবি পেয়ে যান যুগান্তের গল্প, যে গল্পে হরষিত কৃষাণের হাসি বিস্তৃত হয়ে উঠে চাঁদের ঘোলাটে আলোয়।
ক্ষান্ত কার্তিকের মাঠে রাঙারোদের প্রেমে পড়া কবি আশঙ্কায় আকুল থাকেন। তার মনে জাগে সংশয়, হয়ত বা হেমন্তের পাকা ধানের হাসিটুকু বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে তার জীবনের সারাদিন হতে।
হেমন্তে বিমুগ্ধ কবি ‘বনলতা সেন’ এ এসে নাটোরের নীড়াক্ষি, কৃষ্ণকুন্তলবতী বনলতার প্রেমে পড়েন। কিন্তু তবুও ‘কুড়ি বছর পরে’ কবিতায় কার্তিক মাসের ধানের ছড়ার পাশে তার সঙ্গে দেখা হওয়ার বাসনা ব্যক্ত করেন। জোনাকির দেহ হতে ঠিকরানো আলোয় সন্ধ্যার নদীর জলে বনলতাই যেন হয়ে যায় শঙ্খমালা, যাকে অঘ্রাণের অন্ধকারে ডানা মেলে চলা ধূসর পেঁচার মতো দক্ষতায় কবি খুঁজে ফেরেন সেই রকম সন্তর্পণে, শব্দের উৎস খুঁজে খুঁজে। প্রকৃতিতে হেমন্তের সন্ধ্যা বাঙ্ময় হয়ে উঠে জাফরান রঙের নরোম সূর্যে, চিলের সোনালি ডানা রূপান্তিত হয় খয়েরি বর্ণে, ঘুঘু আর শালিকের ঝরে যায় পালক। এতসব পরিবর্তনের মাধ্যমে আসা হেমন্ত কিন্তু এতকিছুর আগে চলে আসে প্রেমিক কবি ও তার দয়িতার মনে।
‘মহাপৃথিবী’র কবি জীবনানন্দ দাশ বেদনাহত অনুভূতিতে সফলতা স্পর্শ করার আগে অল্পায়ু হেমন্তের দিনের অন্তিমতায় আক্ষেপ করেন। তিনি এই কাব্যগ্রন্থের সিন্ধুসারস, লাশকাটা ঘরে, মনোবীজ, প্রেম-অপ্রেমের কবিতাতে হেমন্তকে টেনে নেন নিরাশার দোলাচলে দুলে। হেমন্তের বিকেলের গায়ে সুপক্ব যবের ঘ্রাণ পেয়েও জীবনের এই স্বাদ তিনি উপভোগ করতে পারেন না কেবল তার সঙ্গিনীর অসহ্যবোধের কারণে। ‘সাতটি তারার তিমির’ কাব্যগ্রন্থে হেমন্ত মূর্ত হয় হরিতকী গাছের পেছনে বিকেলের গোল-রাঙা সূর্যে, তারাহীন রাতের আকাশের কোরাসে।
আরও মূর্ত হয় একটানা সমুদ্রে ভেসে চলা নাবিকের বিগত স্মৃতিতে। সময়ের কাছে হেমন্তের স্পন্দন বুকে ধরে কবিও দাবি করেন মনুষ্যত্বের। হেমন্তের ভোরে আদিনারীশরীরিণীকে কবি জনান্তিকে খুঁজে নেন স্মৃতি হাতড়ে। ‘বেলা-অবেলা কালবেলার জীবনানন্দ ঋতুর কামচক্রে হেমন্তরাতকে ক্রমশ ক্লান্ত, অধোগামী ভেবে নেন। নিজেকে সামান্য মানুষ হিসেবে মনে করে কবি জানিয়ে যান, এমন অদ্রষ্টব্য হেমন্ত গোলাকার পৃথিবীতে ঢের গেছে কেটে এবং এই হেমন্তরাই তার হৃদয়কে অবরুদ্ধ করে রেখেছে স্তব্ধতায়। ‘হেমন্তরাতে’র কবিতায় হেমন্তকে কবি কল্পনা করেন হেমন্তলক্ষ্মীরূপে, যেন সে আসে গোলা ভরে দিতে। বিস্ময়মাখা ইতিহাসযানে চড়ে হেমন্তের রৌদ্র-দিনে অতীত হওয়া পুরুষ ও জ্ঞাতিরা পায় তর্পণ। ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র জীবনানন্দে অঘ্রাণের বিকেল হয়ে যায় কমলা আলোক যেন পাখির মতো। ঊনিশ শ’ ছেচল্লিশ-সাতচল্লিশ সালে ধর্মীয় দাঙ্গা লেগে অনেক হিন্দু দেশ হতে ঝরে যায় হেমন্তের অবিরল পাতা ঝরার মতো। অগ্রন্থিত কবিতার জীবনানন্দ সরাসরি বলে ফেলেন, তিনি অঘ্রাণকেই ভালবাসেন।
অর্থাৎ হেমন্ত তার। এই হেমন্তই একদিন বেদনায় তাকে ডুবিয়ে রেখেছিল গভীর রাত।
মিথের কবি জীবনানন্দ তার কবিতায় পেঁচা, রোদের নরম রোম, হেমন্তলক্ষ্মী, হিমের শিশির, অঘ্রাণের পৃথিবী, হেমন্তের কুয়াশা প্রভৃতি শব্দকে মিথের আদল দিয়েছেন। চমৎকার উপমায় তিনি হেমন্তের দিনকে অল্পপ্রাণ বলে অভিহিত করেছেন। যেমনটি বলেছেন, জাফরান রঙের সূর্য, ধূসর পেঁচার মতো ডানা ইত্যাদি উপমাগুলোতে। হেমন্ত কবির কাছে ঋতু নয়, মহাকাল হতে পাওয়া চিত্রপট যেন। যে হেমন্ত কবিকে করেছে বিমোহিত, সে হেমন্তই কবিকে নিয়েছে কেড়ে পৃথিবীর জীর্ণ বুক হতে। তিনি কবিতায় চেয়েছেন, হেমন্তে ঝরে যেতে এই পৃথিবী হতে। বাস্তবিকভাবে তিনি হেমন্তেই ঝরে গেছেন ট্রামের চাকার ঘায়ে। হয়ত ভবিষ্যতদ্রষ্টা কবি অবচেতনে দেখতে পেয়ে পরিণতি, বলে গিয়েছেন অবলীলায়Ñ
যদি আমি ঝরে যাই একদিন কার্তিকের নীল কুয়াশায়
যখন ঝরিছে ধান বাংলার ক্ষেতে ক্ষেতে ন চোখ বুঁজে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT