সাহিত্য

মোস্তফা নূরুজ্জামানের কাব্যকথা

নাঈমা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-১০-২০১৮ ইং ০০:৫০:৩২ | সংবাদটি ৭৭ বার পঠিত

দিনটি ১০ অক্টোবর ২০১৭ খ্রি. মঙ্গলবার। কবি মোস্তফা নূরুজ্জামানের সাথে এই প্রথম দেখা। তখন আমি একজন ব্রেইন স্ট্রোকের রোগিকে দেখছি। তিনি যে কবিতা লেখেন, তা আমার অজানা। তার মাস খানেক পর নভেম্বরের ১০ তারিখ তিনি মারা যান। মারা যাওয়ার দু’দিন পর হঠাৎ গল্পকার সেলিম আউয়াল মোবাইল ফোনে বললেন, নাঈমা তুমি কি মোস্তফা নূরুজ্জামান ভাইকে চেনো? ওই ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানায় চাকরি করতেন? বললাম, হ্যাঁ আমাদের এখানে একজন মারা গেছেন। তাঁর নাম মোস্তফা নূরুজ্জামান (মিনার)। বললেন, তিনিই কবি মোস্তফা নূরুজ্জামান। খুব ভালো মানুষ ছিলেন। আমাকে একদিন হরিণের মাংস খাইয়েছিলেন। যখনই দেখা হত, নাতি ভাই বলে ডাকতেন। ফেসবুকে দেখেছি, খবরটা সঠিক কিনা জানার জন্য তোমাকে কল দিয়েছি। একটা শোকসভা করা দরকার। যদি পারো কবি নূরুজ্জামান ভাইর প্রকাশিত বই সংগ্রহ করে তাঁর সম্পর্কে একটা লেখা তৈরি কর।
অতঃপর কবি মোস্তফা নূরুজ্জামানের বাড়ি থেকে তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ আবার তোরা মানুষ হ এবং ¯েœহপ্রীতি ভালোবাসার ডালি এই দু’টো বই সংগ্রহ করি। জালাল উদ্দিন রুমী বলেছিলেন, মানুষের দেহ নশ্বর কিন্তু তাঁর আত্মা অবিনশ্বর। এ নশ্বর দেহ ধ্বংস প্রাপ্ত হয় বটে, কিন্তু তাঁর ভেতর যে অবিনশ্বর আত্মা রয়েছে তা চিরকাল বেঁচে থাকে। মোস্তফা নূরুজ্জামান নশ্বর দেহ নিয়ে হয়ত পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিয়েছেন কিন্তু তাঁর অবিনশ্বর আত্মা বেঁচে আছে তাঁর প্রতিটি কবিতায়।
মোস্তফা নূরুজ্জামানের সমগ্র জীবনের ভাঙাচোরা অস্তিত্বটুকু তাঁর প্রতিটি কবিতায় খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁর কবিতায় আছে দৈনন্দিন জীবনের আকাক্সক্ষা, আছে ভালোবাসার অতল উৎসার স্বপ্নের গভীর থেকে উদ্গত কোন ক্লান্ত শ্বাসের সমগ্র জীবনের বেদনা বোধের চিহ্ন, সরল উচ্চারণে কবিতায় ধরে রেখেছেন। কবির প্রতিটি কবিতায় ফুটে উঠেছে হৃদয় ছেড়া আর্তনাদ। যে কোন পাঠকের রুদ্ধ দুয়ার খুলে দিতে পারে।
দৃঢ় সরল উচ্চারণের কবি মোস্তফা নূরুজ্জামানের কবিতার কিছু অংশ নিচে উদ্ধৃতি করছি:
‘ট্র্যাজেডির নায়কের মত রাত জেগে / শুধু ভাবি / হয়তোবা শেষ নেই এ ভাবনার / শেষ নেই এ কান্নার /
(অব্যক্ত বেদনা মুহূর্তে পৃ. ২২)
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন বেদনাবিদ্ধ হৃদয়ই কবিতার জন্মভূমি, সত্যি প্রেমের ফাঁদ পাতা ভবনে ট্র্যাজেডির এই নায়ক মনের ছায়া সরল দর্শনে হাস্যরত অবস্থায় আড়াল করে রাখতেন, এমন কিছু অব্যক্ত বেদনা কবিতায় প্রকাশ করে গেছেন যে কোন পাঠককে ওই কথাগুলো আহত করবে। একটা মানুষের সমস্ত জীবন জুড়ে যে দুঃখ থাকবে তা কিন্তু নয়। জীবনকে টুকরো টুকরো করে ভাগ করলে দেখা যাবে এই দুঃখের মধ্যে-ই কোথাও না কোথাও প্রেমের আনন্দ লুকিয়ে আছে। এই যন্ত্রণাদায়ক প্রেমের হাত থেকে তরুণ, বৃদ্ধ, প্রৌঢ় কারোর-ই নিস্তার নেই। তাইত কবি মোস্তফা নূরুজ্জামান কোন এক অত্যাধুনিকাকে নিয়ে লিখেছেন।
‘নিজেকে ক্লিওপেট্রা ভাবো? / অথবা মিস এশিয়া জিনাত আমান। / হাসি পেলেও দক্ষ অভিনেতা পাহাড়ি / স্যানালের মতো / বলেছিলে তুমি অদ্বিতীয়া রূপে আর গুণে / কারণ তুমি আমার অনুসন্ধিৎসা বাড়িয়ে দিয়েছ’।
(উপসংহার ভবিষ্যৎ তোমার উজ্জ্বল হে) পৃ. ২৩
সরল দর্শনের কবি মোস্তফা নূরুজ্জামানের ভালোবাসার যে বহিঃপ্রকাশ যে কোন পাঠককে আন্দোলিত করবে। শেলী বলেছিলেন, পৃথিবীতে যা কিছু সুন্দর যা কিছু মহৎ কবিতা তাঁকে চিরঞ্জীব করে রাখে। সত্যি নিজ দেশের প্রতি কতটা ভালোবাসা থাকলে এমন হৃদয় ছেড়া আর্তনাদ কবিতায় ফোটে ওঠতে পারে। স্বদেশের প্রতি মমত্ববোধ কবি’র গভীর ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে স্বাধীনতা মানে-ই কী এই কবিতায়।
কিন্তু এমন তো কথা ছিল না, ছিল না কোন দর্শন, / ছিল না কোন অভিধান অথবা হৃদয় মানসে / তাইতো আবার রুখে দাঁড়াতে হবে হে / মুক্তিযোদ্ধারা / শেষ করতে হবে সব অনাচার সব জঞ্জাল,/ সব শ্রেণির নৈতিকতার অবক্ষয় / শহীদদের আর্তনাদ তখন-ই সমাপ্ত হবে। / স্বাধীনতার ম্লান সূর্য প্রখর ছড়াবে
(স্বাধীনতা মানে-ই কী........? পৃ. ১৬)
কবিতা হাতড়াতে গিয়ে খুঁজে পেলাম একজন বিশাল হৃদয়ের মানুষকে, সংসার, সমাজ, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের প্রতি এতো ভালোবাসা থাকার পরও সব সময় নিজেকে তুচ্ছ করে দেখেছেন। তাই তো নিজের প্রতি অনিহা বিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছে এই কবিতায়:-
তবুও চলতে হয় তাই চলছি / উৎসাহ উদ্দীপনাহীন ভাবলেশহীন / মুখ থুবড়ে পড়ে আছি ডাস্টবিনে / যেন এক জিন্দালাশ।
(‘কিবা ছিনু কিবা হনু’ পৃ. ১৪)
তবে, মা জাতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ, কবি’র এক একুশোর্ধ্ব মাকে নিয়ে লিখা কবিতা আমার হৃদয়কে তোলপাড় করে পোড়া চোখে জল এনে দিয়েছে কারণ, আমিও একজন মা!
কিন্তু একি চেহারা তোমার? কেন এ জীর্ণদশা? / কেন এ ভরা যৌবনে প্যারালাইসিস রোগীর মত / হাঁটি হাঁটি পা পা করছো? / অথচ এখন তোমার ম্যারাথন রেসে অংশ / নেয়ার বয়স। / তোমার শরীরে রক্ত নেই কেন? / তুমি কি আফ্রিকার সেই রক্ত চোষা বাদুড়ের / পাল্লায় পড়েছো? / তোমার শরীরে মাংসের লেশমাত্র নেই কেন?
তুমি বাতাবিলেবু খেকো কোন কাঠবিড়ালীর / পাল্লায় পড়েছো?
(এক একুশোর্ধ্ব মাকে পৃ. ১৮)
দেশের প্রতি দেশের মানুষের প্রতি প্রেম পূণ্যে উদ্ভাসিত কবি মোস্তফা নূরুজ্জামান সত্যের নিবিড় সাধনায় তাঁর চরিত্র মধুময় হয়ে ফুটে উঠেছে ‘আবার তোরা মানুষ হ’ এই কবিতায়। কবিতার কিছু অংশ নিচে উদ্ধৃতি করছি :
টিভির স্ক্রিনে আর সংবাদপত্রের পাতায়/ এসব পড়ে দেখে শুনে/ ঘরে বসে হায় হুতাশ আর আফসোস না করে/ একবার পুনরুত্থানের শিংগায় ফুক দাও ওহে বিবেকবানরা/ ওদের ¯œায়ুতে ইলেকট্রিক শক্ দিয়ে বলো/ এসব বাঁদড়ামি দেখে
(‘আবার তোরা মানুষ হ’ পৃ. ৩০)
কথার উপান্তে এসে বলতে পারি, কবি মোস্তফা নূরুজ্জামান একজন নিভৃতচারী আড়াল প্রিয় মানুষ। কোমল হৃদয়ের এই মানুষটির প্রেম ছিল লুকানো। মানুষকে ভালোবাসতেন হৃদয়ের গভীর থেকে। সকল শ্রেণি পেশার মানুষকে সহজে আপন করে নিতেন।
বিষাদে ভরা জীবনটাকে দক্ষ অভিনেতার মত হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখতেন। যার ভেতর এতো গুণ এতো প্রতিভা। তিনি চাইলে কলমের কস কস শব্দে সমাজকে আর ভালো কিছু বই উপহার দিতে পারতেন। তবে একটা কথা আছে হাজার কবিতার ভীড়ে একটা কবিতা লিখ যে কবিতায় তুমি হবে পাঠকের প্রিয় কবি। ফুল যখন ফুটে গুনে গুনে ফুটে না। আর সব ফুলে রচেনি পূজার অর্ঘ্য। কবি মোস্তফা নূরুজ্জামান যে ক’টা কবিতা লিখে গেছেন ওই কবিতাগুলো যে কোন পাঠকের অন্তরে ঢেলে দেবে প্রশান্তি এবং লুকানো বিষাদ হৃদয়কে গভীর স্বস্তিতে ভরে তুলবে।
কবি মোস্তফা নূরুজ্জামান কাব্য জগতে হয়ত নিজের নাম কুড়াতে চাননি তাইতো তাঁর এই নিরব প্রস্থান।
নশ্বর দেহ নিয়ে পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিয়েছো তবে অবিনশ্বর আত্মা বেঁচে থাকবে তোমার প্রতিটি কবিতায়।
জীবনপঞ্জি: মোস্তফা নূরুজ্জামান (মিনার), জন্ম : ৩১ ডিসেম্বর ১৯৪৮ খ্রি., পৈত্রিক বাসভূমি : নূরপুর, ফেঞ্চুগঞ্জ, সিলেট, পিতা : মরহুম আখতারুজ্জামান, (তৎকালীন সরকারি কর্মকর্তা স্বনামধন্য স্যানিটারী ইন্সপেক্টর), মাতা : মরহুমা একলিমুন্নেছা খানম, সহধর্মিনী : মরহুমা বেগম লুৎফা জামান, কর্ম : (১৯৬৯-৭১) ফেঞ্চুগঞ্জ ফরিজা খাতুন গার্লস হাইস্কুলে সহপ্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। তারপর ১৯৭২-৭৩ সালে বি.এ.ডি.সি’র আঞ্চলিক হিসাব রক্ষকের দায়িত্ব পালনার্থে সুনামগঞ্জ অবস্থান করেন। পরবর্তীতে (১৯৮১-১৯৯৯) চাকুরীর সুবাদে পাহাড়ি চট্টলার সলিল কন্যা কর্ণফুলীর তীরে চন্দ্রঘোনায় উনিশ বছর কাটানোর পর ১৯৯৯ সালে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসেন ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানায়। ভাইবোন : ৭ ভাই তিন বোনের মধ্যে কবি মোস্তফা নূরুজ্জামান ছিলেন সবার বড়। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : ২টি (১) আবার তোরা মানুষ হ এবং (২) ¯েœহপ্রীতি ভালোবাসার ডালি। মৃত্যু: ১০ নভেম্বর ২০১৭

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT