ইতিহাস ও ঐতিহ্য

শ্রীরামসি গণহত্যা

রফিকুর রহমান লজু প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-১০-২০১৮ ইং ০১:০৯:২৬ | সংবাদটি ৬৪ বার পঠিত

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সারা দেশই বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিলো। শহরে-নগরে-গ্রামে পাড়া গাঁয়ে জল্লাদ জালিমদের তান্ডবে অসংখ্য বধ্যভূমির সৃষ্টি হয়েছে। কোনোটার ইতিহাস অন্তরালে রয়ে গেছে, কোনোটা সংরক্ষিত হয়েছে। স্মৃতিসৌধও হয়েছে, শহিদ মিনারও হয়েছে। এরকম একটি বধ্যভূমি শ্রীরামসি গ্রাম। শ্রীরামসি সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর থানার একটি শিক্ষিত গ্রাম। গ্রামে হাইস্কুল আছে, পোস্ট অফিস আছে, তহশিল অফিস আছে, প্রাইমারি স্কুল আছে।
শ্রীরামসি পল্লী গ্রাম হলেও অজপাড়াগাঁ নয়। রাস্তার দু’ধারে পাকা দালান বাড়ি উঁচু দেয়াল, প্রায় প্রতিটি বাড়িতে সুন্দর সুন্দর গেইট। এসব দেখে মনে হয় না এটা গ্রাম-বাংলার কোনো নিভৃত পল্লী। আসলে এটা পল্লী গ্রাম। অধিকাংশ মানুষ কৃষি কাজে নিয়োজিত।
বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলনে শ্রীরামসির জনগণ উচ্চকিত হয়েছিলো। একাত্তুরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দিলে এ গ্রামের মানুষও সংগ্রামে রাস্তায় নেমেছিলো। যার যার সামর্থ মতো ও দেশ প্রেমের টানে যার যার মতো করে মুক্তিযুদ্ধে শরিক হয়েছিলো। এই গ্রামেও পঁচিশে মার্চের কালরাতের মতো বিপর্যয় নেমে এসেছিলো। ১৯৭১ সালের ৩১ আগস্ট শ্রীরামসি গ্রামে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছিলো। দিনটি ছিলো মঙ্গলবার।
শ্রীরামসির রাজাকার ও স্বাধীনতা বিরোধীরা পাকবাহিনীর জল্লাদদের শ্রীরামসি গ্রামে এনেছিলো। তাদের চক্রান্ত ও পরিকল্পনা অনুযায়ী দু’ডজন হানাদার সেনা জগন্নাথপুরে আসে। স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় কয়েকটি নৌকা যোগে ৩১ আগস্ট সেনারা জগন্নাথপুর থেকে শ্রীরামসি আসে। নৌকাগুলো বাজারের তিন দিকে আটকিয়ে রেখে তারা বাজারে ওঠে এবং রাজাকারদের দিয়ে শান্তি কমিটির সভায় আসার আহবান জানায়। জনগণ ভাবে গ্রামে শান্তির জন্য, তাদের নিরাপত্তার জন্য এই সভা। তাই তারা বাজারে গিয়ে সমবেত হয়। তাদের ডেকে নেবার এটা যে একটা ষড়যন্ত্র তা তারা টের পায়নি। টের পেলে তারা পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করতো। বাজারের পাশেই স্থানীয় হাইস্কুল অবস্থিত। তারা সবাইকে স্কুল ঘরের ভিতরে জড়ো করে। পরে শিক্ষিতদের আলাদ করে অন্য একটি ক্লাস রুমে জড়ো করে। এরপর একে একে প্রত্যেকে হাত পিছন দিকে নিয়ে রশি দিয়ে বাঁধতে শুরু করে। তখন বেঈমানদের চক্রান্ত বুঝতে পারলেও কিছু করার ছিলো না। অপর দিকে সাধারণ মানুষজনদের স্কুল ঘর থেকে বের করে বাজারে চিপা গলি পথে লাইনে দাঁড় করায়। তখনই আদেশ হয় ‘ফায়ার’। সঙ্গে সঙ্গে ব্রাশ ফায়ারে তাজা প্রাণগুলো মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এ যেনো দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের নাৎসিদের কান্ড।
অতঃপর খুনি পশুরা হাত বাধা জুটিবাধা স্কুল শিক্ষক, ডাক্তার তহশীলদারদের একটি বাড়ির পুকুর পাড়ে নিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে। অপর দিকে বাজারসহ সমস্ত গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রাণ ভয়ে মা-বোনেরা শিশু সন্তানদের নিয়ে পালিয়ে যায় গ্রাম ছেড়ে। ভয়ে আতঙ্কেঁ কেউ এ কদিন লাশ পড়ে থাকা এদিক মাড়ায় নি। এতো মানুষের মৃতদেহ পেয়ে শিয়াল কুকুরেরা উল্লাসে মেতেছিলো। কাক-শকুনেরা মানবদেহ থেকে মাংস খুলে নিয়ে মজা করে খেয়েছে। শহিদ পরিবারগুলোর এবং শ্রীরামসিবাসীর একটি দাবি শ্রীরামসি অঞ্চলের নাম ‘শহিদ নগর’ রাখা হোক।
সে দিন শ্রীরামসি গ্রামের ৩৭ জন বাঙালি পাক জল্লাদ বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের বুলেট ও ব্রাশ ফায়ারে প্রাণ হারান। তারা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে দেখে চোখ মুজেছেন। বধ্যভূমির স্মৃতি বেদীতে তাদের নাম উৎকীর্ণ হয়ে আছে। তারা হলেন ১) ছাদ উদ্দিন আহমদ, ২) মাওলানা আব্দুল হাই, ৩) নজির মিয়া, ৪) মজিদ উল্লা, ৫) আলা মিয়া, ৬) শুনু মিয়া, ৭) সামছু মিয়া, ৮) ওয়াসির আলী, ৯) ছোয়াব আলী, ১০) আব্দুল লতিফ, ১১) রইছ উল্লা, ১২) আব্দুল জলিল, ১৩) মানিক মিয়া, ১৪) ছবির মিয়া, ১৫) মরম আলী, ১৬) এখলাছুর রহমান, ১৭) রূপ মিয়া, ১৮) মন্তাজ আলী, ১৯) ছমির আলী, ২০) রুস্তুম আলী, ২১) আব্দুল বারী, ২২) আছাব আলী, ২৩) তৈয়ব আলী, ২৪) রোয়াব আলী, ২৫) মছদ্দর আলী, ২৬) সত্য চক্রবর্তী, ২৭) তফাজ্জুল আলী, ২৮) মোঃ ইয়াহিয়া, ২৯) পোস্ট মাস্টার, ৩০) ডাক পিয়ন, ৩১) প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক, ৩২) মোক্তার মিয়া, ৩৩) ডাঃ আব্দুল মন্নান, ৩৪) দোকান সহকারী, ৩৫), আব্দুল হান্নান, ৩৬), ফিরোজ মিয়া, ৩৭) জহর আলী।
এখানে শুধু স্থানীয়দের নাম দেয়া হয়েছে। বহিরাগতদের নাম যোগাড় করা সম্ভব হয়নি। সে দিন গুলি খেয়ে যারা আহত বা পঙ্গুঁ হয়েছিলেন তারা হলেন ১) ছফিল উদ্দিন, ২) জোয়াহির আলী, ৩) সুন্দর আলী, ৪) আমজদ আলী, ৫) আলকাছ মিয়া, ৬) তপন চক্রবর্তী, ৭) হোসিয়ার আলী। (সূত্র : দৈনিক আজকের সিলেট, ২৪ মার্চ ১৯৯৩, দৈনিক আজকের সিলেট ৩১ আগস্ট ১৯৯৩)
আমি বধ্যভূমি শ্রীরামসি সফর করেছি। সম্ভবত তখন ১৯৯৭ সাল। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ব বিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর হাবিবুর রহমান স্যারের সঙ্গে শ্রীরামসি গিয়েছিলাম। আমরা ঘুরে ঘুরে বধ্যভূমি ও আশপাশ, হাইস্কুল, বাজারের পার্শ্ববর্তী বাড়ির পুকুরপাড় যেখানে এলাকার বুদ্ধিজীবীদের ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করা হয়, স্মৃতিবেদী প্রভৃতি দেখেছি। স্মৃতি বেদীর সামনে দাঁড়িয়ে স্যার বিষন্নতায় কি রকম বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন।
শ্রীরামসি এলাকা ও পার্শ্ববর্তী গ্রাম সমূহের মানুষের জন্য শ্রীরামসি একটি পবিত্র স্থান ও শপথ নেবার কেন্দ্র হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। ৩১ আগস্ট এলে, বিজয় দিবস স্বাধীনতা দিবস এলে ঢল নামে মানুষের স্মৃতি বেদীতে। তারা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন তাদের প্রিয়জনদের, স্বজনদের।
ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসে। সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ে। সূর্য অস্ত যাচ্ছে, আমরা সূর্যের অস্ত যাওয়া দেখে দেখে সিলেটের পথে রওয়ানা দিই।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • খেলাফত বিল্ডিং : ইতিহাসের জ্যোতির্ময় অধ্যায়
  • এক ডিমের মসজিদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের কিছু ঘটনা
  • খাদিমনগরে বুনো পরিবেশে একটি দিন
  • ফিরে দেখা ৭ নভেম্বর
  • শ্রীরামসি গণহত্যা
  • প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের ধারক মৃৎশিল্প
  • বিপ্লবী লীলা নাগ ও সিলেটের কয়েকজন সম্পাদিকা
  • গ্রামের নাম আনোয়ারপুর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • জাতীয় স্মৃতিসৌধ
  • বাংলাদেশের লোকশিল্প
  • উৎলারপাড়ের পোড়া পাহাড় আর বুদ বুদ কূপ
  • চেলা নদী ও খাসিয়ামারা মোহনা
  • Developed by: Sparkle IT