পাঁচ মিশালী

কেমুসাসের হাজারতম আসর উদযাপন

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-১১-২০১৮ ইং ০০:১৪:২৬ | সংবাদটি ৫৪ বার পঠিত

ভোরের আযান শুনে উঠলাম। মনে পড়লো আজ বিশ অক্টোবর। কাক্সিক্ষত দিন উপস্থিত। ক্ষণ এখনও বাকি। আজ দেখা হবে কবির সাথে। নিশ্চয়ই তিনি আসবেন। এতদিন যাকে টিভির পর্দায় দেখেছি। রসালো অথচ জ্ঞানগর্ভ সাহিত্যালাপ শুনেছি। তাঁকে অতি কাছে থেকে দেখবো। সম্ভব হলে আলিঙ্গন করবো। শিহরণ সকাল থেকেই শুরু।
ভোর পাঁচটা ত্রিশ। চট করে ওয়াশ রুমে ঢুকলাম। এতক্ষণ কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলাম স্মরণ করতেই নিজের কাছে লজ্জা পেলাম। অজু করে ফযরের নামায পড়লাম ঘরেই। মসজিদে যাওয়ার সময়টা খুইয়ে ফেলেছি। কুরআন তেলাওয়াত করে যথারীতি মর্ণিং ওয়াকে বের হলাম।
ইতিপূর্বে যার কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ (কেমুসাস) এর ১০০০ তম সাহিত্য আসর উদযাপন অনুষ্ঠানের চিঠি পেয়েছিলেন এমন কয়েকজনকে মর্ণিং ওয়াকে পেয়ে গেলাম। প্রসঙ্গ টেনে দাওয়াত পাকাপোক্ত করলাম। তবে এদের কথার ধরন আমাকে খুব একটা আশান্বিত করল না। ওরা বলল দেখি...। এই দেখিটা কিন্তু ইদানিং বেশ ছড়িয়েছে। কোন প্রস্তাব করার পর যখনই কেউ বলবে দেখি...। তখনই বুঝতে হবে বিষয়টি নেগেটিভ।
যাই হোক, আজ কবি আসাদ চৌধুরীই আমার কাছে বিশেষ আকর্ষণ। বেলা সাড়ে তিনটায় প্রোগ্রাম শুরু। লেখক র‌্যালি হবে। কবিরা রাস্তায় নামবে আজ। জাতির বিবেক বলে খ্যাত লেখিয়ে শিল্পীরা ১০০০ তম সাহিত্য আসর উদযাপনের সাক্ষী হবেন। আমি এটি মিস করতে একেবারেই রাজী নই। বেলা আড়াইটায় কেমুসাসের উদ্দেশ্যে বের হলাম। এক ঘন্টায়- ঠিক ঠাক মতই পৌঁছার কথা। কিন্তু বাঁধ সাধলো ট্রাফিক জ্যাম। ঠিলাগড়, মিরাবাজার পয়েন্টের জ্যাম অতিক্রম করতেই ৪৫ মিনিট খতম। হাতে আর মাত্র পনের মিনিট। বন্দর বাজার পৌঁছে তড়িঘড়ি সি.এন.জি ধরলাম। দরগা গেইট যাবো। কিন্তু আবারও সেই জ্যাম ঐতিহাসিক জিন্দাবাজার পয়েন্টে। সি.এন.জি ড্রাইভার যতই কায়দা করে সামনে এগুতে চাইলো- ততোই রিকশা-ভ্যান, ঠেলা, সাইকেল, হোন্ডা ওর পথ রোধ করে। এদিকে সময় বয়ে যাচ্ছে। যোগ দিতে হবে কবিদের র‌্যালিতে। সে এক অন্যরকম অনুভূতি। এক মিনিট যেনো এক ঘন্টা হয়ে দাঁড়ালো। জ্যামতো সরে না। একবার মনে হলো নেমে হাঁটা দেই, দরগা গেইটের কতই বা দূরত্ব? পরক্ষণে ভাবলাম যদি জ্যাম ছুটে যায়- অযথা দশ টাকা যাবে। তাই মনকে প্রবোধ দিলাম এই ভেবে যে, হাঁটতে হাঁটতে যে সময় লাগবে... সেটা না হয় জামেই গেল।
ভাবনায় কতক্ষণ ডুবেছিলাম খেয়াল নেই। হঠাৎ ভোঁ- করে ছুটে চললো সিএনজি। কোত্থেকে ফুরফুরে বাতাস এসে লাগলো গায়। মনেও এলো একটু স্বস্তি। চৌহাট্টা ততোক্ষণে পেরিয়ে গেলাম। ঐতো কেমুসাস। চোখে পড়তেই ড্রাইভারকে হাতের ছুয়ায় থামালাম। ভাড়া মিটিয়ে কেমুসাস প্রাঙ্গণে পদার্পণ করলাম।
প্রাণের মানুষেরা দাঁড়িয়ে সেখানে। দেওয়ান মাহমুদ রাজা চৌধুরী, আব্দুল মুকিত অপি, মুহিত চৌধুরী, বাছিত ইবনে হাবীব, মামুন সুলতান, নাজমুল আনসারী, কামরুল আলম, জাহেদ চৌধুরী, এখলাছুর রহমান, নীলিমা আক্তার, শাহাদাত চৌধুরী, তুরাব আল হাবীব, মিনহাজ ফয়সল, বাহা উদ্দীন বাহার, শামছুদ্দোহা ফজল সিদ্দিকী, আব্দুল কাদির জীবন, মোয়াজ বিন এনাম সহ অনেক কবি সাহিত্যিকরা প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে প্রধান অতিথির অপেক্ষা করছেন।
একে একে সবার সাথে কুশল বিনিময় হলো। ইতোমধ্যে ফোনালাপ করতে করতে দ্রুত আসলেন সেলিম আউয়াল। ফোনে আলাপ করলেও হাত মিলাতে ভুললেন না। অপি ভাই বললেন, ‘সফেদ পাঞ্জাবীতে আপনাকে সুন্দর লাগছে। আমি বললাম- আপনাকেও ভারি সুন্দর লাগছে আজ...।
এরই মধ্যে একটা সাদামাটা প্রাইভেট কার ঢুকল কেমুসাস প্রাঙ্গণে। দৃষ্টি পড়তেই দেখলাম কবি আসাদ চৌধুরী সেই কারে। মহিলা শিশুসহ বেশ ক’জন। ধীর পদক্ষেপে নামলেন কবি। অবাক বিস্ময়ে দেখলাম তাঁকে। টিভিতে দেখা কবি আর আমার সামনে দাঁড়িয়ে এই কবির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। মাহমুদ রাজা, অপি, সেলিম আউয়াল, সৈয়দ মবনু সহ বেশ ক’জন কবিকে অভ্যর্থনা জানালেন। এক ফাঁকে আসাদ চৌধুরীর সামনে গেলাম। হাত বাড়াতেই দু’হাতে আমার হাতটা নিলেন। গভীরভাবে বললেন ‘কেমন আছেন’। মুখে সেই স্বভাবসুলভ হাসি। সালাম দিতেই উত্তর দিলেন। তিনি আবারও বললেন ভালো আছেন তো? আমি বললাম- আলহামদুলিল্লাহ তাঁর চোখে মুখে যে অভিব্যক্তি আমার মনে হলো মানুষের ভালো থাকাটাই তাঁর চির চাওয়া।
ইতোমধ্যে ব্যানার আসলে কেমুসাস নেতৃবৃন্দ আসাদ চৌধুরীকে নিয়ে শুরু হলো ১০০০ তম সাহিত্য আসর উদযাপন র‌্যালি। আমি ও কুবাদ বক্ত চৌধুরী রুবেল ফ্রন্ট লাইনে থাকলাম। এটা একটা ইতিহাস- একটা গর্বের বিষয়- আমার কাছে।
র‌্যালি শেষে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। কেমুসাস প্রাঙ্গণে পতাকা দন্ডের গোঁড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন কবি আসাদ চৌধুরী সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। অনেক কবি সাহিত্যিক কবির সাথে ফটো তুলতে চাইলে গা ঘেষাঘেষি শুরু হলো। এরই মধ্যে কে জাতীয় পতাকা তুললেন। কে কেমুসাস পতাকা তুললেন খেয়াল করতে পারিনি। পতাকা উত্তোলনের সময় আমরা জোরেশোরে জাতীয় সংগীত গাইলাম। পায়রা উড়াতে গিয়ে ঘটলো বিপত্তি। একটা পায়রা উড়ে গেলেও একটা উড়লো না। মাটিতে বসে রইল। অনেকে ধরতে গিয়েও ধরতে পারলো না। অবশেষে একজন ধরে সেটা উড়িয়ে দিলে এই অধ্যায়ের এখানেই সমাপ্তি।
তবে কাকতালীয়ভাবে আমার ‘পায়রা’ শিরোনামে একটি কবিতা সেদিন স্বনামধন্য সিলেটের ডাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
অনেক পরিচিত জন আমাকে এই কবিতার জন্য ধন্যবাদ দিলেন। আমি তাদের কৃতজ্ঞতা জানাই। অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব শুরু হলো কেমুসাসের দু’তলায় সুলেমান হলে। অপরূপ সাজে সজ্জিত হলটি। ঘড়ি কাটায় কাটায় ৪.৩০। উত্তমরূপে চেয়ার, টেবিল, ফুলদানী, মাইক সবই গোছালো। মন থেকেই প্রশংসা ঝরে পড়লো আয়োজকদের উদ্দেশ্যে। এলেন চিরপরিচিত বন্ধুবৎসল কবি আব্দুল মুকিত অপি। ভরাট কন্ঠে স্পষ্ট উচচারণে প্রাণবন্ত উপস্থাপনা শুরু হলো। প্রথমেই আসন গ্রহণ পর্ব। সভাপতিত্ব করার কথা কেমুসাস সভাপতি প্রফেসর আব্দুল আজিজের। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে আসতে না পারায় সভাপতির আসন অলংকৃত করলেন আ.ন.ম. শফিক। এরপর প্রধান অতিথির নাম উচ্চারণ করা মাত্র মুহুর্মূহু করতালির মাধ্যমে প্রিয় কবি এগিয়ে এলেন মঞ্চের দিকে। হাসিমুখে সালাম জানিয়ে আসন গ্রহণ করলেন।
এরপর বিশেষ অতিথি কবি অধ্যাপক নৃপেন্দ্র লাল দাশ, এম.এ. করিম চৌধুরী, সিলেটের ডাকের নির্বাহী সম্পাদক আবদুল হামিদ মানিক, কবি রাগীব হোসেন চৌধুরী আসন গ্রহণ করেন। সিলেটে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের আগমন শীর্ষক আলোচনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের মূল পর্ব শুরু হলো। অধ্যাপক নন্দলাল শর্মা নিখিল প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন গল্পকার সেলিম আউয়াল। প্রবন্ধটির লিখিত রূপ সুধীজনের মধ্যে বিতরণ করেন- উদযাপন কমিটির স্বেচ্ছাসেবকবৃন্দ। অনুষ্ঠানে সুধীজনের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কবি কালাম আসাদ, লেঃ কর্ণেল (অবঃ) যুবায়ের, আজিজুল হক মানিক, কবি মুকুল চৌধুরী, লেঃ কর্ণেল সৈয়দ আলী আহমদ, প্রবীণ সাংবাদিক বশির উদ্দিন আহমদ প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় কবি আসাদ চৌধুরী বলেন, ‘কবি রবীন্দ্রনাথ ও কবি নজরুল যার যার অবস্থানে থেকে সাহিত্যে আলো ছড়ান। তবে তাদের একে অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ ছিল। কবি নজরুলকে শুধু বিদ্রোহী কবি না ভেবে কবিকে সার্বিকভাবে তাঁর সাহিত্য চর্চা ও মূল্যায়ন করার আহ্বান জানান। একজন নজরুলই তৎকালীন সময়ে সর্ব ভারতে যে সাড়া জাগিয়ে ছিলেন তা সামাল দিতে ব্রিটিশদের হিমসীম খেতে হয়েছিল। সকল স্বাধীনচেতা মানুষের উচিত নজরুল চর্চা করা। বর্তমান শাসকের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমাদের ভোটার হিসাবে নয়- মানুষ হিসাবে ভাবুন’।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিলেটের ডাক পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক ফায়জুর রহমান। এর শিরোনাম ছিল ‘বাংলা সাহিত্যের আঞ্চলিক দায় শোধের অনন্য পদক্ষেপ।’ প্রবন্ধটি অনুষ্ঠানে বেশ সমাদৃত হয়। এর পর কেমুসাস তরুণ সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। প্রধান অতিথির কাছ থেকে ক্রেস্ট ও সার্টিফিকেট গ্রহণ করেন- কবিতায় জান্নাতুল শুভ্রা মণি, ছড়ায়- আক্রাম সাবিত, গল্পে- জিম হামযা, গানে- মাহমুদ শিকদার। প্রাক্তন সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদকদেরও সম্মাননা ও ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। তাঁদের মধ্যে আব্দুল হাই মিনার, আজিজুল হক মানিক, আব্দুল হামিদ মানিক, সেলিম আউয়াল, নাজমুল হক আনসারী, সৈয়দ মুমিন আহমদ মবনু ও আব্দুল মুকিত অপি।
সর্বশেষ স্বরচিত কবিতা পাঠে অংশ নেন স্থানীয় কবি ও সাহিত্যিকবৃন্দ। আবৃত্তি সংগঠন মুক্তাক্ষর তাদের মনোজ্ঞ আবৃত্তি পরিবেশন করে। বিশিষ্ট আবৃত্তিকার আঞ্জুম ইভানের কন্ঠে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আবৃত্তি সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। প্রকৃত বিদ্রোহীর স্বরূপ তার কন্ঠে ভেসে উঠে। এরপর শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের নামকরা শিল্পীরা রবীন্দ্র ও নজরুল সংগীত পরিবেশন করেন। দীর্ঘ অনুষ্ঠান আব্দুল মুকিত অপি একাই উপস্থাপন করেন। কেমুসাসের সাপ্তাহিক সাহিত্য আসরের নিয়মিত উপস্থাপিকা তাসলিমা খানম বীথির অনুপস্থিতি আমাকে বিষণœ করে। এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে তিনি থাকলে অনুষ্ঠানটি আরও প্রাণবন্ত হতো। এর সাথে উপস্থাপক পেতেন তার সহায়ক শক্তি। আমরা গভীরভাবে মিস করেছি তাকে।
নিয়মিত সাহিত্য আসরের বন্ধুদের সবার নাম অত্র প্রবন্ধে সংযোজন করতে পারিনি। কারণ নাম মনে রাখতে না পারা আমার একটা বড় দুর্বলতা। যারা এই হাজারতম সাহিত্য আসর উদযাপন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এবং সার্বিক সহযোগিতা করেছেন সবার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা রইল। কেমুসাস হাজার হাজার বছর বেঁচে থাক। আমাদের প্রকৃত ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধারন করে এখান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে এগিয়ে যাই। যারা এর উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা- সবাইকে বিন¤্র শ্রদ্ধা ও সালাম জানিয়ে এখানেই ইতি টানছি...।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT