পাঁচ মিশালী

কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-১১-২০১৮ ইং ০০:১৮:০৬ | সংবাদটি ৬১ বার পঠিত

গিটার আর কন্ঠকে একাকার করে বাংলাদেশের সংগীতের ভুবনে অনেকটা ঝড় তুলেছিলেন সুরের যুবরাজ ‘আইয়ুব বাচ্চু’ আঙ্গুলের শৈল্পিক স্পর্শে রূপালি গিটারে সুরের ঝংকার তুলে একদিন তিনি কোনো এক মঞ্চে গেয়েছিলেন, ‘এই রুপালি গিটার ফেলে, একদিন চলে যাব দূরে, বহুদূরে...। আর হ্যাঁ, তাঁর কথাই সত্যি হলো শেষ পর্যন্ত। লাখো কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন গত ১৮ অক্টোবর বাংলা ব্যান্ড সংগীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র ও গিটারের জাদুকর আমাদের প্রায় সকলের প্রিয় ‘বাচ্চু ভাই’।
আমার প্রিয় শিল্পী ‘বাচ্চু ভাই কে নিয়ে কিছু না লিখলে যেন আমি শান্তি পাচ্ছিলাম না। কেননা ‘প্রায়ই চান্নি পসর রাইতে আমি আকাশের পানে তাকিয়ে তাঁর গাওয়া এই গানটি গাই- এক আকাশের তারা তুই/ একা গুনিসনে/ গুনতে দিস্ রে তুই মোরে/ ওরে সব ভালো তুই/ একা বাসিস নে/ একটু ভালোবাসতে দিস মোরে...
‘বাচ্চু ভাইয়ের’ গান বাংলাদেশ টেলিভিশনে একদিন আমি প্রথম শুনেই আমার ভাইদের বলেছিলাম, এই শিল্পী গানের ভুবনে একটা সময় ঝড় তুলবে তোমরা দেখে নিও। কারণ, তাঁর গায়কী, তাঁর ফ্যাশন, গান গাওয়ার মুহূর্তে তাঁর যে আন্তরিকতা এটা অনেক ব্যান্ড শিল্পীর মধ্যে নাই। তাঁর মধ্যে পপুলার হওয়ার জন্য একটা পরিকল্পনা আছে, প্রস্তুতি আছে। সেই পরিকল্পনা মাফিক সে এগিয়ে চলছে। অনেকে হয়তো আজ তাঁকে ‘পাগল’ বলছে। কিন্তু তাঁর গায়কীর মধ্যে একটা শক্তি সে ব্যবহার করে, যেন মন প্রাণ উজাড় করে গাইছে। অর্থাৎ বহুদূর যাবার পরিকল্পনা তাঁর আছে। যারা তাঁকে একদিন ‘পাগল’ বলেছে, ‘তাদের সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে যাবার বেলা এক খেল সে দেখাবে। সবাইকে সে কাঁদাবে। দেখো তাঁর মুখভঙ্গি, শোন তাঁর গান- ‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে, সেই আমি কেন তোমাকে দুঃখ দিলেম’। শহীদ মিনারে ‘বাচ্চু ভাইয়ের’ লাশ আনার পর আবহ সংগীত হিসেবে আমার সবচেয়ে প্রিয় এই গানটির সুর যখন টিভি চ্যানেলে বাজছিল, ঠিক তখন পাশের রুম থেকে আমি শুনছিলাম আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলাম। একদিন আমার এক ছোট ভাইকে আমি বলেছিলাম, ঘরের মধ্যে গান বাজালে শুধু রবীন্দ্র সংগীত, আর ইন্ডিয়ান শিল্পীদের গান বাজাবে। সে বললো, আমি এসবের পাশাপাশি ব্যান্ড সংগীতও শুনবো। আমি তখন এলআরবি, সোলস, দলছুট ব্যান্ড-এর গান শোনার পরামর্শ দিয়েছিলাম তাকে। কোনো এক ঈদের দিন ছোট ভাইটি আমার এলআরবি ব্যান্ড-এর একটা সিডি নিয়ে এসে বাজাতে শুরু করলো। আমি তাঁকে বললাম, যে পাগল ঝড় তুলবো, সেই পাগলের গান শুনবা। টাকাটা উশল হবে। আরও বললাম, আমি প্রায় সব ধরনের গান একবার শুনেই হু-ব-হু গাইতে পারি, কিন্তু ব্যান্ড সংগীত কেন যেন বেশি গাইতে পারি না। তবে ‘বাচ্চু ভাই’র গানই একমাত্র গাইতে পারি। সে যেন নিজে গান গাওয়ার সময় তাঁর শ্রোতাকেও গানটা শিখাবার চেষ্টা করে। সবাই যাতে তাঁকে মনে রাখে। হ্যাঁ, ‘বাচ্চু ভাই’কে মনে রেখেই কাজের ফাঁকে এই লেখাটি লিখলাম। জানি না, ডাক- এ সেটা প্রকাশ হবে কি না!
গানে গানে আইয়ুব বাচ্চু বলেছিলেন ‘এর বেশি কাঁদালে উড়াল দিবো আকাশে’। রুপালি গিটার ফেলে দূর অজানা আকাশে উড়াল দেওয়া আইয়ুব বাচ্চু’র পরিচয়টা একনজরে দেখে নেই। জন্ম ঃ ১৬ আগস্ট ১৯৬২, চট্টগ্রাম। মৃত্যু ঃ ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ঢাকা। সংগীতজীবন শুরু ঃ ১৯৭৭। প্রথম গান ঃ হারানো বিকেলের গল্প। ব্যান্ড ঃ প্রথম ব্যান্ড ফিলিংস (১৯৭৮)। এরপর যোগ দেন সোলস-এ। ১৯৮০ থেকে পরবর্তী একদশক এই ব্যান্ডে যুক্ত ছিলেন। ১৯৯১ সালে নিজে গঠন করেন নতুন ব্যান্ড এলআরবি। প্রথমে এলআরবির পূর্ণ অর্থ ছিল লিটল রিভার ব্যান্ড। পরে এই নাম বদলে করা হয় লাভ রানস ব্লাইন্ড। প্রথম একক অ্যালবাম ঃ রক্ত গোলাপ (১৯৮৬)। এলআরবির প্রথম অ্যালবাম ঃ এলআরবি (১৯৯২)।
আইয়ুব বাচ্চু’র কিছু জনপ্রিয় গান ঃ চলো বদলে যাই, রুপালি গিটার, হাসতে দেখ, ঘুমভাঙা শহরে, দরজার ওপাশে, ফেরারী এ মনটি আমার, মেয়ে, কষ্ট পেতে ভালোবাসি, কেউ সুখি নয়, বেলা শেষে ফিরে এসে, এক আকাশের তারা, তারা ভরা রাতে, উড়াল দেব আকাশে, একচালা টিনের ঘর, মন চাইলে মন পাবে, আমি তো প্রেমে পড়িনি, তিন পুরুষ, তাজমহল, বারো মাস, এই রুপালি রাত ইত্যাদি। প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে চলচ্চিত্রে তাঁর ‘আম্মাজান’ গানটিকে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় গানগুলোর একটি ধরা হয়।
আশা আর ভালোবাসা নিয়ে পথ চেয়ে থাকা একজন মানুষ ছিলেন ‘আইয়ুব বাচ্চু’। এই ভালোবাসা বাচ্চু ভাইয়ের গানকে অবিনশ্বর করেছে। শ্রোতা-ভক্তের কাছে তিনি এবি নামেও পরিচিত। তাঁর ডাক নাম রবিন। এই রবিন ছিলেন একাধারে গায়ক, লিড গিটারিস্ট, গীতিকার, সুরকার, প্লেব্যাক শিল্পী। আইয়ুব বাচ্চুর নিজের একটি স্টুডিও আছে। ঢাকার মগবাজারে অবস্থিত এই মিউজিক স্টুডিওটির নাম এবি কিচেন।
দুর্দান্ত গিটার বাদক আইয়ুব বাচ্চুর বন্ধুর সংখ্যা ছিল অগুনতি। ছেলে আহনাফ তাজোয়ার তাজোও তাঁর বন্ধু ছিল। টুপি, রিস্টব্যান্ড, কালো পোশাক, ঘড়ি ও আংটিও বোধ হয় তাঁর বন্ধু ছিল?
বন্ধু’র কথা যখন আসলো, তখন আমার এক গরিব বন্ধুর কথা মনে করে লেখাটি শেষ করছি। বন্ধুটির সাথে আমারই এক আপন ছোট ভাইয়ের মাধ্যমে পরিচয় একটি হাসপাতালে। গরিব আর স্বল্প শিক্ষিত বলে এক সময় সে আর আমার সাথে দেখা করতে পারে না। ইনজাংশন জারি করে আমার ছোট ভাই। একদিন সে লুকিয়ে কোর্টে এসে আমার সাথে দেখা করলো। আমি বললাম, তুমি আসছ কেন? তুমি তো গরিব! সে বললো, আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি, তাই তোমার কাছে ছুটে আসি! আমি হাসি। সে বলে, তোমার হাসি দেখার জন্য আসছি। এই হাসি দেখা হলো তাঁর শেষ দেখা। আমার বড় ভাই বিজ্ঞ আইনজীবি তাঁকে নিষেধ করে দিলো আমার সাথে দেখা না করার জন্য। কারণ, সে গরিব! আর আজ আমার লেখার সাবজেক্টই গরিব, বিপন্ন মানুষ। সেই গরিব বন্ধুটি আর আমার কাছে আসে না। গরিব বলে হয়তো ভয় পায়? তবে আমি কোর্টের হাজার মানুষের ভীড়ে, বন্ধুদের ভীড়ে আমার সেই গরিব বন্ধুকে খুঁজি আর শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর সুরে গাই- আমি বারো মাস তোমায় ভালোবাসি/তুমি সুযোগ পাইলে বন্ধু আইও...।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT