স্বাস্থ্য কুশল

শীতে নাক কান গলার সমস্যা ও সমাধান

অধ্যাপক ডা. জাহীর আল-আমিন প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-১১-২০১৮ ইং ০১:১৪:৪৬ | সংবাদটি ৫৬ বার পঠিত

শীত আসছে। এ সময়ে নাক, কান, গলার অনেক সমস্যা হতে পারে। কিছু কিছু সমস্যা শীতকালেই হয় আর কিছু কিছু সমস্যা শীতে বাড়ে।
সর্দি হাঁচিতে সাইনাস সমস্যা :
প্রধান যে সমস্যাটা দেখা যায় তাহল, সাইনাসজনিত সমস্যা। সর্দি, হাঁচি, নাক বন্ধ, নাক দিয়ে পানি পড়া, মাথা জ্যাম হয়ে থাকা বা মাথা ভার-ভার লাগা- এগুলো সাইনাসের সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ। একটু একটু জ্বর থাকতে পারে বা গা গরম থাকতে পারে অথবা রোগী বলতে পারে যে ফ্যান বা এসি সহ্য হয় না। এ পর্যায়কে আমরা ক্রনিক সাইনোসাইটিস বলে থাকি। এর থেকে মাঝে মাঝে একিউট সাইনোসাইটিস রোগ তৈরি হয়ে থাকে, যেখানে ব্যথা প্রচ- আকার ধারণ করে থাকে এবং টেম্পারেচার অনেক বেড়ে যায়। একিউট বা ক্রোনিক সাইনোসাইটিস থেকে সমস্যাটা এক্সটেনশন হয়ে (ছড়িয়ে) কানে, গলায়, শ্বাসনালিতে যেতে পারে এবং পুরো শরীরে ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়তে পারে। সাধারণত যা হয় তাহল নাকের সর্দি কানে অ্যাফেক্ট করে ফলশ্রুতিতে কান বন্ধ, কানে কম শোনা, কানে প্রচ- ব্যথা থেকে শুরু করে কানের পর্দা ফেটে গিয়ে কান দিয়ে পুঁজ বা পানি পড়তে পারে।
এগুলোকে আমরা ঊঁংঃধঃরড়হ ঞঁনব ঙনংঃৎঁপঃরড়হ, এষঁব বধৎ, অপঁঃব ঙঃরঃরং সবফরধ রিঃয রঃং পড়সঢ়ষরপধঃরড়হ বলতে পারি। চিকিৎসা হিসেবে নাকের সমস্যার অবশ্যই সমাধান করতে হবে। কান দিয়ে পানি পড়লে কান শুকনা রাখতে হবে এবং কানের মধ্যে কোনো মতেই তেল বা কিছু দেয়া যাবে না। এক বা দুই দিনের মধ্যে কানের সমস্যার সমাধান না হলে অতি শিগগির ডাক্তার দেখাতে হবে।
গলা ব্যথা ও খুসখুস করা :
একটি সমস্যা প্রায়ই হয় যা পূর্ববর্তী নাকের সমস্যা থেকে আসতে পারে অথবা সরাসরি হতে পারে- তা হলে গলায় প্রদাহ বা ক্রনিক ফেরিনজাইটিস। গলা খুসখুস করা, ঠা-াতে কাশি হওয়া থেকে শুরু করে রাতে ঘুমের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে আসা বা ঘরের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে আসা বা শ্বাসকষ্ট পর্যন্ত হতে পারে। রোগী বদ্ধঘরে থাকতে ভয় পায় বলে দম বন্ধ হয়ে আসছে ভাব হয়, জানালা দরজা বন্ধ থাকলে তা সহ্য করতে পারে না। কাশি অনেক সময় প্রচ- আকার ধারণ করে তবে কাশি সাধারণত শুকনো থাকে। গরম ভাপ নিলে বা গড়গড়া করলে এবং ঠা-া এড়িয়ে চললে অনেক সময় এর সমাধান পাওয়া যায়। ঘরের মধ্যে পর্যাপ্ত আলো বাতাস ঢুকলে এবং ঘরের মধ্যে যে ধুলোবালি জমে, যেমন : লেপ-তোষক, কম্বল, পুরনো বই, কার্পেট, মকমলের সোফা, কাপড়চোপড় ভারী পর্দা এগুলো হয় সরিয়ে ফেলতে হবে অথবা যেগুলো সরানো সম্ভব নয় যেমন- লেপ-তোষক, কম্বল, বালিশ এগুলোকে সপ্তাহে ২-৩ বার কমপক্ষে সকাল সন্ধ্যা রোদে দিতে হবে।
নাক বন্ধ থাকা :
নাকের সমস্যা স্বরনালিতে এক্সটেনশন হয়ে গলার স্বর বসে যাওয়া বা গলা দিয়ে কথা স্বর না বের হওয়া এমন সমস্যা হতে পারে। এ সমস্যাগুলো নাকের সমস্যার পরবর্তীতে হতে পারে অথবা সরাসরি হতে পারে। এ সমস্যাগুলো শীতে বৃদ্ধি পায় অথবা শীতের প্রকোপে শুরু হয়। ঠা-া এড়িয়ে চলা, লবণ গরম পানি দিয়ে নাক পরিস্কার করা, লবণ গরম পানি দিয়ে গড়গড় করা এবং গরম ভাপ নেয়া, এসব করলে ডাক্তার দেখানো ছাড়া অনেক সময় এ সমস্যাগুলোর সমাধান প্রাথমিক পর্যায়ে করা সম্ভব। একটা কথা মনে রাখতে হবে যে গলার স্বর বসে যাওয়ার সর্বশেষ চিকিৎসা হল কথা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়া। আমরা অনেক সময় কথা বন্ধের নামে ফিসফিস করে কথা বলি যা আসলে আরও খারাপ পরিণতি হয়। গলার স্বরযন্ত্রের জন্য কথা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। ফিসফিস করে কথা বলা যাবে না। আরেকটা কথা কয়েক দিন কথা বন্ধ রাখার পর গলার স্বর যদি সম্পূর্ণ ফেরত না আসে তবে অবশ্যই ডাক্তার দেখিয়ে গলার স্বড়যন্ত্রটা পরীক্ষা করিয়ে নেয়া উচিত। গলার স্বরযন্ত্রের চিকিৎসার সঙ্গে সঙ্গে আনুষঙ্গিক যে সমস্যা গলায় বা নাকে আছে সে সমস্যাগুলোর দিকেও নজর দেয়া বা সেগুলোর চিকিৎসা করার দরকার আছে।
নাক দিয়ে রক্ত ঝড়া :
নাক, কান, গলার আর একটি সমস্যা শীতকালে দেখা যায় বাচ্চাদের নাক দিয়ে রক্ত ঝড়া। এটা সাধারণত রাতের বেলায় বেশি হয় যখন ঘর শুকনো হয়ে যায়। বাচ্চাদের নাক ঝাড়তে শেখানো উচিত এবং বেশিরভাগ বাচ্চা ৪-৫ বছর বয়সে এটা সুন্দরভাবে করতে পারে। এই একটি কাজ করলেই বাচ্চাদের নাকের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। এর সঙ্গে বাচ্চাদের নাকে ভেসলিন বা পেট্রোলিয়াম জেলি দিতে পারেন। শর্ত হল এটা দিনে বেশ কয়েকবার বা ৪-৫ বার দিতে হবে। পারতপক্ষে নাকের মাঝখানের পর্দায় এটা না লাগিয়ে নাকের উভয় দিকের ওয়ালের ভেতরে লাগিয়ে নাকটা চেপে ধরলেই এটা নিজ থেকেই নাকের ভেতরে চলে যাবে। এর সঙ্গে নাক দিয়ে রক্ত পড়লে অভিভাবকদের বাচ্চার নাকের নরম অংশটা দুই আঙ্গুল দিয়ে বেশ শক্তভাবে চেপে ধরতে হবে। মনে রাখবেন কমপক্ষে ৫ মিনিটের আগে এই চাপ ঢিলা করা যাবে না। আগে চাপ ছেড়ে দিলে আবারও প্রচ-ভাবে রক্ত ঝড়তে পারে। প্রাথমিক চিকিৎসায় কাজ না হলে অথবা সমস্যা যদি ঘনঘন হতে থাকে অথবা সমস্যার আকার ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তবে অবশ্যই ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।
টনসিল ও এডেনয়েডে সমস্যা :
একটি সমস্যা শীতকালে দেখা যায় তাহল- টনসিল এবং এডেনয়েড সমস্যা। অনেক বাচ্চারই শীতকালে টনসিল এবং এডেনয়েডের সমস্যা দেখা দেয়। টনসিলের সমস্যা হলে গলা ব্যথা করে, ঢোক গিলতে অসুবিধা হয়, বাচ্চা খেতে চায় না। জ্বরজ্বর ভাব বা প্রচ- জ্বর পর্যন্ত হতে পারে এর সঙ্গে শারীরিক অসুস্থতা যেমন বাচ্চা দুর্বল হয়ে পড়ে, খেলাধুলা বন্ধ করে দেয়- এটাও থাকতে পারে। টনসিল ইনফেকশন হলে কিছু ক্ষেত্রে প্যারাসিটামল ওষুধ খেলেই সমস্যার সমাধান হতে পারে। এর সঙ্গে বাচ্চাকে কুসুম গরম লবণ পানি দিয়ে গড়গড়া করাতে পারেন। মনে রাখতে হবে যে ছোট বাচ্চারা গড়গড়া করতে পারে না। এক্ষেত্রে ডাক্তার দেখাতে হবে। ঠা-া বা ঠা-া খাবার এড়িয়ে চললে ভালো ফল পাওয়া যায় তবে মনে রাখতে হবে যাদের শীত এলেই টনসিলের সমস্যা শুরু হয় তাদের টনসিল অপারেশন করে ফেলাটাই উত্তম। এডেনয়েডের সমস্যা হলে বাচ্চা হাঁ করে শ্বাস করে নেয় এবং রাতে নাক ডাকে, শ্বাস নেয়ার জন্য ছটফট করে এবং ঘুমাতে খুব কষ্ট হয়। এসব বাচ্চার দিনের বেলায়ও খাবার সময় ঢোক গিলতে সমস্যা হতে পারে। শীত এড়িয়ে চলে বা এন্টিবায়োটিক খেয়েও এ সমস্যা দূর না হলে এডেনয়েড গ্রন্থি অপারেশন করে ফেলে দেয়াটাই উত্তম। শীতকালে ঠা-াতে অনেক বাচ্চারই হাঁপানি সমস্যা দেখা দেয়। অনেক বাচ্চারই হাঁপানির সঙ্গে নাকের এলার্জিজনিত সমস্যা, গলায় খুসখুসে ভাব এবং নাক ডাকার সমস্যা জড়িত থাকে। শুধু ইনহেলার বা এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করে এসব বাচ্চারা ভালো ফল নাও পেতে পারে। এদের অবশ্যই নাকের এবং গলার সমস্যার ও হাঁপানির চিকিৎসা একসঙ্গে করা উচিত।

শেয়ার করুন
স্বাস্থ্য কুশল এর আরো সংবাদ
  • কম বয়সে হৃদরোগের ঝুঁকি
  • শিশুর কয়েকটি অসুখ ও পরামর্শ
  • হাড়ক্ষয় রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা
  • শীতে নাক কান গলার সমস্যা ও সমাধান
  •   নীরব ঘাতক রক্তচাপ
  • গর্ভাবস্থায় কী খাবেন
  •   মাতৃস্বাস্থ্য ও মাতৃমৃত্যু কিছু কথা
  • সচেতন হলেই প্রতিরোধ ৬০ শতাংশ কিডনী রোগ
  •   হৃদরোগীদের খাবার-দাবার
  • ঘামাচি থেকে মুক্তির উপায়
  • মুখে ঘা হলে করণীয়
  • পায়ের গোড়ালি ব্যথায় কী করবেন
  • নীরব রোগ হৃদরোগ
  • পরিচিত ভেষজের মাধ্যমে অর্শের চিকিৎসা
  • অনিদ্রার অন্যতম কারণ বিষন্নতা
  • রক্তশূন্যতায় করণীয়
  • চোখে যখন অ্যালার্জি
  • স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে বাঁচার ১০টি উপায়
  • রোগ প্রতিরোধে লেবু
  •  স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্কের যত্ন নিন
  • Developed by: Sparkle IT