ইতিহাস ও ঐতিহ্য

খাদিমনগরে বুনো পরিবেশে একটি দিন

সুমন্ত গুপ্ত প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-১১-২০১৮ ইং ০০:৩০:৪০ | সংবাদটি ৪৮ বার পঠিত

যান্ত্রিক জগতে কোলাহল মুক্ত পরিবেশ কে চান না, তাই ঝিঁঝি পোকার ছন্দে আর সবুজের সমারোহে ঘুরে বেড়ানোর মজাই আলাদা। আর এ নিরিবিলির ছোঁয়া পেতে আমরা যারা শহুরে তাদের অনেক কষ্টই করতে হয় বৈকি। আর সেই নিরিবিলি স্থানটি যদি বন হয় তাহলে আর কথাই নেই, শত ব্যস্ততার মাঝে কিছু সময় যদি বুনো পরিবেশে ঘুরে বেড়ান যায় তাহলে মন সজীব হয়ে যায়।
রাস্তার দুইপাশে ঘন সবুজ বন। বনের ভেতর থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝি পোকার ডাক। মাঝে মধ্যে এর সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে সুরেলা পাখির কণ্ঠ। আশপাশে জনমানবের অস্তিত্ব খুব একটা চোখে পড়ে না। দুইপাশের টিলার গাছপালার ডাল নুয়ে পড়েছে রাস্তার ওপর। দূর থেকে মনে হতে পারে এটা পায়ে চলার কোনো রাস্তা নয়, সবুজের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়ার মায়াময় সুড়ঙ্গপথ। সবুজের ছাউনির এ রাস্তা বয়ে গেছে সিলেটের খাদিমনগর জাতীয় উদ্যানের বুক চিড়ে। খাদিমনগর জাতীয় উদ্যানের সৌর্ন্দয উপভোগ করতে হলে আপনাকে শুধু এ পথ ধরে হাঁটলেই চলবে না। আপনাকে হতে হবে আরেকটু সাহসী, পরিশ্রমী। আর এ সাহসিকতার জন্য আপনি দেখা পেতে পারেন মুখ পোড়া বানর অথবা অজগর সাপ অথবা অন্য কোনো প্রাণী। সিলেটে প্রায় সবাই কম বেশি ঘুরতে গিয়েছেন কিন্তু শহর থেকে ৫ কি.মি দূরের খাদিম রেইন ফরেস্ট এ অনেকেই যাননি। সিলেট শহর থেকে বেরিয়ে জাফলং রোডে হজরত শাহপরানের মাজারের পর বামপাশে খাদিমনগর টি এস্টেটের রাস্তা ধরে কয়েকশ’ মিটার এগোলেই বনের শুরু। এখানে দুটি ট্রেইল ধরে ট্রেকিং করতে পারেন, ছোট ট্রেইলে ৪৫ মিনিট আর বড় ট্রেইলে দু-ঘণ্টা সময় লাগবে। খুব কাছের দূরত্ব হওয়ার পরেও সময়ের অভাবে যেতে পারিনি খাদিম রেইন ফরেস্ট। তাছাড়া শুনলাম সম্প্রতি খাদিম ফরেস্টে যুক্ত হয়েছে ট্রি অ্যাকটিভিটিজ আর জিপ লাইন। এ নতুন দুই অ্যাকটিভিটিজ স্বাদ পাওয়ার জন্যই আরও মন আকুল হয়ে উঠেছিল খাদিম ফরেস্টে যাওয়া জন্য। আমি, মা, সানন্দা আর সুকান্ত রওয়ানা দিলাম গন্তব্য খাদিম ফরেস্ট। সিলেট শহর থেকে জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, মিরাবাজার পেরিয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম। শুক্রবার স্নিগ্ধ সকাল রাস্তায় তেমন যানজট নেই। তাই স্বল্প সময়ের মাঝেই আমরা পৌঁছে যাই খাদিম ফরেস্টে ঢোকার রাস্থায়। দুই পাশেই চা বাগান একদিকে খাদিম চা বাগান অন্য দিকে বুরজান চা বাগান। বাগানের রাস্তা তাই কোথাও পিচ করা আবার কোথাও মাটির রাস্তা। রাস্তার অবস্থা বেগতিক দেখে আমরা হেঁটেই পথ পাড়ি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। পদব্রজে চলছি আমরা এগিয়ে সিলেট এ চা বাগানগুলোর পরিবেশ অসাধারণ। বাগানের বাসাগুলো দেখলেই থেকে যেতে মন চায়। প্রতিটি বাসার সামনে বাঁশের বেড়া দেয়া আর নিপুণ এক শৈল্পিক ছাপ। চারপাশে চা বাগানের অবারিত সবুজের বন্যা।

চা কারখানা, চা শ্রমিকের শিল্পিত বাসস্থান দেখতে দেখতে গহীন অরণ্যের নির্জনতার দিকে ঢুকে যাচ্ছিলাম আমরা। আমরা হাঁটছি বাগানের মেঠোপথ ধরে। যত ভেতরে ঢুকা যায় নির্জনতা তত বাড়তে থাকে বিভিন্ন পাখির কলরব মনকে ছুঁয়ে যায়। পথি মধ্যে ব্যাঙের ডাক মনে করিয়ে দিল অল্প কিছুক্ষণ এর মধ্যে বৃষ্টি আমাদের বরণ করবে। অল্প কিছুক্ষণ এর মধ্যে মুষল ধারায় বৃষ্টি শুরু হল আমরা ফরেস্টের বিট অফিসে পথে হাঁটছি। অবিরাম বর্ষণের জলধারার পরশে বৃক্ষরাজি নব যৌবন লাভ করে। প্রায় ৪৫ মিনিট হাঁটার পর আমরা পৌঁছলাম ফরেস্টের বিট অফিসে। বিট অফিসে গিয়েই দেখা পেলাম নতুন দুটি অ্যাকটিভিটি যোগ হয়েছে। ১০০ টাকা করে প্রতিটি অ্যাকটিভিটির জন্য। নতুন দুটি অ্যাকটিভিটির জন্য টিকিট কিনলাম। আমাদের মতো বেশ কয়েকজন পর্যটক ও দুই অ্যাকটিভিটির জন্য টিকিট কিনলেন। প্রথমে দেখে মনে হয়েছিল খুব সহজ কিন্তু উপরে ওঠার পরে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। ব্যাপারটা ভালোই কঠিন। মনে মনে বেশ ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম এ বুঝি পড়ে গেলাম। বিশেষ করে লাস্ট দুইটা অ্যাকটিভিটি বেশ কঠিন। আমার ঘাম ঝরিয়ে ছাড়ল।
তবে এ যাত্রা পথে কারও উচ্চতা ভীতি থাকলে সমস্যায় পড়বেন। ভয় লাগবে তখন। জিপ রোলিংটা অসাধারণ। যদিও দূরত্বটা অনেক কম মনে হয়েছে আমার কাছে। মাত্র ৬/৭ সেকেন্ডেই শেষ হয়ে যাবে। এইটাতে ব্যাপক আফসোস রয়ে গেছে কেন আরও লম্বা লাইন হল না! দুই অ্যাকটিভিটির কাজ শেষ করে সেখানে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে শুরু করলাম আমাদের ট্রেকিং। আগেই বলেছি এখানে দুটি ট্রেইল ধরে ট্রেকিং করতে পারেন, ছোট ট্রেইলে ৪৫ মিনিট আর বড় ট্রেইলে দু-ঘণ্টা সময় লাগবে। আমরা দুই ঘণ্টার পথে যাত্রা শুরু করলাম। একদিকে বৃষ্টির অবিরাম ধারা অন্যদিকে পাখির ডাক। আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমরা হাঁটছি ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। তবে বলে রাখা ভালো বৃষ্টির সময় জোঁক এর আনাগোনা বেশি থাকে তাই এক জায়গায় বেশি সময় না দাঁড়ানই ভালো। গাছে গাছে ফল ধরে আছে কাঁঠাল, দু-পাশের ঘন ডালপালা নুয়ে এসে চলার পথকে সুড়ঙ্গ বানিয়ে ফেলেছে, কিছুটা অন্ধকার। পথের মাঝে পাবেন স্বচ্ছ পানির খাল স্থানীয়ভাবে যাকে ছড়া বলে, বৃষ্টির পরপর এগুলো বিপুল বেগে পানি বহন করে, অন্য সময় হালকা একটা ধারা বজায় থাকে, কিংবা শীতকালে একেবারে শুকিয়ে যায়। বৃষ্টি ঝরছে অঝোরে, কপালে কি আছে দেখাই যাক না। রিমঝিম বৃষ্টির আওয়াজ আর একটানে ডাকা ঝিঁঝি পোকার লহরি।
কাদামাখা পায়ে ছপ ছপ শব্দ করে নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছি আমরা। এর মধ্যে অবশ্য রক্তদান প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে, পা থেকে টেনে জোঁক উঠালাম দুটি। সামনে ট্রেইলটা আরও সরু, জঙ্গল বর্ষার পানিতে একদম ঘন হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে ছড়া বয়ে গেছে বেশ কিছু। খুব বেশি হলে হাঁটু পানি হবে, মানে এগুলো বর্ষাকালীন ছড়া। পাড়ের বালুটা খুব নরম, পা দিতেই চোরাবালির মতো দেবে গেল। একটু টিলার মতো জায়গা পেরিয়ে আবার মোটামুটি সমতল। পথে দেখা পেলাম বানর দল এর কিন্তু ছবি তোলার আগেই নিমিষে বানর দল হারিয়ে গেল গভীর বনের দিকে। আরও কিছু দূর যাওয়ার পর দেখা পেলাম বিরল প্রজাতির মুখপোড়া হনুমান। সেই বিশাল লম্বা লেজ আমাদের সঙ্গে দেখা পেলাম কয়েকটা বাচ্চা হনুমানের পেছন ধরেছে। পাশের এক দোকান থেকে কলা কিনে এনে দিল। কলা পেয়ে হনুমান মহোদয়কে বেশ উৎফুল্ল দেখলাম। আমাদের গাইড বিভিন্ন প্রজাতির গাছ চিনিয়ে দিচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে জঙ্গল এমনই গভীর হয়ে গেল যে, আর হাঁটা যাচ্ছে না, শুরু হল বসে বসে স্ক্রল করা। উপরে আবার বেতের ঝাড় আর কিছু নাম না জানা কাঁটাগাছ। হাতে পায়ে গায়ে সমানে আটকে যাচ্ছে কাঁটাগুলো, আমরা বসে বসে এগোচ্ছি আর উপরে বৃষ্টি। ঘন জঙ্গল, বিশাল লম্বা লম্বা দেশি-বিদেশি গাছে ঢাকা পথ হেঁটে আরও দুয়েকটা ঝিরি পার হলাম, সামনে এসে দাঁড়াল দুর্ভেদ্য জঙ্গল। একদম ডেড অ্যান্ড, গাছ না কেটে আগানোই যাবে না।
আমাদের গাইড দা দিয়ে ঝোঁপ কেটে আমাদের রাস্তা করে দিলেন। পায়ের দিকে তাকালেই ঝামেলা, জোঁক তুলতে হয়। এ চিনা জোঁক জিনিসটা খুবই খারাপ। বেশ কয়েকজন ভয়ে ফিরে যেতে চাচ্ছিলেন কিন্তু ফেরার উপায় না পেয়ে আমরা আবার ফিরে চললাম ট্রেইল ধরে। ততক্ষণে অবশ্য এক ঘণ্টার বেশিই হয়ে গেছে। বনের ভেতরে নির্জনতা আর মনের ভেতরের ভয় সব মিলিয়ে এক বিচিত্র সময় পার করছিলাম আমরা। সামনে কি আছে তা আমরা জানি না একমাত্র আমাদের গাইডই বলতে পারেন তবে ভাগ্যিস আমারা গাইড পেয়েছিলাম তা না হলে আমাদের ফরেস্টের ভেতর থেকে বের হওয়া কঠিন কাজ ছিল। অদূরে চা গাছের আড়ালে সূর্য ঢলে পড়েছে। শেষ সূর্যের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ল আকাশজুড়ে। সেই সঙ্গে অগণিত পাখির নীড়ে ফেরার ব্যাকুলতা। বন গোধূলির স্বপ্নীল মোহে আচ্ছন্নে হয়ে কখন যে বিকাল পেরিয়ে সন্ধ্যার আঁধারে ঢুকে গেছে টের পাইনি।
কীভাবে যাবেন : সিলেট শহর এর বন্দরবাজার থেকে খাদিম যাওয়ার জন্য টাউন বাস/সিএনজি প্রতিনিয়ত ছাড়ে। শাহপরান মাজার সামনে নেমে মাজার জিয়ারত করে সহজে আপনার কাক্সিক্ষত যাত্রা পথে রওনা দিতে পারেন। তবে দল বড় হলে বনবিভাগের অনুমতি নিয়ে ঢুকাই ভালো।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • খেলাফত বিল্ডিং : ইতিহাসের জ্যোতির্ময় অধ্যায়
  • এক ডিমের মসজিদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের কিছু ঘটনা
  • খাদিমনগরে বুনো পরিবেশে একটি দিন
  • ফিরে দেখা ৭ নভেম্বর
  • শ্রীরামসি গণহত্যা
  • প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের ধারক মৃৎশিল্প
  • বিপ্লবী লীলা নাগ ও সিলেটের কয়েকজন সম্পাদিকা
  • গ্রামের নাম আনোয়ারপুর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • জাতীয় স্মৃতিসৌধ
  • বাংলাদেশের লোকশিল্প
  • উৎলারপাড়ের পোড়া পাহাড় আর বুদ বুদ কূপ
  • চেলা নদী ও খাসিয়ামারা মোহনা
  • Developed by: Sparkle IT