ইতিহাস ও ঐতিহ্য

মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের কিছু ঘটনা

অধ্যাপক মোঃ আহবাব খান প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-১১-২০১৮ ইং ০০:৩২:৩৪ | সংবাদটি ৪৯ বার পঠিত

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। অনেক বাঙালি দলে দলে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে গিয়ে ট্রেনিং করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছেন। ঠিক ওই সময় নবীগঞ্জের ফুরিকোনা গ্রামে পাক হানাদার বাহিনী চারটি ফাইটার প্লেন নিয়ে নিরিহ জনগণের উপর বোমাবর্ষণ করতে লাগলো। স্থানীয় জনগণ অতর্কিত হামলায় হতবিহ্বল হয়ে পড়লেন। এদিক ওদিক পালাতে লাগলেন।
প্রথম দিন বোমা বর্ষণ করে অনেক জানমালের ক্ষয়ক্ষতি করে সন্ধ্যার পূর্বেই ফুরিকোনার আকাশ থেকে ফাইটারগুলো চলে যায়। এরপরের দিন সকাল ১০টার দিকে আবারও পাক বাহিনী ফাইটার নিয়ে এসে গুলি বর্ষণ করতে থাকে, সাথে সাথে জগন্নাথপুর থানাধীন জামালপুর গ্রামের বীর বাঙালিরা গ্রামের পূর্বের দিকে নদীর পাড়ে জমায়েত হন এবং গ্রামবাসীর করণীয় কি, এ নিয়ে পরামর্শ করতে থাকেন।
এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয় ঐ জানোয়ারদের উচিত শিক্ষা দিয়ে বাংলার মাটি থেকে বিতাড়িত করা হবে। এ সিদ্ধান্তের সাথে সাথে বীর বাঙালি মুক্তি পাগল জামালপুর গ্রামবাসী যার যার বাড়িতে গিয়ে লাঠি, ছুলফি, কোঁচা জগড়া, ডেগার নিয়ে ফুরকোনার দিকে দৌঁড়াতে লাগলেন হানাদার বাহিনীকে মোকাবিলা করার জন্য। আমার ‘সুনামগঞ্জের চাচাজী’ সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী হাইস্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোঃ আব্দুল হাশিম খান বিএবিটি সাহেব বললেন তোমরা ঐ সব দেশীয় অস্ত্র দিয়ে হানাদার পাক বাহিনীকে মোকাবেলা করতে পারবেনা। তাদের ফাইটার ও অত্যাধুনিক অস্ত্র রয়েছে। তোমরা বরং ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিয়ে এসে তাদেরকে মোকাবেলা করো। কিন্তু কে শুনে তার কথা। জামালপুরের বীর বাঙালি টগবগে যুবকরা যার যা কিছু আছে তা দিয়ে মোকাবেলা করবে ফুরিকোনায়। তিন ভ্রাতৃদ্বয় হাজী মোঃ শফিক উল্লা, হাজী মোঃ রফিক উল্লাহ ও মোঃ তাহিদ উল্লাহ তাদের সাথে মোঃ জমশের আলি, মোঃ মকরম উল্লাহ, মাসুক মিয়া, মোঃ আবরছ উল্লাসহ গ্রামের অনেকে’ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে দৌঁড়াতে লাগলেন। দাওরাই গ্রামে শাহ মোঃ রুস্তুম উল্লাহ মেম্বার সাহেব এক নলা বন্ধুক ও কিছু লোকজন নিয়ে জামালপুরের মুক্তিপাগল জনতার সাথে শামিল হয়ে নেতৃত্ব দিতে থাকেন ও অভিষ্ট লক্ষ্য পাকহানাদারকে বিতাড়িত করে বাংলাকে শত্রু মুক্ত করা। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে চাতলপাড় এলেন। এখানে অনেক লোক জড়ো তারা বললেন আপনারা এইসব দেশীয় অস্ত্র দিয়ে মোকাবেলা করতে পারবেন না। তাই আপনারা বাড়ীতে চলে যান এবং ভারতে গিয়ে ট্রেনিং ও অস্ত্র নিয়ে এসে শত্রুদের মোকাবেলা করেন। তাদের কথা শুনে শাহ মোঃ রুস্তুম মেম্বারের নেতৃত্বে সবাই স্ব-স্ব গ্রামের বাড়িতে চলে যান। এতেই প্রমাণিত হয় যে জামালপুরের গ্রামবাসী সারা বাংলার সাথে এক ও একত্রিত। আরেক দিনের ঘটনা জগন্নাথপুর থানাধীন বড়ফেছি গ্রামে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বোশেখ মাসের এক বিকেলে হানাদার বাহিনীর তত্ত্বাবধানে ও নির্দেশে রাজাকাররা এক ধ্বংসলীলা চালাতে তৎপর হয়ে ওঠে। গ্রামের পশ্চিম দিকের রসিদ মিয়ার বাড়ির সকল লোককে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে প্রত্যেকের দু’টো হাত একত্র করে পিছনে বাঁধে; গুলি করে হত্যা করার উদ্দেশে এবং বাড়ির খড়ের ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়, কারণ রসিদ মিয়া তখন আওয়ামী লীগ কর্মী। শেষ পর্যন্ত কোন এক অজানা কারণে, যে কারণ ঘাতকরাই জানে, তাদের হাতের বাঁধ ছেড়ে দেয় এবং তাদের হত্যা না করে মুক্তি দেয় এবং তাদের গোশালায় আগুন দেয়। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পূর্বে ফেছীর কিছু সংখ্যক মহিলা ও পুরুষ প্রায় দৌঁড়ে দৌঁড়ে এসে আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নেন। তাদেরকে আমার বাবা আলহাজ্ব মোঃ আছদ্দর খান ও তার পরিবার তাদেরকে সসম্মানে থাকার ব্যবস্থা করে দেন ও আদর আপ্যায়ন করেন। ঘন্টা তিন এক পরচরা গ্রাম থেকে তাদের আত্মীয়-স্বজন আমাদের বাড়িতে এসে তাদেরকে চরা গ্রামে নিয়ে যান।
আমাদের গ্রাম সম্পর্কে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে তা হলো ‘দাওরাইর উত্তরে রোউর জামালপুর, এই অঞ্চলে তাদের মতো নাহি কারো জুর। সুনাম আছে এইনা গ্রামের লোকে জানে কাজ, দেশ-বিদেশে করছে রুজি চড়ে হাওয়াই জাহাজ। তাই আমার গ্রামের সম্মানিত জনগণ সবসময়ই দেশের কল্যাণে ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে বলিষ্ট ভূমিকা পালন করে থাকেন। তাই আমরা দেশ-বিদেশে যেখানে থাকিনা কেন ফিরে যাই আমার সবুজ শ্যামল জামালপুরে।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • খেলাফত বিল্ডিং : ইতিহাসের জ্যোতির্ময় অধ্যায়
  • এক ডিমের মসজিদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের কিছু ঘটনা
  • খাদিমনগরে বুনো পরিবেশে একটি দিন
  • ফিরে দেখা ৭ নভেম্বর
  • শ্রীরামসি গণহত্যা
  • প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের ধারক মৃৎশিল্প
  • বিপ্লবী লীলা নাগ ও সিলেটের কয়েকজন সম্পাদিকা
  • গ্রামের নাম আনোয়ারপুর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • জাতীয় স্মৃতিসৌধ
  • বাংলাদেশের লোকশিল্প
  • উৎলারপাড়ের পোড়া পাহাড় আর বুদ বুদ কূপ
  • চেলা নদী ও খাসিয়ামারা মোহনা
  • Developed by: Sparkle IT