ধর্ম ও জীবন

শতবর্ষের স্থাপত্য সিকন্দরপুর জামে মসজিদ

মুহাম্মদ বুরহান প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-১১-২০১৮ ইং ০০:৪১:৫২ | সংবাদটি ১২৬ বার পঠিত

হাওর-নদীঘেরা ভাটি অঞ্চল সুনামগঞ্জের কিছু স্থাপত্য নিদর্শন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে; ক’জনইবা তার খোঁজ রাখেন। খুব প্রাচীন না হলেও স্থাপনাগুলোর ঐতিহ্যিক তাৎপর্য অপরিসীম। এ অঞ্চলের তিনটি মসজিদের কথা বলছি, যেগুলো মোগল স্থাপত্যরীতির অনুকরণে করা। মহাসিং নদীর পাড়েই প্রায় সমসাময়িক দু’টি স্থাপত্য নির্মিত হয়। সিকন্দরপুরের শাহী মসজিদ ও পাগলা বড় মসজিদ। তৃতীয়টি হচ্ছে দিরাইয়ে অন্তর্গত ভাটিপাড়ার কেন্দ্রীয় মসজিদ। পাগলার বড় মসজিদ সম্পর্কে অনেকেই জ্ঞাত; কিন্তু যে অগ্রজ স্থাপত্যকর্ম পাগলা মসজিদ নির্মাণের পেছনে অন্যতম প্রেরণা, সেটা অনেকেরই অজানা।
বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তর, কৃষিক্ষেত্র আর জলাভূমি পেরিয়ে একেকটি গ্রাম যেনো একমুঠো ছায়া। তেমনি এক ছায়ানিবিড় গ্রাম সিকন্দরপুর। দিরাই উপজেলা সদর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে এ গ্রাম। ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি এ গ্রামেই। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে এলাকার বাসিন্দা আলহাজ্ব আব্দুল্লাহ সিকন্দরপুর শাহী জামে মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু করেন। প্রমত্তা মহাসিং এর দক্ষিণ দিকে নদীর এক কিনার ঘেঁষে মসজিদটির অবস্থান। নদীঘাটের সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতেই মসজিদ প্রাঙ্গণ।
মোগল রীতির অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘সাহন’ বা আঙিনা। এ মসজিদেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ১৮ শতক ভূমির পুরোটা অল্প উচ্চতার বাউন্ডারিঘেরা। মূল মসজিদটি ছিলো প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ জুড়ে। যেখানে জুল্লার দৈর্ঘ্য ছিলো সাড়ে ৩০ ফুট, প্রস্থ সাড়ে ১৩ ফুট, উচ্চতা ৩০ ফুট। বারান্দার দৈর্ঘ্য সাড়ে ৩০ ফুট, প্রস্থে সাড়ে ১০ ফুট।
মুসল্লিদের স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় পরবর্তীতে মূল ভূমি নকশার দু’পাশে দুটি আইল যুক্ত করেন কর্তৃপক্ষ। পূর্বপার্শ্বের তিনটি প্রবেশপথ সুসজ্জিত বহু খাঁজবিশিষ্ট খিলানযুক্ত। পূর্বদিকের তিনটি প্রবেশপথের সাথে মিল রেখে তিনটি গম্বুজ এবং পশ্চিমের দেয়ালে তিনটি মিহরাব বা কুলুঙ্গি রাখার রীতিটা অনুসৃত হয়নি, যেমনটি অধিকাংশ প্রাচীন মসজিদগুলোতে, বিশেষত সুলতানী আমলের মসজিদে পরিলক্ষিত হতো। এখানে পশ্চিমের দেয়ালে একটি মিহরাবই রাখা হয়েছে। পূর্বপাশে তিনটি প্রবেশপথসহ উত্তর-দক্ষিণ পার্শ্বে দুটি করে মোট ৭টি প্রবেশপথ।
মসজিদটিতে গম্বুজ রয়েছে পাঁচটি। মধ্যখানের কেন্দ্রীয় একটি সবচে’ বড়ো, তার দু’পাশে তুলনামূলক ক্ষুদ্রাকৃতির দু’টি করে আরো চারটি। গম্বুজগুলো খিলানভিত্তিক স্কুইঞ্চ পদ্ধতিতে নির্মিত, যেখানে বর্গাকার ভিত্তিকে অষ্টভূজাকৃতিতে রূপান্তরের মাধ্যমে তার উপর গম্বুজ বসানো হয়। চুন-সুরকি নির্মিত আড়াই ফুট প্রস্থের দেয়ালের বাইরের দিকটা চিনামাটির পাত্রের ভাঙা টুকরো দিয়ে সজ্জিত । এ পদ্ধতিকে ‘চিনি টিকরী’ বা চিনি দানার কাজ বলা হয়। ঠিক যেমনটি ঢাকার তারা মসজিদ ও দেওয়ানবাড়ি মসজিদে বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
চারটি কোণের পার্শ্ব বুরুজ অষ্টাভূজাকৃতির। অলংকৃত পাত্রসদৃশ ভিতের উপর দাঁড়ানো স্তম্ভগুলোর শীর্ষ ছাদ পেরিয়ে উর্ধ্বদিগন্তে খানিকটা সরু হয়ে বিস্তৃত। বুরুজগুলোর শীর্ষভাগে রয়েছে ছত্রী, তারপর ফুটন্ত পদ্মের নকশাবেষ্টিত ক্ষুদ্রাকৃতির গম্বুজ, শীর্ষচূড়ায় রয়েছে সুদৃশ্য ফিনিয়াল । শ্বেত শুভ্র পুরু দেয়ালের বহিরাভরণে চিনি টিকরীর ব্যবহার অনন্য রূপময়তায় প্রতিভাত করে তুলে মসজিদটিকে। গম্বুজের গায়ে সাদা ও নীলের মেলবন্ধনে ঝুলন্ত পাতা ও ঝাঁড়বাতির নকশা দেখা যায়। মেঝে উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে দুর্লভ মার্বেল পাথর।
প্রতিটি খিলানপথের উপরে জালি করা ডিজাইনে রঙিন কাঁচের ব্যবহার ছিলো, যেগুলো এখন আর আগের মতো নেই। মিহরাবের অংশে ফুলেল নকশাখচিত সবুজ টাইলস ব্যবহৃত হয়েছে। মসজিদের বহির্ভাগে বদ্ধ কুলুঙ্গি প্যানেল প্রাচীন মসজিদ স্থাপত্য ঐতিহ্যের চিহ্ন বহন করে। লালচে, সোনালী ও নীলাভ সিরামিক টুকরোর ব্যবহারে ফুটিয়ে তুলা হয়েছে বাহারি ডেকোরেটিভ প্যাটার্ন। কার্ণিশের উপর ফুটন্ত পদ্মপাতার মোটিফে সজ্জিত প্যারাপেট অনন্য মাত্রা যোগ করেছে মসজিদের নন্দননির্মাণে। নানাবিধ ঐতিহ্যিক উপকরণের নিপুণ ব্যবহার যথার্থ ব্যঞ্জনায় রচিত হয়ে তখনকার ওস্তাগর শিল্পীদের দক্ষতার পরিচয় বহন করছে।

মসজিদটির নির্মাতা আলহাজ্ব আব্দুল্লাহ ঠিক কী কারণে এ অঞ্চলে একটি মসজিদ নির্মাণে ব্রতী হলেন সে নিয়ে লোকমুখে বিভিন্ন কথা শোনা যায়। তবে পরিবারের দেওয়া তথ্যমতে, এ অঞ্চলের একজন মানুষের জন্যে সেকালে হজ্ব করতে যাওয়া অতো সহজ কথা ছিলো না। অগাধ ধর্মীয় অনুরক্তি থেকে হাজী আব্দুল্লাহ হজ্বে যাওয়ার মনস্থ করেন। সে সময়েই তার মনোবাসনা জাগে একটি মসজিদ নির্মাণের। হজ্ব থেকে ফেরার পথে কলকাতা হতে দু’জন ওস্তাগর শিল্পী নিয়ে দেশে আসেন। তাদেরকে প্রকল্প স্থান পরিদর্শন করিয়ে তাদেরই পরামর্শকল্পে মূল নির্মাণকার্য বাস্তবায়নে মনোনিবেশ করেন। এক অনন্য স্থাপত্য সৃষ্টির পেছনের অনুষঙ্গ এটাই।
ধর্মীয় আনুগত্যের পাশাপাশি জ্ঞানচর্চার প্রতি তাঁর অনুরাগ ফুঁটে ওঠে মসজিদের সামনে একটি প্রাথমিক স্কুল ও একটি হাইস্কুল নির্মাণের দ্বারা। যেগুলো অর্ধশতাব্দিরও অধিক সময় ধরে শিক্ষাচর্চায় অসামান্য অবদান রাখছে। তাঁর অবর্তমানে মসজিদটির সার্বিক তত্ত্বাবধান করে আসছেন তাঁর উত্তরসূরীরা। মসজিদটির আনুষঙ্গিক খরচের জন্যে এবং ইমাম সাহেবের ভাতার জন্যে সুনির্দিষ্ট পরিমাণ জমি ওয়াকফ করে গেছেন হাজী আব্দুল্লাহ।
হাজী আব্দুল্লাহর পৌত্র ডা. রুহুল আমিন জানান, ‘নদীর তীরবর্তী হওয়ায় মসজিদটি বর্তমানে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। এক সময় নদীভাঙনের প্রভাবে নিচের মাটি সরে যাওয়ায় ফ্লোরে ব্যবহৃত কিছু মার্বেল পাথর ভেঙে যায়। শতবর্ষ পুরনো স্থাপত্য নিদর্শনটি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে উৎসুক দর্শনার্থীদের মনযোগ কাড়বে এবং নদীভাঙনের কবল থেকে সংরক্ষণ রাখা সম্ভব হবে।’
পাগলার বড় মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ইয়াসিন মৃধা হচ্ছেন হাজী আব্দুল্লাহর আত্মীয়। সিকন্দরপুরের মসজিদটি দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ইয়াসিন মৃধা এরচে’ উঁচু আরেকটি স্থাপনা নির্মাণের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। ফলস্বরূপ একই মহাসিং এর আরেক কূলে নির্মিত হয় এ ঘরানার আরেকটি মসজিদ। পাগলা বড় মসজিদ। বেশ বড়ো এবং দ্বিতল বিশিষ্ট।
সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক ধরে গেলে জাউয়া বাজার পরবর্তী ডাবর পয়েন্ট হতে দক্ষিণদিকের সড়ক ধরে কলকলিয়া হয়ে সড়কের শেষ প্রান্ত কামারখাল গাঙপারে পৌঁছা যায়। সেখান থেকে নৌকাযোগে খানিকটা পশ্চিমে গেলেই সিকন্দরপুর গ্রাম। নদীতীরের ঘাট আর সাদামাটা তোরণ আপনাকে অভ্যর্থনা জানাবে।

 

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  • শতবর্ষের স্থাপত্য সিকন্দরপুর জামে মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  •  আত্মার খাদ্য
  • মানব জীবনে আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা
  • সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ : ইসলাম কী বলে
  • মৃত্যুর আগে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করি
  •   তাফসীর
  • ইসলামে বিনোদনের গুরুত্ব
  • কুরআনে হাফিজের মর্যাদা
  • মদীনা রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকা-ের কেন্দ্র ছিল মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  • এতিম শিশু
  • বার্মিংহামে আল কুরআনের হাতে লেখা প্রাচীন কপি
  • রাসুলের সমগ্র জীবন আমাদের জন্য অনুকরণীয়
  • মৌল কর্তব্য আল-কুরআনের বিধান
  • তাফসিরুল কুরআন
  • ওলীগণের লাশ কবরে অক্ষত থাকে
  • ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার
  • কওমি সনদের স্বীকৃতিতে কী লাভ
  • ইসলামে সংখ্যালঘুর অধিকার
  • Developed by: Sparkle IT