উপ সম্পাদকীয়

ধৈর্যশীলদের জন্য আল্লাহর পুরস্কার নির্ধারিত

মুফতি আবুল কালাম যাকারিয়া প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-১১-২০১৮ ইং ০০:৫৩:১২ | সংবাদটি ৫৭ বার পঠিত

খতিব, দরগাহে হযরত শাহজালাল (রহ.) জামে মসজিদ, সিলেট
মানব জাতির জন্য আল্লাহর শ্রেষ্ঠ উপহার হচ্ছে কুরআনুল কারিম। মানুষের জন্য হেদায়েত স্বরূপ এ গ্রন্থটির অন্যতম সুরা হচ্ছে সুরা আসর। এই সুরাটির আয়াত তিনটি। এটি কুরআনের ছোট সুরাগুলোর অন্যতম। এই সুরাটি ছোট হলেও এর তাৎপর্য ব্যাপকতর। সুরা আসরে মহান রাব্বুল আলামিন সময়ের কসম খেয়ে বলছেন মানুষ বড়ই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে এবং এই ক্ষতি থেকে একমাত্র তারাই রক্ষা পেয়েছে যারা চারটি গুণাবলীর অধিকারী হতে পেরেছে : (১) ঈমান, (২) সৎকাজ, (৩) পরস্পরকে হকের উপদেশ দেয়া এবং (৪) একে অন্যকে সবর করার উপদেশ দেয়া।
এখানে মহান আল্লাহ সময়ের কসম করার যথার্থ যুক্তি আছে। আল্লাহ সৃষ্টিকুলের কোনো বস্তুর শ্রেষ্ঠত্ব, অভিনবত্ব প্রকাশের জন্য কখনও কসম বা শপথ করেননি, বরং যে বিষয়টি অকাট্যভাবে প্রমাণ করতে চেয়েছেন, তার ক্ষেত্রেই তিনি সত্যতা প্রমাণ করতেই কসম খেয়েছেন। সময় খুবই মূল্যবান একটি বিষয়। সময় বলতে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে বোঝায়। এটি কোনো দীর্ঘ সময়ের অর্থে নয়। ভবিষ্যতের গর্ভ থেকে বের হয়ে আসা বর্তমান অতীতে নিপতিত সময়কে বোঝানো হয়েছে।
অতীতের কসম হলো ইতিহাসের সাক্ষ্য। বর্তমানের কসম হলো বর্তমানের অতিবাহিত সময়। মানুষকে কাজের জন্য সময় দেয়া হয়েছে। সময় এক ধরনের মূলধন। মূলধন নামক মানুষের এই সময় দ্রুতই অতিবাহিত হচ্ছে। মানুষকে যে সময় দেয়া হয়েছে তা বরফ গলে যাওয়ার মতো দ্রুত অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে। একে যদি নষ্ট করে দেয়া হয় অথবা ভুল কাজে ব্যয় করা হয় তাহলে সেটিই মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতি। কাজেই চলমান সময়ের কসম খেয়ে এই সূরায় যা বলা হয়েছে তার অর্থ এই যে, এই দ্রুত গতিশীল সময় সাক্ষ্য দিচ্ছে, সূরা আসরে বর্ণিত চারটি গুণাবলীশূন্য হয়ে যে মানুষ যে কাজেই নিজের জীবনকাল অতিবাহিত করে, তার সবটুকুই ক্ষতির সওদা ছাড়া কিছুই নয়। পরীক্ষার হলে যে ছাত্র প্রশ্নপত্রের উত্তর দেয়ার পরিবর্তে অন্য কাজে সময় নষ্ট করেছে, তাকে পরীক্ষার হলে টাঙানো ঘড়ির কাঁটা বলে দিচ্ছে তুমি নিজের ক্ষতি করছো। যে ছাত্র এই সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত নিজের প্রশ্নপত্রের জবাব দেয়ার কাজে ব্যয় করেছে একমাত্র সেই লাভবান হচ্ছে। আর রেজাল্টের দিন সেই ছেলেটিই সফলতা অর্জন করবে।
সময় মূলত আমাদের জীবন বা হায়াত। সময় বা হায়াত একটি বড় নেয়ামত। হায়াত যতক্ষণ আছে সব কিছুর মূল্য আমাদের কাছে আছে। হায়াত আছে বলেই আমি ‘আমার’ বলে দাবি করি। আমরা কোনো বস্তুর গুরুত্ব বোঝাতে আল্লাহ তায়ালার শপথ করি। আর আল্লাহ তায়ালা যখন কোনো জিনিসের গুরুত্ব বোঝাতে চান তখন ওই বস্তুর শপথ করেন। সময়ের গুরুত্ব বুঝাতেই আল্লাহ তায়ালা সময়ের কসম করেছেন, ‘কসম সময়ের, নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে, তারা ছাড়া যারা ঈমানদার, সৎ কর্মশীল, পরস্পরকে সত্যনিষ্ঠার নির্দেশ প্রদানকারী এবং ধৈর্য ধারণকারী ও অবিচল।’ (সূরা আসর : ১-৩)। আলোচ্য সূরার মাঝে চারটি কর্মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ সময়ের গুরুত্ব কর্মের কারণেই হয়ে থাকে। কর্মের মধ্যে ভালো-মন্দ উভয় ধরনের বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে রয়েছে এর জন্য পূর্ণ প্রতিফলের ব্যবস্থাও। ইসলাম মানুষকে সময়ের ব্যাপারে সচেতন হতে নির্দেশ দেয়। মনে করিয়ে দেয়া হয় যে, এ পার্থিব জীবন নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী। হায়াতের পরিধি কতটুকু এবং কখন আসবে মৃত্যুর পরোয়ানা তা জানা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। এরশাদ হচ্ছে, ‘প্রত্যেক সম্প্রদায়ের একটি প্রতিশ্রুত সময় রয়েছে। যখন তাদের সময় এসে যাবে, তখন তারা না এক মুহূর্ত পিছে যেতে পারবে, আর না এগিয়ে আসতে পারবে। সময়ের মূল্যায়ন যদি আমরা করি তাহলে দুনিয়া ও আখেরাতের ক্ষতিগ্রস্ততা থেকে আমারা বাঁচতে পারবো।
একজন মানুষ যদি অনাহারে সময় কাটায় কিন্তু আখেরাতের জীবন যদি তার সুখের হয় অবশ্যই সে ক্ষতিগ্রস্ত নয়। ক্ষতিগ্রস্ত সেই মানুষ যে মানুষের আখেরাতে সুখের নয়, অর্থাৎ যে মানুষ আখেরাতের সফলতা অর্জন করতে পারেনি।
ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে দু’টি গুণ ওয়াল মানুষ; যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে তারা পরস্পরকে হক কথা বলা, হক কাজ করা এবং ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিতে হবে। ঈমান আনা, অর্থাৎ শুধুমাত্র মুখে স্বীকার করলেই তাকে ঈমান আনা বলা হয় না বা ঈমানের দাবি পূরণ হয় না। বরং ঈমানের কিছু ধাপ রয়েছে। তা হলো অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা, তারপর মুখে স্বীকৃতি তথা বিশ্বাস অনুযায়ী মুখে প্রকাশ করা, এবং তা বাস্তবে কাজে পরিণত করা। আল্লাহ বলেন, আসলে তারাই প্রকৃত মুমিন যারা আল্লাহ ও রাসূল (সা:)-এর প্রতি ঈমান এনেছে এরপর কোনরূপ সন্দেহে পতিত হয়নি।
ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে তারা যারা আমলে সালেহ তথা সৎকাজ করে।
প্রশ্ন হলো সৎ কাজ কি? আমলে সালেহ্ মানে যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা ও উপযুক্ততা অর্জন করা, যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জনের কাজ করা, নিজেকে যোগ্য, প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত বানানোর কাজ করা। ধারণ ক্ষমতা ও সক্ষমতা অর্জন করা।
আমলে সালেহ্ মানে সেইসব কাজ, যা উপকারী, সাহায্যকারী, কল্যাণকর, উন্নতি দানকারী; যা সুবিধা দানকারী, ফলদায়ক, লাভজনক। আমলে সালেহ্ মানে পরামর্শ করে কাজ করা, উপদেশ গ্রহণ করা, স্বীকৃত পন্থায় কাজ করা। আমলে সালেহ্ মানে ভদ্র, সৌজন্যমূলক এবং সুন্দর ও চমৎকার আচরণ করা।
এরপরে রয়েছে পরস্পরকে হকের উপদেশ দেয়া এমন কথা ও কাজ যাকে শরিয়ত হারাম, অপছন্দ ও ঘৃণা করে হারাম সাব্যস্ত করেছে। উপরোক্ত সংজ্ঞাকে সামনে রাখলে আমরা দেখতে পাব যে শরিয়তের মৌলিক ও আনুষঙ্গিক সব বিষয় যেমন আক্বিদা-বিশ্বাস, ইবাদত, আখলাক-সুলুক ও মুআমালাত-ফরয হোক বা হারাম, মোস্তাহাব কিংবা মাকরূহ-সবই উভয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এগুলোর মধ্যে যা ভাল ও কল্যাণকর তা মারূফের অন্তর্ভুক্ত আর যা খারাপ ও অকল্যাণকর মুনকারের অন্তর্ভুক্ত।
আমার বিল মারূফ ও নেহি আনিল মুনকার ওয়াজিব। এ মর্মে অনেক আয়াত ও অসংখ্য হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তা ছাড়া এ ব্যাপারে উম্মতের ইজমাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে এটি ওয়াজিবে কেফায়া। উম্মতের যথেষ্ট পরিমাণ অংশ এ দায়িত্ব পালন করলে অন্যদের থেকে গুনাহ রহিত হয়ে যাবে। কুরআনে আছে আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত, যারা সৎকাজের প্রতি আহ্বান করবে, নির্দেশ করবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে। আর তারাই হল সফলকাম। (সূরা আলে ইমরান : ১০৪) আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের বন্ধু। তারা ভাল কাজের নির্দেশ দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করে। এদেরই উপর আল্লাহ তাআলা দয়া করবেন।
সবার শেষে রয়েছে একে অন্যকে সবর করার উপদেশ দেয়া। হকের নসিহত করতে গিয়ে বা হকের সমর্থন করতে গিয়ে যে সব সমস্যা ও বাধার মুখে নিপতিত হতে হয় তার মোকাবেলায় তারা পরস্পরকে অবিচল ও দৃঢ় থাকার উপদেশ দিতে থাকবে। হক এবং বাতিলের দ্বন্দ্ব চিরন্তন। যেখানেই হক সেখানেই বাতিল আঘাত হানার চেষ্টা করে। হক তথা সত্য পথে থেকে সফলতা অর্জন করতে গেলে বাধা-বিপত্তি আসবেই। ধৈর্যের সাথে তার মোকাবেলা করতে হবে। আর ধৈর্যশীলদের জন্যই আল্লাহর পুরস্কার নির্ধারিত।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • পরিবহন নৈরাজ্য
  • মাদকবিরোধী অভিযান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
  • ছড়াকার বদরুল আলম খান
  • একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিগত দশটি নির্বাচন
  • বইয়ের বিকল্প প্রযুক্তি নয়
  • আগুনের পরশমণি ছোয়াও প্রাণে
  • বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যা
  • জনসচেতনতাই পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে পারে
  • এক শারীরিক প্রতিবন্ধীর কথা
  • এই অপসংস্কৃতির অবসান হোক
  • সৈয়দ সুমন আহমদ
  • পানিশূন্য তিস্তা
  • বিদ্যুৎ প্রিপেইড মিটারের গ্যাড়াকলে গ্রাহকরা : দায় কার?
  • পরিবহন ধর্মঘট এবং জনদুর্ভোগ
  • পানি সমস্যা সমাধানে নদী খনন জরুরি
  • শব্দসন্ত্রাস
  • মাধবপুর : যাতায়াত দুর্ভোগ
  •   তাফসীরুল কুরআন
  • ধৈর্যশীলদের জন্য আল্লাহর পুরস্কার নির্ধারিত
  • প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমান (রাহ.) ও সাদাকায়ে জারিয়া
  • Developed by: Sparkle IT