উপ সম্পাদকীয়

মাধবপুর : যাতায়াত দুর্ভোগ

মোঃ জহিরুল আলম শাহীন প্রকাশিত হয়েছে: ১০-১১-২০১৮ ইং ০০:০৯:০১ | সংবাদটি ৪৯ বার পঠিত

সুপ্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যবাহী চা’য়ে সবুজে, ধনে ধানে ফুলে ফলে ভরা, প্রাকৃতিক সম্পদে ঘেরা, পাহাড় টিলায়, অপরূপ রূপসী প্রকৃতির বৈচিত্রের লীলাভূমি হবিগঞ্জ জেলা। পীর আউলিয়াদের পদস্পর্শে ধন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রাণী হবিগঞ্জ জেলা বাংলাদেশের প্রাচীন জনপদ। বৃহত্তর সিলেট জেলার প্রবেশ দ্বার হিসেবে বিবেচিত ইতিহাস-ঐতিহ্য প্রাকৃতিক সম্পদ শিক্ষা, আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অধিকারী এ জেলার একটি উল্লেখযোগ্য উপজেলা মাধবপুর। ভৌগলিক অবস্থান, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এ উপজেলার জমিন এবং কীর্তিমান পুরুষদের অবদান দেশের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। আসাম প্রাদেশিক সরকারের এক গেজেটে নোটিফিকেশন মোতাবেক ১৮০৪ সালে মাধবপুর থানা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। হবিগঞ্জ শহর থেকে ৫৯ কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে মাধবপুর উপজেলা অবস্থিত। স্বাধীনতা যুদ্ধের ঊষালগ্নে ৪ঠা এপ্রিল ১৯৭১ ইংরেজি তারিখে বাংলা মায়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর সেনানীরা এই মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ‘ডাক বাংলাতে’ শপথ বাক্য পাঠ ও যুদ্ধ পরিচালনার নকশা প্রণয়ন করেছিলেন। তাই মাধবপুর উপজেলা ইতিহাসের পাতায় গৌরব উজ্জ্বল স্থান দখল করে আছে।
এমন সুনামধন্য তথা বিশ্বের বুকে পরিচিত উপজেলাটির বর্তমান যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই করুণ। এ উপজেলার প্রায় রাস্তাঘাটই ভাঙ্গা আর গর্তে ভরা। যা যোগাযোগের ক্ষেত্রে যানবাহন চলাচল করা সম্ভব হচ্ছে না। বৃটিশ আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ এবং দেশের শিক্ষা সংস্কৃতি, অর্থনীতি সকল ক্ষেত্রে এ জনপদের মানুষের অবদানের শেষ নেই। দেশের উন্নয়নের মহাসড়কে এ উপজেলার মানুষের অবদান অতুলনীয়। কিন্তু এ উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কোনো ছোঁয়া লাগেনি। দৃশ্য পটে মনে হয় এ অঞ্চলের জনগণের নাগরিক সুযোগ সুবিধা দেখার কেউ নেই। উপজেলার রাস্তাঘাটগুলোর অবস্থা দেখলে মনে হয় যেন আফ্রিকার জঙ্গি রাস্তা। বিশেষ করে মাধবপুর সদর থেকে দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের জনগণের একমাত্র চলাচলের মাধবপুর-ধর্মঘর, হরষপুর, মাধবপুর কাসিম নগর, মাধবপুর চেঙ্গার বাজার, চৌমুহনী, কাসিমনগর, মনতলা রাস্তাগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। রাস্তার কোনো কোনো স্থানে ইট বা পাথরের কোনো চিহ্ন নেই। রাস্তায় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে যাতে বৃষ্টির পানি জমে ছোট পুকুরের মতো মনে হয়। অতিগুরুত্বপূর্ণ মাধবপুর-ধর্মঘর-হরষপুর রাস্তাটি এত পরিমাণে খারাপ যে ছোট বড় যে কোনো গাড়ি চলাচলে হেলেদুলে চলতে হয়। মনে হয় দুর্গম পাহাড়ি রাস্তা।
যোগাযোগ ব্যবস্থা যে কোনো স্থানের উন্নয়নের বড় নিয়ামক। যাতায়াতের পথ সুষ্ঠু ও সুন্দর করতে পারলে সেই এলাকা উন্নয়নের সিঁড়ি বেয়ে জনগণের জীবন ধারায় সুখ শান্তি বয়ে আনে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সেই সাথে এলাকার শিক্ষা, হাট বাজারের ব্যবস্থা বাণিজ্যের উন্নয়ন ঘটতে থাকে। ফলে এলাকার কৃষিজ পণ্যের রপ্তানির বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হয়। এতে এলাকার কাঁচামাল শাক-সবজি সহ নানা ফসলাদি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাটবাজারে পৌঁছানোর মাধ্যমে বিরাট আয়ের পথ সৃষ্টি হয়। রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে দীর্ঘ দিন হতে এমন সুযোগ সুবিধা হতে মাধবপুর উপজেলাবাসী বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে উপজেলাবাসীর কৃষক সম্প্রদায় দিন দিন অর্থনৈতিক দিক থেকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উপজেলা সদর হতে ধর্মঘর পর্যন্ত দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার আর ধর্মঘর হতে হরষপুর পর্যন্ত দূরত্ব ৫ কিলোমিটার। মোট ২১ কিলোমিটার রাস্তার আশেপাশে প্রায় ১৪৯টি গ্রামের মানুষের একমাত্র উপজেলা ও দেশের অন্যান্য স্থানের সাথে যোগাযোগের মাধ্যম এ রাস্তাটি। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আর শত শত নানা যানবাহন এই রাস্তার বুকে চলাচল করতে হয়। তাছাড়া কৃষি কাজের নানা জাতের সবজি ও ধান উৎপাদনে এ উপজেলা উল্লেখযোগ্য। মনতলা, চৌমুনী, ধর্মঘর, হরষপুর হতে শত শত মন নানা শাকসবজি, তরিতরকারি দেশের রাজধানী সহ বিভিন্ন জেলা সদরে, বিভাগে রপ্তানি করা হয়। যা দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকাররা এ উপজেলার উক্ত হাট বাজার হতে সকাল-বিকাল সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। সুতরাং এ অঞ্চলের মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন সুখী-সমৃদ্ধির বড় একটি খাত এ ফসলাদি।
বর্তমানে রাস্তার করুণ অবস্থার কারণে বিভিন্ন পণ্য পরিবহন করা যাচ্ছে না। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানের পাইকারি ব্যবসায়ীরা এখন আর এসে মালামাল নিতে চায় না। এতে অঞ্চলের কৃষি খাতের ফসলাদি বিক্রি করতে পারছে না। বিক্রি করলেও উপযুক্ত মূল্য পাচ্ছে না। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষকরা। আর চাষীরা ও ক্ষেত থেকে ফসলাদি বাজারে নিতে পারছে না। তাছাড়া আশেপাশের প্রাথমিক মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ সমূহের শত শত শিক্ষার্থীর চলাচলের মারাত্মক অসুবিধায় চলাচল করছে। যোগাযোগের অসুবিধার কারণে দূরের কোনো শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে ও কলেজে যেতে পারছে না। বাহিরের কোনো গাড়ির চালক উক্ত রাস্তায় আসতে বা যেতে চায় না। এতদঅঞ্চলের জনগণের বিশেষ কাজ না থাকলে এ রাস্তা দিয়ে বের হতে চায় না। অপর দিকে বিশেষ অসুবিধায় দিন পার করছে চাকরিজীবিরা। উক্ত উপজেলার দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের চাকরিজীবিরা দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মরত। অনেকেই নিজ জেলার ও অন্যান্য জেলার কর্মস্থলে প্রতিদিন আসা যাওয়া করতে হয়। রাস্তা ভাঙ্গা থাকার কারণে খুব কম সংখ্যক গাড়ি চলাচল করে। ফলে গাড়ি পাওয়া যায় না আর গাড়ি পেলেও সঠিক সময়ে গন্তব্য স্থানে পৌঁছা সম্ভব হয় না। এ ভোগান্তির যেন শেষ নেই।
জনগুরুত্বপূর্ণ এ সড়কটি মেরামতের কাজ জরুরি ভিত্তি বা বিশেষ ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ করা খুবই প্রয়োজন। সড়ক ও জনপথ বিভাগ এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করা অতীব জরুরি। এ ছাড়া এ উপজেলার কৃতি সন্তান, জ্ঞানী-গুণী, স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গ দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, দপ্তর, অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ বিভাগে কর্মরত আছেন। এ লেখাটি যদি কারো নজরে আসে তাহলে আমাদের আকুল আবেদন সর্বমহলের সহযোগিতায় অত্যন্ত অবহেলিত এ অঞ্চলের জনগণের দুঃখ দুর্দশার কথা বিবেচনা করে অন্তত যোগাযোগের জন্য রাস্তাটি আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নতুনভাবে তৈরী করার ব্যবস্থা করবেন। তাছাড়া উক্ত উপজেলার নির্বাচিত শ্রদ্ধেয় মাননীয় সংসদ সদস্য রাস্তাটির দিকে নজর দিবেন। আপনি এ অঞ্চলের জনগণের সুখ-দুঃখের কান্ডারী। আপনার হাতের ছোঁয়ায় জনগণের ভোগান্তি পথ শান্তির পথে পরিণত হতে পারে বলে আমরা মনে করি। আর জনগণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করবে, মনে রাখবে এবং প্রতিদানও দেবে। পরিশেষে বলব সরকারের কর্তব্য হওয়া দরকার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এবং সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের প্রতি নজর দেওয়া। এমনটাই প্রত্যাশা উপজেলাবাসীর ।
লেখক : শিক্ষক ও কলাম লেখক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • পরিবহন নৈরাজ্য
  • মাদকবিরোধী অভিযান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
  • ছড়াকার বদরুল আলম খান
  • একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিগত দশটি নির্বাচন
  • বইয়ের বিকল্প প্রযুক্তি নয়
  • আগুনের পরশমণি ছোয়াও প্রাণে
  • বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যা
  • জনসচেতনতাই পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে পারে
  • এক শারীরিক প্রতিবন্ধীর কথা
  • এই অপসংস্কৃতির অবসান হোক
  • সৈয়দ সুমন আহমদ
  • পানিশূন্য তিস্তা
  • বিদ্যুৎ প্রিপেইড মিটারের গ্যাড়াকলে গ্রাহকরা : দায় কার?
  • পরিবহন ধর্মঘট এবং জনদুর্ভোগ
  • পানি সমস্যা সমাধানে নদী খনন জরুরি
  • শব্দসন্ত্রাস
  • মাধবপুর : যাতায়াত দুর্ভোগ
  •   তাফসীরুল কুরআন
  • ধৈর্যশীলদের জন্য আল্লাহর পুরস্কার নির্ধারিত
  • প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমান (রাহ.) ও সাদাকায়ে জারিয়া
  • Developed by: Sparkle IT