পাঁচ মিশালী

এসেছে হেমন্ত! বাজিছে সুর...

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ১০-১১-২০১৮ ইং ০০:১১:২২ | সংবাদটি ৩১ বার পঠিত

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়- হায় হেমন্তলক্ষ্মী তোমার নয়ন কেন ঢাকা/ হিমের ঘন ঘোমটাখানি ধূসর রঙে আঁকা/ সন্ধ্যাপ্রদীপ তোমার হাতে/ মলিন হেরি কুয়াশাতে/ কন্ঠে তোমার বাণী যেন করুণ বাষ্পে মাখা/ ধরার আঁচল ভরে দিলে প্রচুর সোনার ধানে/ দিগঙ্গনার অঙ্গন আজ পূর্ণ তোমার দানে...।
হেমন্তকে সবচেয়ে বেশি চেনা যায় ভোরের শিশিরে। পাতার গায়ে জমে থাকা শিশির বিন্দু এক অপার্থিব দৃশ্যমালা রচনা করে। এই হেমন্তের দুই রূপ প্রতিভাত হয়। প্রথম মাসটির এক রূপ। পরের মাসের অন্য রূপ। এক সময় হেমন্তের প্রথম মাসটি ছিল অভাবের। কারণ, ফসল হতো না। বিভিন্ন জেলায় খাদ্যের অভাব দেখা দিতো। এই সময়ে এসে সারা বছরের জন্য জমিয়ে রাখা ধান ফুরিয়ে যেতো। তাই কার্তিক মাসকে বলা হতো- ‘মরা কার্তিক’। রবি ঠাকুরের কবিতায়ও মন্দাক্রান্ত কার্তিক মাসের আভাস পাওয়া যায়। কবি লিখেছেন- শূন্য এখন ফুলের বাগান/ দোয়েল, কোকিল গাহে না গান/ কাশ ঝরে যায় নদীর তীরে...।
অগ্রহায়ণ মাসে আবার ভিন্ন চিত্র চোখে পড়ে। কারণ, নবান্নের এ মাস সমৃদ্ধি ও জাগরণের। মাঠের সোনালি ধান এ সময় কাটা শুরু হয়। গোলা ভরে ওঠে কৃষাণ-কৃষাণির। পাকা ধানের মৌ-মৌ গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়ায়। গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনা নতুন ধানে ভরে ওঠে। আর সেই ধান মৃদু হেসে কৃষাণ বউ শুকাতে ব্যস্ত থাকে। অপরূপ সে দৃশ্য। জীবন ও প্রকৃতিতে হেমন্ত এক আশ্চর্য সময় নিয়ে আসে। প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায়- লিপি কাছে রেখে ধূসর দ্বীপের কাছে আমি/ নিস্তব্ধ ছিলাম বসে/ নিমের শাখা থেকে একাকীতম এক পাখি নামি/ উড়ে গেলো কুয়াশায়/ কুয়াশার থেকে দূর কুয়াশায় আরো... দিনে দিনে বদলে যাচ্ছে সেই হিসাব-নিকাশ। আগের সে কুয়াশাও এখন বেশি নেই। খুব অল্প কুয়াশা থাকে। মানুষের সেই অভাবও এখন আগের মতো চোখে পড়ে না। গ্রামে অভাবি লোক খুব কম পাওয়া যায়। কৃষকরা এখন প্রায় সারা বছরই ব্যস্ত থাকেন। নানা ধরনের ফসল ফলানো নিয়ে ব্যস্ত থাকেন কৃষকরা। তা ছাড়া এখন কার্তিক মাসেই রিষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠে আগাম আমন ধানের সোনা রঙা শীষ। পুরো অগ্রহায়ণ মাসজুড়ে তাই সারা দেশের গ্রামাঞ্চলে এমন কি শহরাঞ্চলের কোথাও কোথাও এখন নবান্ন উৎসব চলে বেশ জমকালো আয়োজনে। নাড়ির টানে অনেক প্রবাসিও এই সময় দেশে আসেন পরিবার পরিজন নিয়ে। মধুর পরিবেশ তৈরি হয় চারপাশে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের ফলে প্রকৃতিও যেন আর আগের নিয়ম মানতে নারাজ। খামখেয়ালী হয়ে উঠছে প্রাকৃতিক ঋতু ও পরিবেশ। দেশের আবহাওয়াবিদদের মতে, এখন থেকে যতো দিন যাবে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ও সর্বনি¤œ তাপমাত্রার পার্থক্য ততোই কমতে থাকবে। আর এই পার্থক্যটা যতো কমতে থাকবে, শীত ততোই বাড়তে থাকবে।
জলবায়ু নিত্য বদল হবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই পরিবর্তনের সাথে আমাদের মন- মানসিকতাগুলোও পরিবর্তন করতে হবে। পোষাকে আশাকে মডার্ণ, কিন্তু মনের গহীনে অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার রেখে চললে হবে না।
মনকে আলোকিত করতে হেমন্তের রূপ প্রত্যক্ষ করে হাঁটতে হবে সুন্দর আগামীর পথে। যেতে হবে হেমন্তের তীব্র বাতাসের মতো দূর অজানায়! দূর অজানায়!
হেমন্ত এসেছে প্রকৃতিতে। তাই মাতাল সুরে বাজিছে গান- একই অপরূপ রূপে মা তোমার/ হেরিনো পল্লী জননী!/ ফুলে ও ফসলে/ কাদা-মাটি জলে টলমল করে লাবণী/ হেরিনো পল্লী জননী/ হেরিনো পল্লী জন-নি.....।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT