পাঁচ মিশালী

পান

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১০-১১-২০১৮ ইং ০০:১৬:৪৮ | সংবাদটি ৪৩ বার পঠিত

পান একটি পর্ণ শব্দ। পর্ণ শব্দের অর্থ পাতা। গ্রীষ্মকালীন অঞ্চলের এক প্রকার গুল্মজাতীয় গাছের পাতা। আর্য এবং আরবগণ পানকে তাম্বুল নামে অভিহিত করতো। প্রাচীনকালের বাংলাদেশে পানকে ‘বর’ বলা হতো- শব্দটি প্রাচীন এ দেশের অধিবাসীদের। এই বর থেকেই বরজ শব্দ হয়েছে। যার অর্থ পানের বাগান। যারা পান চাষের সাথে জড়িত, তাদের ‘বারুই’ বলে- যার মধ্যে ‘বর’ শব্দটি আছে।
নিশ্বাসকে সুরভিত করা এবং ঠোঁট ও জিহ্বাকে লাল করার জন্য মানুষ পান খায়। অবশ্য পানে কিছুটা মাদকতার আনন্দও বিদ্যমান, প্রধানত দক্ষিণ এশিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চলের রাষ্ট্রসমূহ, দক্ষিণ পূর্ব-এশিয়া, উপ-সাগরীয় অঞ্চলের মানুষ পান খায়। কেবল স্বভাব হিসেবেই নয়, বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে সামাজিক রীতি, ভদ্রতা এবং আচার-আচরণের অংশ হিসেবেই পানের ব্যবহার চলে আসছে। অনুষ্ঠানাদিতে পান পরিবেশন দ্বারা প্রস্থানের সময় ইঙ্গিত করা হয়। উৎসব, পূজা, পুণ্যাহে পান বাংলাদেশের জনজীবনে অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাচীন অভিজাত জনগোষ্ঠীর মাঝে পান তৈরী এবং তা সুন্দরভাবে পানদানিতে সাজানো লোকজ শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পেত।
অতীতে বাংলার সকল অঞ্চলেই পান চাষ করা হতো, যদিও পান উৎপাদনের ক্ষেত্রে দিনাজপুর, রংপুর, চট্টগ্রাম জেলা ছিল বিখ্যাত। প্রাচীন বাংলার সওদাগররা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বাণিজ্য করে পানের বদলে মরকত মণি এবং সুপারীর বদলে মাণিক্য নিয়ে আসতেন। বাংলাদেশের বহু লোক-ছড়া ও প্রবাদ প্রবচনে পান সুপারির কথা আছে।
পান চাষের জন্য যেমন বিশেষ ধরনের জমির প্রয়োজন তেমন প্রচুর যতেœরও দরকার হয়। পান চাষের জন্য নির্বাচিত জমি সাধারণত উঁচু, মাটির ধরন একটু শক্ত এবং জলাশয়, পুকুর ইত্যাদির ধারে কাছে হওয়া দরকার। পানের বাগানকে বলা হয় বরজ এবং একটি বরজের আয়তন সাধারণত বারো থেকে কুড়ি শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকে।
পানের বরজ তৈরীর জন্য পাশের কোনো জমি থেকে মাটি কেটে বরজের স্থানে ফেলে জায়গাটিকে উঁচু করে নিতে হয়। প্রথাগতভাবে বরজে সরিষার খৈল, গোবরকে সার হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে প্রচলিত জৈবসারের সাথে রাসায়নিক সারও ব্যবহার হচ্ছে। চাষের উপযোগী করে জমিকে তৈরী করার পর মে ও জুন মাসে পানের লতা রোপণ করা হয়। মাঝখানে দুই ফুট দূরত্ব রেখে চারাগুলি সমান্তরাল লাইনে রোপন করা হয় এবং পরে বাঁশের শলা খুঁটি পুঁতে তার সাথে পানের লতাগুলি জড়িয়ে দেওয়া হয়। রোদ এবং গরু ছাগলের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বরাজের চারিদিকে ৫/৬ ফুট উঁচু বাঁশের শলা ও খুঁটি দিয়ে বেড়া এবং একই সামগ্রী দিয়ে উপরে মাচান তৈরি করা হয়। চারা রোপণের এক বছর পর পান আহোরণের উপযোগী হয় এবং বরজ তৈরির পর কয়েক বছর পর্যন্ত তা থেকে উৎপাদন অ্যাহত থাকে।
আকার, কোমলতা, ঝাঁজ, সুগন্ধ ইত্যাদির বিচারে বহু ধরনের পান রয়েছে। প্রত্যেক জেলার অন্তত এক ধরনের পানের সাথে পানসেবীরা পরিচিত। অতীতে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ এলাকায় কর্পূরের গন্ধবিশিস্ট ‘কাকুরি’ নামের এক প্রকার অতি উন্নতমানের চমৎকার পান উৎপাদিত হতো। তখন এই পান কলকাতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে রপ্তানি করা হতো। বর্তমানে আরও বেশি লাভজনক জাতের পান চাষ শুরু হওয়ার কারণে এই জাতের পান এখন বিলুপ্তির পথে। মানের দিক থেকে এর পরেই পার্বত্য চট্টগ্রামে উৎপাদিত সাঁচি পানের স্থান। এছাড়া সাধারণ জাতের পানের মধ্যে রয়েছে বাংলা, ভাটিয়াল, চাল ভোগা এবং ঘাস পান ইত্যাদি। সাধারণত পানের সাথে চুন এবং সুপারি মিলিয়ে খাওয়া হয়। অনেকে আবার পানের সাথে ধনিয়া, এলাচি, দারচিনি এবং অন্যান্য সুগন্ধী দ্রব্য মেশায়।
পানের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ওপর ভিত্তি করে বারুই নামের একটি পেশাজীবী গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটেছে। পান উৎপাদনের জন্য যারা বরজ তৈরি করে তারা কালক্রমে বারুই নামের একটি পেশাজীবী শ্রেণির সৃষ্টি করেছে। যেহেতু বরাজ তৈরি মুসলমানদের আগমনের পূর্বের পেশা। সে কারণে মূলত সকল বারুই ছিল হিন্দু এবং সমাজে তাদের স্থান শ্রেণি বিন্যাসে বেশ উপরেই ছিল। উনবিংশ শতাব্দীতে অনেক বারুই জমিদারি ও তালুকদারির মালিক হয়। মুসলমান শাসন আমলে কৃষকদের মধ্যে বারুই শ্রেণি ছিল সবচেয়ে ধনী। ১৮৭২ এবং ১৮৮১ সালের আদমশুমারিতে দেখা যায় যে, সবচেয়ে বেশি পান উৎপাদনকারী বারুই বসবাস করত বর্ধমান, মেদিনীপুর, যশোর এবং ঢাকা জেলায়। ১৯৪৭ সাল থেকে বহু পানের বরজই আসল বারুইদের হাতছাড়া হয়ে যায় অথবা তারা বিক্রি করে দেয় এবং এগুলি মুসলমান বিনিয়োগকারীরা কিনে নেয়। বর্তমানে পান উৎপাদনের সিংহভাগই হচ্ছে মুসলমান কৃষকদের হাতে। তবে উৎপাদন কৌশল অপরিবর্তিত রয়েছে।
পানে এক ধরনের সুগন্ধ থাকার কারণে পানের বরজ ক্ষতিকর প্রাণী বা কীটপতঙ্গ দ্বারা কখনও আক্রান্ত হয় না। সুতরাং পান বরজের আয় নিশ্চিত। এক সময় পানের বরজ থেকে আয় এতই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হতো যে, বাংলার সুবাহদার আজিম উস শন পান চাষকে ‘সাউদিয়া খাস’ নামে একচেটিয়া রাজকীয় ব্যবসায় পরিণত করেন। ১৭৫৫ সালে রবার্ট ক্লাইভ দেওয়ানী লাভের পর তিনিও ১৯৬৭ সালে পান চাষকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া ব্যবসায় পরিণত করেন। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পানের বাজার রয়েছে। এই বাজার প্রসারে দুটি বিষয় কাজ করছে। প্রথমত দক্ষিণ এশিয়ার পান সেবীদের বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া, দ্বিতীয়ত পানের ভেষজ গুণাগুণের বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি। পান পাতায় বেশ কিছু পরিমাণ ভিটামিন ‘সি’ আছে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT