পাঁচ মিশালী

আপেক্ষিক আক্ষেপ

মো. আবদুল বাসিত প্রকাশিত হয়েছে: ১০-১১-২০১৮ ইং ০০:১৭:৪২ | সংবাদটি ১২৩ বার পঠিত

ছোট্ট মেয়ের প্রচন্ড পেট ব্যথা, মা মেয়েকে নিয়ে ছুটছেন ডাক্তারের দিকে। পথে হোঁচট খেয়ে মেয়েটি পড়ে গেল, হাঁটুতে ব্যথা পেল একটু। হাতে থাকা ২৫০ এমএল সোডাভর্তি বোতল গেল ভেঙ্গে। মেয়ে আমার বোতল, আমার বোতল বলে কান্না জুড়ে দিল। পায়ের ব্যথা, পেটের ব্যথা ভুলে বোতল শোকে কাতর মেয়ে!-- কিন্তু কথা সেটা না..
ছোটদের সাথে আমি তর্কে যাই না, বড়দের সাথেও তর্ক করি না, কারণ তাতে তাদের ছোট করা হয়। ছোটদের সাথে তর্কে জড়াই না কারণ তাতে নিজেকে ছোট করা হয়। ছোট-বড় কোনটাই হতে মন চায় না! তাতে কেউ ভাবে এই, কেউ ভাবে সেই, আমি ভাবি আমার মতো। কিন্তু কথা সেটাও না।
কথা হলো আমাদের স্বভাবটাই এমন হয়ে গেছে, মূল ছেড়ে ডাল পালায় ঝুলাঝুলি! সাবজেক্ট-অবজেক্ট বাদ দিয়ে এডজেক্টিভ নিয়ে মাতামাতিতে আমরা আনন্দ খুঁজি! সঙ্গত কারণেই আমরা এক পা আগালে তিন পা পেছাই। অন্ধকার পুর্ণিমার গল্প করতে ভালবাসি। এখন আবার মাথা ঘামানো শুরু হবে পুর্ণিমা আবার অন্ধকার হয় কেমন করে?
স্বপ্ন সেটা না, যা আপনি ঘুমিয়ে দেখেন, স্বপ্ন সেটা, যা আপনাকে ঘুমাতে দেয়না। এপিজে আবুল কালামের এই উক্তিটি আমার অসম্ভব ভাললাগার। অবশ্য স্বপ্ন দেখতে হলে যে স্বাপ্নিকতার ছন্দ লাগে সেটাও একটা কথা।
কিছু মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোঁকা বানানো যায়, সব মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোঁকা বানানো যায়। কিন্তু সব মানুষকে সব সময়ের জন্য বোঁকা বানানো যায় না।
যাই হোক, বিষয়টা কিন্তু আপেক্ষিক! আসলে অপেক্ষিক শব্দটাই আপেক্ষিক। যখন কোন বিষয় অন্য কোন বিষয়ের সাথে কার্যকারণ সম্পর্কে আবদ্ধ থাকে তখনই তা আপেক্ষিক। আপনি যদি ভাল শব্দটিকে অনুভূতি হিসেবে ব্যবহার করেন তাহলে সেটা আপেক্ষিক, কারণ পৃথিবীর সব অনুভূতিই আপেক্ষিক। ভাল হচ্ছে খারাপের বিপরীত, তাই খারাপের চেয়ে ভাল কোন কিছু বোঝাতেই ভাল শব্দটির ব্যবহার হয়। তাই ভাল-খারাপ উভয়ই আপেক্ষিক। ভালর পরিমাণ কমতে থাকলে খারাপের দিকে আগায়, আবার খারাপের পরিমাণ কমতে থাকলে ভালর দিকে আগায়, তাই উভয়েই আপেক্ষিক। এখানে আবার আরেকটি আপেক্ষিক বিষয়ের অবতারণা হয়, তা হল আক্ষেপ। ভাল বা মন্দ উভয় থেকেই আক্ষেপের সৃষ্টি হয়। মন্দ হলে ভাল হলোনা’র আক্ষেপ আবার ভাল হলে আরো ভাল না হওয়া বা ভালটা হারিয়ে ফেলার আক্ষেপ। মানুষের জীবনে সদা-সর্বদাই পাইনি, করে উঠতে পারিনি’র আক্ষেপ বিদ্যমান। খুব কম মানুষই আছেন যারা নিজের উপর ভরসা রেখে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবনটা কাঁটাতে পারেন। আর বেশিরভাগ মানুষই সমাজ বাস্তবতার কাছে নতিস্বীকার করেন। শেষ জীবনে সেই আক্ষেপ তাদের থেকেই যায়।
অনেকেই তাদের শক্তি, সামর্থ্য, আবেগকে কাজে লাগিয়ে দম্ভ করে পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়ান। নিজের প্রতি অস্বাভাবিক ও অবাস্তব উঁচু ধারনা নিয়ে এগিয়ে চলেন। কিছুটা সফলতা পেয়েই নিজেকে অনেক বড় ভাবতে শুরু করেন। এরা আবার অসম্ভব ‘ইগো’ সম্পন্ন হোন। এরা নিজের ভুল বুঝতে পারলেও তা স্বীকার করেন না। এদের প্রধান সমস্যা হল তারা যা জানে তার অনেক বেশী জ্ঞানী বলে নিজেদের জাহির করতে চায়। সোজা বাংলায় ‘দুই লাইন বেশী বোঝে’। শেষ জীবনে এদেরকেই সবচেয়ে বেশী আক্ষেপে পুড়তে হয়। ইগো সম্পন্ন মানুষ অন্যের সাফল্য সহ্য করতে পারে না, হিংসায় লিপ্ত হয়। এদেরকে কখনো যুক্তি দিয়ে বোঝানো যায় না। এরা ব্যর্থ হলে ব্যর্থতা থেকে না শিখে বরং পরিস্থিতি বা অন্যের উপর এর দায় চাঁপাতে ভালবাসে। ইগো তাদের জন্য মানসিক প্যারালাইসিস এ পরিণত হয়, যা তাদের বিশ্বাস করায় যে, তিনি শো’য়া অবস্থায়ও উড়ছেন! পরবর্তীতে যা তাকে আক্ষেপের আগুনে নিমজ্জিত করে।
আমরা অনেকেই মনে করি, জীবনটা ভাল করে কাটানোর জন্য অর্থই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই অর্থের পেছনে ছুটে পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে জীবনটা কেটে যায়। এ সমস্ত মানুষ মৃত্যুকালে আক্ষেপ করে যদি পরিশ্রম কম করে জীবনের কিছুটা সময় আনন্দে কাটাতাম। মৃত্যুশয্যায় পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত অনেকেই বুঝে উঠতে পারেন না যে ভাল থাকা, সুখে থাকা, সম্পূর্ণ নিজের উপর নির্ভর করে। নিজের পুরনো ধ্যান-ধারনা নিয়েই জীবনটা কাটিয়ে দেয়ার পর মৃত্যুশয্যায় এই অনুতাপ করেন, হায়! যদি নিজেকে আরেকটু খুশি রাখতে পারতাম!
সর্বদা অন্যকে খুশি রাখার কাজে লিপ্ত লোকেরা অধিকাংশ সময়েই নিজের মনের কথা চেপে রাখেন। এরাও শেষ জীবনে নিজের মনের কথা প্রকাশ করতে না পারার বা না করার আক্ষেপে/অনুতাপে ভুগতে থাকেন। কাজ ও জীবনের ব্যস্ততার কারণে অনেকেই বন্ধুদের সঙ্গ হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু এরাও এক সময় জীবনে সুখের জন্য বন্ধুদের সঙ্গ কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা উপলব্ধি করে অনুতাপে ভুগেন।
আসলে মানুষের জীবনটাই কতগুলো আক্ষেপের সমষ্টি। শৈশব থেকেই শুরু হয় আক্ষেপের। পছন্দের খেলনাটা না পাওয়ার আক্ষেপ, পুরো ম্যাচে ফিল্ডিং করেও বড়দের ভিড়ে ব্যাট না পাওয়ার অক্ষেপ, একটু বড় হলে শুরু হয় পড়ালেখা নিয়ে আক্ষেপ, বাবা-মা’র সেই সোনার সন্তান হতে না পারার আক্ষেপ, আরেকটু বড় হলে পছন্দের মানুষের সাথে কথা বলতে না পারার আক্ষেপ, কিছুদিন পর তাকে অন্যের সাথে ঘুরতে দেখার আক্ষেপ, কিছুদিন পর আবার নিজের অযোগ্যতা বা বাবা-মা’র ইচ্ছার কারণে পছন্দের কিছু না পাওয়া বা করতে না পারার আক্ষেপ। এতসব আক্ষেপের ভিড়েও জীবনটা এগিয়ে চলে। চেয়ে থাকে চোখগুলো নিষ্পাপ অপলক, নিঃশ্বাসি নিরালায়- জীবন তো কেটে গেল ব্যবহৃত হয়ে হয়ে! এবার না হয় ঘুরে দাঁড়াই, ব্যবহার করতে শিখি, আগামীর আয়োজনে, অভিশাপের অভিমুক্তে!

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT