উপ সম্পাদকীয় দৃষ্টিপাত

শব্দসন্ত্রাস

সাধন সরকার প্রকাশিত হয়েছে: ১০-১১-২০১৮ ইং ০০:১৮:৪২ | সংবাদটি ১১৬ বার পঠিত

শব্দদূষণ নামের নীরব ঘাতক রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ‘শব্দসন্ত্রাসে’ রূপ নিয়েছে। রাজধানীতে যেখানে-সেখানে যানবাহনে হর্ন বাজানোর ওপর বিধি-নিষেধ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে, পথে ট্রাফিক জ্যাম থাকলেও অযথা হর্ন বাজানো হচ্ছে। মোটরসাইকেলসহ রাজধানীর অনেক যানবাহনে এখনও ‘হাইড্রোলিক হর্ন’ ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে হাইকোর্ট যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু কেউ এই নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা করছে না। স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশ দিয়ে যানবাহন চলার সময় হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ হলেও তা মানা হচ্ছে না। শব্দদূষণ নামের এই মারাত্মক সমস্যা মূলত মানুষেরই সৃষ্টি। যারা শব্দদূষণ করেন তাদের মধ্যে বিবেক-বুদ্ধি তো কাজ করেই না, আবার কেউ শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে অনুরোধ করলে বা প্রতিবাদ করলে হিতে বিপরীত আকার ধারণ করে!
যদিও এই পরিবেশগত সমস্যা নিয়ন্ত্রণযোগ্য। শব্দদূষণের বহুবিধ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যানবাহনের মাত্রাতিরিক্ত শব্দ, বিভিন্ন অবকাঠামো-নির্মাণ কাজের শব্দ, মিছিলে কিংবা অন্যান্য কাজে মাইকের অতিরিক্ত আওয়াজ, বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শহরে বাসার ছাদে ব্যান্ডসংগীতের আয়োজন, কল-কারখানার শব্দ ইত্যাদি। হর্ন-মাইকের বিরক্তিকর শব্দ মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে হর্ন-মাইকের ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ আমাদের দেশে যেখানে-সেখানে এই মাইকের ব্যবহার করা হচ্ছে। শব্দদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। বৈশ্বিক এক গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের শিশুদের কানের সমস্যা বিশ্বের যেকোনো দেশের শিশুদের চেয়ে বেশি। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, বসতি এলাকায় দিনের বেলা ও রাতে শব্দমাত্রা হওয়া উচিত যথাক্রমে ৫৫ ও ৪৫ ডেসিবেল। বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ও রাতে যথাক্রমে ৬৫ ও ৫৫ ডেসিবেল। শিল্পাঞ্চলে দিনে ও রাতে যথাক্রমে ৭৫ ও ৬৫ ডেসিবেল। সহনীয় মাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত শব্দ যদি দিনের পর দিন, রাতের পর রাত অনেকদিন ধরে নিরুপায় হয়ে শুনতে হয় তাহলে শরীর ও মনে তার প্রভাব তীব্রভাবে পড়ে।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় শব্দের গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৪০ থেকে ৭০ ডেসিবেলের মধ্যে থাকার কথা। অথচ ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় নির্ধারিত মানদ-ের চেয়ে গড়ে প্রায় দেড়গুণ বেশি শব্দ সৃষ্টি হচ্ছে। কোথাও কোথাও শব্দের মাত্রা গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে তিনগুণেরও বেশি হচ্ছে! বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫-এর ক্ষমতাবলে ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬’ প্রণয়ন করা হয়। বিধিমালা অনুসারে নীরব, আবাসিক, মিশ্র, শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকা চিহ্নিত করে শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। আইন অমান্য করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য একমাস কারাদগু বা অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদ- অথবা উভয় দ- এবং পরবর্তী অপরাধের জন্য ছয়মাস কারাদ- বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত হওয়ার বিধান রয়েছে। আবার ‘মোটরযান আইন-১৯৮৮’-এর ১৩৮ ধারায়ও শাস্তিসহ জরিমানার বিধান আছে। কিন্তু বাস্তবে এসব আইনের তেমন প্রয়োগ দেখা যায় না। ফলে যা হবার তা-ই হচ্ছে, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, ৬০ ডেসিবেল মাত্রার শব্দ মানুষকে অস্থায়ী বধির এবং ১০০ ডেসিবেল মাত্রার শব্দ মানুষকে স্থায়ীভাবে বধির করে দেয়। রাজধানী ঢাকা বা শুধু বিভাগীয় শহর নয়, জেলা ও উপজেলা শহরগুলোতেও শব্দদূষণ বেড়েই চলেছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীতে কাজ করা বেশিরভাগ ট্রাফিক পুলিশ সদস্য বধির হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সব দিক বিবেচনায় ঝুঁকি ও দূষণমুক্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও নিরাপদ জাতি গঠনে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে যানবাহনের চালক ও মালিকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। পথেঘাটে, যেখানে-সেখানে হর্নের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। শব্দদূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর; এটা সবাইকে বোঝাতে হবে। শব্দের মাত্রা পরিমাপের যন্ত্র নিয়ে ট্রাফিক পুলিশকে আরও সক্রিয় হতে হবে। নির্দেশনা অমান্য করলে চালকদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবে সবচেয়ে জরুরি হলো সামাজিক সচেতনতা। সামাজিকভাবে সব ধরনের চালক ও সাধারণ জনগণ যত সচেতন হবে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা তত সহজ হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শান্তি সুখের সন্ধানে
  • কী চাই, কী চাই না
  • প্রসঙ্গ : প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতি বিরোধী অঙ্গীকার
  • সাংবাদিক কামরুজ্জামান চৌধুরী
  • প্রাইভেট টিউশন বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি
  • ফসল রক্ষা বাধ ও নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা
  • সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম
  • রেল ভ্রমণ কবে স্বস্তিদায়ক হবে
  • অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান
  • পৌষ সংক্রান্তি
  • আল্লামা ফুলতলীর রাজনৈতিক দর্শন
  • নতুন বছরের অর্থনীতি
  • এই কথাটি মনে রেখো
  • হকারমুক্ত ফুটপাত চাই
  • পড়িলে বই আলোকিত হই
  • গ্রামীণ নাগরিক সুবিধা প্রসঙ্গ
  • বিশ্বব্যবস্থা ক্রান্তিকাল ও নিরাপদ পৃথিবীর প্রত্যাশা
  • তুরস্ক-রাশিয়া সম্পর্ক ও পশ্চিমাবিশ্ব
  • শিক্ষার মৌলিক পরিবেশ
  • দেশপ্রেমিক ধর্মগুরু স্বামী বিবেকানন্দ
  • Developed by: Sparkle IT