উপ সম্পাদকীয়

পানি সমস্যা সমাধানে নদী খনন জরুরি

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১০-১১-২০১৮ ইং ০০:২১:৪১ | সংবাদটি ৮০ বার পঠিত

জনবসতি যত বাড়ে, তত বাড়ে বসতবাড়ী, রাস্তাঘাট। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য পরিসেবা ইত্যাদি অনেক বিষয়ের বৃদ্ধির প্রয়োজন পড়ে। কারণ, জনসংখ্যার অনুপাতে দৈনন্দিন জীবন পরিচর্যার কারণে পরিসেবা বৃদ্ধির দরকার যথেষ্ট। কিন্তু পরিসেবা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বন্যা প্রশ্নে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের কারণে নদীর সংখ্যা বৃদ্ধির প্রয়োজন আছে কি? নিশ্চয় এই প্রশ্নে পাঠক অবাকই হবেন। বলবেন, এ আবার কি কথা। যত আজগুবি প্রসঙ্গ। পানি প্ল¬াবন ঘটছে বলে নদী বৃদ্ধি? অসম্ভব-অলীক কল্পনা।
ঠিকই, নদী বৃদ্ধি ঘটানো যায় না। নদী বৃদ্ধির কথা আসছে এই কারণে যে, যতই ঘন বৃষ্টিপাত হোক, নদী বৃদ্ধি ঘটলে প্রবাহিত নদীগুলোর বাড়তি পানি বৃদ্ধিপ্রাপ্ত নদী টেনে নিয়ে যাবে, জনগণ আর বাড়তি পানি দেখবেন না। বন্যা আর হবে না।
নদী প্রকৃতির সৃষ্টি। মানুষ নদী তৈরি করেনি। তাছাড়া জনসংখ্যার অনুপাত বিবেচনা করে নদী তৈরি হয়নি। পৃথিবী পৃষ্ঠে পতিত বৃষ্টি তার ঢালুপথ বেয়ে আপনাতেই এগিয়ে ছিল সৃষ্টির লগ্ন থেকে এবং কোথায় কার সঙ্গে মিলবে ও সহযোগিতা করবে তা তার নিজস্ব ব্যাপার ছিল।
লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ক্রমাগত পানিধারা একই গতিতে চলতে চলতে নদী-মহানদী হয়েছিল। সভ্যতার মূলে নদী থাকায় নদীকেন্দ্রিক জনবসতি গড়ে উঠেছিল। সুতরাং জনবসতি আগে নয়। নদী আগে। তাই নদী যদি আগে হয় তাহলে পানি প্ল¬াবনে নদীর কি দোষ? সাধারণ দৃষ্টিতে নদীকে দোষ দেয়া হচ্ছে এ কারণে যে, তার চলার গতির পরিসীমা থেকে অধিক পানি ধারণ করতে না পেরে বাড়তি পানি ঠেলে বের করে দিচ্ছে দু’পারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের দিকে। আবাসগুলো ডুবছে। আর ওই অধিক পানিকেই জনগণ বলছেন বন্যা। এখন প্রশ্ন হল, লক্ষ লক্ষ বছর ধরে চলা পানিধারার মধ্যে হঠাৎ করে কেন অধিক পানি বইতে শুরু করে দেয় বর্ষার সময়? নদী তো তৈরি হয়েছিল ভূপতিত পানিকে টেনে নিয়ে যাওয়া ও সাগরে নিক্ষেপ করার জন্য। তাহলে নদীবক্ষে অধিক পানি আসে কোথা থেকে? আকাশ থেকে মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়া তো আর নতুন নয়। ভরা গাঙ, ভরা নদী, ঘনঘোর বর্ষা ইত্যাদি বাক্য বহু প্রাচীন। বৃষ্টিও প্রাচীন। কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রা ও জনবসতি নদীর মতো প্রাচীন নয়।
একটা কথা আছে, ‘যত দোষ নন্দ ঘোষ।’ নদীগুলোকে আমরা দোষ দিচ্ছি। কিন্তু নদীর প্রাচীন ইতিহাস ঘেঁটে দেখছি না। নদী দু’পারের সব পানি টেনে নিয়ে যাবে সাগরে তা কিন্তু নদ-নদী ও সাগরের ইতিহাসে নেই। নদী তার যতটুকু টানার টানবে। স্থলভাগের কিছুটা দায়িত্ব আছে পানি ধরে রাখার। পাহাড়-পর্বতের পানি তো টেনে নিচ্ছেই নদী। তাই বলে স্থলভাগের সব পানি শুষে নেবে কেন নদী? বাড়তি পানি যে স্থলভাগ বুকে ধরে রাখবে তার ব্যবস্থা নদী করেই রেখেছিল তা ছাড়া অংশ রেখে দিয়ে। নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়। নদী পারও ভাঙে। সে কারণেই নদীর ছেড়ে যাওয়া অংশকে বিল, হাওর, খাল, চর ইত্যাদি বলে।
এ কথা তো মানতেই হবে নদীর সৃষ্টি পাহাড়-পর্বত থেকে। স্থলভাগ থেকে নয়। যদি স্থলভাগের পুরো চাপ নদীর সহ্য করতে হয় তাহলে তো নদী ফুঁসবেই। পাহাড়-পর্বত থেকে পানি টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় পথের ধারে স্থলভাগের যা পানি পাবে তা টেনে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নদীর। যতক্ষণ পারা যায় টানবে। অধিক হলে তখন আর কিছু করার থাকে না নদীর। উগরে দেয় দু’পারের দিকে।
নদীতে যাতে অধিক পানি হয় পানি প্ল¬াবন যাতে ঘটে, সেজন্য স্থলভূমির জলাশয়গুলো বুজে দিয়ে জনবসতি গড়ে তোলার সুবিধাটা কে করে দিচ্ছে, নদী না মানুষ? মূল কথা হল মানুষ স্থলভাগে পানি ধরে রাখার জায়গাগুলোতে বসতবাড়ি গড়ে তুলছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে। মানুষ বসতবাড়ি গড়ে তুলতে পারে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঘটাতে পারে, আরো কতকিছু পারে, কিন্তু পারে না নদী তৈরি করতে। পারে না খাল-বিল-হাওড় তৈরি করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে এবং নদীকে অধিক পানি ধারণ থেকে অব্যাহতি দিতে। সুতরাং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে জলাশয়ের অভাবে বন্যা হবে। ঘরবাড়ি ডুববে। মানুষের দুর্ভোগ হবে।
একটা কথা বহুল প্রচলিত যে, নদী পার ভেঙে ঘরবাড়ি-রাস্তাঘাট তলিয়ে নিয়ে যায়। নদীর পার ভাঙা তো নতুন কিছু নয়। নদী সৃষ্টির পর দৃষ্টান্তও আছে। যেমন-পানি দূষণের হাত থেকে জনগণকে মুক্ত রাখতে সরকার গড়ল জনস্বাস্থ্য কারিগরি বিভাগ। গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠল পরিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। আর তাতেই মানুষ ঝাড়া হাত-পা হয়ে দিলেন সব পুকুর বুজিয়ে। গ্রামে এখন পুকুর পাওয়া দায়। আগে পুকুরের গভীরতা কমে যাচ্ছে দেখলেই খনন করা হতো। নতুন তো হতোই। তাতে বৃষ্টির পানি স্থান পেত। তাছাড়া গ্রামে বিশাল বিশাল ধানের মাঠ ছিল। সেসব মাঠে পানি জমা হত। নালা-খালে তো ছিলই। এখন আর বড়ো বড়ো ধানের মাঠ কোথায়? জনবসতি গড়ে ওঠেছে, কল-কারখানা হচ্ছে। দালানঘর তৈরির কারণে ইটভাটা তো ধানক্ষেতের সর্বনাশ করেই ছাড়ছে। তাছাড়া সড়ক নির্মাণের জন্য বালু-পাথর ভাঙার কারখানা দিন দিনই বাড়ছে। নিচু জায়গা পাওয়া ভার। তাই পানি তার পিতৃপুরুষের বাস্তুভিটা না পেয়ে গতিভ্রষ্ট হয়ে জনগণের বাস্তুভিটা ডোবাবেই।
এই যে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কথা এল, কে নিয়ন্ত্রণ করবে? যৌন সুখভোগের মাপকাঠি কারা বজায় রাখবে? তাছাড়া জনগণের মগজে ঢোকানো ‘মানুষ সৃষ্টিকর্তার দান’ কথাটার বিপরীতে কে বলবে মানুষ সৃষ্টির মূলে মানুষ? জনবিস্ফোরণ কথাটার মূল অর্থ কারা বুঝবে? কোনো মেশিন থেকে তো মানুষ ক্রমাগত বাড়ছে না যে মেশিনটা বন্ধ করে দিলেই চলে। আসলে মানুষকে বুঝতে হবে ক্রমাগত মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধির ফলে শুধু রাষ্ট্রের সমস্যা হচ্ছে না, নিজেরও সমস্যা হচ্ছে। একটা মানুষের সুস্থভাবে জীবন যাপন করতে যা যা নিত্যনৈমিত্তিক জিনিস প্রয়োজন তা যথাযথ আছে কি না দেখা দরকার। প্রতিটি পরিবার যদি সেদিকে দৃষ্টি রেখে জীবন যাপন করে তাহলে বর্তমান বহু সমস্যার সমাধান ভবিষ্যতে সম্ভব। সৃষ্টিকর্তার দানকে সংসারে অযথা এনে কষ্ট দেয়াটা দূর হবে। আসলে নিজেদের আত্মসুখ ভোগ করতে গিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উশৃংখলতা ও ব্যভিচার চলছে। অবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষিত সমাজ সন্তান সীমিত রাখার প্রয়োজন বুঝলেও অশিক্ষিত সমাজ দেহ সুখ-ভোগের ফলাফল কি হতে পারে বা নিয়ন্ত্রণ রাখার বৈজ্ঞানিক বিধিনিষেধ কি তার ধারেকাছে যাচ্ছে না। এক শ্রেণীর মানুষ জনসংখ্যা বৃদ্ধির রাজনীতি করে সমস্যার আগুনে ঘি ঢালছে।
এ কথা স্বীকার করতেই হবে নদী তার গভীরতা হারিয়েছে। নদী খনন জরুরি। কেন নদী গভীরতা হারিয়েছে সে দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে নদী তার উৎসমুখ থেকে পাথর-বালু টেনে নিয়ে প্রবাহিত হবার সময় স্থলভাগের মাটিও টানে। ফলে তলদেশ ক্রমে ক্রমে ভরাট হয়। ওই ভরাট অবস্থা যত বাড়তে থাকে ততই গভীরের স্রোতধারা কমতে থাকে। স্রোতধারা কমার ফলে নদীর পক্ষে পাথর-বালু-মাটি সাগর পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা থাকে না। ফলে নদীর মধ্যে চর পড়ে। সে কারণেই দেখা গেছে নদীর তলদেশ নাড়িয়ে দিতে জাহাজ চলাচলকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। যদি প্রতিটি নদীর উৎসমুখের দিকে নজর দেই তাহলে দেখা যাবে পাথর ব্যবসায়ীরা পাথর খুঁজতে খুঁজতে পাহাড়ের গভীরের দিকেই এগোচ্ছে। পাহাড় ভাঙছে। পাথর বের হচ্ছে। সেসঙ্গে কাঠ ব্যবসায়ীরা গাছ কেটে পাহাড় পরিষ্কার করে দিচ্ছে। যার ফলে পাহাড়ে বৃষ্টি সোজাসুজি পাথর ও বালুর মধ্যে আঘাত করে স্থানচ্যুত করছে। পানির তোড়ে আসছে নদীতে। যদি স্থলভাগের দিকে দৃষ্টি দেই তাহলে দেখব যে দূর্বাঘাস এখন প্রায় নেই। কৃষির উদ্দেশ্যে বা বসতবাড়ি তৈরি করার উদ্দেশ্যে দূর্বাঘাস প্রায় লুপ্ত হবার পথে। দূর্বাঘাস মাটি ধরে রাখার এক ধরণের সিমেন্ট আস্তরণ বলা যায়। সেই দূর্বাঘাস লুপ্ত হওয়ায় পানির টানে মাটি নদীতে এসে পড়ছে। সুতরাং নদীর গভীরতা কমবেই। অধিক পানি ধারণ করে রাখার ক্ষমতা হারাবে। পানিপ¬াবন হবে। বন্যা দেখা দেবে। এই বন্যাকে বর্ষার মৌসুমে অধিক বৃষ্টিপাতের কারণ বলাটাও ঠিক পুরোপুরি যুক্তিসঙ্গত বলা যায় না।
শহরে যে কৃত্রিম বন্যা বলে কথা ওঠে, সেই কৃত্রিম বন্যা তো স্থানীয় পানির সঙ্গে নদী বা জলাশয়, যেমন খাল-বিল-হাওর ইত্যাদির যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণেই ঘটছে। যে যেমন করে পারে নিজের বাসস্থান হলে বেঁচে গেল ওই নীতিতেই ঘরবাড়ি-রাস্তা তৈরি করে নিচ্ছে। আসলে কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই শহর ও নগর গড়ে উঠেছে। দূরদর্শিতার বড়ো অভাব। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা না থাকায় সময়োপযোগী পরিকল্পনা নষ্ট হচ্ছে। ইচ্ছেমতো ঘরবাড়ি তৈরির নির্দেশ এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাচীন শহরগুলো এখন মানুষ ও যানবাহনের চাপ সহ্য করতে না পেরে রাস্তাঘাট ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • পরিবহন নৈরাজ্য
  • মাদকবিরোধী অভিযান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
  • ছড়াকার বদরুল আলম খান
  • একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিগত দশটি নির্বাচন
  • বইয়ের বিকল্প প্রযুক্তি নয়
  • আগুনের পরশমণি ছোয়াও প্রাণে
  • বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যা
  • জনসচেতনতাই পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে পারে
  • এক শারীরিক প্রতিবন্ধীর কথা
  • এই অপসংস্কৃতির অবসান হোক
  • সৈয়দ সুমন আহমদ
  • পানিশূন্য তিস্তা
  • বিদ্যুৎ প্রিপেইড মিটারের গ্যাড়াকলে গ্রাহকরা : দায় কার?
  • পরিবহন ধর্মঘট এবং জনদুর্ভোগ
  • পানি সমস্যা সমাধানে নদী খনন জরুরি
  • শব্দসন্ত্রাস
  • মাধবপুর : যাতায়াত দুর্ভোগ
  •   তাফসীরুল কুরআন
  • ধৈর্যশীলদের জন্য আল্লাহর পুরস্কার নির্ধারিত
  • প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমান (রাহ.) ও সাদাকায়ে জারিয়া
  • Developed by: Sparkle IT