উপ সম্পাদকীয়

বিদ্যুৎ প্রিপেইড মিটারের গ্যাড়াকলে গ্রাহকরা : দায় কার?

এম আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১১-১১-২০১৮ ইং ০১:১৩:২১ | সংবাদটি ৫৬ বার পঠিত

বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার সংযোজন বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার-একটা অন্যতম পদক্ষেপ। অনেক বছর ধরে পরীক্ষা নিরীক্ষার পর বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার প্রতিস্থাপনে গ্রাহকরা বেশ আশান্বিত হয়েছিলেন এই ভেবে যে, এবার বুঝি দুর্নীতির পথ রোধ হলো। এবার বুঝি রক্ষা পেলাম ভূতোড়ে বিল আর অতিরিক্ত বিলের বোঝা থেকে। কিন্তু গ্রাহকদের সে আশায় গুড়েবালি। এখন বিলের ফাঁক ফোকরে অসৎ বিলবাজরা সক্রিয় রয়েছে গ্রাহকদের পকেট কিভাবে কাটা যায়। একটা উদাহরণ দিলেই জিনিসটা আরো স্পষ্ট হবে।
গত ১৫ জুলাই ২০১৮ জনৈক গ্রাহকের বাসায় প্রিপেইড মিটার সংযোজন করা হয়। বাড়ির মালিককে কোন নোটিশ ছাড়াই সেটা সম্পন্ন করে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মচারিরা। মিটার লাগিয়ে যাবার সময় পূর্ববর্তী মিটারের লাস্ট পেমেন্টের কপিটি নিয়ে যায়। তিনি লাস্ট পেমেন্ট ০৯/০৭/২০১৮ তারিখে সম্পন্ন করেন। অর্থাৎ ০৮/০৫/২০১৮ হতে ০৭/০৬/২০১৮ পর্যন্ত লাস্ট পেমেন্টটি বিস্তৃত ছিল। তাহলে ০৮/০৬/২০১৮ হতে ০৭/০৭/২০১৮ এক মাস এবং ০৮/০৭/২০১৮ হতে ১৫/০৭/২০১৮ পর্যন্ত মোট এক সপ্তাহ অর্থাৎ পূর্ববর্তী সর্বোচ্চ পাঁচ সপ্তাহের বিল দেয়ার কথা থাকলেও তিন মাস পর বিল দেয়া হয় ২৯৯৭.০০ টাকা। যেখানে জুলাই-আগস্ট, সেপ্টেম্বর উল্লেখ করে এই বিল ১০/১০/১৮ তারিখে পরিশোধের কথা বলা হয়। আগে যেখানে মাসে বিল আসত ৮০০.০০ টাকার ভেতর। সেখানে পাঁচ সপ্তাহে ২৯৯৭.০০ টাকা হয়ে গেল। সচেতন গ্রাহক বিপিডিবি সিলেট ফেইজ-২ অফিসে যোগাযোগ করলে জনৈক এসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার বিল পরীক্ষা করে একটা দরখাস্ত করার কথা বলেন। গ্রাহক গত ০৭/১০/২০১৮ তারিখে পরিচালক বরাবরে অপ্রত্যাশিত বিল প্রত্যাহার প্রসঙ্গে বিলের কপিসহ একটা দরখাস্ত পেশ করেন।
তিন/চারদিন পর অফিসে যোগাযোগ করলে জনৈক কর্মকর্তা অফিসের আরেক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। নিরীহ গ্রাহক সেই কর্মকর্তার খুজে অফিসে গেলে প্রথমে বলেন উনি ছুটিতে। পরে আসতে বলেন। গ্রাহক বসে থাকলে পরে উনি আবার নিজেই এই কর্মকর্তা বলে স্বীকার করেন এবং দরখাস্ত হাতে নিয়ে পরখ করেন। পরবর্তীতে বললেন নেটে ভাল কাজ করছে না। এখন আপনার তথ্যগুলো পাচ্ছি না। আপনি অন্যদিন আসেন। গ্রাহক ‘কোনদিন আসবেন’ জানতে চাইলে তিনি একদিন পর সময় দেন। অথচ ঐদিনই তিনি নেটে ঢুকে একাউন্ট নম্বর সংশোধন করেন যেটি পরেও সেই গ্রাহক সাফার করেন। বিষয়টিতে পরে আসছি।
এখন প্রশ্ন হলো ডিজিটাল যুগে যদি খোদ অফিসে এনালগ পদ্ধতিতে কাজ করা হয় তাহলে গ্রাহকরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। যেদিন প্রিপেইড মিটার সংযোজিত হলো সেদিনইতো সেটা কম্পিউটারে মিটার নাম্বার একাউন্ট নাম্বার অন্তর্ভুক্তির কথা এবং গ্রাহক কিভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে সেটাতো কর্তৃপক্ষ এবং যারা বিল করার দায়িত্বে আছেন তাদের জানার কথা। সেটা না জেনে তিন মাস পর ভূতুড়ে বিল পৌঁছে দিয়ে কেন গ্রাহককে হয়রানি করা হলো তা আমার বোধগম্য হলো না। বিষয়টি এখানে শেষ নয়। বিপিডিবি যখন আনুমানিক গত বছর বা তার পূর্বে হাত বদল হয় তখন বিল নিয়ে ব্যাপক ঝামেলা হয় এবং মিটারে উল্লেখিত বিলের চেয়েও অতিরিক্ত বিল আসলে সেই গ্রাহক বিপিডিবির পরিচালক জনাব পারভেজ আহমদ এর সাথে দেখা করে বিষয়টির ব্যাখ্যা চাইলে তিনি বলেন ‘যদিও গত মাসের ৭ তারিখ থেকে পরবর্তী মাসের আট তারিখ পর্যন্ত বিল দেয়া হয় তথাপি আমরা পরবর্তী মাসের ২৮ তারিখ পর্যন্ত একটা এভারেজ বিল সংযোজন করে দেই। যদি তার কথায় আসি তবে সেই হিসেবে উল্লেখিত গ্রাহকের বিল একেবারেই সামান্য আসার কথা। অথচ গ্রাহক যখন প্রিপেইড মিটার সংযোজনের পর বিলের অভিযোগ নিয়ে গেলেন তখন হিসাবে দেখানো হলো পাঁচ সপ্তাহের বিল এবং সেইমতে দুই মাসের এস্টিমেটেড বিল ধরে ১৯৮২.০০ টাকার বিল দেয়া হলো, গ্রাহক অনেক দেন দরবার করেও কোন ফল হয়নি। কর্তৃপক্ষ এটা পরিশোধের সিদ্ধান্ত দিলেন।
কিন্তু মজা আরও অপেক্ষা করছে। উক্ত গ্রাহক ২৮.১০.২০১৮ তারিখে ৪০০ টাকার বিদ্যুৎ কিনলেন প্রিপেইড মিটারের জন্য। তাকে দেয়া হলো মাত্র ৫.৩ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ। এখানে দেখা যায় মিটার চার্জ কাটা হয়েছে চার মাসের ৪০৪ = ১৬০ টাকা, ডিমান্ড চার্জ কাটা হয়েছে ৫০৪ = ২০০ টাকা, ভ্যাট কাটা হয়েছে ১৯.০৬ টাকা আর বিদ্যুৎ দেয়া হয়েছে ২১.২ টাকার। এটা দেখে উনি ‘থ’ হয়ে গেলেন। ব্যাপার কি? পরখ করে দেখলেন এতদিন ধরে অর্থাৎ ১৫/০৭/২০১৮ ইং হতে এই পর্যন্ত যে একাউন্ট নম্বরে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন তার নং ২১২ ......। কিন্তু ২৮.১০.১৮ তারিখ যে একাউন্ট নং দেখানো হয়েছে তাহলো ২১১২....... বিষয়টি গ্রাহকের হঠাৎ মনে পড়লো-সেদিন যে কর্মকর্তা একাউন্ট নম্বর ঠিক করেছিলেন কিন্তু এর সাথে পরিশোধিত ডিমান্ড চার্জ, মিটার চার্জ সংযোজন করেন নাই-এ কারণে এই গ্রাহককে আবারও পিনাল্টি দিতে হলো। গ্রাহক আর রাগ করে অফিসে যান নাই। ভাবলেন আবারও যদি এই তিনশত ঊনআশি টাকার জন্য রোজ রোজ ধর্না দিতে হয়। বিষয়টি সয়ে গেলেন এবং ৩১.১০.১৮ তারিখে আবারও ৩০০ টাকার বিদ্যুৎ কিনতে বাধ্য হলেন।
এখন কথা হলো গ্রাহক বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে-বিল পরিশোধ করবে এটাইতো স্বাভাবিক। কিন্তু এই যে কম্পিউটারের গ্যাড়াকলে ফেলে ভোগান্তিটা ঘটানো হচ্ছে এর জন্য দায়ী কারা। প্রথম যেদিন প্রিপেইড মিটারে একাউন্ট নম্বর লিখলো সে এই বিদ্যুৎ বিভাগেরই লোক। আর পরবর্তী সময়ে সে মিটার নম্বর ঠিক করল সেও ঐ বিদ্যুৎ বিভাগেরই লোক। এখন এই ভুলের খেসারত দিল কে? গ্রাহক। সেকি কোন অপরাধ করেছে? এই যদি একজন সচেতন গ্রাহকের অবস্থা-এখন চিন্তা করুন সাধারণ নাগরিক বা যারা লেখাপড়া জানেনা বা অল্প শিক্ষিত তাদের অবস্থাটা? কিভাবে ওদের সমস্যায় ফেলা হচ্ছে তা পাঠক মাত্রই সেটা অনুমান করতে পারবেন।
এ ছাড়াও যে ভোগান্তি সেটা হলো প্রিপেইড মিটারের বিদ্যুৎ কেনা একটা বড় ঝামেলা। অজ¯্র গ্রাহকের জন্য যে বিদ্যুৎ বিক্রির বুথ খোলা হয়েছে তা জনসংখ্যার তুলনায় অপ্রতুল। ফলে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে বিদ্যুৎ কিনতে হয়। বিদ্যুৎ কার্ড সহজলভ্য না করে মিটার সংযোজন করা যুক্তিযুক্ত হয়নি। মোবাইলের মত বিদ্যুৎ কার্ড সহজলভ্য করা এখন খুবই জরুরি। পাশাপাশি পরবর্তী প্রিপেইড মিটার প্রতিস্থাপন করার আগেই শেষ বিদ্যুৎ বিল দিয়ে দেওয়া জরুরি। অর্থাৎ নোটিশ দিয়ে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা সাপেক্ষে মিটার সংযোজন করা যেতে পারে। একটা বিল ঝুলন্ত রেখে আরেকটা পদ্ধতিতে যাওয়া উচিত নয়। অথবা এই পর্যন্ত যা হয়েছে তার ত্রুটি সংশোধন করে ভবিষ্যতে যাতে আর এভাবে গ্রাহক হয়রানি না হয় সেদিকে সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT