উপ সম্পাদকীয়

পানিশূন্য তিস্তা

আব্দুল হাই রঞ্জু প্রকাশিত হয়েছে: ১১-১১-২০১৮ ইং ০১:১৯:৩২ | সংবাদটি ৫৫ বার পঠিত

খর¯্রােতা তিস্তা এই নভেম্বর মাসেই পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। বর্ষাকাল সবে শেষ হয়েছে। যদিও এ বছর বর্ষাকালে উত্তরাঞ্চল জুড়েই তেমন কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি। আবার চিরাচরিত বন্যার তেমন একটা দেখাও মেলেনি। ইতিমধ্যে শীতের আমেজ দেখা দিয়েছে। দিনে আবার চৈত্রের তীব্র রোদের মতোই আবহাওয়া বিরাজ করছে। মূলত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অতিবৃষ্টি, খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন বাংলাদেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী। এর ওপর আবার ভারতের উজানে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবায় ব্যারাজ নির্মাণ করে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশ অংশে ১১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ তিস্তা নদী পানির অভাবে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। শুধু তিস্তাই নয়, উত্তরাঞ্চলের প্রমত্তা নদনদীগুলো পানির অভাবে মরাখালে পরিণত হয়েছে। এখন তিস্তা নদীতে পানি না থাকায় চোখে পড়ে শুধু ধু-ধু বালুচর। এখন আর নদী পারাপারে চিরচেনা খেয়া নৌকার প্রয়োজনও পড়ে না। অধিকাংশ স্থানে হাঁটুপানি মানুষ হেঁটেই পাড়ি দিচ্ছেন। এমনকি তিস্তার বুকে এখন কৃষক নানা জাতের ফসলের চাষাবাদও করছেন। কোনো সময় দেখলে মনে হয়, নদী নয়, এ যেন ফসলের কোনো সবুজ মাঠ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে এখন পানিপ্রবাহ গড়ে রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কিউসেক। কিন্তু প্রতিদিনই কমছে পানি। একের পর এক জেগে উঠছে বালুচর। মূলত গত অক্টোবরের মাঝামাঝিতে তিস্তার পানিপ্রবাহ কমতে শুরু করে। এখন তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানির প্রবাহ ১৩-১৪ হাজার কিউসেকের বেশি হবে না। এভাবে পানি কমতে থাকলে পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক উপসহকারী প্রকৌশলী বলেন, তিস্তা সেচ প্রকল্পসহ তিস্তা নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে ন্যূনতম ২০ হাজার কিউসেক পানির প্রয়োজন। অথচ বর্ষা পুরোপুরি শেষ হতে না হতেই গত ১৫-২০ দিনে ব্যারাজের মূল গেটের পানিপ্রবাহ এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কিউসেক। অথচ তিস্তা ব্যারাজকে ঘিরে সেচ প্রকল্প চালু রাখতে হলে ২০ হাজার কিউসেক পানির প্রয়োজন পড়ে। হয়তো আসন্ন বোরো সেচ মৌসুমে চাহিদার অর্ধেকের বেশি পানি পাওয়া সম্ভব হবে না। মূলত ভারত তিস্তা নদীর উজানে ভারত অংশে ব্যারাজ তৈরি করে সংযোগ খালের মাধ্যমে তিস্তার পানি মহানন্দা নদীতে, জলপাইগুড়ি জেলার দার্জিলিং, পশ্চিম দিনাজপুর ও উত্তর দিনাজপুরের মালদহ ও কোচবিহার জেলায় সেচ সুবিধা নিচ্ছে। যেখানে পানির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ আটক কিংবা পরিবর্তন করার বৈধতা আন্তর্জাতিক আইনে নেই, সেখানে ভারত আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে একতরফাভাবে তিস্তার পানির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ আটকে দিয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলকে মরুভূমির দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা অনৈতিক ও বাংলাদেশের মানুষের ওপর এক ধরনের অবিচার!
বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দেশ বাংলাদেশ। এ দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় ধরনের একটি চ্যালেঞ্জ। এর ওপর আবার মানুষ বাড়ছে হুহু করে। অথচ দেশের ভৌগোলিক অবস্থান কার্যত স্থির। অর্থাৎ সীমিত পরিমাণ জমিতে চাষাবাদ করে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য জোগান দিতে হয়। বিশেষ করে সেচভিত্তিক চাষাবাদের বদৌলতে ১৬ কোটি মানুষের দেশে খাদ্য উৎপাদনে এখন উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলার ভূমিকা অনন্য। এ কারণেই উত্তরাঞ্চলকে এখন খাদ্য ভা-ার বলা হয়। আর উত্তরাঞ্চলের উজানে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও পদ্মা নদীগুলো প্রবাহিত। কমবেশি প্রতিটি নদীর উজানে ভারত অংশে তারা বাঁধ কিংবা ব্যারাজ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করছে। যার কবল থেকে সিলেটের সুরমা নদীও রেহাই পায়নি। অথচ ভারত আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ। যাদের আশ্রয় ও সহযোগিতায় আজ থেকে ৪৭ বছর আগে আমরা অর্জন করেছি আমাদের মহান স্বাধীনতা। সে দেশের সরকারের কাছ থেকে এ ধরনের বৈরী আচরণ আমরা আশা করি না। কিন্তু আমাদের আশা-নিরাশায় কী আসে-যায় তাদের। তারা তো পানির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ পরিবর্তন করে খাদ্য উৎপাদনে সফলতা এনেছে। তাদের উৎপাদিত ধান, চাল এখন দেশি চাহিদা পূরণের পর দেদার বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা দেশে রফতানি হচ্ছে। অথচ স্বাধীনতা লাভের ৪৭ বছরেও আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারিনি। এখনও আমাদের দেশে গম ও চাল আমদানি করতে হয়। ফলে বৈদেশিক রিজার্ভের ওপর কমবেশি প্রতিবছরই চাপ বাড়ে। অথচ আমরা তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা পেলে সেচভিত্তিক চাষাবাদকে নির্বিঘœ করতে পারি। কারণ কমবেশি প্রতিবছরই নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহের অভাবে সেচভিত্তিক চাষাবাদ বিঘিœত হয়। বাধ্য হয়েই চাষিরা নদীর পানির পরিবর্তে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়েই সেচভিত্তিক চাষাবাদ করেন। ফলে উত্তরাঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। অনেক স্থানে চাষিরা মাটিতে ১০-১২ ফুট পর্যন্ত গর্ত করে নিচে সেচযন্ত্র বসিয়ে জমিতে সেচ দেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে নিকট ভবিষ্যতে পানির অভাবে উত্তরাঞ্চলের সেচভিত্তিক চাষাবাদ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমতাবস্থায় এখন আমাদের কাছে জরুরি হচ্ছে, তিস্তা নদীর ন্যায্য পানির হিস্যা অর্জন করা। আমাদের সরকারও তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে তিস্তা চুক্তির জন্য দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক তৎপরতা দীর্ঘদিন ধরেই অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দোহাই দিয়ে কালক্ষেপণ করছে। আর দিদি মমতার মনের বরফ একবার গললেও কার্যত পানির হিস্যা ছাড়তে তিনি নারাজ। ফলে বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও আমাদের বেঁচে থাকার অন্যতম নিয়ামক তিস্তার পানি চুক্তির সুফল দেখছি না। কবে কখন হতে পারে এমন সম্ভাবনাও ক্ষীণ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, কারও পৌষ মাস, আর কারও সর্বনাশ।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT