উপ সম্পাদকীয়

এক শারীরিক প্রতিবন্ধীর কথা

রফিকুর রহমান লজু প্রকাশিত হয়েছে: ১২-১১-২০১৮ ইং ০০:২৬:৩৮ | সংবাদটি ৫৫ বার পঠিত

পান্না লাল সোম একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষ। তার দেহের অর্ধেক অংশ কোমর থেকে নিচ দিক সম্পূর্ণ অচল। এই অংশ নেই বললেই চলে। প্রতিবন্ধী বলতে সচরাচর যা বুঝায়, তেমন প্রতিবন্ধী নয় পান্না সোম। কোমর থেকে উপর দিক পুরোপুরি সুস্থ স্বাভাবিক। মানসিক ভাবেও তার কোনো দুর্বলতা নেই। সুন্দর সুঠাম দেহায়ব। তার পার আছে বলে মনে হয় না। নামে পা আছে,তা অস্বাভাবিক চিকন, বেঁটে, বেঢপ-কুশ্রী এবং অনুভূতিহীন। সে সবসময় বসে বসে তার কাজ সারে। খাড়া হতে পারে না, খাড়া হবার ক্ষমতাই নেই। এতোসব প্রতিবন্ধকতা নিয়েও সে সুস্থ মানুষের মতো চলাফেরা করে। সে হামাগুড়ি দিয়ে চলে। তার বাহন কোনো লোকের পীঠ ও সাইকেল। পীঠে চড়ার সময় সে নান্দনিক ভাবে লাফ দিয়ে পীঠে ওঠে বসে, দুই হাত দিয়ে গলা ধরে বসে থাকে। বাইসাইকেল ‘বারে’ বসে সে ঘুরাঘুরি করে। কর্মস্থলে যাতায়াত করে, দরকার মতো অন্যান্য স্থানে যায়। পান্না সোম জন্মলগ্ন থেকে শারীরিক প্রতিবন্ধী। দীর্ঘকাল থেকে জীবনের প্রয়োজনে কসরত করতে করতে সে তার মতো করে চলাচলের একটা কায়দা রপ্ত করে নিয়েছে। স্বাভাবিকভাবে চলাচলে অপারগতা-অক্ষমতার জন্য তার কোন খেদ নেই, আফসোস নেই। সে তার সীমাবদ্ধতায় সন্তুষ্ট, তার প্রভুর নিকট কৃতজ্ঞ। এই মানুষটি আর আমাদের মধ্যে নেই। গত ২২ আগস্ট/১৮ সে অকস্মাৎ মৃত্যুবরণ করেছে। ডাক্তার দেখানোর জন্য ঐদিন সে সিলেট আসার কথা ছিলো। সকালে সে যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলো সিলেটে আসার, তখন হঠাৎ করে তার মৃত্যু হয়। শ্রীমঙ্গলে নিজ বাসায়। আগের দিন পান্না সোম পাড়ার দোকানী ও মাছওয়ালাকে ডেকে তাদের পাওনা মিটিয়ে দেয়। পান্নার আর সিলেট আসা হয়নি। আর সিলেট আসা হবে না তার কোন দিন।
ছোটবেলা স্বজনরা আদর করে পান্নাকে পানু বলে ডাকতেন। পরে পানু ডাকনাম হয়ে যায় তার। পানুর জন্ম ৯ জানুয়ারি, ১৯৪১ সালে। তার পিতা রমেশচন্দ্র সোম করিমপুর চা বাগানের বড়টিলা বাবু ছিলেন। এই করিমপুর চা বাগানে তার জন্ম। কিন্তু তার পৈতৃক বাড়ি ছিলো কুলাউড়া উপজেলার টিলাগাও ইউনিয়নের লালবাগ গ্রামে। পানুর পিতা ও বড়ভাই ব্রিটেনের ডানকান ব্রাদার্সের মালিকানাধীন করিমপুর চা বাগানে চাকরি’র সূত্রে পানুরও চাকরি হয় এখানে। সে বাগানের অফিসে টাইপিস্ট ছিলো। অসুস্থতার কারণে বাগান কর্তৃপক্ষের সহানুভূতি ছিলো তার ওপর। ডানকান কোম্পানী তার শারীরিক অসুবিধার জন্য একখানি হারকিউলিস বাইসাইকেল বরাদ্দ করেছিলো তার জন্য। সাইকেলের ‘বার’-এ বসিয়ে তাকে অফিসে আনা-নেওয়ার জন্য কোম্পানী একজন লোকও নিযুক্ত করেছিলো। সাইকেলে করে পানু বাগানময় এবং আশপাশ এলাকা চষে বেড়াতো। পানু বরমচাল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেছিলো। সে খুব মেধাবী ছাত্র ছিলো। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধীত্বের কারণে কলেজে যেতে পারেনি।
পানু তার সব প্রতিবন্ধকতা, সীমাবদ্ধতা ও অসুস্থতার কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। তার মনোবল ও ইচ্ছাশক্তি ছিলো প্রবল এবং তাই সে সকল প্রতিকূলতাকে জয় করে নিয়েছিলো। এক সময় কি করে রাজনীতির সঙ্গে রাখি বন্ধন হয়ে যায় এই লোকটির। তাও আবার বাম রাজনীতি। বাগানের পাশেই একটি গ্রাম খলাগ্রাম। এই গ্রামে প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও বিপ্লবী শশাঙ্ক শেখর ঘোষের বাড়ি। এখানে আসতেন কমিউনিস্ট পার্টির ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ (আত্মগোপনকারী) নেতারা। আসতেন কমরেড তারা মিয়া, আব্দুল মালিক, আজির উদ্দিন খান এবং আরো কেউ কেউ। শুনেছি এই বাড়িতে কমিউনিস্ট পার্টি সিলেট জেলা কমিটির বৈঠক হয়েছে। যদি তাই হয়, তাহলে এই বাড়িতে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড আব্দুস সালাম (বারীণ দত্ত), কমরেড বরুণ রায়, ডা. কৃপেন্দ্র বর্মন প্রমুখও এসেছেন। পানু সোম শশাঙ্ক শেখর ঘোষের মাধ্যমে এই নেতৃবৃন্দের সংস্পর্শে এসে সে পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয় এবং এক সময় সদস্যপদও লাভ করে। করিমপুর বাগানে-খলাগ্রামে পার্টির সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিতে পানু দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে। হুইল চেয়ারে বসে সে শ্রমিক বস্তি ও বাঙালি শ্রমিকদের কলোনীতে গিয়ে তাদের সঙ্গে মিশতো, তাদের ভালোমন্দের খোঁজ নিতো এবং এভাবে সে শ্রমিকদের ঘনিষ্টজন হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর পর ১৯৭৩ সালে খলাগ্রামে সিলেট জেলা কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। খুব জাঁকজমক ও সাংগঠনিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে এই সম্মেলন হয়েছিলো। খলাগ্রামে এই সম্মেলনে যোগদান করেন কমরেড মণি সিংহ, কমরেড বারীণ দত্ত, পীর হবিবুর রহমান, কমরেড বরুণ রায়, শান্তি দত্ত, তারা মিয়া, আব্দুল মালিক এবং আরো অনেকে। সম্মেলন অত্যন্ত সফল হয়েছিলো। পান্না সোম এই সম্মেলনে কর্মী ছিলেন এবং একদল কর্মী দিয়ে তিনি কৃষক র‌্যালি ও কৃষক সমাবেশ সফলে অবদান রাখেন। কর্মীদের মধ্যে ছিলো সৈয়দ নজাবত আলী, আব্দুল বারী, ইলিয়াস আলী, কানু দেব, আব্দুর রাজ্জাক, নিধু বাবু, নাজির মিয়া প্রমুখ। পান্না সোম হুইল চেয়ারে বসে লাল পতাকা হাতে নিয়ে মিছিলের সামনে ছিলো। তার এলাকায় পার্টির বিভিন্ন শাখার সঙ্গে সে যোগাযোগ রাখতো। কর্মীদের কোনো সমস্যা থাকলে পানু তার সমাধানের চেষ্টা করতো।
শারীরিক প্রতিবন্ধী পান্না সোমের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিলো অনেক আগে। চৌহাট্টার সেন্ট্রাল ফার্মেসীর বাসুর বোনকে বিয়ে করেছিলেন পানুর বড় ভাই। আবার পার্টি কর্মী বাদল করের বোনের বিয়ে হয়েছে সেন্ট্রাল ফার্মেসীর বাসায়। বাসু ও বাদল কর দু’জনের সঙ্গেই আমার ঘনিষ্ট সম্পর্ক। সিলেটের এই দুই বাসা ছিলো পানুর ঠিকানা। যদ্দুর মনে পড়ে সমস্যার সমাধানের পথ বাতলে দিয়েছে। কাউকেই সে শূন্য হাতে ফেরায়নি, কোনো না কোনোভাবে সহায়তা দিয়েছে, সান্তনা দিয়েছে।
খলাগ্রামে আরেকটা বাসা ছিলো আমাদের ঠিকানা। পানুর বাসায় থাকলেও শান্তিপদ ঘোষ মতি (এডভোকেট, মৌলভীবাজার)-দের বাসায় খেতে হতো। মতির অন্যান্য ভাই শক্তিপদ ঘোষ, ঋষিকেশ ঘোষ সহ সকল ভাইদের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ট সম্পর্ক। খাবার ব্যাপারে মতির মা-মাসীমাকে কত জ্বালাতন করেছি। পানুর বাসায়ও আপ্যায়নের ব্যবস্থা থাকতো সব সময়। পানুর বাসায় নারায়ন নামে একটা ছেলে থাকতো। অতিথি অভ্যাগতদের চা-নাস্তার দিকটা সে সামাল দিতো। এখানে থেকে সে পড়ালেখাও করতো। আমি খলাগ্রামে গেলে নারায়ন আমাকে সঙ্গ দিতো। বাদল করের বাসায় পানুর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা ও পরিচয়। বাদল কর পানুর গল্প করেছিলো আমার সঙ্গে এবং বলেছিলো এবার এলে আপনাকে খবর দেবো। কিছুদিনের মধ্যেই পানু সিলেটে এসেছিলো। খবর পেয়েই আমি বাদল করের বাসায় গিয়ে পানুর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। সে বিছানায় বসেছিলো, তার যে পা নেই এটা বুঝা যাচ্ছিলো না। সে আগেই কথা বললো। বললো : তোকে না দেখলেও তোকে আমি চিনি। তোর সম্পর্কে অনেক শুনেছি। আয় কাছে আয়, পাশে এসে বস। প্রথম পরিচয়েই আপন করে নিলো। মনে হলো অনেক দিনের পরিচিত আমরা।
অতঃপর আমি যখনই খলাগ্রাম গিয়েছি আমার ঠিকানা হয়েছে পানুর বাসা। দেখেছি তার বাসায় মানুষের আসা-যাওয়া। তাদের সঙ্গে আলাপ করে তাদের পানুর ভাগনা বিভাষ রঞ্জন ঘোষ একাত্তরে পানুর তৎপরতা সম্পর্কে লিখেছে : ’৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতে না গিয়ে থেকে অর্থাৎ করিমপুর চা বাগানে থেকে যেভাবে মুক্তিযোদ্ধার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন তাহা অবিশ্বাস্য ঘটনা। সংগঠনের সকলের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা, বিভিন্ন সেক্টরের সাথে যোগাযোগ, এদিকে নিজের চাকরি রক্ষা করা-এই পঙ্গুলোক কিভাবে করেছেন, তাহা কল্পনা করার মতো নয়। কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় সব নেতৃবৃন্দের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করেছেন। তখন তিনিকে সাহায্য করেছে খলাগ্রামের কয়েকটি ছেলে। পান্না লাল সোম তার এলাকায় রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে আলোকবর্তিকা হিসেবে মানুষের মধ্যে কাজ করেছে। অনেকের রাজনৈতিক ও মানুষকে ভালোবাসার প্রেরণা ছিলো দৈহিক প্রতিবন্ধী এই মানুষটি।
পান্না লাল সোমের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ছিলো তার সহকর্মীদের। তার মৃত্যুর পর তার সহকর্মী সুভার্থীরা ঝটপট একখানি স্মরণিকা (এলিজি পান্না লাল সোম) প্রকাশ করেছে। পান্নার মৃত্যু হয়েছে ২২ আগস্ট আর ‘এলিজি পান্না লাল সোম’ বের হয়েছে ৩ সেপ্টেম্বর। এত অল্প সময়ে স্মরণিকা প্রকাশ তার প্রতি রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, শ্রমিক ও শুভানুধ্যায়ীদের ভালোবাসারই স্মারক। স্মরণিকাটি যৌথভাবে সম্পাদনা করেছে অম্লান দেব রাজু ও বিকাশ দাশ বাপ্পন। স্মরণিকায় লিখেছেন সিপিবি নেতা সৈয়দ আবু জাফর আহমদ, অধ্যাপক নৃপেন্দ্র লাল দাশ, দ্বীপেন্দ্র ভট্টাচার্য, আব্দুর রাজ্জাক, দীপংকর মোহান্ন, অপূর্ব কান্তি ধর, অর্ধেন্দু কুমার দেব, ডা. বাসুকা রঞ্জন ধর প্রমুখ। স্মরণিকা ছাড়াও গহীন হৃদয়ের অনুভূতি ব্যক্ত করে লিখেছেন আব্দুল মালিক, কৃষ্ণ লাল কালোয়ার, বিভাষ রঞ্জন ঘোষ (অঞ্জু), সুমিত শ্যাম পল, প্রভাষিনী সিনহা, জনি পাল, অলক দত্ত, জাবেদ ভুইয়া, মাসুক মিয়া এডভোকেট, জয়শ্রী চৌধুরী প্রমুখ।
মনোবল ও ইচ্ছাশক্তির কাছে যে কোনো প্রতিবন্ধকতা হার মানতে বাধ্য। পানু এই সত্যটা প্রমাণ করে গেছে।
লেখক : সাবেক শিক্ষক ও সিনিয়র কলাম লেখক।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT