ইতিহাস ও ঐতিহ্য

খেলাফত বিল্ডিং : ইতিহাসের জ্যোতির্ময় অধ্যায়

সিরাজ উদ্দীন হুসাইনী প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-১১-২০১৮ ইং ০০:৩৫:৫৮ | সংবাদটি ১৩৬ বার পঠিত

বিশ শতকে ‘আঞ্জুমানে ইসলামিয়া’ সিলেটের ইতিহাসে একটি আলোকিত অধ্যায়। আর ঐতিহ্যবাহী খেলাফত বিল্ডিং একটি ঐতিহাসিক লাইট হাউস। মারকাযিয়া মাদ্রাসা একটি অনুকরণীয় মডেল। এই তিনটি সাবজেক্ট ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল ও বাংলাদেশ আমল সিলেটের ইতিহাসে বিভিন্নভাবে জড়িত।
১১৭৯ ঈসায়ী সালে সুলতান মুহাম্মদ ঘুরী ভারতবর্ষ অধিকার করার পর থেকে দীর্ঘ ৫৭৮ বছর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মাধ্যমে মুসলিম রাজন্যবর্গ সগৌরবে ভারতবর্ষ শাসন করেন।
১৭৫৭ সালে পলাশীর আ¤্রকাননে নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে শহীদ করে মুসলমানদের হাত থেকে ভারতের শাসন ক্ষমতা ইংরেজ বেনিয়ারা ছিনিয়ে নেয়। এরপর ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ১৯০ বছর ভারতবাসীকে গোলামীর জিঞ্জিরাবদ্ধ করে শাসনের নামে তারা শোষণ করে। সিরাজুদ্দৌলা শহীদ হওয়ার ২৫ বছর পর সিলেটের কৃতি সন্তান, আযাদী আন্দোলনের প্রথম শহীদ সৈয়দ মুহাম্মদ হাদী ও সৈয়দ মুহাম্মদ মাহদী ভ্রাতৃদ্বয় ভারতবাসীকে গোলামীর জিঞ্জির থেকে মুক্তির জন্য ১৭৮২ সালে পুণ্যভূমি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শাহী ঈদগাহে ইংরেজদের সাথে বীর সিংহের ন্যায় সম্মুখ সমরে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন।
১৮৫৭ সালে ইংরেজদের সাথে লাতুর লড়াই ও কানাইঘাটের লড়াই হয়। সিলেট গোবিন্দপার্কে (বর্তমান হাসান মার্কেট) মোজাহিদদের ফাঁসী দেয়া হয়। দরগাহ মসজিদ থেকে মোজাহিদদের ধরে নিয়ে কারাগারের সামনে ফাঁসী ও কবর দেয়া হয়। ডাক বাংলা (বর্তমান সার্কিট হাউস) ও নবাবী মসজিদের পশ্চিমে বিটপির ডালে ডালে মুজাহিদদের লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়। এসব নাম না জানা শহীদদের ইতিহাস জানা ও গবেষণার অতীব প্রয়োজন।
সিলেটের মুসলিম সমাজের সার্বিক অবস্থান যখন অত্যন্ত নাজুক, শহরে বসার মত, আলাপ-আলোচনা করার মত না ছিল কোন সংস্থা বা স্থান, এহেন পরিস্থিতিতে সিলেটের জ্ঞানী গুণী মুসলমানদের নিয়ে ১৮৯৬ সালের ২৩ মার্চ গঠিত হয় আঞ্জুমানে ইসলামিয়া বা ইসলামী সংগঠন। যার লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম ও মুসলিম সমাজের সেবা করা। তখন প্রয়োজন দেখা দিল বসার মত একটি জায়গার। তাই মুসলিম সমাজের মঙ্গল সাধনার্থে দানের হস্ত প্রসারিত করলেন মহলে শাহচান্দ গাজী মানিকপীর রোড নয়াসড়ক নিবাসী আব্দুল মজিদ, পিতা-মিঃ জকি মিয়া, নফী মিয়া, পিতা মুন্সী মিয়া, মুহাম্মদ সুলতান নাবালগ পক্ষে মি: নফী মিয়া, মি: আব্দুল আজীজ পিতা কুটি মিয়া, মোসাম্মৎ সোনা বিবি বেওরে কুঠি মিয়া, মোসাম্মাৎ হাসিবা বানু, মোসাম্মাৎ আসিকা বানু এবং মি: আব্দুর রহমান নাবালগ পক্ষে তাদের মাতা মোসাম্মাৎ সোনা বিবি প্রমুখ মহৎপ্রাণ ব্যক্তিগণ।
আঞ্জুমানে ইসলামিয়ার নামে আঞ্জুমানের পক্ষে মহল্লে হাওয়াপাড়া নিবাসী মি: আব্দুল্লাহ, পিতা ফযলুর রহমান (সেক্রেটারী আঞ্জুমানে ইসলামিয়া) কে বার্ষিক ২০ কুড়ি টাকা খাজনা ধার্য করে ১৯২১ইং ৪ ফেব্রুয়ারি ১৩২৭ বাংলা ১২ মাঘ এক কবুলত নামা সম্পাদন করে এক খ- ভূমি দান করেন। যার সাব রেজিস্টার ছিলেন সৈয়দ সিকন্দর আলী, সাক্ষী ছিলেন আব্দুল মজীদ, আব্দুল ওহাব ও কামিনী মোহন প্রমুখ। জায়গার পরিমাণ ছিল ২ কেদার।
মুসলমান সমাজের উন্নয়ন ও ইসলামের খেদমতের জন্য দুই কেদার ভূমি দান করা নিশ্চয়ই প্রশংসনীয় মহৎ কাজ। তাঁদের মহানুভবতা, উদারতাও ত্যাগের নজীর স্থাপন করা আমাদের জন্য আনন্দ, গর্ব, ঐতিহ্য ও বিস্ময়ের বিষয়।
আঞ্জুমানে ইসলামিয়ার উল্লেখযোগ্য কর্মকর্তা ছিলেন মৌলভী আব্দুল্লাহ বিএল মাওলানা ইব্রাহীম চতুলী, মাওলানা আব্দুল হক মুক্তারপুরী, মাওলানা আব্দুল মুসাব্বির গহরপুরী, মাওলানা সিদ্দীক আলী, ডাঃ মর্তুজা চৌধুরী গাভুরটেকী, মৌলভী আব্দুল মতীন চৌধুরী, শায়খ বশীর আহমদ শায়খে বাঘা, সৈয়দ জামিলুল হক সৈয়দপুরী, মৌলভী মকবুল হুসেন চৌধুরী বিন্নাকুলী প্রমুখ।
১৯৫২ ও ১৯৫৬ সালে সরকারি জরিপে উল্লিখিত জায়গা আঞ্জুমানে ইসলামিয়ার নামে রেকর্ডভুক্ত হয়। এখানে মেঝে ও দেয়াল পাকাটিনের ছাউনি সমেত বিরাট লম্বা একখানা গৃহনির্মাণ করা হয়। এ গৃহে সিলেটের জ্ঞানীগুণীসহ সর্বস্থরের মুসলমানরা সম্মিলিত হয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের আশয় বিষয় আলাপ-আলোচনা করতেন। ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা করার পরিকল্পনা প্রণয়ন করতেন। আঞ্জুমানের সভাপতি মাওলানা ইব্রাহীম চতুলীসহ সদস্য শুভানুধ্যায়ী সকলেই ছিলেন খেলাফত নেতাকর্মী। তাই এ গৃহটিতে খেলাফত অফিস করা হয়।
প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ চলাকালে ইসলামের পবিত্র ভূমি মক্কা-মদীনা খৃষ্টানদের করতলগত হওয়ার আশঙ্কায় মুসলমানগণ ইসলামী খেলাফত ও তুরষ্ক স¤্রাজ্য রক্ষার উদ্দেশ্যে ২৭ অক্টোবর ১৯১৯ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে খেলাফত দিবস পালন নামে একটি সংগঠন করা হয়। এর সভাপতি ছিলেন মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর। ভারতীয় কংগ্রেস জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ (প্রতিষ্ঠা ১৯১৯ সাল) ও খেলাফত প্রভৃতির নেতাকর্মীগণ একট্টা হয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম করেন। সে আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গ সিলেটবাসীকেও উত্তীপ্ত করে তুলে। ১৯২১ সালে মৌলভীবাজারে খেলাফত কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত বিরাট কন্ফারেন্সে কংগ্রেস নেতা করমচাঁদ মহাত্মা গান্ধী, জমিয়ত নেতা শাইখুল ইসলাম মাওলানা সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী ও খেলাফত নেতা মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহার প্রমুখ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সুভাগমন করেন। তখন তাঁদের আবাস ছিল খেলাফত বিল্ডিং। এ কারণে এ গৃহটি সর্বসাধারণে খেলাফত বিল্ডিং নামে পরিচিতি লাভ করে। অধ্যাবধি সে ঐতিহ্যবাহী স্থানটি আলিম ও সুধী সমাজে ঐ নামেই খ্যাত।
সিলেটের আলিম ও সুধী সমাজের ঐকান্তিক আহবানে শাইখুল আরব ওয়াল আযম শাইখুল হাদীস মাওলানা সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী (রাহ.) ১৯২৩ সালে পুণ্যভূমি সিলেটে শুভাগমন করে খেলাফত বিল্ডিং এ ‘মারকাযিয়া মাদ্রাসায়’ সিলেটবাসীর দীর্ঘকালের লালিত অভিলাষ “দরসে হাদীসের” সুচনা করেন। এটাই ছিল পুণ্যভূমি সিলেটে প্রথম দরসে হাদীস।
এ মারকাযিয়া মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে আসামের ৩০টি মাদ্রাসা নিয়ে একটি বোর্ড গঠন করে ইলমে দ্বীনের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস করেন। বর্তমানে এটাই প্রাচীনতম “আযাদ দ্বীনী এদারায়ে তা’লিম বাংলাদেশ নামে খ্যাত।
অন্যদিকে নয়াসড়ক মসজিদকে কেন্দ্র করে মাদানী খানকায় মানবাত্মা পরিশুদ্ধ করার জন্য তিনি ইলমে মা’রিফাতের দীক্ষাদানের সূচনা করেন। তাই হযরতের খলিফাদের তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করে রয়েছেন সিলেটের বিশিষ্ট ৩২ জন খলিফা। ইসলামী সমাজ সংস্কার করার জন্য তিনি অহর্নিশ বৃহত্তর সিলেটের অলিগলি অতিক্রম করে কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে সুসংস্কারের হাওয়া চালু করেন। পলিটিক্যাল ফিল্ডে তিনি জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি হিসেবে সুদূর প্রসারী ভাবুক ছিলেন। খেলাফত বিল্ডিংয়ে ছিল জমিয়তের অফিস। এখান থেকেই তিনি ইসলাম, মুসলমান, আলিম সমাজ ও দেশের নেতৃত্ব দান করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে ইংরেজ বিরোধি নেতাকর্মীগণ দু’ভাগে বিভক্ত হন। মুসলমানদের নিয়ে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ পৃথক রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলন শুরু করেন। অন্যদিকে কুতবে আলম মাওলানা সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী (রাহ.) অখন্ড ভারতের পক্ষে প্রচারণা আরম্ভ করেন। তিনি এর একটি রূপরেখাও প্রণয়ন করেন, যা ‘মাদানী ফরমুলা’ নামে খ্যাত।
পাকিস্তান আন্দোলনে শুধু সিলেটে ভোটের লড়াই হয়েছিল। পাকিস্তানের পক্ষে নেতৃত্ব দান করেন মাওলানা আযাদ সোবহানী, মাওলানা সহুল উসমানী (রাহ.) মাওলানা সাখাওয়াতুল আম্বিয়া, মাওলানা আতহার আলী (রাহঃ) মি: আব্দুল মতীন চৌধুরী ও মাওলানা শায়খ লুৎফুর রহমান বর্ণবী (রাহ.) প্রমুখ। অখ- ভারতের পক্ষে নেতৃত্ব দান করেন: মুজাহিদে মিল্লাত মাওলানা সাইয়্যিদ মাদানী (রাহ.) মাওলানা ইব্রাহীম চতুলী (রাহ.) মাওলানা মুশাহিদ বায়মপুরী ((রাহ.)) শায়খ বশীর আহমদ বাঘা (রাহ.) হাফিজ মাওলানা আব্দুল করীম শাইখে কৌড়িয়া (রাহ.), ও ডাঃ মর্তুজা চৌধুরী (রাহ.) প্রমুখ।
খেলাফত বিল্ডিং এ যেহেতু মারকাযিয়া মাদ্রাসা ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের অফিস ছিল, তাই এটা মাদানী অনুসারীদের আয়ত্ত্বে ছিল। পাকিস্তান আন্দোলন চলাকালে শাহাদাত বরণ করেন নয়া সড়ক মানিকপীর রোড চারা দিঘিরপার নিবাসী আলকাছ। তাঁর তাজা রক্তে রঞ্জিত হয় কোর্ট বিল্ডিং ও গোবিন্দ পার্ক। সিলেটের হাটে-মাঠে আবাল বৃদ্ধ বনিতার মুখে স্বর ছিল ‘আসামে আর থাকব না- গুলি খেয়ে মরবনা’, আসাম সরকার যুলুম করে নামাজেতে মানুষ মারে, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান-পাকিস্তান হামারা জান, পাকিস্তানকা মতলব কিয়া-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। ,
পাকিস্তানপন্থী ভদ্রলোকগণ মাওলানা মাদানীকে লাঞ্ছিত করেন, তাই তাঁর ভক্তদের কণ্ঠে রচিত হল, ‘মাওলানা মাদানীর দায়- কলিজা ফাটিয়া যায়, কি খবর শুনাইল আখবারে মদীনায়।’ মাওলানা মাদানী সজ্জিত বাহিনী নিয়ে চলেছেন বাঁধা নাহি মানি। সাত শত গু-াগণে শাইখুল ইসলামকে মারিবারে চায়।’ ‘মাওলানা মাদানীর পাগড়ী নাপাক পায়েতে মলি আগুনে জ্বালায়।’ ইত্যাদি গজল, ক্রন্দন ও মাতম। সিলেটের প্রাচীনতম পত্রিকা যুগভেরীর ১৪ নভেম্বর ১৯৮৮ সনের সংখ্যায় এমন বর্ণনা রয়েছে।
ভোট যুদ্ধে বিজয়ী হন পাকিস্তানপন্থী মুসলিম লীগ বাহিনী। পরাজিত হন প্রতিপক্ষ। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিপক্ষ বর্ণনাতীত যাতনা, লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা ভোগ করেন। তাদের হাতছাড়া হয় খেলাফত বিল্ডিং। ১৯৪৫ সালে ‘আঞ্জুমানে তরক্কিয়ে উর্দু’ গঠন করা হয়েছিল। দরগাহ মহল্লায় একটি বাসা ভাড়া করে তাদের কার্যক্রম শুরু করেন। পরে মুসলিম সাহিত্য সংসদের জায়গা দখল করে ‘আঞ্জুমানে তরক্কিয়ে উর্দুর’ সাইনবোর্ড সাঁটা হয় এবং উর্দু স্কুল খোলা হয়, অতঃপর এখানে ‘জাতীয় শিক্ষাকেন্দ্র’ লেখা একটি সাইনবোর্ড দেখা যায়। বাবায়ে উর্দু ডঃ সিদ্দিকী ও ড. আব্দুল হক প্রমুখ দিল্লীর জামিয়া মিল্লিয়ার অনুকরণে উর্দু জামিয়া স্কুল (বর্তমানে ব্লুবার্ড স্কুল ও সংস্কৃত কলেজ) স্থাপন করেন।
১৯৪৯ সালে আঞ্জুমানে ইসলামিয়া সেক্রেটারী আব্দুল্লাহ বিএল আঞ্জুমানে তরক্কিয়ে উর্দুর সেক্রেটারীর নামে আঞ্জুমানে ইসলামিয়া খেলাফত বিল্ডিং এর দুই কেদার জমি মবলগ ১৮৫/= টাকা নগদ নিয়ে বার্ষিক ৪৫/- টাকা খিরাজ দেয়ার অঙ্গিকারে বন্দোবস্ত দেন। আঞ্জুমানে উর্দুওয়ালাদের আড্ডাখানা হল খেলাফত বিল্ডিং ও ডিসির বাংলা। কুমারপাড়া, মানিকপীর রোডের বাঙালি তরুণরা মিলে ছোট একটি ক্লাব ও লাইব্রেরী গঠন করে স্থানীয় যুবকদের সৎ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল। তাদেরও অফিস ছিল খেলাফত বিল্ডিং এ। সহ্য হলনা নব্য পাকিস্তানী উর্দু ওয়ালাদের। লেখাপড়ায়, খেলাধুলায় মেধাবী ও পটু যুবকদের বিতাড়িত করা হল। তাদের বই পুস্তক আসবাবপত্র কোথায় গেল, কে নিল? তা বলতে পারেন উর্দুওয়ালারা।
স্থানীয় দরগা মহল্লায় ১৯৩৫ সালে ঝরনার উত্তর পাশে একটি ক্ষুদ্র কুড়েঘরে জন্ম নিয়েছিল ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ। বাঙালি লেখক-পাঠক, সাহিত্যিক-সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের মিলন কেন্দ্র ছিল এ সংসদ। পরবর্তীতে পূর্ব দরগা গেইটের দক্ষিণ পাশে এর কর্মস্থল স্থানান্তরিত হয়। বর্তমানে এ সংসদ এখানেই স্বগৌরবে স্বকীয়তা রক্ষা করে জাতির আরশি হিসেবে আকর্ষিত।
মাওলানা সহুল উসমানী (রাহ.) সিলেটে পাকিস্তানী পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। তাকে মাথায় তুলে নৃত্য করে উল্লাস করেন পাকিস্তানী বন্ধুরা। তাঁর অকৃত্রিম ভক্তবৃন্দ দরগা মহল্লার দর্শন দেউড়িতে জায়গা দিয়ে ঘর-বাড়ী নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় সেই অকৃতজ্ঞ সন্তানেরা সেই জায়গা জমি ঘর বাড়ী বিক্রি করে সবার অজান্তে কোন স্বর্গরাজ্যে পাড়ি দিয়েছেন, সেটা তারাই জানেন।
পাকিস্তান কালের শেষ দিকে আঞ্জুমানে ইসলামিয়া খেলাফত বিল্ডিংকে আঞ্জুমানে তরক্কিয়ে উর্দু ওয়ালারা বিড়ি ফ্যাক্টরী ও লজেন্স ফ্যাক্টরীর কাজে ভাড়া দিয়েছিলেন। এক সময় এখানে পুলিশ ক্যাম্প ছিল বলেও জানা যায়। স্বাধীনতা সংগ্রামের পর তারা কোথায় উধাও হয়ে যান, তখন এ স্থানটি হয়ে যায় আন্প্রটেকট।
প্রাচীনতম দ্বীনি শিক্ষাবোর্ড আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তা’লীম বাংলাদেশের মধ্যে বিভেদ দেখা দিলে এবং আলিমগণের প্রাচীনতম রাজনৈতিক সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামে মতভেদ দেখা দিলে সর্বজন শ্রদ্ধেয় সভাপতি সদরুল উলামা হাফিজ মাওলানা ক্বারী আব্দুল করিম শাইখে কৌড়িয়া (রাহ.) ১৯৮৯ সালে বৃদ্ধ বয়সে বৃহত্তর সিলেটের আলিম সমাজকে এক প্ল্যাট ফর্মে দেখে যাওয়ার লক্ষ্যে ঐতিহ্যবাহী সেই খেলাফত বিল্ডিংয়ে বৈঠক আহবান করেন। এতে প্রায় অর্ধশহ¯্রাধিক শীর্ষ উলামায়ে কিরামের সমাবেশ হয়, এতে নিবন্ধকারও উপস্থিত ছিলেন। অতঃপর হযরত মাওলানা আমিন উদ্দীন শাইখে কাতিয়া (রাহ.) এ স্থানটি দখল করে একটি রমযান মাস এখানে অবস্থান করেন। পরে জনাব ডা. মঞ্জুর সাহেব এ স্থানটি হস্তগত করে ১৯৯৪ সালে লায়ন্স শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে তখনকার প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে এনে এর উদ্বোধন করেন। এরই পাশে জালালাবাদ রোটারী হাসপাতাল ও জালালাবাদ প্রতিবন্ধী কেন্দ্র স্থাপন করেন। ১৯৯৬ সালে মহান জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পীকার ছিলেন মরহুম আলহাজ্ব হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। তিনি কায়িদুল উলামা হযরত শাইখে কৌড়িয়া (রাহ.) এর অনুরক্ত ছিলেন। সিলেটের চৌকিদেখিস্থ মদনী মঞ্জিলে হযরতের বাসায় তিনি সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যান এবং বলেন, হুযুর! আপনাদের দোয়ায় আল্লাহপাক আমাকে জনসেবা করার সুযোগ দান করেছেন। বলুন আমি আপনার কী খেদমত করতে পারি? হযরত বললেন; আমার ব্যক্তিগত কোন খেদমতের প্রয়োজন নেই। কুতবে আলমের স্মৃতি বিজড়িত খেলাফত বিল্ডিং যেখানে ছিল (সিলেটে প্রথম) পবিত্র হাদীস শরীফের দরসগাহ (দারুল হাদীস), এ স্থানটিতে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার কি কোন ব্যবস্থা করা যায়? স্পীকার বললেন, আর কি কোন খেদমত করতে পারি? হযরত শাইখ বললেনÑ জামিয়া ইসলামিয়া আব্বাসিয়া কৌড়িয়া ইসলামাবাদ একটি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে দ্বীনি শিক্ষা দ্বারা আলিমে দ্বীন ও দেশের সৎ এবং সুনাগরিক তৈরি করা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শুভাগমন করেন বিশিষ্ট লোকজন, অধ্যয়ন করেন শত শত শিক্ষার্থী। তাঁদের চলাচল ও গমনাগমনের জন্য ভাল একটি রাস্তার প্রয়োজন। পরে মাননীয় স্পীকার প্রায় দেড় কিলোমিটার রাস্তা পাকা করে সিলেট ভায়া কামাল বাজার বিশ্বনাথের সাথে সংযোগ করেছেন। আর খেলাফত বিল্ডিং এর ব্যাপারে মজুমদারী লেচু বাগানের বিশিষ্ট সমাজসেবী আলহাজ নাদির খান সাহেবের বাসায় স্পীকার সাহেব ও সিলেটের তখনকার এডিসি (ভূমি) এবং হযরত শাইখে কৌড়িয়া (রাহ.) এর সাহেবজাদা হাফিজ মাওলানা শাইখ মহসিন আহমদ ও নিবন্ধকার প্রমুখসহ এক নৈশভোজে মিলিত হন। এতে স্পীকার সাহেব এডিসি (ভূমি)কে খেলাফত বিল্ডিংয়ে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার ব্যবস্থা করে দেয়ার নির্দেশ দেন। তদনুযায়ী এডিসি সাহেব ডা. মঞ্জুর সাহেব ও মুফতী মাওলানা ফয়যুল হক সাহেব প্রমুখ এবং আমাদেরকে নিয়ে ডিসি অফিসে বৈঠক করেন। অতঃপর নির্মীয়মাণ জালালাবাদ রোটারী হাসপাতালে উভয় পক্ষকে নিয়ে অকুস্থল পরিদর্শন করে বৈঠক করেন। পরিশেষে ডাঃ মঞ্জুর সাহেব সাত শতক জায়গা হযরত শাইখে কৌড়িয়া (রাহ.)’র নামে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার জন্য ছেড়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। হযরত এখানে মাদ্রাসার জন্য একটি বিল্ডিং নির্মাণ করার ব্যবস্থা করেন। এর ভিত্তি স্থাপন করেন বিশ্ব বরেণ্য আধ্যাত্মিক রাহবার ফিদায়ে মিল্লাত মাওলানা সাইয়্যিদ আস আদ মাদানী (রাহ.) ও স্পীকার আলহাজ্ব হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এবং ক্বায়িদুল উলামা হাফিয মাওলানা আব্দুল শাইখে কৌড়িয়া (রাহ.), বিশিষ্ট আলিমে দীন মাওলানা শাইখ ফরীদ উদ্দিন মাসউদ, হা

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সাত মার্চের কবিতা ও সিলেট বেতার কেন্দ্র
  • পার্বত্য তথ্য সংকটের মূল্যায়ন
  • সিলেটের প্রাচীন ‘গড়’ কিভাবে ‘গৌড়’ হলো
  • ৮৭ বছরের গৌরব নিয়ে দাঁড়িয়ে সরকারি কিন্ডারগার্টেন প্রাথমিক বিদ্যালয় জিন্দাবাজার
  • খেলাফত বিল্ডিং : ইতিহাসের জ্যোতির্ময় অধ্যায়
  • এক ডিমের মসজিদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের কিছু ঘটনা
  • খাদিমনগরে বুনো পরিবেশে একটি দিন
  • ফিরে দেখা ৭ নভেম্বর
  • শ্রীরামসি গণহত্যা
  • প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের ধারক মৃৎশিল্প
  • বিপ্লবী লীলা নাগ ও সিলেটের কয়েকজন সম্পাদিকা
  • গ্রামের নাম আনোয়ারপুর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • Developed by: Sparkle IT