উপ সম্পাদকীয়

ইলেকট্রনিক ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে ক্ষতিকর প্রভাব

আবু আফজাল মোহা. সালেহ প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-১১-২০১৮ ইং ০২:১০:১১ | সংবাদটি ৪১ বার পঠিত

বছরের পর বছর নদী বা সমুদ্রের পানিতে ফেলা হচ্ছে ইলেকট্রনিক বর্জ্য। আর ফেলা হচ্ছে প্লাস্টিক দ্রব্য; যা বছরের পর বছর নষ্ট হয় না। প্লাস্টিক সামগ্রী ক্ষয় হতে হাজার বছরেরও বেশি সময় লাগে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। যেখানে সেখানে প্লাস্টিক দ্রব্য ফেলা হয়। এতে মাটি দূষিত হয়। নদী ও সমুদ্রে প্লাস্টিক সামগ্রীর অংশ ফেললে পানি দূষিত হয়। প্লাস্টিকের মধ্যে অনেক ক্ষতিকর পদার্থ রয়েছে, যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। প্লাস্টিকে থাকা সিসা, ক্যাডমিয়াম ও পারদ প্রাণী স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর। এসব পদার্থ সরাসরি বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কিছু কিছু প্লাস্টিকে ডিইএইচপি নামক পদার্থ থাকে, যা থেকে ক্যান্সার রোগের সৃষ্টি হয়। প্লাস্টিক ও ই-বর্জ্য থেকে প্রাপ্ত ক্ষতিকর পদার্থ মানব স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এসব পদার্থ। শিশুর বিকাশ ব্যাহত হয় এতে। এভাবে চললে দেশ সুনাগরিক পেতে ব্যর্থ হবে। এখনই ই-বর্জ্য ও প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবহারে রাশ টেনে ধরতে হবে।
বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী অনেক এলাকার মানুষই নদীতে সরাসরি ময়লা-আবর্জনা ফেলেন। এসব ময়লা-আবর্জনা নদীর পানিতে মিশে যায়। নদীকে ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ভয়াবহ দূষণে বুড়িগঙ্গা নদীর পানি কুচকুচে কালো। ঢাকার প্রাণ বলা হয় এ বুড়িগঙ্গাকে। কিন্তু দূষণে জর্জরিত নদীটি দিনে দিনে যেন মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে। ঢাকার বাবুবাজার এলাকা দিয়ে সরাসরি বর্জ্য মিশ্রিত পানি ফেলা হচ্ছে বুড়িগঙ্গায়। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার এরকম বেশ কিছু জায়গা থেকে সরাসরি বুড়িগঙ্গায় ফেলা হয় বর্জ্য। বুড়িগঙ্গার পানি দূষণের এটি একটি অন্যতম কারণ। বুড়িগঙ্গার পানিতে রাসায়নিক বহন করার ব্যাগ পরিষ্কার করছেন শ্রমিকরা। পুরান ঢাকার বেশ কয়েকটি স্থানে নিয়মিত রাসায়নিক বহনের ব্যাগ, কন্টেইনার পরিষ্কার করার কারণে এ নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। পুরান ঢাকার ইসলামবাগ, সোয়ারিঘাট, কামরাঙ্গীর চরসহ বিভিন্ন এলাকায় বুড়িগঙ্গার তীরজুড়ে চলে প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ। বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রিত এসব প্লাস্টিক সামগ্রী পরিষ্কারের কাজটি সরাসরি করা হয় বুড়িগঙ্গার পানিতে। পানি দূষণের আরেকটি কারণ ফলে ব্যবহৃত প্লাস্টিক জাতীয় মোড়ক, ফোম ইত্যাদি। পুরান ঢাকার বাদামতলী এলাকায় ঢাকার সবচেয়ে বড় ফলের পাইকারি বাজার থেকে এসব অপচনশীল দ্রব্যাদি সরাসরি ফেলা হয় বুড়িগঙ্গায়। এসব ঘটনা অন্য অনেক নদী, খাল বা এমনকি সমুদ্রের পানির ক্ষেত্রেও ঘটছে।
ক্রটিপূর্ণ এবং অব্যবহার্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি পরিত্যক্ত বৈদ্যুতিক বা ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম বা যন্ত্রপাতিকে ই-বর্জ্য বলি। এগুলো মূলত ভোক্তার বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, যেমন- ফ্রিজ, ক্যামেরা, মাইক্রোওয়েভ, কাপড় ধোয়ার ও শুকানোর যন্ত্র, টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ইত্যাদি। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ইলেকট্রনিক বর্জ্যরে নিয়মনীতিহীন ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াকরণ থেকে মানব স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে এবং পরিবেশ দূষণ হতে পারে। রসায়নবিদদের মতে, ইন্টারনেট ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ডিভাইসের ব্যবহার বেড়ে যাচ্ছে, যার ফলে বর্জ্যও বাড়ছে। এ বর্জ্য যেখানে সেখানে ফেলে রাখলে ‘এসিডিক কন্ডিশন’ তৈরি হয়। পরে মাটির স্তর ভেদ করে পানির স্তর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
ই-বর্জ্যতে থাকে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর পদার্থ। সিসা, ক্যাডমিয়াম, বেরিলিয়াম, ক্রোমিয়াম, পারদ, পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি), আর্সেনিক, পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইল (পিসিবি), ইত্যাদি অন্যতম। এই ক্ষতিকর পদার্থ মাটি, পানি ও বায়ুর সাথে মিশে গিয়ে মানুষের জন্য বিষাক্ত এক উপাদান সৃষ্টি করে। এগুলো আমরা দেখতে পাই না বলে এদের ভয়াবহতা স¤পর্কে বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছি। কিন্তু এগুলো মরণঘাতী নীরব বিষ! যারা এগুলো সংগ্রহ করে, এগুলো নিয়ে কাজ করে, তাদের স্বাস্থ্যের জন্য এটি মারাত্মক হুমকি। এগুলো পরিবেশের জন্য নীরব ঘাতক। একটি তথ্য দেইÑ একটি সেলফোনে ব্যবহৃত ক্যাডমিয়াম ছয় হাজার লিটার পানি দূষণ করে। এতে ব্যবহৃত অগ্নিপ্রতিরোধক উপাদান যেমন সিসা, ক্যান্সার, যকৃত, স্নায়ুযন্ত্রের ক্ষতি করে। ডিসপ্লে ও বোর্ডে ব্যবহৃত পারদ বা মার্করি মস্তিষ্ক ও কিডনি নষ্ট করে। গবেষণায় দেখা যায়, এক চামচ পারদে বিশ একর জমির পানি দূষিত করতে পারে! ভেবে দেখুন একবারÑ মনের অজান্তেই কতকিছু ঘটছে! সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে। আর বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকির হার। কম্পিউটারের সিপিইউ বা কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়াকরণ যন্ত্রাংশটির মতো কিছু কিছু ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশে সিসা, ক্যাডমিয়াম, বেরিলিয়াম, ক্রোমিয়াম, ইত্যাদির মতো ক্ষতিকর পদার্থ থাকা সম্ভব। উন্নয়নশীল দেশের ইলেকট্রনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জড়িত শ্রমিক সম্প্রদায়ের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি অনেক বেশি। এ সমস্ত বর্জ্য পুনঃচক্রায়ন প্রক্রিয়াতে শ্রমিকেরা ভারি ধাতুর সংস্পর্শে যেন না আসে, সে ব্যাপারে অত্যন্ত যতœবান হওয়া উচিত।
২০১৪ সালে জাপানে অবস্থিত জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয় ঞযব এষড়নধষ ঊ-ধিংঃব গড়হরঃড়ৎ ২০১৪ : ছঁধহঃরঃরবং, ঋষড়ংি ধহফ জবংড়ঁৎপবং শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যাতে বলা হয় যে, বিশ্বে প্রতি বছর ৪ কোটি টনেরও বেশি ইলেকট্রনিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সারা বিশ্বের ই-বর্জ্যরে এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদন করে। ভারত ই-বর্জ্য উৎপাদনে বিশ্বে ৫ম। ভারতে ই-বর্জ্য উৎপাদিত হয় বছরে ২০ লাখ টন। ই-বর্জ্যে অনেক অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ধাতু ও অন্যান্য উপাদান আছে, যেগুলো পুনঃচক্রায়ন করা সম্ভব। লোহা, তামা, সোনা, রূপা, অ্যালুমিনিয়াম, প্যালাডিয়াম থাকে ই-বর্জ্যে। প্রতি বছর বিশ্বে ই-বর্জ্য বৃদ্ধি পায় প্রায় ১০ শতাংশ হারে। অন্যদিকে এ বর্জ্যরে শতকরা ৫ ভাগের বেশি পুনরুদ্ধার করা যায় না। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়া যথাযথ না হলে ই-বর্জ্য হতে তৈরি হওয়া নতুন সামগ্রী পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ।
সেমিনারে ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটির স্টেপ ইনিশিয়েটিভের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়- ২০১২ সালে বিশ্বে ৪৫.৬ মিলিয়ন টন ই-বর্জ্য সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৬ সালে যা হয় ৯৩.৫ মিলিয়ন টন। বিশ্বে এখন ৩৫৬ কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহার হচ্ছে, ২০১৮ সালে বিশ্বে ৪০০ কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহার করবে। বিটিআরসির তথ্যমতে, বাংলাদেশে ১১.৬৫ কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহার হচ্ছে, যার ওজন ১ হাজার ১২৫ টন। ১৬ কোটি মানুষের দেশে প্রায় ১৩ কোটি মোবাইল সেট ব্যবহৃত হচ্ছে; যার প্রতি বছর শতকরা ৩০ ভাগ ই-বর্জ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে।
সভ্যতার উন্নতির সাথে সাথে ইলেকট্রনিক্স ও ইলেকট্রিক, প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহার বেড়েই যাচ্ছে। আমাদের এখনই সচেতন হতে হবে। না হলে আমরা মারাত্মক পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ব। হাতে নিতে হবে সময়োপযোগী নীতিমালা ও আইন। প্রয়োগ করতে হবে কঠোরভাবে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বা ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানকে চুক্তির আওতায় আনতে হবে। বর্জ্য জিনিসগুলোকে তাদের সংগ্রহ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ করে পরিবেশবান্ধবভাবে পুনঃব্যবহার উপযোগী করতে হবে বা বিনাশ করতে হবে। না করতে পারলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার হবে আমাদের জন্য। পলিথিন ব্যবহার বাদ দিয়ে ‘সোনালি ব্যাগ’ ব্যবহারে প্রচারণা চালাতে হবে। যত্রতত্র প্লাস্টিক সামগ্রী (চিপস বা বিভিন্ন মোড়ক) ফেলা যাবে না। পানি বা নদীতে ফেলা যাবে না। এতে পানিপ্রবাহ ব্যাহত হয়। ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। পুরাতন জিনিসপত্র রেখে দিয়ে আর্থিক সুবিধা বা পুনঃসরবরাহ করে এ সহযোগিতা তারা করতে পারে। ভাগাড় তৈরি করতে হবে পরিকল্পিতভাবে। ভারত ও চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকলে কোন শিল্প স্থাপনা করার অনুমোদন না দেয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অধিক কঠোর হতে হবে। প্লাস্টিক সামগ্রী, পলিব্যাগ, চিপস-সামগ্রীর মোড়কের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। সর্বোপরি জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT