উপ সম্পাদকীয়

আমেরিকা : ট্রাম্প শাসনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব

এডভোকেট আনসার খান প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-১১-২০১৮ ইং ০২:১১:২৮ | সংবাদটি ৩৪ বার পঠিত

আমেরিকার বহুল আলোচিত মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষে ফলাফল জানা গেছে এবং প্রকাশিত চুড়ান্ত ফলাফল অনুযায়ী দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইন সভার প্রথম কক্ষ অর্থাৎ প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্রেট পার্টি ৪৩৫ আসনের মধ্যে ২২৫ আসন পেয়ে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় বিগত আট বছর পরে দলটি প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নিতে সক্ষম হলো।
অন্যদিকে আইন সভার উচ্চ কক্ষ সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি সিনেটে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পূর্বে বিদ্যমান প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয় কক্ষেই রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ ছিলো। মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের হাত থেকে নিয়ন্ত্রণ চলে গেলো ডেমোক্রেটদের দখলে। ফলে এই পরিবর্তন আমেরিকার ভবিষ্যত রাজনীতি, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরবর্তী দুই বছরের শাসনকাল দ্বন্দ্বমুখর হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্পর্কে সম্যক ধারণা নেওয়া সঙ্গত হবে বলে মনে করি। কেন এই নির্বাচনকে মধ্যবর্তী নির্বাচন বলা হয়, এমন প্রশ্ন এসে যায়। এর উত্তরে বলা যায়-আমেরিকার প্রেসিডেন্টের পদের মেয়াদ চার বছর। নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে এবং পরবর্তী দুই বছর মেয়াদপূর্ণ কালে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আইন সভার উভয় কক্ষের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে বলে এই নির্বাচনকে মধ্যবর্তী নির্বাচন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। ২০১৬ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মিঃ ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং চলিত নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মিঃ ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হওয়ার দুই বছর মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে।
ট্রাম্পের পদের মেয়াদ দুই বছর পূর্ণ হওয়াকালে আমেরিকার আইনসভা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের এবং রাজ্যগুলোর গভর্ণরশীপের নির্বাচন নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হলো বলে এটিকে মধ্যবর্তী নির্বাচন বলা হয়ে থাকে। এটি আমেরিকার সাংবিধানিক পদ্ধতি।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সকল আসনের অর্থাৎ ৪৩৫টি আসনের, সিনেটের মোট ১০০ আসনের মধ্যে এক তৃতীয়াংশরা ৩৫টি আসনের এবং ৫০টি অঙ্গরাজ্যের গভর্ণরশীপের মধ্যে ৩৬টির গভর্ণরশীপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে এবং এবারের নির্বাচনেও তাই হয়েছে।
আমেরিকান রাজনৈতিক অঙ্গনের পর্যবেক্ষক ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের অভিমত হলো পূর্বের যে কোন মধ্যবর্তী নির্বাচনের চেয়ে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিলো এ কারণে যে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন সব কর্মসূচি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন যা গোটা আমেরিকান রাষ্ট্র ও সমাজ এবং এমনকি ইউরোপসহ গোটা বিশ্ব ব্যবস্থায় বিতর্কের ঝড় তুলেছিলো।
ট্রাম্পের বিতর্কিত অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্র সংক্রান্ত বিতর্কিত নীতি কৌশলের বিপরীতে ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে তাই ট্রাম্পের দুই বছরের শাসনের প্রতি দেশের জনগণের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে গণভোট হিসেবে গণ্য করা হয়েছিলো এবং একইভাবে এই নির্বাচনকে ট্রাম্পের গৃহীত লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতির, যেটির প্রতিনিধিত্ব স্বয়ং ট্রাম্প করে চলেছেন তার প্রতিও জনগণের আস্থা আছে কিনা সেটিরও গণভোট হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিলো।
নির্বাচনী ফলাফল পর্যালোচনা করে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা ভিন্ন ভিন্ন অভিমত দিলেও একটি বিষয়ে প্রায় একমত পোষণ করেছেন যে, গণভোটে কোনো পক্ষই অর্থাৎ প্রেডিডেন্ট ট্রাম্প, রিপাবলিকান পার্টি বা ডেমোক্রেট পার্টি এককভাবে বিজয়ী হতে পারেননি। গোটা আমেরিকার জনগণ বিভক্ত হয়ে পড়েছেন দু’টি ধারায়। ট্রাম্প সমেত রিপাবলিকান পার্টি বনাম ডেমোক্রেট, এ দুটি ধারায় আমেরিকানরা স্পষ্টতই বিভাজিত এবং এ বিভাজন অনাগত দিনগুলোতে আমেরিকান রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরণের প্রভাবক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এটিও মনে করেন, আমেরিকানরা দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ার কারণেই আমেরিকান ভোটাররা ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দিয়েছেন এবং আবার ট্রাম্পের বিপক্ষেও ভোট দিয়েছেন দেখতে পাওয়া যায়। যেমন বিষয়টি পরিষ্কার করে বলা যায়-এ নির্বাচনের পূর্বে আমেরিকান আইনসভা কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলো। কিন্তু মধ্যবর্তী নির্বাচনে হিসেবটি পাল্টে গেছে। উচ্চকক্ষ সিনেটে ভোটাররা ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির পক্ষেই ভোট দিয়েছেন বিধায় সিনেটে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। অন্যদিকে, নি¤œকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে ভোটাররা ডেমোক্রেটদের পক্ষে ভোট দেওয়ায় এখানে ডেমোক্রেটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এটিকে এক ধরণের ভারসাম্য বলা যায়। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে উভয় কক্ষ পরস্পরের উপর নির্ভরশীল থাকবে বিধায় আমেরিকানদের স্বার্থের পরিপন্থী আইন প্রণয়ন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে এবং এর ফলে ট্রাম্পের কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার সামাল দেওয়া সম্ভব হবে বলে ধারণা করছেন আমেরিকানরা।
নির্বাচনী এই ফলাফলের কারণে উভয় পক্ষই বিজয়ী হতে পেরেছেন মর্মে দাবী করতে পারবেন, এটি সত্য। তবে ট্রাম্পের জন্য পরবর্তী দুটি বছর রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে অনেক বাধাবিপত্তি আসতে পারে এবং এমনকি তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারও হুমকির মধ্যে পড়তে পারে। প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্রেটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার ফলে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা অনেকটাই খর্ব হওয়ার বিষয়টি অবধারিত। অনেক ক্ষেত্রেই ডেমোক্রেটদের সাথে সমঝোতা করেই প্রেসিডেন্টকে কাজ করতে হবে।
আমেরিকান সংবিধান অনুযায়ী আইনসভা বা কংগ্রেস, সিনেট এবং প্রতিনিধি পরিষদ-এ দুটি কক্ষ নিয়ে গঠিত এবং যে কোনো আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত বিল এর যেকোনো একটি কক্ষে উত্থাপন করতে হয় এবং উত্থাপিত বিলটি অবশ্যই দুটি কক্ষের দ্বারা অনুমোদিত হয়ে চুড়ান্ত স্বাক্ষরের জন্য প্রেসিডেন্টের কাছে যাবে। কাজেই এটি বলা যায় যে, প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্রেটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকায় প্রেসিডেন্ট ইচ্ছে করলেই নিজের পছন্দের আইন প্রণয়ন করতে পারবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত না প্রতিনিধি পরিষদের সাথে সমঝোতায় আসতে পারবেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্পের জন্য বহুবিধ সমস্যা হয়ে দেখা দেবে এবং আগামী জানুয়ারী (২০১৯ সাল) মাসে যখন মিডটার্মে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন তৎপরবর্তী সময়কাল থেকেই সমস্যা সমুহ দৃশ্যমান হতে থাকবে, যা পর্যবেক্ষকরা এমনই অনুভব করতে পারছেন। এর কতকগুলো বিষয় এমন হতে পারে-
১. বাজেট পাস সহ রিপাবলিকানদের তথা ট্রাম্পের যে কোনো এজেন্ডা যাতে পাস ও বাস্তবায়ন না হতে পারে সেজন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্রেটরা ডেডলক সৃষ্টি করতে পারে।
২. নির্বাচনের ফলাফল ডেমোক্রেটদেরকে অনেক বেশি ক্ষমতায়িত করেছে এবং প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্রেট ভেটো প্রদানের ক্ষমতা পেয়েছে। ফলে রিপাবলিকান পার্টি তথা প্রেসিডেন্টের যে কোনো বিলে ডেমোক্রেটরা ভেটো প্রয়োগ করে বিলটি আটকে দিতে পারে।
৩. ডেমোক্রেটরা সমন বা তলবানা জারীর ক্ষমতা পেয়েছে প্রতিনিধি সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার কারণে। এই ক্ষমতার বলে প্রতিনিধি সভা ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত করতে পারবে। কর্মকর্তাদের প্রতি সমনজারী করে প্রতিনিধি সভায় ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে এবং যে কোনো প্রয়োজনীয় দলিল দস্তাবেজ উপস্থাপনের জন্য তলবানা জারী করতে পারবে।
তদন্ত করার বা সমনজারী করার ক্ষমতার কারণে ২০১৬ সালের নির্বাচনে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবে।
৪. ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আয়কর রিটার্ন, তাঁর ব্যবসা সংক্রান্ত নানা বিষয়ে সমনজারী করা সহ তদন্ত করতে পারবে।
৫. ওবামা কেয়ার রিপিল বিল, স্বাস্থ্য বীমা, সামাজিক নিরাপত্তা বিল, ফুড স্টাম্প ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন আইনের যে সকল বিষয়ের উপর ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে আইন তৈরী করার চেষ্টা করছে, সেগুলো আটকে দিতে পারে ডেমোক্রেটরা। এছাড়াও ইমিগ্রেশন আইন সংক্রান্ত যে কোনো ধরনের সংশোধনী পাসে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে ডেমোক্রেটরা।
৬. পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক ব্যবসা নীতি, আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা ইত্যাদি বিষয়গুলোতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে ডেমোক্রেটরা।
৭. আগামী বছরগুলো ‘অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠবে এবং ট্রাম্প যেখানে বলছেন সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী যে কোনো মূল্যে রক্ষা করবেন, সেখানে ডেমোক্রেটরা চেষ্টা করবেন দেশের ভেতরের অস্ত্র বহন বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে। ফলে এখানেও ট্রাম্প এবং ডেমোক্রেটদের মধ্যে সংকট তৈরী হবে।
মোটের ওপর এটা বলা যায় যে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে আমেরিকানদের মধ্যে যে বিভাজন তৈরী হয়েছে, সামনের দিনগুলোতে এটি আরো বিস্তৃত হতে থাকবে এবং সেটি গোটা আমেরিকার ঐক্যের জন্য বড় ধরণের সংকট ডেকে আনবে। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকট সবে শুরু হলো মাত্র। গোটা আমেরিকানরা এখন দুটি শিবিরভুক্ত হয়ে পড়েছে। আগামীতে বড় বিপদ আসতে পারে। ট্রাম্প কীভাবে এসব সামাল দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন তাও দেখার বিষয় হয়ে থাকবে।
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT