সম্পাদকীয়

উৎসব শুরু নবান্নের

প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-১১-২০১৮ ইং ০২:১৫:৪৩ | সংবাদটি ৪৫ বার পঠিত

শীতের আগমনী বার্তা ঘোষণা দিচ্ছে হেমন্তের মৃদু ঠান্ডা বাতাস। দোলা লেগেছে গ্রামবাংলায়, শহরে-বন্দরে। দিগন্ত জোড়া মাঠে সোনালী ধান বাতাসের দোলায় হেসে উঠছে। আবার কখনও নুয়ে পড়ছে মাটিতে। এমন দৃশ্য এখন বাংলার মাঠের পরে মাঠ জুড়ে। চোখ ধাঁধানো এমন রূপের সঙ্গে আছে পাকা ধানের মন মাতানো ঘ্রাণ। সব মিলিয়ে এমনই অপরূপ দৃশ্যের অবতারণা হয় শুধুমাত্র এই অগ্রহায়ণে নতুন ধান তোলার উৎসবে। শুরু হয়ে গেছে নবান্নের উৎসব। চলছে ঘরে ঘরে পিঠা তৈরি। রকমারী পিঠাপুলি চিরায়ত বাংলার ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে। তেমনি বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে অগ্রহায়ণ। আজ অগ্রহায়ণের প্রথম দিন। বাংলার কৃষক তথা পুরো জনগোষ্ঠী সারা বছরই বসে থাকে এই অগ্রহায়ণের অপেক্ষায়। কারণ, এই মাসে নতুন ধান ওঠে ঘরে, হাসি ফোটে কৃষকের মুখে। নবান্নের উৎসবে মেতে ওঠে জাতি। আজকের দিনটিকে কৃষি দিবস হিসেবেও পালন করা হচ্ছে। শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই পালিত হয় দিবসটি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রদেশে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষি দিবস পালিত হচ্ছে গত অর্ধ শতাব্দী ধরে।
আজকের দিনটিকে মূলত ধান কাটার উৎসব হিসেবেই ‘কৃষিদিবস’ নামে পালিত হচ্ছে। যখন এই দিবসটি পালিত হচ্ছে, কিংবা যখন শুরু হয়েছে নবান্নের উৎসব-তখন আমাদের দেশের সার্বিক কৃষি পরিস্থিতি কেমন? একদিকে হ্রাস পাচ্ছে কৃষি জমির পরিমাণ, অপরদিকে হ্রাস পাচ্ছে জমির উর্বরতা। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়ছে খাদ্য উৎপাদনে। তারপরেও আমাদের কৃষক ও কৃষিবিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে দেশে সার্বিক খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশ এগুচ্ছে বার্ষিক চার মেট্রিকটন খাদ্য উৎপাদনের দিকে। তবে বিজ্ঞানীদের অভিমত হচ্ছে, যে হারে কৃষি জমি কমছে সেই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী অর্ধশতাব্দী পর দেশে কোনো কৃষি জমি থাকবে না। তাছাড়া, দীর্ঘদিন ধরে জমিতে অপরিমিত মাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করায় জমির উর্বরতা শক্তি কমে আসছে। সেই সঙ্গে রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এই অবস্থায় আরেকটি দুঃসংবাদ হচ্ছে, কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া। সর্বোপরি কৃষকদের জীবনমান উন্নত হচ্ছে না। এই প্রসঙ্গে একটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরি। তা হলো, বৈশ্বিক খাদ্য পরিস্থিতি। নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই যে, সারা বিশ্বের খাদ্য পরিস্থিতি এখন সুবিধাজনক নয়। খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে বিভিন্ন দেশে। বিশ্বের অর্ধেক মানুষের প্রধান খাদ্য এখন ভাত। অথচ বিভিন্ন দেশে কমে আসছে চালের উৎপাদন। দরিদ্র দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোও খাদ্যসংকট মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জনগণ তাদের আয়ের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যয় করে খাদ্যের জন্য। এর মধ্যে এশিয়ার অবস্থা আরও করুণ। এই অঞ্চলে খাদ্য সংকটের পাশাপাশি রয়েছে মূল্যস্ফীতি। বেড়েই চলেছে খাদ্যপণ্যের দাম। সেই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা। আমাদের দেশের জনগণকে খাদ্যপণ্যের পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে উপার্জনের ৭০ শতাংশ। ফলে তারা খাদ্যের বাইরে অন্যখাতে অর্থ ব্যয় করার সুযোগ পাচ্ছে না। তাই তাদের জীবনমানও যাচ্ছে নীচের দিকে। এই অবস্থায় কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।
আমাদের এই প্রিয় জন্মভূমিতে জনবসতি গড়ে ওঠেছে কয়েক হাজার বছর আগে। ক্রমবিবর্তনের ধারায় সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে এই উর্বর ভূমিতে। আর এই সভ্যতার বিকাশের পেছনে অবদান রয়েছে মূলত কৃষির। মাটির উর্বরতা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঋতুবৈচিত্র্যের কারণে খৃস্টপূর্ব সময় থেকেই এই অঞ্চলে কৃষিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রচুর সম্ভাবনার কথা শোনা যায়। জনবসতির শুরু থেকেই এ অঞ্চলের কৃষি ক্ষেত্রে সম্ভাবনা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আস্তে আস্তে মানুষেরা জমিতে ফসল চাষে অভ্যস্ত হয়। গড়ে উঠতে থাকে মানুষের মধ্যে একটা শ্রেণি। যার নাম কৃষক। বর্তমানে দেশে ৬০ শতাংশ মানুষ কৃষক বা কৃষিজীবী। বলা হয়, কৃষকরা জাতির মেরুদন্ড। কৃষক বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। কিন্তু আমাদের কৃষকরা বরাবরই অবহেলিত। তাদের ভাগ্যের উন্নতি হয় নি অতীতে, হচ্ছে না এখনও। অতীতে যেমন তাদের বলা হতো ‘চাষাভুষা’ এখনও তাদের প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য থামে নি। সত্যিকার অর্থে যারা কৃষকদের ছোট করে দেখে, তারা নিজেরাই ছোট হয়ে যায়; কারণ কৃষকরা সমাজের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্টিত। তারা আমাদের গর্বের ধন। আজকের এই নবান্নের উৎসবের দিনে কৃষকদের অবহেলার চোখে দেখার হীনমানসিকতা পরিবর্তনের শপথ নেয়া দরকার।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT