উপ সম্পাদকীয় দৃষ্টিপাত

মৃত্যুই দিয়েছে তাঁরে চিরমুক্তি!

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-১১-২০১৮ ইং ০২:১৬:২৯ | সংবাদটি ২৩৯ বার পঠিত

নির্দোষ হয়েও এক যুগ (১২ বছর) কনডেমড সেলের যন্ত্রণা সইতে হয়েছে ওবেদ আলীকে। অবশেষে বড় অভিমানে চলে গেলেন চিরতরে। গত ৭ অক্টোবর ছিল ওবেদ আলীর কারামুক্তির দিন। এইদিন জীবন থেকেই চির মুক্তি নিয়ে চলে গেলেন ক্যান্সার আক্রান্ত ওবেদ আলী। অবশেষে মুক্তি মিলেছে ওবেদ আলীর। তবে মৃত্যুই তাঁকে চিরমুক্তি দিয়েছে।
২০০৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ রোডের ফটিক বাবুর বাড়ির সামনে দুই পুলিশ কনস্টেবলকে হত্যা করা হয়। এই হত্যা মামলায় মাননীয় নি¤œ আদালত ২০০৬ সালে রায়হানুল ইসলাম, মো. জাকির হোসেন ও ওবেদ আলীকে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেন। মৃত্যু দন্ডপ্রাপ্ত তিন আসামীকে নেওয়া হয় কারাগারের কনডেমড সেলে। তারপর কেটে যায় এক যুগ। এরই মধ্যে মহামান্য সর্বোচ্চ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে ওবেদ আলী ও জাকির হোসেন নির্দোষ।
ওবেদ আলী ও জাকির হোসেন নির্দোষ হওয়ার সংবাদটি পেয়েছিলেন প্রায় ৭ বছর পূর্বে মহামান্য হাইকোর্টের রায়ে খালাস পাওয়ার মধ্য দিয়ে। কিন্তু এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। ফলে বিচার বিলম্বে ওবেদ আলী ও জাকির হোসেনের কারাবাস দীর্ঘায়িত হয়। চলতি বছর ১১ এপ্রিল আপিল বিভাগ ও মহামান্য হাইকোর্টের খালাসের রায় বহাল রাখেন। আর কনডেমড সেলে থাকাকালে চার বছর আগে ওবেদ আলীর কোলন ক্যান্সার ধরা পড়ে। ওবেদ আলী লড়তে থাকেন মৃত্যুর সঙ্গে। আপিল বিভাগ নির্দোষ হিসেবে ঘোষিত রায়ের কপি অবশেষে গত ৪ অক্টোবর হাতে পান ওবেদ আলীর ছেলে শেখ আশিকুর রহমান শাওন।
কফিনে শুয়ে বেরিয়ে এসেছেন ১২ বছর কনডেমড সেলে তীব্র যন্ত্রণা ভোগকারী ওবেদ আলী। দীর্ঘ সময় পর নির্দোষ ওবেদ আলী বাড়ি ফিরেছেন। মৃত অবস্থায় তাঁর বাড়ি ফেরা মেনে নিতে পারছেন না পরিবারের সদস্যরা। তাই ওবেদ আলীর স্ত্রী আছিয়া খাতুনের আক্ষেপ-‘বাড়িতে ফিরে লোকটার ছেলেমেয়েদের বুকে টেনে নেওয়ার ইচ্ছা ছিল, সেটা আর ওরা করতে দেয়নি।’
প্রশ্ন হচ্ছে, ওরা কারা? ওরা হলেন, ওবেদ আলী’র শত্রুলোক এবং ওবেদ আলী’র পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবিরা। বিশেষ করে ওবেদ আলী’র পক্ষের আইনজীবীদের ভুলের কারণে এমন হৃদয়স্পর্শী পরিণতি ঘটেছে ওবেদ আলীর জীবনে। মুক্ত পরিবেশে সন্তানদের সঙ্গে বাঁচার আকুতি ছিল ওবেদ আলীর। তা, আর হলো না। তাঁর পক্ষের আইনজীবির ভুলের কারণে সাধের ইচ্ছা তাঁর পূর্ণ হলো না। আর আইনজীবীর ভুলটি হলো-এ ধরনের ফাঁসির আসামী আপিল বিভাগ থেকে খালাস পাওয়ার সাথে সাথেই একটি শর্ট অর্ডার (সংক্ষিপ্ত আদেশ) দিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। কারণ, পূর্ণাঙ্গ রায় লিখতে তো সময় লাগে। এক্ষেত্রে, ওবেদ আলী’র আইনজীবী যদি আপিল বিভাগে বলতেন, মহামান্য আদালত, একটা শর্ট অর্ডার দিয়ে দেন, তাহলে হয়তো ওবেদ আলী আরও অনেক আগেই মুক্তি পেতেন। বিজ্ঞ আইনজীবির গাফিলতির কারণে ওবেদ আলী’র বাড়ি ফেরা হলো না জীবিত অবস্থায়। মৃত্যুই দিয়েছে তাঁরে চিরজনমের মুক্তি।
ওবেদ আলী’র জীবনে যা ঘটার ঘটে গেছে, কিন্তু এ রকম ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে। কারো বিরুদ্ধে যদি কোনো মামলা হয়, মামলার যে বিভিন্ন প্রক্রিয়া রয়েছে-তদন্ত থেকে শুরু করে বিচার সম্পন্ন করা পর্যন্ত প্রত্যেকটি কাজ দ্রুততার সঙ্গে করতে হবে। এতে অপরাধীরা দ্রুত সাজা পাবে, আর নিরাপরাধীরা দ্রুত মামলার জাল থেকে মুক্তি পাবে। এটা করতে ব্যর্থ হলে মামলা প্রমাণ ও অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। বিচার প্রার্থীরাও অনেক সময় সঠিক বিচার পায় না। এবং যারা বিনা অপরাধে কারাগারে আছে, তাঁদের কারাবাসও অনেক সময় দীর্ঘায়িত হতে থাকে। এতে ওই সমস্ত বিনা অপরাধে অপরাধী ব্যক্তিদের পরিবারের যে কত রকমের ক্ষতি হয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রথমতঃ সামাজিকভাবে তাঁরা হেয়প্রতিপন্ন হয়। দ্বিতীয়তঃ আর্থিক, শারীরিক, মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। কেউ বা কারাগারেই মারা যায়। ওবেদ আলীই যার প্রমাণ।
ওবেদ আলী’র বিবিএ পাস করা ছেলে শাওনকে সরকারের পক্ষ থেকে চাকরি দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি এবং যে বিজ্ঞ আইনজীবীর গাফিলতির কারণে একজন ওবেদ আলী’র ট্রাজিক মুক্তি মিললো, সেই লার্নেড পারসনকে আরও সচেতন হয়ে মামলা পরিচালনার বিনীত অনুরোধ করছি। কোর্টে গিয়ে শুধু নিজের পেটের ধান্ধা করলে হবে না, যে ক্লায়েন্ট আপনাকে ফিস দিলো তাঁর অবস্থাটাও আপনাকে মাথায় রাখতে হবে। ঠান্ডা মাথায়, শান্ত মনে সকল ক্লায়েন্টদের প্রবলেমগুলো সলভ করার চেষ্টা করে আপনাকে নীড়ে ফিরতে হবে। তা নাহলে, আপনি নীড়ে ফিরবেন ঠিকই, তবে আপনার নিরপরাধ কোনো আসামী কারাগারে ওবেদ আলী’র মতো স্বপ্ন বুকে নিয়ে মারা যাবে। শুধু ওবেদ আলী’র আইনজীবীই কেন, আমাদের সকল বিজ্ঞ আইনজীবীদের তা মনে রাখতে হবে। আইন পেশা একটি মহৎ পেশা। মানুষকে রিলিফ দেওয়াই আমাদের কাজ। কিন্তু আমরা সকল ল’ইয়ারগণ কি তা করছি?
ওবেদ আলী যে হৃদয়স্পর্শী বার্তা দিয়ে গেল, আমরা যেন তা স্মরণ রাখি। এলার্ট থাকি। তবেই কারাগারের কিছু বন্দি অন্তত পাবে মুক্তির স্বাদ। আর মুক্তির আনন্দে পরান খুলে গাইবে-আমার মুক্তি / আলোয় আলোয় / ঘাসে ঘাসে / এই আকাশে ...।
সুতরাং, কারাগারের ওবেদ আলীদের আলোকিত মুক্তির আনন্দ দিতে সহায়তা কি আমরা করতে পারি না? প্রিয়, বিজ্ঞ আইনজীবী বন্ধুগণ দিনশেষে নিজের ভুলগুলো খোঁজে দেখুন। আর ক্লায়েন্টদের উপকারের কথা ভাবুন।
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মহাসড়কে চলাচল কতটা নিরাপদ
  • প্রসঙ্গ : সঞ্চয়পত্র
  • সিলেট-সুনামগঞ্জ ও দিরাই সড়কে যাত্রী দুর্ভোগ
  • ফিরে দেখা : ১৫ আগস্ট ১৯৭৫
  • শিশুদের সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ
  • সামাজিক আচরণ ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার
  • সময়ের আলোচিত প্রসঙ্গ মশা: আমাদের করণীয়
  • খাদ্য নিরাপত্তায় বিকল্প চিন্তা
  • জন্মাষ্টমী ও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ
  • বৃহত্তর সিলেটবাসীর একটি গৌরবগাঁথা
  • পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ
  • জলবায়ু পরিবর্তনই আসল সমস্যা
  • কিশোর অপরাধ
  • আ.ন.ম শফিকুল হক
  • হোটেল শ্রমিকদের জীবন
  • বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও কাশ্মীরের ভবিষ্যত
  • বাংলাদেশে অটিস্টিক স্কুল ও ডে কেয়ার সেন্টার
  • বেদে সম্প্রদায়
  • গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে সুপারিশমালা
  • ত্যাগই ফুল ফুটায় মনের বৃন্দাবনে
  • Developed by: Sparkle IT