উপ সম্পাদকীয়

সামাজিক আন্দোলন : নিরাপদ সড়ক চাই

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-১১-২০১৮ ইং ০১:২৪:২৯ | সংবাদটি ৩৭ বার পঠিত

দেশব্যাপী ক্রমবর্ধমান সড়ক দুর্ঘটনা নিরসনে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়োজনে এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে ১৯৯৩ সালে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) শীর্ষক একটি সংগঠনের। সড়ক দুর্ঘটনামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে গঠিত নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) তার কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দেশের সর্বস্তরের মানুষের সমর্থনে ধন্য হয়ে ওঠে। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ এই ২০ বছরের মধ্যে জনকল্যাণমুখী সংগঠন হিসাবে ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পেয়েছে যথেষ্ট পরিচিতি। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচ) এখন একটি সফল সামাজিক আন্দোলনের নাম। ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে মর্মান্তিকভাবে নিহত হন চিত্রনায়ক ্ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন। উল্লেখ করা যেতে পারে এরও আগে ১৯৮৮ সালে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন স্বয়ং মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন। নিজের জীবনের বিনিময়ে মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা এবং স্ত্রী বিয়োগের বেদনার বাস্তবতা, তারকা নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনকে উদ্বুদ্ধ করে, সড়ক দুর্ঘটনায় স্বজন হারানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত পঙ্গু মানুষের পাশে দাঁড়াতে। ক্রমবর্ধমান সড়ক দুর্ঘটনা নিরসনে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে ১৯৯৩ সালের ১লা ডিসেম্বর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা থেকে জাতীয় প্রেসক্লাব পর্যন্ত ‘‘নিরাপদ সড়ক চাই’’ শীর্ষক এক পদযাত্রায় শামিল হন তিনি। সে দিনের সেই পদযাত্রা এবং নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনকে সাংগঠনিক পর্যায়ে রূপদানের পরামর্শ এবং অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন যায় যায় দিন এর তৎকালীর সম্পাদক, বিশিষ্ট সাংবাদিক শফিকুর রেহমান। ইলিয়াস কাঞ্চনের নেতৃত্বে ‘‘নিরাপদ সড়ক চাই’’ শীর্ষক প্রথম পদযাত্রায় বিভিন্ন সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষের ব্যাপক অংশ গ্রহণই তাকে এই আন্দোলনে ব্যাপক উৎসাহ যোগায়।
প্রথম পদযাত্রা শেষে জাতীয় প্রেসক্লাবের সম্মুখে বিশাল জনসমাবেশে ইলিয়াস কাঞ্চন চালক- মালিক- যাত্রী তথা জনসাধারণের এবং সরকার এর উদ্দেশ্যে ২২ দফা সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেন। সড়কের মড়ক থেকে জাতিকে উদ্ধারের জন্য চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন ঢাকায় ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ শীর্ষক পদযাত্রা করেই ক্ষান্ত হলেন না, তিনি তার দাবি নিয়ে ছুটে বেড়াতে থাকলেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। আয়োজন করতে থাকলেন পদযাত্রার। তুলে ধরতে থাকলেন তার দাবিসমুহ। নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন তার নিরাপদ সড়ক চাই দাবিকে সংগঠনে রূপান্তরিত করলেন। নাম রাখলেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই( নিসচা)’।
ইলিয়াস কাঞ্চন এবং তার নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন তথা নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সংগঠন সামাজিক সংগঠন হিসাবে পেতে থাকে দৃঢ় ভিত্তি। সড়ক দুর্ঘটনামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টির এসব কার্যক্রমের পাশাপাশি আন্দোলনের প্রথম দিকেই তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী, যোগাযোগমন্ত্রী কর্ণেল (অব.) অলি আহমেদ, আব্দুল মতিন চৌধুরী, সবার কাছে স্মারকপত্র প্রদান করা হয়। এছাড়া প্রতিবছর নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মরহুমা জাহানারা কাঞ্চনের মৃত্যুবার্ষিকীতে এবং বিভিন্ন কর্মসুচী পালনের মধ্য দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস, জনমত সৃষ্টি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়ে যাচ্ছে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)।
সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধের দাবিতে সোচ্চার নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর পক্ষ থেকে প্রতিবছর ২২ অক্টোবরকে নিরাপদ সড়ক দিবস হিসাবে পালনের দাবি উত্থাপন করা হয় এবং প্রতিবছর সংগঠনের তরফ থেকে এই দিনটিকে নিরাপদ সড়ক দিবস হিসাবে পালন করা হতে থাকে। ২০০৩ সালে তৎকালীন সরকার জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)- এর প্রতিষ্ঠাতা এবং চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চনকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সেই সাথে প্রতিবছর সরকারি উদ্যোগে ২২ অক্টোবর জাতীয় পর্যায়ে নিরাপদ সড়ক দিবস পালনেরও ঘোষণা দিয়েছে। সে থেকে প্রতিবছর ২২ অক্টোরব জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে।
জাতীয় পর্যায়ে নিরাপদ সড়ক দিবস পালনের দাবি উত্থাপনের পাশাপাশি নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)- এর পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিবছর ২২ অক্টোবর নিরাপদ সড়ক দিবস পালনের জাতিসংঘের কাছে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এই বিষয়ে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিকভাবে নিরাপদ সড়ক দিবস পালনের নিমিত্তে ২০০৪ সালের ৭ এপ্রিল এক সভার আয়োজন করে এবং সেই সভাতে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর প্রতিনিধিকে উপস্থিত থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানান। উল্লেখ্য জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০০৬ সালে ২২ এপ্রিল হতে ২৯ এপ্রিল নিরাপদ সড়ক সপ্তাহ পালিত হয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিারাপদ সড়ক সপ্তাহ পালনে জাতিসংঘের উদ্যোগকে আমরা অভিনন্দিত করি। সেই সাথে আমরা আরো বলতে চাই ২২ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিকভাবে নিরাপদ সড়ক দিবস হিসাবে পালনের ঘোষণা হলে নিসচার দিবস আন্দোলন সার্থক হবে বলে বিজ্ঞমহল মনে করেন। নিারপদ সড়ক চাই (নিসচা)- এর পক্ষ থেকে পদযাত্রা সাংবাদিক সম্মেলন, সেমিনার, আলোচনা সভা, জনসভার মত্ োকর্মসুচির পাশাপাশি দাবি বাস্তাবায়নে স্মারকপত্র পেশ করা হয়েছে যেমনি তেমনি আবার সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসা সেবা প্রদানের লক্ষ্যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এর প্রয়োজনীয় অবন্থানে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠারও পরিকল্পনা রয়েছে। এমনকি সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ আদায়ের আইনি সহায়তা প্রদান, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রকৃত দোষীদের আইনের হাতে সোপর্দ করা ইত্যাদি বিষয়ে সাংগঠনিকভাবে তৎপরতা চালানোর ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে নিরাপদ সড়ক চাই এর পক্ষ থেকে সড়ক দুর্ঘটনা মর্মান্তিক পরিণতি তুলে ধরে সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়ে প্রমাণ্য এবং প্রচার চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে চালক এবং জনগণকে আরো বেশি সচেতন ও সতর্ক করে তোলার ব্যাপারে নিসচা কাজ করছে।
১৯৯৩ সাল থেকে নিরাপদ সড়ক চাই ( নিসচা) আন্দোলনের শুরু, ২০ বছরে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনায় কয়েক কোটি টাকা ব্যয় হলেও এর সামান্যতম অংশই বিভিন্ন সুত্রে প্রাপ্ত অনুদান থেকে এসেছে। বৃহদাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে আন্দোলনের জন্মদাতা নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চনের ব্যক্তিগত অনুদান থেকে। বর্তমান পর্যায়ে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর কার্যক্রম যেমন সাফল্যের মুখ দেখেছে, তেমনি সড়ক দুর্ঘটনামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিরাপদ সড়ক চাই এর কার্যক্রম আরো প্রসারিত ও গতিশীল করে তোলার বিষয়টিও হয়ে উঠেছে জরুরি। সঙ্গত কারণেই আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টিও হয়ে উঠেছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। নিসচা সমাজ কল্যাণ অধিদপ্তরের ও জয়েন্ট ষ্টক কোম্পানির অনুমোদন পেয়েছে এবং সংগঠনটি এনজিও ব্যুরোর অন্তর্ভুক্তি প্রক্রিয়ধীন রয়েছে। ১৯৯৩ সালে জন্ম হয়েছিল নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের। চলছে ২০১৮ সাল। বিগত এত বছরের অভিযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনারোধের যখন যে ধরনের কর্মসুচি প্রয়োজন নিসচা সেই সব কর্মসুচি গ্রহণ করেছে। ক‘বছর আমেরিকান সেন্টারের অর্থায়নে নিসচা গাজীপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম, খুলনা, ও পাবনায় পেশাজীবি চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ ও গণসচেতনতামুলক র‌্যালি, সেমিনার প্রভৃতি কর্মসুচি পালন করেছে। জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসুচি এবং ‘নিরাপদ ’ শীর্ষক স্মরণিকা প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সকলের সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে সড়কের সন্ত্রাস মুক্ত হোক আমাদের স্বদেশ। মুক্ত হোক সারা পৃথিবী। সড়ক দুর্ঘটনামুক্ত বাংলাদেশ চাই। চাই সড়ক দুর্ঘটনামুক্ত পৃথিবী।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT