ধর্ম ও জীবন

বিশ্বনবীর কাব্যপ্রীতি

আহমদ আল কবির চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-১১-২০১৮ ইং ০১:২৮:৩৭ | সংবাদটি ৪৬ বার পঠিত

ডা. লুৎফুর রহমানের ভাষায়, ‘কোন জাতিকে ধ্বংস করতে হলে সে জাতির সমস্ত সাহিত্যভান্ডারকে ধ্বংস করাই যথেষ্ট।’ শুধু লুৎফুর রহমান কেন, এ পৃথিবীর সকল গুণীজন একথা মানতে বাধ্য যে, কাব্য, সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতি সমাজের দর্পন। সমাজকে সঠিক পথ নির্দেশনা দানের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মন বা অনুভূতি মানুষকে যেভাবে, যে পথে তাড়িত করে, সেটাই হয় সেই নির্দিষ্ট মানব সমাজের লক্ষ্য বা আদর্শ। সে জন্য কাব্য সাহিত্য ও শিল্প সংস্কৃতির যারা চর্চা করেন, তাদের সৃষ্টিকর্মে উৎসাহ প্রদান যেমন প্রয়োজন, আবার তাদেরকে যথোপযুক্ত পথনির্দেশনা আরো গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে মানবতার মহান দিশারী, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ অনুকরণীয়।
মূলত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেমন কাব্যপ্রেমিক ছিলেন, কারো পক্ষে তার যথাযথ বর্ণনা প্রদান করা সম্ভব নয়। এখানে তাঁর বিশাল কাব্য প্রেম থেকে যৎকিঞ্চিত আলোচনা করছি।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এটাই দৃষ্টিগোচর হয় যে, শুধু কবিতা পাঠের জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত হাসসান (রা.) এর জন্য আলাদা একটি মঞ্চ তৈরি করলেন মসজিদে নববীর ভেতর।
কবি কুবরা বিন হাবিরা ইসলাম গ্রহণ করলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কবিতার প্রতি মুগ্ধ হয়ে তাকে দু’খানা চাদর উপহার দেন। উপরন্তু তাঁকে নিজ ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করিয়ে বিরল সম্মানে ভূষিত করেন এবং তাঁকে তাঁর গোত্রের নেতা মনোনীত করেন।
হুনাইনের যুদ্ধে গণিমতের মাল বণ্টনকালে কবি আবাস বিন মিরদাস (রা.) এর ভাগে পড়ল চারটি উট। এতে তিনি সন্তুষ্ট হলেন না। কবিতার ভাষায় জানালেন মনের আকুতি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করলেন, কবিকে খুশি করার মতো কে আছ? সঙ্গে সঙ্গে রাসুলের প্রিয় সহচর সিদ্দীকে আকবর (রা.) এগিয়ে এলেন। কবিকে সাথে নিয়ে তাঁকে ইচ্ছামতো একশ’টি উট বেছে নিতে বললেন। এ হলো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবি ও কবিতার প্রতি ভালোবাসার উদাহরণ।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুধু উপহার উপঢৌকন দিয়েই ক্ষান্ত হননি। তিনি মানবজাতিকে নির্দেশ দিয়ে উচ্চারণ করেছেনÑ‘কবিদের আর্থিক সহযোগিতা করা পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার সমতুল্য।’
এ রকম আরো বহু হাদিস আছে। পৃথিবীর নন্দিত ইতিহাসে একমাত্র মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন এক সাহিত্য প্রেমিক, কাব্যপ্রেমিক ছিলেন যিনি ইন্তিকালের পরও কবিতার প্রতি দেখিয়েছেন দরদ। শায়খ শরফুদ্দীন বুসিরী (র.) তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কবিতাকে কেন্দ্র করে সপ্নে পান রাসুলের ডোরাকাটা চাদর। এক সঙ্গে তিনি রোগ মুক্তিও লাভ করেন। মুসলিম বিশ্বের অতি পরিচিত কবিতাÑ‘বালাগাল উলা বি কামালিহি...।’ এর রচয়িতা শেখ সাদী এই কবিতার মাধ্যমে পান রাসুলের দীদার এবং চার লাইনের চতুর্থ লাইন যোগ করা হয় প্রিয়তম নবী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে। এটা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাব্য প্রীতির উজ্জ্বল নিদর্শন।
কবি আল্লামা জামী প্রিয় নবীর শানে কবিতা লিখে ইচ্ছা করলেন মদীনা শরীফ গিয়ে রওজা মোবারকের পাশে দাঁড়িয়ে তা পাঠ করবেন। যখন তিনি মক্কা শরীফ থেকে মদিনা মনোওয়ারায় যেতে ইচ্ছা করলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনার গভর্নরকে স্বপ্নে বললেন, জামীকে মদিনায় আসতে দিবে না। গভর্নর তাঁকে যেতে নিষেধ করলেন। তিনি গোপনে মদিনা শরীফ রওনা দিলেন। গভর্নরকে পুনরায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, জামী মদিনায় এসেছে। তাকে রওজায় আসতে দিবে না। এতে গভর্নর জামীকে গ্রেফতার করে জেলে আবদ্ধ করেন। গভর্নর আবার স্বপ্নে দেখেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জামী কোন দোষী নয় যে, তাকে জেলে রাখতে হবে। সে আমার প্রশংসায় কিছু কবিতা লিখেছে এবং এখানে রওজার পাশে দাঁড়িয়ে পাঠ করার ইচ্ছা পোষণ করছে। যদি সে তা করে, তা হলে রওজা হতে ভালোবাসার অতিশয্যে আমার হাত মুসাফাহার জন্য বের হয়ে আসবে।
এ থেকে আমরা কবি ও কবিতা সম্পর্কে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দৃষ্টিভঙ্গি উপলব্ধি করতে পারি। ইসলামে কাব্য-সাহিত্য সংস্কৃতির গুরুত্ব বর্ণনাতীত। একটি সমাজের উত্থানে যেমনÑ পতনেও ঠিক তেমনি কাব্য সাহিত্য-সংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই আসুন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাব্যপ্রীতিকে আমরা যথাযথ মূল্যায়ন করে সুস্থ ও সৃজনশীল কবিতা রচনা করি। সমাজ ও জাতিকে অপসংস্কৃতির করালগ্রাস থেকে মুক্ত করে সমাজকে সুসংস্কৃতি উপহার দেই।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT