ধর্ম ও জীবন

মাতা-পিতার অবাধ্যতার শাস্তি

মুহাম্মদ লুৎফুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-১১-২০১৮ ইং ০১:৩০:১৯ | সংবাদটি ৬৭ বার পঠিত

একজন সাহাবীর মৃত্যুকালে তার মুখ দিয়ে কালিমা বের হচ্ছিল না। সাহাবী কেন কালিমা উচ্চারণ করতে পারছেন না, তা নিয়ে চিন্তিত সবাই। হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বিষয় জানানো হলো। নবী রাসুলগণের পরই সর্বশ্রেষ্ঠ মানব সাহাবীগণ। তাঁদের মতো আর কেউ নেই এই পৃথিবীতে এবং কখনও আসবেন না। সংবাদ পেয়ে হযরত রাসূলাল্লাহ (সা.) তাশরীফ আনলেন। সাহাবীর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রথম দৃষ্টিতেই ধরে ফেললেন এ কোন পাপের অভিশাপ। কোন পাপ তার মুখকে বন্ধ করে দিয়েছে।
হযরত মহানবী (সা.) সাহাবীর মাকে ডেকে এনে বললেন, তুমি তোমার ছেলেকে ক্ষমা করে দাও। মা বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.)! আমি তাকে ক্ষমা করব না; কারণ সে আমাকে কষ্ট দিয়েছে। রাসুলল্লাহ (সা.) বললেন, তাহলে একে আগুনে পোড়াবে? মা বললেন, এটা আমি বরদাশত করতে পারবো না। হুজুর (সা.) ইরশাদ করলেন, তুমি যদি ক্ষমা না কর তাহলে সোজা সে জাহান্নামে যাবে। মা বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.) তাহলে আমি তাকে ক্ষমা করে দিচ্ছি। মায়ের মুখ থেকে একথা বের হবার সঙ্গে সঙ্গে সাহাবী কালিমা পড়ে নিঃশ^াস ত্যাগ করলেন। হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) তার জানাজা পড়ালেন।
লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, যিনি হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সাহাবী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন; অথচ তিনি যখন মায়ের অবাধ্য হয়েছেন তখন তার মুখে কালেমা পড়তে পারেননি। এটা খুবই ভয়ানক পাপ। মানব জীবনের এই অভিশাপ সম্পর্কে হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, শিরকের পর সবচাইতে ভয়াবহ কবীরা গুনাহ হলো মাতা-পিতাকে কষ্ট দেয়া এবং তাদের অবাধ্য হওয়া। কিন্তু আজ আমাদের ঘরে ঘরেই চলছে এই অভিশাপ। একদিন হযরত জিব্রাইল (আ.) হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কে প্রশ্ন করলেন, ‘কেয়ামত কবে হবে, কিছু আলামত বলুন। হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করলেন, আল্লাহই ভালো জানেন। জিব্রাইল (আ.) বললেন, কিছু আলমত বলুন। হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করলেন সন্তানকে যখন মায়ের সাথে চাকরের মতো আচরণ করতে দেখবে, তখন মনে করবে কেয়ামত ঘনিয়ে এসেছে।’
ইসলামী সমাজ নির্মাণের এটাই দ্বিতীয় ভিত্তি। অথচ আজ এই ভিত্তি সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে পড়েছে। মাতার চোখের পানি, পিতার অন্তরের ব্যথা সন্তানের নিকট গুরুত্বহীন হয়ে যাচ্ছে। মূলত, বাইরের চাকচিক্য তাদের চোখকে অন্ধ করে দিয়েছে। তাই তারা মাতা-পিতার কান্না শুনতে পায় না। তাদের চোখের পানি দেখতে পায় না। মাতা-পিতার ব্যথাক্লিষ্ট মুখ দেখার অবসর তাদের নেই। তারা ব্যস্ত আছে প্রবৃত্তির কামনা পূরণে।
অথচ কুরআনে কারিমে একাধিকবার আল্লাহর আনুগত্যের নির্দেশের সাথে সাথে পিতা-মাতার আনুগত্য করার প্রতি নির্দেশ এসেছে। ধ্বনিত হয়েছে তাদের সাথে খারাপ আচরণ করার প্রতি কঠিন হুশিয়ারী। কেয়ামতের দিন ভয়ানক বিকৃতরূপে এদের উত্থিত হওয়ার কথা জানিয়ে দেয়া হয়েছে।
হযরত রাসুলল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, এমন একটি শাস্তি যা মানুষ এই দুনিয়াতেও ভোগ করবে এবং আখেরাতেও ভোগ করবে; আর সেটা মাতা-পিতার অবাধ্যতা। আর এসব কারণেই আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে কারিমে তার ইবাদতের পরই পিতা-মাতার প্রতি সদাচারণ করার কথা বলেছেন বারবার। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হচ্ছে, ‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে; তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলেও তাদেরকে বিরক্তিসূচক কিছু বলো না। এবং তাদেরকে ভর্ৎসনা করো না; তাদের সাথে কথা বলো সম্মানসূচক নম্র কথা।’ (সূরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৩)
পবিত্র কোরআনের অন্যত্র আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘আমার কৃতজ্ঞতা এবং তোমার পিতা-মাতার কৃতজ্ঞতা আদায় কর।’ (সূরা : লোকমান, আয়াত : ১৪)
এক যাযাবর মাকে কাধে নিয়ে তাওয়াফ করছেন। যেখানে তাওয়াফ করাই দুরূহ ব্যাপার। সেখানে কাউকে তাওয়াফ করানো যে কত কঠিন তা বলাই বাহুল্য। তাওয়াফ করাতে করাতে হাপিয়ে উঠেছে। ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) সামনেই উপবিষ্ট ছিলেন। যাযাবর এগিয়ে জিজ্ঞেস করলো, আমি কি আমার মায়ের হক আদায় করতে পেরেছি। উত্তরে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বললেন, তোমার মা তোমাকে ছোটবেলায় লালন পালন করতে গিয়ে যে লাখ লাখ দীর্ঘশ^াস গ্রহণ করেছেন সেই একটি শ^াসের হক আদায় হয়নি। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) একথা বলেননি যে, একটি হক আদায় হয়েছে; বরং বলেছেন, একটি শ^াসের হকও আদায় হয়নি। আর তুমি ভাবছো তোমার মায়ের পূর্ণ হক আদায় করে ফেলেছ। সুতরাং দুনিয়া আখেরাতের সফলতা আদায়ের সহজ পথ হলো পিতা-মাতার হক আদায়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT