উপ সম্পাদকীয়

‘জাতীয় বীর’ কৃষকদের নিয়ে কিছু কথা

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-১১-২০১৮ ইং ০০:১৪:৫৯ | সংবাদটি ২৯ বার পঠিত

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের শুরুতেই বঙ্গবন্ধু লিখেন ‘আমার সহধর্মিনী একদিন জেল গেটে বসে বলল, ‘বসেই তো আছ, লেখ তোমার জীবনের কাহিনী।’ বললাম লিখতে যে পারিনা আর এমন কি করেছি যা লেখা যায়! আমার জীবনের ঘটনা গুলি জেনে জনসাধারণের কি কোন কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এইটুকু বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি।’ একেই বুঝি বলে প্রচারবিমুখতা। বাংলার জনসাধারণের জন্য কি করেননি তিনি? অনেকের দৃষ্টিতে হয়তো বা কিছুই করেননি। কিন্তু সব সত্যের চরম সত্যটি হলো সপরিবারে তিনি জীবন দিয়েছেন। আমরা কি ত্যাগ স্বীকার করেছি? ত্যাগ স্বীকারের প্রসঙ্গ উঠলে আমরা অনেকেই এখানে-সেখানে-চলনে-বলনে বলে বেড়াই এটা করেছি, সেটা করেছি, হাতি মেরেছি, ঘোড়া মেরেছি আরো কত কিছুই না করেছি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বলেননি কখনো ত্যাগ স্বীকার করেছি। বলেছেন ত্যাগ স্বীকারের চেষ্টা করেছি। বলেছেন ‘নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু চেষ্টা করেছি।’
কি সে নীতি ও আদর্শ? তেমনি এক নীতি ও আদর্শের কথা আমরা জানতে পারি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিনের একটি স্মৃতিচারণ থেকে। আমাদের জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেছেন-‘আমি যখন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত সচিব নির্বাচিত হলাম তখন আমাকে বললেন, বাবা দেখ, আমার কাছে অনেক ধরনের মানুষ আসবে। তবে কৃষক-কৃষাণিরা আমার কাছে এলে তাদের দেখা করতে দিস। তাদের বাধা দেবে না।’ এ প্রসঙ্গে ড. ফরাস উদ্দিন আরো বলেন, ‘এই শিক্ষা বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা, আমার বাবার শিক্ষা।’ এখন প্রশ্ন হলো এই শিক্ষা যদি বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা হয়ে থাকে এবং আমাদের প্রত্যেকেরই বাবার শিক্ষাই হয়ে থাকে তাহলে সেসব শিক্ষাকে আমাদের নিজ নিজ বাস্তব জীবনে এর প্রতিফলন যদি না ঘটে সেক্ষেত্রে সে শিক্ষাকে কি সত্যিকার শিক্ষা বলা চলে? ছোট বেলা আমরা মুখস্থ করেছি Early to bed and early to rise makes a man healthy and wise কিন্তু বাস্তবে ক’জন আমরা ইংরেজী এই উপদেশ বাক্য পালন করে থাকি!
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধু মাত্র তিন বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তারপর দেশী-বিদেশী পরাজিত অপশক্তি অমানবিক চক্রান্তের মাধ্যমে এ দেশীয় গুটিকয়েক অকৃতজ্ঞ জল্লাদ বাহিনী সৃষ্টি করে বাংলাদেশের জন্মদাতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। এরপর কতো সরকার প্রধান কতো রাষ্ট্রপ্রধান এলেন গেলেন, কতো মন্ত্রী-এমপি, আমলা-কামলা অনেক পদ পদবির অধিকারী হলেন সে হিসেব কারো অজানা নয়। সরকারী খাতায়ই এর হিসেব লিখা আছে। এটাও লিখা আছে যে উনাদের প্রত্যেকেরই ছিলেন সচিব, একান্ত সচিব হয়তো বা আরো অনেক এপিএস-পি.এস ইত্যাদি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব ড. ফরাস উদ্দিনের মতো কেউ কি এমন স্মৃৃতিচারণ করতে পারেন? কৃষাণ-কৃষাণিদের নিয়ে এমন স্মৃতিচারণ করার মতো কোন ঘটনা কি তাদের স্মৃতির পাতায় লিখা আছে? আমার তো মনে হয় বাংলার কৃষাণ-কৃষাণিদের নিয়ে এমন আবেগ প্রবণ হৃদয় নিংড়ানো কথা আজ পর্যন্ত কেউ বলেননি। একমাত্র বঙ্গবন্ধুই বোধ হয় এ ব্যাপারে ব্যতিক্রম।
অথচ আমরা যে যে পদেই অধিষ্ঠিত হই না কেন আমরা সকলই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষি কাজের সাথে একদিন জড়িত ছিলাম বা আছি। আর সে অর্থে আমাদের রক্তে কৃষকের রক্ত¯্রােত বইছে। আমাদের পূর্ব পুরুষ বা জন্মদাতা পিতা কৃষক সম্প্রদায়ের মানুষ। অর্থাৎ কৃষক। কারো ইতিহাস হয়তো সুদূর অতীত, কারো বা নিকট অতীত। এইটুকু তফাৎ মাত্র। অস্বীকার করার কি কোন উপায় আছে। কিন্তু আমরা অনেকেই তা অস্বীকার করতে আপ্রাণ চেষ্টা করি। পিতাকে কৃষক বলে পরিচয় দেবার চেয়ে কোন অফিসের নি¤œমান কেরানী বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি। দুঃখজনক হলেও এটাই সত্য যে এমনটিই যেন আমাদের জাতীয় চরিত্র। অন্তত বাস্তবে। তারপরও আমরা অনেকেই নিজেদেরকে পৃথিবীতে সভ্য জাতি বলে মনে করে থাকি। কিন্তু যতটুকু মনে পড়ে কোন এক মনীষী বলেছেন-যতদিন কোন দেশে কবিতা লিখা এবং কৃষি কাজ সমমর্যাদা পূর্ণ কাজ বলে গণ্য করা না হয় ততদিন সে দেশের মানব সমাজকে বা জাতিকে সভ্য জাতি বলে ধরে নেয়া যায় না। বলা যায় না সে সমাজকে সভ্য সমাজ। এটা আমাদের অনুদার মানসিকতারই পরিচয় বলেই মনে হয় যা অবশ্যই কাম্য হতে পারে না। যতটুকু মনে পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান তাঁর বক্তৃতা বিবৃতিতে নিজেকে কৃষকের সন্তান বলে পরিচয় দিতে নাকি গর্ববোধ করতেন। এতে উনার মান-সম্মানের কি এতোটুকু হানি হতো? হতো না। বরং বৃদ্ধি পেতো। তিনি হয়তো নিতান্তই আবেগের তাড়নায় একবার কৃষকদের সম্মান দেখাতে গিয়ে বলে বসলেন ‘জাতীয় বীর’। তিনি হয়তো অন্তর থেকেই তা বলেছেন। কিন্তু বাস্তবে একেবারেই তা অসত্য। যদি তাই না হতো কৃষি লোনের খেলাপি নিয়ে দেশের ব্যাংকার গোষ্ঠী কি এতো মাতামাতি করতেন। ৫০০০/- টাকা কৃষি ঋণের কারণে কি কৃষকের হাতে অশালীন কোন জিনিস পড়াতে এতো ব্যস্ত হতো। ব্যাংকার ভাইয়েরা (বড় কর্তাগণ) কি একটি বার ভেবে দেখেছেন কৃষি ঋণের কিছু অংশ খেলাপি হলেও তা দেশের বাইরে পাচার হয়নি। সে কৃষি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে লাখ লাখ কৃষকের মাঝে। কিন্তু দেশের গুটিকয় তথাকথিত প্রভাবশালী বলে খ্যাত লজ্জাহীনদেরকে যে হাজার হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে ব্যাংক ঋণ দেয়া হলো, তারপর খেলাপি হল, পাচার হয়ে গেল বিভিন্ন দেশে তাদের নিয়ে পত্রিকায় কিছু খবরাখবর ছাড়া তেমন কোন হৈ চৈ এর খবর তো তেমন পাওয়া যায় না। তাদের হাতে কোন লজ্জা জাতীয় কিছু পড়ানো হয়নি। তাহলে ‘জাতীয় বীর’ কারা হলো? এসব প্রশ্নতো স্বাভাবিকভাবেই এসে যায়। যেখানে দেশের ৭০/৮০ ভাগ মানুষ কৃষক সেখানে দেশের ক’টা সুখবর কৃষকদের নিয়ে ছাপা হয়? ক’জন সম্মানিত কলাম লেখক কৃষকদের নিয়ে কলাম লিখেন।
দেশে ইতিমধ্যে সরকারী কর্মচারী আইন পাস হয়েছে। এই আইনের মর্মকথা কারো অজানা নয়। দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ঘুষখোরদের গ্রেফতারে আইন কোনো বাধা হবে না। এই ঘুষখোররা কারা? দেশের ষোল কোটি মানুষের মধ্যে ক’জন ঘুষখোর? দেশের শতকরা ৭০/৮০ জন কৃষক। দেশের সহজ-সরল কৃষক ভাইয়েরা কি ঘুষনামক হারাম খায়? এর ধারে কাছেও যায় না। এক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় লজ্জা হলো আমরা গুটিকয় নির্লজ্জ ঘুষখোর দুর্নীতিবাজকে আইনের আওতায় আনতে পারছিনা। ওদের বিচারই বা করবে কে! দেশে নির্বাচনী গরম হাওয়া বইছে। দুঃখজনক হলো, এই গরম হাওয়ার মধ্যে কেউই ঘুষখোর নির্লজ্জদেরকে নিয়ে কোন কথাই বলছেন না। দেখে শুনে মনে হয় দেশের সব ঘুষখোর বুঝি তোষের আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। সুনাতিতে বুঝি এবার আমরা বিশ্বে চ্যাম্পিয়ান হয়ে যাব। হওয়াটা অবশ্যই কোন কঠিন কাজ নয়। আর্থিক উন্নয়নের পাশাপাশি মনের উন্নয়ন হলেই তা সম্ভব। ‘জাতীয় বীর’ কৃষকদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সম্মানবোধ থাকলেই সম্ভব। ড. ফরাস উদ্দিন বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে যে শিক্ষা পেয়েছেন আসুন সে শিক্ষায় আমরা শিক্ষিত হই।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা কলামিস্ট, সাবেক ব্যাংকার।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা
  • বিজয়ের ৪৭ বছর
  • প্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর
  • মুশকিল আসানের এক সৈনিক আব্দুল মঈদ চৌধুরী
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • রপ্তানিতে সুবাতাস, ইতিবাচক বাংলাদেশ
  • ডিসেম্বর আমাদের অহংকারের মাস
  • পোশাক শিল্পের অগ্রগতি
  • উন্নয়ন, আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • Developed by: Sparkle IT