স্বাস্থ্য কুশল

শিশু কিশোরদের বাতের সমস্যা

ডা. জুবায়ের আহমেদ প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-১১-২০১৮ ইং ০১:১৮:০২ | সংবাদটি ৫৬ বার পঠিত

বাতের কারণে কষ্ট পাবার কথা ওঠলে প্রথমেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে লাঠি হাতে বয়স্ক কোনো ব্যক্তির ছবি। কিন্তু আমরা অনেকেই জানিনা যে, এই বাত শিশু এবং কিশোর বয়সেও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি লাখে ৯৪ জন শিশুকিশোর বাতের সমস্যায় ভুগছে। ১৬ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে কারো যদি এক বা একাধিক অস্থি সন্ধিতে ৬ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ব্যাথা, ফুল যাওয়া এবং সেই সাথে অস্থি সন্ধি শক্ত হয়ে নড়া চড়া কমে যাবার ইতিহাস থাকে তবে এই অবস্থাকে শৈশবকৈশোরকালীন বাত বা ডাক্তারি ভাষায় জুভেনাইল ইডিওপ্যাথিক আর্থাইটিস বলা হবে। প্রায় দুই তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে এই অসুখটি থেমে না থেকে বরং বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে রোগীর বাকী জীবনের সঙ্গী হিসেবে থেকে যেতে পারে। একটি কথা মনে রাখা দরকার যে, এই অসুখটিকে বাতজ্বরের সাথে মিলিয়ে ফেললে কিন্তু চলবে না। বাতজ্বর বা রিউম্যাটিক ফিভার সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অসুখ।
এই অসুখের অবশ্য বেশ কয়েকটি রকম ফের পরিলক্ষিত হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে এই বাত শুধুমাত্র এক বা উভয় হাটুতে, আবার অনেক সময় তার বা পায়ের আঙ্গুল, মনিবন্ধ, গোড়ালি সহ অন্যান্ন অস্থি সন্ধিগুলিতেও দেখা দিতে পারে। অনেকের আবার চোখের মনিতে প্রদাহ এবং কোমর শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থারও সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়াও অসুখটির প্রকার ভেদে জ্বর, চামড়ায় ছোট ছোট ফুসকুড়ি ওঠা, গলা বা অন্য কোন স্থানের গ্র্যান্ড ফুলে যাওয়া, লিভার অথবা প্লিহা বড় হয়ে যাওয়া সহ অন্যান্য সমস্যাও দেখা দিতে পারে। কিন্তু শিশুর ক্ষেত্রে শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে দেখা যায়, এমনকি সময় মতো চিকিৎসা না করালে শিশুটি পঙ্গু হয়ে পড়তে পারে। এ ছাড়াও, এরা অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা এবং খেলাধুলা করতে না পারার কারণে হীনমান্যতা সহ নানা ধরণের মনস্তাত্বিক বৈকল্যের শিকার হয়ে পড়তে পারে।
সঠিক কারণটি জানা না গেলেও ধারণা করা হয় যে দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাতে এক ধরণের ত্রুটির কারণে এই অসুখটির সূচনা হয়। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রধান কাজই হচ্ছে জীবাণু বা অন্য কোন বহিরাগত শত্রুকে অনুপ্রবেশে বাধা দেওয়া। এই অসুখে দেহের এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি ভুলবশতঃ অস্থি সন্ধিকেই আক্রমন করে বসে যার ফলে সেখানে প্রদাহের সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীতে তা বাত আকারে ধরা দেয়। অনেক সময় অসুখটি একই পরিবারের একাধিক মানুষকে আক্রান্ত করে থাকে।
এই রোগটি সঠিকভাবে সনাক্ত করা এবং সেই অনুযায়ী উপযুক্ত চিকিৎসা প্রদানের জন্য একজন বিশেষজ্ঞ রিউম্যাটোলজিস্ট বা বাতরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অপরিহার্য। রোগটি নির্ণয়ের জন্য কিছু রক্ত পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে আক্রান্ত অস্থি সন্ধির এক্সরে সহ আরো কিছু পরীক্ষা করা হতে পারে।
আজকাল এই অসুখের ভালো চিকিৎসা রয়েছে। বর্তমানে বাজারে অনেক ধরণের ব্যাথানাশক ওষুধ পাওয়া যায় যাদের কল্যাণে তেমন কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ছাড়াই একজন রোগী অনেক দিন ধরইে এই ওষুধগুলি সেবন করতে পারে। আক্রান্ত অস্থি সন্ধিতে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে ষ্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ প্রয়োগ করে দীর্ঘ মেয়াদী সুফল অর্জন করা সম্ভব। মেথোট্রেক্সেট জাতীয় ওষুধের দ্বারা অস্থি সন্ধির ক্ষয় রোধের মাধ্যমেও যথেষ্ট সুফল পাওয়া যায়। এছাড়াও বর্তমানে মানবদেহ থেকে সরাসরি কিছু প্রদাহ নিরোধক পদার্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে। যেগুলি আধুনিক চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
এ কথা ঠিক যে শুধুমাত্র কিছু ওষুধ প্রয়োগ করেই সব সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এর পাশাপাশি ফিজিওথেরাপিষ্ট এবং অকুপেশনাল থেরাপিষ্ট এর পরামর্শ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট ব্যায়ামের ব্যবস্থা রাখতে হবে। অনেক সময় হৃত মনোবল ফিরে পেতে মনোবিজ্ঞানির সহায়তা এবং চোখ এবং দাঁতের জন্য বিশেষ চিকিৎসা নিতে হতে পারে। তবে এতো সব সুযোগ সুবিধা একসাথে পাওয়া দুষ্কর বিধায় উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই বাতের সমস্যা নিরসনে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে কিছু ইনস্টিটিউট এবং সামাজিক সংগঠন গড়ে ওঠেছে। সময় এসেছে আমাদের দেশেও এই ধরণের সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করা, যাতে করে এই সকল শিশু কিশোরদেরকে স্বাভাবিক জীবনে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT