ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য তথ্য সংকটের মূল্যায়ন

আতিকুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ২১-১১-২০১৮ ইং ০২:০৬:৫৬ | সংবাদটি ৫০ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
(তাং- রোববার ১৪০৬ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ খ্রি., দৈনিক গিরিদর্পণ, রাঙ্গামাটি)
ধারা নং-৪০। চীফ ও হেডম্যানদের প্রশাসনিক ক্ষমতা। এই আইনে ভিন্ন কিছু থাকা ব্যতিরেকে মৌজা হেডম্যানেরা নিজ নিজ মৌজার বাসিন্দাদের দ্বারা উত্থাপিত বিরোধ সমূহের বিচার সম্পন্ন করবেন। তারা পক্ষ সমুহের সামাজিক রীতি নীতি অনুযায়ী উপজাতীয় মামলাদি নিষ্পন্ন করবেন। তাতে ক্ষমতা হলো ২৫ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ মূলক অর্থদন্ড আরোপ এবং জেলা প্রশাসকের আদেশ লাভ পর্যন্ত আসামীদের আটক করে রাখা।
এই আইনে ভিন্ন কোন ব্যবস্থা না করা হলে চীফেরা তাদের খাস মৌজার হেডম্যান হিসেবে তথাকার বিরোধ সমূহের বিচার কাজ সম্পাদন করবেন এবং ঐ সব উপজাতীয় মামলাদির বিচার কার্য চালাবেন, যেগুলো হেডম্যানদের রায় শেষে অথবা হেডম্যান হিসাবে তাদের নিজেদের পক্ষ থেকে ও উত্থাপিত হবে। চীফদের ৫০ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ মূলক অর্থ দন্ড আরোপের ক্ষমতা থাকবে এবং এতদ ব্যাপারে তারা জেলা প্রশাসকের আদেশ পাওয়া পর্যন্ত আসামীদের আটক করে রাখতে পারবেন। উপজাতীয় মামলাদি ও সে সবের রায় সমূহ জেলা প্রশাসকের পুনরবিচার এখতিয়ার সাপেক্ষ এবং তা-ই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
যে সব মামলায় চীফ বা হেডম্যানেরা আরোপিত শাস্তি কার্যকর করতে অপারগ হবেন সেগুলোর জন্য তারা সাহায্য চেয়ে জেলা প্রশাসকের নিকট আবেদন করতে পারবেন। চীফ বা হেডম্যানদের কাছে বিচারাধীন উপজাতীয় মামলা সমূহে কোন রূপ কোর্ট ফি আরোপিত হবে না। অনুরূপ মামলায় আরোপিত অর্থ দন্ড, যদি কোন ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ থাকে তবে তাকে এবং সার্বিকভাবে সমাজকে, উপজাতীয় রীতি নীতি অনুসারে বরাদ্দ করা হবে। উপজাতীয় রীতি নীতির অনুমোদন অনুসারে সমাজের প্রাপ্য ইজমালী অর্থদন্ডের অংকে, চীফ ও হেডম্যানদের একাংশ প্রাপ্য হবে। কোন অজুহাতেই কোন রূপ নজর বা অন্য কোন রূপ পাওনা, সে যে ধরনেরই হোক, এ জাতীয় উপজাতীয় মামলায় আরোপ করা যাবে না।
তবে চীফ ও হেডম্যানরা জেলা প্রশাসক কর্তৃক অনুমোদিত পরিমানে, মামলাগুলোর পক্ষে ব্যয় নির্বাহযোগ্য ফি, আরোপ করতে পারবেন। এই আইনের অধীন চীফ ও হেডম্যানদের নিকট দায়ের যোগ্য উপজাতীয় মামলা ব্যতিত কোন ফৌজদারী ও দেওয়ানী মামলা পরিচালনার ক্ষমতা তাদের থাকবে না, যদি না গভর্নর কর্তৃক কোন সময় তাদের অনুরূপ ক্ষমতা দেয়া হয়। এই আইনে চীফ ও হেডম্যানদের, অনুশীলনযোগ্য সমুদয় ক্ষমতার উপর জেলা প্রশাসকের সাধারণ পুনঃবিচার ও ভিন্নতা করার এখতিয়ার থাকবে।
নি¤œ বর্ণিত অপরাধ সমূহ এই আইনের অধীন চীফ ও হেডম্যানদের দ্বারা বিচার্য বিষয় সমূহের বহির্ভূত থাকবে। যেমনÑ
(০১) রাষ্ট্র ও রাজকর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত অপরাধ ও প্রচলিত আইনে বিচার যোগ্য অপরাধ সমূহ।
(০২) ঐ সব দাঙ্গা হাঙ্গামা, যেগুলোতে গুরুতর জখম সংঘটিত অথবা মারাত্মক অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে।
(০৩) কোন ব্যক্তির দ্বারা অনুষ্ঠিত নি¤েœাক্ত গুরুতর অপরাধ সমূহ যথাÑ হত্যা, গণহত্যা, স্বেচ্ছায় গুরুতর জখম করা, অন্যায় অবরোধ, ধর্ষণ, চুরি, রাহাজানি, ছিনতাই এবং অন্যান্য অস্বাভাবিক অপরাধ।
(০৪) অপহরণ, রাহাজানি, ডাকাতি, গুম করা অনধিকার প্রবেশ বা ঘর ভাঙ্গা ও ৫০ টাকার অধিক মূল্যের সম্পত্তি হস্তাগত করা।
(০৫) জালিয়াতি।
(০৬) পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন ১/১৯০০ এর অধীন প্রণীত পার্বত্য অঞ্চল শাসন বিধির অধ্যায় ৪ এর অধীন অনুষ্ঠিত অপরাধ সমূহ, অন্য কোন প্রকার বা শ্রেণির অপরাধ, যা বিভাগীয় কমিশনার কর্তৃক এতদসঙ্গে নির্দিষ্ট হবে।
ধারা নং-৪১ (ক) হেডম্যান স্বীয় মৌজাধীন প্রাকৃতিক সম্পদ সমূহ রক্ষায় দায়ী থাকবেন। এ জন্য যে কোন হেডম্যান স্বীয় মৌজাধীন বনের বাঁশ, গাছ ও অন্যান্য বনজ দ্রব্য যা গৃহস্থালী প্রয়োজন ব্যতিত অন্য কোন কাজে তার নিজ মৌজার বাসিন্দা বা অন্য অনাবাসী কর্তৃক যে কোনো কাজে হস্তান্তর নিষিদ্ধ করতে পারবেন।
(খ) তিনি স্বীয় মৌজার যে কোনো এক বা একাধিক এলাকা এই উদ্দেশ্যে জুম চাষ থেকে বাদ দিতে পারবেন যে এলাকা বা এলাকাগুলো মৌজার প্রয়োজনীয় বাঁশ, গাছ ও অন্যান্য বনজ দ্র্রব্যের জন্য সংরক্ষিত বন রূপে ধরে রাখা প্রয়োজন।
(গ) তিনি নবাগতদের নিজ মৌজায় জুম চাষ থেকে বিরত রাখতে পারবেন, যদি তার ধারণা হয় যে, তাতে ভবিষ্যতে তার নিজ মৌজাধীন প্রজাদের জুম করনে অভাব দেখা দিবে।
(ঘ) তার নিজ এলাকায় জুম চাষের জন্য ক্ষতিকর মনে হলে, তিনি নিজ মৌজায় যে কোনো ব্যক্তির পশুচারণ বারণ করতে পারবেন।
ধারা নং-৪৭। চীফের খাস মৌজা : বিভাগীয় কমিশনারের মঞ্জুরীক্রমে তিনি যে মৌজার বাসিন্দা সেটি নিজের খাস মৌজা রূপে ধরে রাখতে পারবেন এবং এই ক্ষেত্রে তিনি চীফের প্রাপ্য আর্থিক-সুযোগ সুবিধাদির অতিরিক্ত হেডম্যানের প্রাপ্য আর্থিক সুবিধাদি ও ততোদিন ভোগ করার অধিকারী হবেন, যতোদিন পর্যন্ত তিনি হেডম্যান ও মৌজার কর্মকর্তার দায়িত্ব যথাযথ পালন করতে থাকবেন। এখানে উল্লেখ্য যে ধারা ৪৮ অনুযায়ী জেলা প্রশাসক কোন চীফ ও হেডম্যানের ইচ্ছায় অনিচ্ছার কাছে বাধ্য নন।
এখানে প্রচলিত আইনগুলোর উদৃতি এটাই প্রমাণ করে যে, চীফেরা জেলা প্রশাসকের নির্বাহী ও দেওয়ানী ক্ষমতার আওতাধীন লোক। তাদের ক্ষমতা কেবল উপজাতীয় মামলার মীমাংসা জুম কর আদায়, সরকারকে রাজস্ব সরবরাহ করা, আর শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষায় জেলা প্রশাসকের সহায়তা দান। তাদের আরো দায়িত্ব হলো পাড়া পরিবেশের পরিবর্তন, ফল ফসল, জনসংখ্যা, শিক্ষা স্বাস্থ্য ইত্যাদির ব্যাপারে জেলা প্রশাসকের তথ্য পরামর্শ দান। অথচ এই আসল দায়িত্বগুলো পালনে তারা হামেশাই নিস্ক্রিয়। সর্দারী পদ ও নিযুক্তিকে পুঁজি করে, তারা কেবল নিয়মিত সম্মান, মাসোহারা ও কমিশন ভোগ করছেন।
নির্বাহী ও দেওয়ানী ক্ষমতাসীন প্রত্যয়ন ক্ষমতা কোনো আইনেই চীফদের প্রাপ্য নয়। এটা জেলা প্রশাসকদের এখতিয়ারাধীন বিষয়। স্বাধীন এই দেশে নির্বাচিত ও কর্মকর্তা রূপে নিযুক্ত কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্য কোনো নাগরিক কর্তারূপে মান্য হতে পারেন না। এমনিতে পার্বত্য শাসন আইন সাংবিধানিকভাবে অনুমোদিত নয়। এমন একটি পরিত্যক্ত আইনই হলো চীফদের, পদ মর্যাদা ও ক্ষমতার ভিত্তি। তাকে অবলম্বন করে, তাদের সার্টিফিকেট দাতা চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষে উন্নীত করা মানে ক্ষমতাধর রাজায় পরিণত করা। সংশ্লিষ্ট সংসদীয় আইনটি চীফদের উপর রাজ ক্ষমতা আরোপেরই শামিল। হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়েল ও তাদের জন্য অনুরূপ ক্ষমতা অনুমোদন করে না।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ কি নাগরিকদের স্বাধীনতা বিলোপও তাদের প্রতি পরাধীনতা আরোপের ক্ষমতা রাখে? পার্বত্য অধিবাসীরা কি তিন চীফের স্বামন্তীয় প্রজা? চীফেরা জি জমিদারী বা রাজ ক্ষমতার অধিকারী? রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা জনপ্রতিনিধি বা রাজা হওয়া ছাড়া তো কারো উপর ক্ষমতার অধিকার বর্তায় না।
এটা পরিস্কার যে, চীফেরা কোন প্রকৃত রাজা সরকারি কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধি নন। তাদের রাজ পদ সম্মানজনক পদবী মাত্র। তারা সার্বভৌম ক্ষমতাধর নৃপতি নন। তাদের সরকারি রাজ পদবি লাভের ইতিহাস হলো :
‘পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজারা দেশের সার্বভৌম কোনো কর্তৃপক্ষের দ্বারা নিযুক্ত নন বরং সাধারণ জুমিয়া, কুকি ও অন্যান্য অধিবাসীদের দ্বারাই রাজা অভিহিত। (সূত্র : চট্টগ্রামের কমিশনারকে লিখিত রাজস্ব চিঠি নং- ১৪৯৯, তাং- ১০ সেপ্টেম্বর ১৮৬৬) এই যুক্তি ও তথ্যের আলোকে বলা যায়, আওয়ামী সরকার এক আজগৌবী চীফ তন্ত্র তথা রাজতন্ত্রকে পার্বত্য অধিবাসীদের ভাগ্য বিধাতা বানিযে চাপিয়ে দিয়েছেন। এই ব্যবস্থা সংবিধানের ধারা নং- ১, ৭ ও ১১ এর পরিপন্থী। তাতে বলা হয়েছে :
অনুচ্ছেদ নং-১। প্রজাতন্ত্র। বাংলাদেশ একটি একক স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র যাহা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামে পরিচিত হইবে।
[চলবে]

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সাত মার্চের কবিতা ও সিলেট বেতার কেন্দ্র
  • পার্বত্য তথ্য সংকটের মূল্যায়ন
  • সিলেটের প্রাচীন ‘গড়’ কিভাবে ‘গৌড়’ হলো
  • ৮৭ বছরের গৌরব নিয়ে দাঁড়িয়ে সরকারি কিন্ডারগার্টেন প্রাথমিক বিদ্যালয় জিন্দাবাজার
  • খেলাফত বিল্ডিং : ইতিহাসের জ্যোতির্ময় অধ্যায়
  • এক ডিমের মসজিদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের কিছু ঘটনা
  • খাদিমনগরে বুনো পরিবেশে একটি দিন
  • ফিরে দেখা ৭ নভেম্বর
  • শ্রীরামসি গণহত্যা
  • প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের ধারক মৃৎশিল্প
  • বিপ্লবী লীলা নাগ ও সিলেটের কয়েকজন সম্পাদিকা
  • গ্রামের নাম আনোয়ারপুর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • Developed by: Sparkle IT