ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সাত মার্চের কবিতা ও সিলেট বেতার কেন্দ্র

রফিকুর রহমান লজু প্রকাশিত হয়েছে: ২১-১১-২০১৮ ইং ০২:০৮:১২ | সংবাদটি ৫৭ বার পঠিত

একাত্তরের সাত মার্চ। সাত মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের দিন। দিনটি বাঙালি জীবনে এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি স্বর্ণোজ্জল দিন। রেসকোর্স ময়দানে যে ভাষণ দেন তা শুধু ইতিহাসই নয়, সেটি একটি কবিতা। কবি যেভাবে সুললিত কণ্ঠে মাত্রাবৃত্ত মেপে মেপে কবিতাটি আবৃত্তি করলেন, মনে হলো কবি বার বার পড়ে মুখস্থ করে কবিতাটি আবৃত্তি করেছেন। আবৃত্তি শুনে শ্রোতামন্ডলী ভাবাবেগে উদ্বেলিত হয়ে ওঠলেন এবং স্বাধীনতার জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারের শপথ নিলেন আগে ভাগেই। কবি তাঁর ভাষণে শুধু কবিই থাকলেন না। তিনি কিছু কথা বললেন কবি সুলভ মাধুর্যে, কিছু বললেন নেতা হিসেবে, কিছু বললেন রণাঙ্গণের সিপাহসালার রূপে। সব মিলিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও করণীয় পেয়ে গেলো জনগণ। দেশবাসী জনগণ যে কথাটি শোনার জন্য উন্মুখ হয়েছিলো সে কথাটিই বেরিয়ে এলো নেতার মুখ থেকে। তিনি বললেন, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। তিনি আরো বললেন, ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তুলুন। সাত মার্চের সতের দিন পরে ২৫ মার্চ যুদ্ধ শুরু হলেও আসলে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মধ্য দিয়ে, তার নির্দেশের মধ্য দিয়ে সাত মার্চের বাঙালির স্বাধীনতার লড়াই, বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।
সাত মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারে সিলেট বেতার কেন্দ্র দুঃসাহসিক ও অনন্য ভূমিকা পালন করেছে। সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু ও হুমকিকে উপেক্ষা করে সিলেট বেতার কেন্দ্র বঙ্গবন্ধুর ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো প্রচার করেছে। কথা ছিলো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সবক’টি বেতার কেন্দ্র থেকে সম্প্রচার করা হবে। কিন্তু সামরিক আইন কর্তৃপক্ষের বাঁধার কারণে তা হয়নি। তা সত্ত্বেও সিলেট বেতার সম্পূর্ণ ভাষণটি প্রচার করতে না পারলেও প্রায় এক ঘণ্টা ব্যাপী দেয়া ভাষণে জাতি ও সরকারের প্রতি বঙ্গবন্ধুর দেয়া ১০টি নির্দেশ ও শর্ত বিশেষ সংবাদ বুলেটিন শিরোনামে সিলেট বেতার প্রচার করে ছিলো। এটা সিলেট বেতারের একক সাহসী পদক্ষেপ যা বেতারের অন্য কোনো কেন্দ্র করতে পারেনি। এই বুলেটিন প্রচারে কণ্ঠ দেন অনুষ্ঠান উপস্থাপক আনোয়ার মাহমদু দিলু ও বদরুল হোসেন রাজু।
ঢাকা থেকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্ম সচিব জহিরুল হকের নিকট থেকে নির্দেশ ও বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সারাংশ হাতে পেয়ে সিলেট বেতার কেন্দ্রের আঞ্চলিক পরিচালক ম. ন. মুস্তফা, সহকারী আঞ্চলিক পরিচালক জমির সিদ্দিকী (উর্দু ভাষী), বার্তা সম্পাদক মহিউদ্দিন আহমদ ও অনুষ্ঠান সংগঠক মুনাওয়ার আহমেদ সামরিক আইন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ উপেক্ষা করে সেদিন এই অসাধ্য সাধন করেন। বুলেটিন প্রচারের ফাঁকে ফাঁকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর সৃষ্টি এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ এবং ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গান দু’টিও বাজানো হয়।
সাত মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মূল কথা সিলেট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতাকামী সিলেটবাসীর মধ্যে এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গণ সংগঠনের নেতৃত্বে মানুষ রাজপথে নেমে আসে, শ্লোগানে শ্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে সিলেট। শুধু তাই নয়, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা আব্দুল মন্নান আফতাবের পরিচালনায় সামরিক প্রশিক্ষণও শুরু হয়ে যায়। এ সময়কালেই কবি দিলওয়ারের সমস্বর লেখক ও শিল্পী সংস্থার নেতৃত্বে কলম- তুলি- কণ্ঠ- সংগ্রাম পরিষদ আত্মপ্রকাশ করে। পরিষদের উদ্যোগে ১৯ মার্চ বিক্ষোভ মিছিল ও ২২ মার্চ রেজিস্ট্রারি মাঠে গণসঙ্গীতের অনুষ্ঠান হয়। পরদিন ২৩ মার্চ ছাত্র নেতৃবৃন্দ রেজিস্ট্রারি মাঠে এবং জেলা প্রশাসন কার্যালয় থেকে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে সবুজ জমিনে লাল সূর্যের মাঝে সোনালী মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। এসময় আনন্দ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয় এলাকা।
এরপর আসে ২৫ মার্চ। সারা দিন শহরে মিছিল চলে। লাঠি হাতে অগণিত মানুষ মিছিলে যোগ দেয়। বিকেলে রেজিস্ট্রারি মাঠে আওয়ামী লীগের জনসভায় মানুষের ঢল নামে। ডা. এম. এ. মালিকের সভাপতিত্বে এ সভা ছিলো স্মরণকালের বৃহত্তম জনসভা। রাত ১২ টার পর জালালাবাদ সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে আসে শত্রুসেনা। তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকালয়ে। টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কিছু কিছু এলাকায় রাস্তায় বেরিকেড দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা চালায় সাহসী ছাত্ররা।
আবার চলে যাই সাত মার্চ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্রের সাহসী মানুষজনের সে দিনের ভূমিকা স্মরণ করতে। কথা ছিলো বেতারের সকল কেন্দ্র থেকে একযোগে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করা হবে। কিন্তু বিকেল গড়িয়ে গেলেও ভাষণের কোনো খবর নেই। সন্ধ্যার পর ঢাকা থেকে ফোন পেলেন আঞ্চলিক পরিচালক এম এন মোস্তফা। তিনি একটু কথা বলেই ফোন রেখে লিখতে শুরু করলেন। পরে ঘোষক মঈন চৌধুরীকে বললেন যা দিয়ে যাবো ঠিক ঠিক প্রচার করবেন। পরে তিনি ঘোষক আনোয়ার মাহমুদ দিলুর হাতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ১০টি প্রধান দাবি লিখা একটি কাগজ তুলে দিয়ে বললেন, বিশেষ বুলেটিন হিসেবে এটা প্রচার করবে। একবার ভাষণের এই অংশটুকু প্রচার হবে এবং এরপর ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটি বাজবে। আরো বললেন, এই ভাবে কোনো বাধা না পাওয়া পর্যন্ত চলতে থাকবে। সেই সঙ্গে তিনি ডিউটি অফিসার সাইফুল ওয়াদুদ জায়গীরদারকে সব কিছু বুঝিয়ে দিয়ে মহিল ঘোষক দোখতার জামান, সজিব সিদ্দিকী, মনোয়ার আহমদ ও বার্তা সম্পাদককে নিয়ে চলে যান।
সন্ধ্যায় মঈন চৌধুরী ঘোষণা দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করেন। কুরআন তেলাওয়াত করেন ক্বারী বদর উদ্দিন আহমদ। বাংলা সংবাদ পাঠ করেন বদরুল ইসলাম। আনোয়ার মাহমুদ দিলু, মঈন চৌধুরী ও বদরুল ইসলাম পালা করে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের অংশ প্রচার করতে থাকেন। সে সাথে বাজতে থাকে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’। কিছুক্ষণের মধ্যেই বেতার কেন্দ্রে বার বার ফোন বাজতে থাকে। সিলেট বেতার থেকে আনোয়ার মাহমুদদের প্রচারিত অনুষ্ঠান প্রথমে কুমিল্লা ক্যান্টমেন্ট থেকে শুনার পরপর সাথে সাথে সিলেট সেনানিবাসে এ খবর দ্রুত পৌঁছানো হয়। এদিকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে জাতীয় উর্দু সংবাদ প্রচারের সময়ও পার হয়ে গেছে। সিলেট বেতার থেকে উর্দু সংবাদ প্রচার করা হয়নি।
কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে খবর পাওয়ার সাথে সাথে ছুটে আসে কয়েকজন ক্ষ্যাপা সেনা সদস্য। তারা অফিসে ঢুকে খুব তর্জন গর্জন করে, উর্দু প্রচার না করার জন্য কৈফিয়ত তলব করে। এদিকে আনোয়ার মাহমুদ ও মঈন চৌধুরী প্রচারিত ভাষণের কাগজের টুকরোগুলো দু’জনে মিলে কিছু অংশ কার্পেটের নিচে এবং কিছু টুকরো মুখে দিয়ে গিলে ফেলেন। তাই তারা এব্যাপারে কোনো আলামত খোঁজে পায়নি। অতঃপর সেনা কর্মকর্তা নির্দেশ দেয় তাদের অবহিত না করে আর কোনো অনুষ্ঠান প্রচার করতে পারবে না সিলেট বেতার।
বেতারের সকল কেন্দ্র থেকেই সাত মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সাত মার্চেই প্রচারের জন্য সকল কেন্দ্রেই তা পাঠানো হয়েছিলো। সিলেট কেন্দ্র ছাড়া আর কোনো কেন্দ্রই এটা প্রচার করতে পারেনি। একমাত্র সিলেট কেন্দ্রেই জীবনের ঝুকি নিয়ে অকুতোভয় বেতার কর্মীরা এই দুঃসাহসিক কাজটি করতে পেরেছিলেন। দেশ প্রেমের আর্কষণে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার আকাঙ্খা বাস্তবায়নের জন্য জীবন উৎসর্গের অঙ্গীকার করে তারা মহতী কাজটি করেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে একাত্তরে সিলেট বেতার কেন্দ্রের দেশ প্রেমিক কর্মীদের সাহসী ভূমিকাও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সাত মার্চের কবিতা ও সিলেট বেতার কেন্দ্র
  • পার্বত্য তথ্য সংকটের মূল্যায়ন
  • সিলেটের প্রাচীন ‘গড়’ কিভাবে ‘গৌড়’ হলো
  • ৮৭ বছরের গৌরব নিয়ে দাঁড়িয়ে সরকারি কিন্ডারগার্টেন প্রাথমিক বিদ্যালয় জিন্দাবাজার
  • খেলাফত বিল্ডিং : ইতিহাসের জ্যোতির্ময় অধ্যায়
  • এক ডিমের মসজিদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের কিছু ঘটনা
  • খাদিমনগরে বুনো পরিবেশে একটি দিন
  • ফিরে দেখা ৭ নভেম্বর
  • শ্রীরামসি গণহত্যা
  • প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের ধারক মৃৎশিল্প
  • বিপ্লবী লীলা নাগ ও সিলেটের কয়েকজন সম্পাদিকা
  • গ্রামের নাম আনোয়ারপুর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • Developed by: Sparkle IT