ধর্ম ও জীবন

বাংলাকাব্যে মহানবী (সা.)

মাজহারুল ইসলাম জয়নাল প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-১১-২০১৮ ইং ০১:২৭:০৮ | সংবাদটি ৪৫ বার পঠিত

পৃথিবীর প্রায় ভাষাতেই হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর চরিত্র তুলে ধরা হয়েছে। রাসূল (সা.) এর মহব্বতে যুগে যুগে দেশ-বিদেশের অগণিত কবি রচনা করেছেন তাঁদের হৃদয় উৎসারিত পংক্তিমালা। আরবি, ফার্সি, হিন্দি, উর্দু তথা বিভিন্ন ভাষায় নিবেদিত পংক্তিমালাগুলো প্রশংসার দাবিদার। ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমে (১২০৩ ঈসায়ী) তুর্কিবীর ইখতিয়ার উদ্দীন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজী কর্তৃক বঙ্গবিজয় বাংলাভাষা ও সাহিত্যের বিপুল কল্যাণ বহন করে এনেছিল। তখন থেকেই বাংলা কাব্যসাহিত্যে রাসূল (সা.) কে নিয়ে লেখালেখিও শুরু হয়। বাংলা কাব্যসাহিত্যের ধারায় ইসলামি ঐতিহ্যের যে রূপ পরিলক্ষিত হয় তা এসেছে নানা সূত্রে ও বিচিত্রভাবে। ‘মুহাম্মদ’ (সা.) শব্দটি বাংলাসাহিত্যে প্রথম ব্যবহৃত হয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ বা চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। রামাই পন্ডিতের ‘শূন্যপুরান’ এর নিরজ্ঞনের রুষ্মাতে এভাবে মুহাম্মদ (সা.) এর নামটি এসেছিল-ব্রম্মা হৈল মঁহামদ/ বিঞ্চু হৈলা শুলপানি।/ গণেষ হৈলা গাজী/ কার্তিক হৈলা কাজী/ ফকির হৈলা যতমুনি।
বাংলাসাহিত্যের প্রথম মুসলিম কবি হিসেবে যাকে গণ্য করা হয়, সেই শাহ মুহাম্মদ সগীর (১৩৩৯-১৪০৯) থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত সকল কবির বাংলাকাব্যে প্রিয় নবী (সা) এর প্রসঙ্গ লক্ষ্য করা যায়। শাহ মুহম্মদ সগীর তাঁর সর্বপ্রথম প্রকাশিত ‘ইউসুফ জোলেখা’ কাব্যে লিখেছেন-‘জীবাতœার পরমাতœা মুহাম্মদ নাম/ প্রথম প্রকাশ তথা হৈল অনুপাম।/ যতো ইতি জীব আদি কৈলা ত্রিভূবন/ মুহাম্মদ হন্তে কৈলা তা সব রতন।’
১৫ (পনেরো) শতকের বিখ্যাত কবি জৈনুদ্দীন প্রথম ‘রসূল বিজয়’ কাব্য রচনা করেছেন। এর মাধ্যমে একাধারে ইসলামের ইতিহাস, ইসলামি সংস্কৃতি, ধর্ম-বিশ্বাস ও মূল্যবোধ প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি লিখেন, ‘রাসুল বিজয় বাণী অমৃতের ধার/ গুণীগণ মনে আনন্দ অপার।/ শান্ত দান্ত গুণবস্ত ধৈর্যবন্দ হৃদি/ শাহমুহাম্মদ হলো সর্বগুণ নিধি।’
কবি দৈলত উজির বাহরাম খান তার বিশাল কাব্য (লায়লি মজনু) বিরচন করেন (১৫৬০-১৫৭৫ ঈসায়ি) তাতে প্রণামহুঁ আল্লাহ নিবেদনের পর মুহাম্মদ (সা.) এর প্রশংসা করে সাত অধ্যায়ে লিখেন-‘প্রণামহুঁ তান সখা মুহাম্মদ নাম/ এ তিন ভূবনে নাহি যাহার উপাম/ আদি অন্তে মুহাম্মদ পুরুষ অতুল/ স্থলশূণ্য না আছিল, আছিল রসুল।
কবি দৈল উজির বাহরাম খানের কবিতা থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে মুহাম্মদ (সা.) এর সাথে তুলনা করার মতো কোনো বস্তু তিন ভুবনের মধ্যে নেই। তিনি সর্বগুণে গুণান্বিত মহামানব। মহাকবি সৈয়দ আলাওল (১৬০৭-১৬৮০ ঈসায়ি) ছিলেন ম্যধযুগের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ মুসলিম কবি। মুহাম্মদ (সা.) এর পবিত্র নূর যে প্রথম সৃষ্টি এবং এ নূরে মুহাম্মদ থেকে তামাম পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়েছে বলে লোকমুখে শোনা যায়। এই সৃষ্টিতত্ব কবি আলাওল তার সুবিখ্যাত ‘পদ্মাবতী’ কাব্যে অধিকতার স্পষ্ট ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন-‘পূর্বেতে আছিল প্রভু নৈরূপ আকার/ ইচ্ছিলেক নিজ সখা করিতে প্রচার/ নিজ সখা মুহাম্মদ প্রথম সৃজিলা/ সেই জ্যোতির মূলে ভূবন নির্মিলা।’
মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্যের আরেক দিক পাল হচ্ছেন কবি হেয়াত মামুদ (১৬৮০-১৭৬০ ঈসায়ি) তিনি একজন ধর্মপরায়ন মানবতার কবি ছিলেন। মুহাম্মদ (সা.) এর অনুসরণ ব্যতিত পৃথিবীতে শান্তি আসতে পারে না, এ কথাটি তিনি সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। যেমন-‘নবীর চরণে বন্দো করিয়া ভক্তি/ যাহার চরণ বিনে অন্য নাহি গতি/ মুক্তিপদ হতো যার কলেমা পড়লে/ অনন্তকালে উদ্ধারিত উম্মত আপনে।’
মধ্যযুগে বাংলাকাব্যে রাসূল (সা.) কে নিয়ে আরো অনেকেই লিখেছেন। প্রত্যেক কবিই মুহাম্মদ (সা.) এর আদর্শে অসংখ্য মূল্যবান নাত রচনা করেছেন। যা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অবদানের ক্ষেত্রে প্রশংসার দাবিদার। উনবিংশ শদাব্দীতে রাসূল প্রেমিক লেখকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন, মীর মোশারফ হোসেন, মহাকবি কায়কোবাদ, মোজাম্মেল হক, খন্দকার শামসউদ্দিন সিদ্দিক, মুন্সী মেহেরুল্লাহ, মনিুরুজ্জামান ইসলামাবাদী প্রমুখ। মীর মোশারফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২) লিখেন-‘তুমি হে ইসলাম রবি/ হাবিবুল্লাহ শেষ নবী/ নত শিরে তোমায় সেবি/ মুহাম্মদ ইয়া রাসূলুল্লাহ’।
মীর মোশারফ হোসেনের এই কবিতা আজও মিলাদ মাহফিলে গাওয়া হয়। যা রাসূল প্রেমিকদের মনে তৃপ্তি যোগায়। মহাকবি কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫১) তাঁর সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘গওছপাকের প্রেমের কুঞ্জি’ এর প্রথম কবিতায় লিখেছেন-‘পান করেনে ওরে পথিক/ রাসূলের সেই প্রেমের সুরা/ তুলনা যার নাইকো ভবে/ স্বর্গের সে শারাবান তহুরা’।
বিশশতকের শুরুতে নাতে রাসূল (সা.) রচনায় যাদের বিশেষ অবদান রয়েছে তাঁরা হলেন- আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কবি গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ, বন্দে আলী মিয়া, পল্লী কবি জসিম উদ্দীন, কাজী কাদের নেওয়াজ প্রমুখ। কবি গোলাম মোস্তফার (১৮৯৭-১৯৬৪ ঈসায়ি) অমর কাব্যগ্রন্থ ‘বিশ্বনবী)’ যা বাংলাসাহিত্যকে বিশ্বময় আলোকিত করেছিল। তিনি লিখেছেন-‘তুমি যে নূরের রবি/ নিখেলের ধ্যানের ছবি।/ তুমি না এলে দুনিয়ায়/ আঁধারে ডুবিত সবি।’
ইসলামি রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদের সুবিখ্যাত ‘সিরাজাম মুনিরা’ প্রকাশিত হয় ১৯৫২ ঈসায়ি সালে। তাঁর কাব্যে রাসূল (সা.) এর কথা এসেছে এভাবে-‘কে আসে কে আসে সাড়া পড়ে যায়/ কে আসে কে আসে নতুন সাড়া।’
বাংলাকাব্যে নাত রচনায় উল্লেখযোগ্য অবস্থান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬ ঈসায়ি)। তিনি রাসূল (সা.) এর প্রেম উজ্জিবিত একজন কবি ছিলেন, সেজন্যই তিনি রাসূল (সা.) কে নিয়ে অসংখ্যা গজল রচনা করেছেন। নজরুলের সবগুলো নাত-ই মর্মস্পর্শী। তাঁর কয়েকটি নাতে রাসূলের কলি এখানে তুলে ধরছি-‘ত্রিভূবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলোরে দুনিয়ায়/ আয়রে সাগর আকাশ বাতাস দেখবি যদি আয়।’/ ‘মুহাম্মদ নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে/ তাই কিরে তোর কন্ঠেরই গান এত মধুর লাগে?/ ‘মুহাম্মদ মোর নয়নমনি, মুহাম্মদ মোর জপমালা/ ঐ নামে মিটাই পিয়াসা, ও নাম কাওসারের পিয়ালা।’/ নজরুলের আরো ক’টি বিখ্যাত নাতে রাসূল-/ ‘নাম মোহাম্মদ বল রে মন, নাম আহমদ বল’/ ‘তৌহিদেরই মুর্শিদ আমার মোহাম্মদের নাম’/ ‘তোমার নামে এ কী নেশা হে প্রিয় হযরত?/ ‘এ কোন্ মধুর শরাব দিলে আল আরাবি সাকি!’/ মোহাম্মদ নাম যতই জপি ততই মধুর লাগে/ নামে এত মধু থাকে কে জানিত আগে?’/ ‘ইয়া মোহাম্মদ বেহেশত হতে খোদা পাওয়ার পথ দেখাও’ প্রভৃতি।
হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে নিবেদিত কাব্যমালা ও নাতে রাসূল রচনা বর্তমান সময়েও অব্যাহত রয়েছে। রাসূলের ভালোবাসায় সাম্প্রতিক সময়ে লিখে গেছেন, কবি সৈয়দ আলী আহসান, দেওয়ান আজরফ, আব্দুল মান্নান সৈয়দ আফজাল চৌধুরী, মতিউর রহমান মল্লিক, গোলাম মোহাম্মদসহ অনেকেই। এখনও লিখে যাচ্ছে কবি আল মাহমুদ, রুহুল আমিন খান, আল মুজাহিদী, মোশাররফ হোসেন খান, আসাদ বিন হাফিজ, কালাম আজাদ, রাগিব হোসেন চৌধুরী, মুসা আল হাফিজ সহ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শীর্ষস্থানীয় কবিবৃন্দ। এছাড়া তরুণ পর্যায়ে এ চর্চা অব্যাহিত রয়েছে। বাংলা ভাষায় যুগে যুগে অসংখ্যা কবি সাহিত্যিক রাসূলের শানে রচনা করেছেন বহু সাহিত্যকর্ম। যা বাংলাভাষাকে করেছে সমৃদ্ধশালী।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT